প্রভাব নয়, দেশ স্বাধীন করতে পারার সুখানুভূতি তাড়িত করে মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহেদ আলীর


প্রকাশিত : November 1, 2019 ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: বয়স তখন ৩৭ ছাড়িয়েছে। সংসারে নির্ভরশীল পিতা মাতা আর স্ত্রীসহ রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। হঠাৎ করেই চারিদিকে বেঁেজ ওঠে যুদ্ধের দামামা। এ যুদ্ধ শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষিত কোটি জনতার।
বছর ছয়েক আগেই ইপিআরের প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি সদ্যই আনছার বাহিনীর প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার সুযোগও মিলেছে তার। এমতাবস্থায় দু’দিক থেকে ডাক পড়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণের।
একপক্ষ পাকিস্থানী শাসকগোষ্ঠী, যারা কিনা ভারত বিভাগের পরবর্তী দুই যুগ ধরে পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর অবিরাম নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। আর দ্বিতীয় পক্ষ শাসকগোষ্ঠীর ওই অনাচার রুখে দিয়ে নুতন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
শক্তিশালী শাসক শ্রেণি, নাকি শাসিত লক্ষ কোটি অত্যাচারিত সাধারণ মানুষের পক্ষে লড়বেন-এমন দোদুল্যমান অবস্থায় পিতা গোরাই গাজীর সাথে পরামর্শে বসেন তিনি। অল্পক্ষণের আলাপচারিতায় বাপ-বেটার মিলিত সিদ্ধান্তে এপ্রিলের প্রথমভাগেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাড়ি ছাড়েন আব্দুল ওয়াহেদ।
শ্যামনগর উপজেলা সদরের গোপালপুর গ্রামের নিভৃত পল্লীতে চার ছেলে ও তিনি মেয়েসহ স্ত্রী আর নাতি-পুতিদের নিয়েই এখন সময় কাটে তার। পার্থিব জগতের শেষের সময়টা নামাজ কালাম আর জিকির আজগারে মত্ত থাকা মো. আব্দুল ওয়াহেদ জীবনের সেরা প্রাপ্তি হিসেবে দেশকে স্বাধীন করার সুখানুভূতির কথা জানান।
তার দাবি প্রভাব প্রতিপত্তি কিংবা ক্ষমতা কোনকিছুই তাকে টানে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন স্বশস্ত্র সৈনিক হওয়া সত্ত্বেও অর্থ কিংবা বিত্ত বৈভব করতে না পারার জন্যও তার কোন আক্ষেপ নেই। বরং অপ্রকাশযোগ্য অনেক আনন্দ রয়েছে দেশকে স্বাধীন করা যোদ্ধাদের কাতারে সামিল হতে পারায়।
নুতন বাংলাদেশ গড়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণের যে গৌরব তা ভাষায় প্রকাশ করার নয় উল্লেখ করে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়াহেদ জানান, কোন কিছুর লালসায় পড়ে যুদ্ধে যায়নি। শুধমাত্র দেশমাত্রিকার স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার কারনে তাই জীবনে আর কোন অপ্রাপ্তি নেই বলেও জানান এ বীর যোদ্ধা।
যুদ্ধকালীন স্মৃতিকথা এবং ঘটনাবলী নিয়ে কথা বলতে যেয়ে সদ্য পঁচাশি বছর পেরুনো এ বীরযোদ্ধা কেঁদে ফেলেন। অশ্রুসজল চোখে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, স্বাধীনতার এতদিন পরেও স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে বিতর্ক তাকে ব্যথিত করে।
নিজ অঙিনায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা স্মরণে তিনি জানান, যুদ্ধের শেষ দিকে একটানা পাঁচ দিন পর্যন্ত না খেয়ে যুদ্ধ করেছেন অপরাপর সহযোগীদের সাথে মিলে। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগেও গল্লামারী এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অবস্থান করে যুদ্ধ করার সময়ে চাউল আর পানি খেয়েও কাটিয়েছিলেন তারা।
তবে এতসব কষ্টের পরও দেশ স্বাধীন করার খুশিতে পরবর্তীতে সব কষ্টই মুহুর্তেই উধাও হয়ে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, টাকা পয়সা কিংবা অর্থ সম্পদ না থাকলেও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মানুষ যে সম্মান করে-সেটাই সর্বোত্তম প্রাপ্তি। রাস্তাঘাট কিংবা পথে প্রান্তরে যেখানেই মানুষের সাথে দেখা হয়, সেখানে সবাই সালাম জানিয়ে বীর যোদ্ধা হওযার সুযোগে যে করমর্দন করে তাতে যেন প্রাণটা জুড়িয়ে যায়।
নুরনগর বলফিল্ড এর পাশের যুদ্ধে তার গুলিতে পাক জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার জন্য ক্যাপ্টেনের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি গুলির সুত্রপাত ঘটান। ঐ যুদ্ধে তার গুলিতে পাক জওয়ানের মৃত্যুর পর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিমুখী আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পাক সেনাদের পিছু হটার ঘটনা তাদেরকে আরও বেশি আত্মবিশ^াসী করে তোলে বলেও জানান একাত্তরের রণাঙ্গনের এ বীর সেনা।
জানা যায়, শুরুতে তিনি ভারতের বিহার হয়ে বশিরহাটের জামতলা ক্যাম্পে যেয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এ কে ফজলুল হকের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম লিপিবদ্ধ করান। প্রশিক্ষণ শেষে অন্যদের সাথে তাকে শুরুতে নৈকাটি ও রতনপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলকায় অভিযানে অংশ নেন তিনি। এসব এলাকার অপারেশন শেষে তাকে আবারও ভারতের হিঙলগঞ্জ ক্যাম্পে ফিরিয়ে নেয়ার পর নুতন করে দায়িত্ব দিয়ে খুলনার ডুমুরিয়া ও গল্লামারীসহ আশপাশের এলাকায় পাঠানো হয়।
নুরনগর এবং গল্লামারীর দুটি অপারেশন আজও তার শরীরের রক্ত সঞ্চালনা বাড়িয়ে দেয় জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি মানুষ যেন তার নায্য সম্মান এবং অধকার ভোগ করতে পারে-স্বাধীন এ রাষ্ট্রের কাছে এটাই তার একমাত্র কামনা।
উল্লেখ্য, ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন হুদা ও ক্যাপ্টেন বেগের অধীনে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন মো. আব্দুল ওয়াহেদ। জায়গা-জমি কিংবা সহায় সম্পত্তি না থাকলেও স্বল্প শিক্ষিত এ বীর যোদ্ধা ছোট্ট একটি চায়ের দোকান পরিচালনা করে নিজ সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। খুব বেশি শিক্ষিত করতে না পারলেও তিনি তার প্রতিটি সন্তানকে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের মতো উপযোগী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হওয়ায় আজ তারা প্রত্যেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী। হাফিজুর রহমান নামের তারই এক সন্তানের উদ্যোগে এতদাঞ্চলে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড নামীয় একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ করার বিষয়টিও তাকে আলোড়িত করে বলেও জানান এ বীর যোদ্ধা।