বিলীন হয়ে যাচ্ছে প্রমত্তা যমুনা: দেখবে কি সদাশয় কতৃপক্ষ?


প্রকাশিত : November 3, 2019 ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: এককালের প্রমত্তা যমুনা নদীর শেষ অংশটুকুও দখলের মহোৎসব চললেও দেখার কেউ নেই। স্থানীয়রা প্রতিদিন জমির অগ্রভাগ দাবী করে একট্ ুএকটু করে যমুনাকে গিলে ফেললেও জনপ্রতিনিধি থেকে প্রশাসন কারও কোন মাথা ব্যথা নেই।

কদাচিৎ দুই/একজন প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তি বা পরিবেশ সচেতন ব্যক্তি যমুনা দখলকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার  হলেও অজ্ঞাত কারণে কৃতপক্ষের নীরবতার সুযোগে ভূমি দস্যুরা অব্যাহতভাবে দখল বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে শ্যামনগরের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত আদি যমুনার বিভিন্ন অংশ ঘুরে এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে সরকারি এসব জায়গা দখলের পর তা নাকি রীতিমত লাখ লাখ টাকায় হাত বদলও হচ্ছে। সামগ্রিক বিষয়ে পাউবো কতৃপক্ষ অবহিত থাকার পরও তারা পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসব জায়গা উদ্ধারে কোন উদ্যোগই নিচ্ছে না।

উল্লেখ্য শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদী ছিল এ অঞ্চলের ব্যবসা বানিজ্যের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। তাছাড়া এলাকার জলাবদ্ধতা দুরীকরনে দীর্ঘসময় ধরে এ নদীটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে আসলেও গত কয়েক দশকে প্রভাবশালীদের দখল বানিজ্যে মৃতপ্রায় নদীটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। দখলদারদের আগ্রাসনে কালের স্বাক্ষী যমুনা এখন পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে দখলদারগণের অব্যাহত অপতৎপরতায় গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে শ্যামনগর সদরসহ আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরী হয়। গোটা বর্ষা মৌসুম ধরেই উপজেলা পরিষদ এলাকা, হাসপাতাল ও নকিপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, উত্তর বাদঘটা, নকিপুর বাজার, কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, নকিপুর পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কাছড়াহাটিসহ আশপাশের বহু এলাকা দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে নিমজ্জিত থাকে।

আবুল খায়ের ও আজিজুল ইসলামসহ অনেকেরই দাবি যমুনা অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় বর্ষার সময় সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশ একে অপরটি থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কেবলমাত্র পানিবন্দী অবসথার সৃষ্টি হওয়াতে।

আর পানি নিস্কাশনের সুযোগ না থাকার দরুন উপজেলা সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষি জমির ফসল তলিয়ে যাওয়া ছাড়াও এসব অংশের পুকুর ডোবা একাকার হয়ে যাওয়ায় মৎস্য সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার অপেক্ষায় থাকা যমুনার চর ও পাড়ে শত শত স্থাপনা গড়ে তুলেছে স্থানীয়রা। কেউ কাঁচা আবার কেউ পাকা ইমারত নির্মান করে দিব্যি দখল করে রাখার পাশাপাশি পাশর্^বর্তী অংশে নুতন করে মাটি ভরাট করে সীমানার আয়তন বাড়িয়ে নিচ্ছে। অনেকে আবার যমুনা পাড়ের একাধিক স্থানে স্থাপনা নির্মান করে তা ভাড়া দেয়ার পাশাপাশি এক থেকে দেড় দুই লাখ টাকায় পর্যন্ত বিক্রি করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাদঘাটা গ্রামের কয়েকজন জানান সম্প্রতি জহুর গাজীল ছেলে একব্বার গাজী যমুনা পাড়ে তার দখলে থাকা জমি জনৈক রুবেল মিয়ার কাছে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করেছে। পরবর্তীতে রুবেল মিয়া সেখানে একতলা আলিশান বাড়ি তৈরী করে বসতি গড়ার পর বিল্ডিং বাড়ির পাশে মাটি ফেলে যমুনার আরও কিছু অংশ দখল করে নিয়েছে।

প্রায় অভিন্ন ঘটনার জম্ম দিয়ে যমুনাকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে জনৈক জামান, সাব্বির ও মলয় কুমারসহ আরও অনেকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়দের অনেকে জানান, যমুনা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের হলেও উক্ত দপ্তরের একটি মানুষও গত এক দশকে যমুনা দখলকারীদের বিরুদ্ধে তৎপরতা দেখায়নি। যার ফলে অতি উৎসাহী হয়ে সময়ের স্বাক্ষী প্রমত্ত্বা যমুনা সম্পুর্নভাবে গিলে খেতে স্থানীয় ভূমিদস্যুতা দিনের পর দিন বিনা বাধায় অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

জাহিদুল ইসলাম ও হাফিজুর রহমানসহ অনেকে অভিযোগ করেন স্থানীয় একটি ভূমিদস্যু গ্রুপ অর্থেও বিনিময়ে যমুনা পাড়ে বসবাসরতদের একাধিক জাল কাগজ তৈরী করে দিয়েছে। এসব কাগজকে পুঁজি করে যমুনাকে গিলে খাওয়ার প্রতিযোগিতায় সামিল ব্যক্তিরা সরকারি এসব জমি স্ট্যাম্পের উপর লেখালেখি করে বেঁচা বিক্রি করছে।

কয়েকটি চক্র ইতোপূর্বে ইউনিয়ন তহশীল অফিস সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে যমুনার উপর বন্দোবস্তসুত্রে পাকা স্থাপনা তৈরী করেছে বলেও জানায় স্থানীয়রা। এসব দখলবাঁজ ভূমিদস্যুদের অপতৎপরতার কারনে আদি যমুনা এখন অনেক জায়গায় বদ্ধ পুকুরে পরিনত হয়েছে বলেও দেখা মেলে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের পরবর্তী সময়ে সাতক্ষীরার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আ খ ম ডাঃ রুহুল হকের ঐকান্তিক চেষ্টায়র্  কালিগঞ্জ ও শ্যামনগরের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহমান যমুনার কালিগঞ্জ অংশে পুনঃ খনন কাজ শুরু হয়। ঐ পুন:খনন কাজ কালিগঞ্জ অংশে অনেকটা সফলভাবে সম্পন্ন হলেও তার কোন প্রভাব শ্যামনগরে না পড়ায় উপকুলবর্তী এ উপজেলার বিভিন্ন অংশের জলাবদ্ধা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

এ প্রসংগে যমুনা বাঁচাও আন্দোলন কমিটির নেতা সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-ই এলাহী বলেন, শ্যামনগর সদরের জলাবদ্ধতা দুরীকরণে চন্ডিপুর থেকে শ্মশানঘাট পর্যন্ত যমুনা খনন খুবই জরুরী। ইতোমধ্যে সাতক্ষীরার প্রান সায়েরসহ জেলার মোট পাঁচটি খাল পুন:খনন কাজের উদ্যোগ নেয়ায় মাননীয় জেলা প্রশাসকের ভুয়সী প্রশংসা করে তিনি যমুনার শ্যামনগর সদর অংশকেও এবারের খণন কর্মসুচির অর্ন্তভুক্ত করার দাবি জানান।

এদিকে শ্যামনগর সদরকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষাসহ আদি যমুনার শেষ চিহ্ন রক্ষার জন্য অতিসত্ত্বও চন্ডিপুর এলাকা থেকে শ্মশানঘাট পর্যন্ত যমুনাকে দখল করে তা পুন:খননের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ জেলা প্রশাসকের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী।