প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন

গুলশান আরা: বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে দুই কোটিরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী অধ্যায়ন করে থাকে। বিগত বছরগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি পেলেও তাদের মানসম্মত পড়াশোনা নিশ্চিতকরণ বিষয়টি এখনও একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষক, শিক্ষাদান ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসকল উদ্যোগের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন একটি অন্যতম উদ্যোগ।

প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা বিভিন্ন মূল্যায়নের সাথে পরিচিত। যেমন ক্লাস টেস্ট, সাপ্তাহিক টেস্ট, যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা, বিদ্যালয়ের সাময়িক পরীক্ষা প্রভৃতি। তবে এই মূল্যায়ণ সাধারণত দুই ধরনের হয়। ১. লিখিত, ২. মৌখিক।

জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ণ কী?

এটি একটি নমুনা ভিত্তিক মূল্যায়ন। আদর্শমান বজায় রেখে প্রণীত ৩৫/৪০টি অভিক্ষা পদের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর কৃতিত্ব পরিমাপের উদ্দেশ্যে এক বছর অন্তর পরিচালিত জাতীয় কৃতি অভিক্ষার মাধ্যমে এ মূল্যায়ন করা হয়। এটি বাংলাদেশের শতকরা ৯৪ ভাগ শিক্ষার্থীর শ্রেণি বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা অর্জণের প্রতিরূপ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

সরকারিভাবে পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, এবতেদায়ী মাদ্রাসা, ব্র্যাক সেন্টার, সদ্য জাতীয় করণকৃত বিদ্যালয়, রক্স স্কুল  ও উচ্চ বিদ্যালয়ে এটি পরিচালনা করা হয়ে থাকে। এ কৃতি অভীক্ষা ২০০৬, ২০০৮, ২০১১, ২০১৩, ২০১৫ ও ২০১৭সালে একই নিয়মে পরিচালিত হয়।

জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ণের উদ্দেশ্য:

জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ণের উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ:

১. তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জণের মাত্রা যাচাই করণ।

২. ভালো ওকম ভালো বিদ্যালয় গুলোতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা।

৩. মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর শিখনস্তর চিহ্নিত করে নীতি প্রনয়ণের জন্য সুপারিশমালা উপস্থাপন করা।

৪. স্বল্প মেয়াদি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গতিশীলতা ও মান নিশ্চিতকরণে সহায়তা করা।

২০১৫সালের ফলাফল:

২০১৫সালের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ণের ফলাফলে দেখা যায় তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বিষয়ে প্রতি ৩ জনে ২জন প্রত্যাশিত যোগ্যতা অর্জণ করেছে। ১ জন পারেনি। আর গণিত বিষয়ে প্রতি ৫জনে ২ জন প্রত্যাশিত যোগ্যতা অর্জণ করতে পেরেছে, ৩ জন পারেনি। ৫ম শ্রেণির বাংলা বিষয়ে প্রতি ৪ জনে ১ জন প্রত্যাশিত যোগ্যতা অর্জণ করেছে, ৩ জন পারেনি। গণিত বিষয়ে প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১জন শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত যোগ্যতা অর্জণ করতে পেরেছে, ৯ জন পারেনি।

মন্তব্য: সাধারণত যেসকল শিক্ষার্থী বাড়িতে পাঠ্যবই ছাড়া অন্যান্য বই পড়েছে, তাদের বাংলা ও গণিতে ফলাফল অপেক্ষাকৃত ভালো হয়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই এর পাশাপাশি সমমানের বই পড়া এবং বাড়িতে অনুশীলনে আগ্রহী করে তুলতে হবে।

শিক্ষকদের জন্য করণীয়:

প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজ গতিতে  ভিন্ন ভিন্নভাবে শিক্ষা অর্জণে সহায়তা করতে পারে। দূর্বল ও ধীর  গতি সম্পন্ন শিক্ষার্থীর প্রতি যতœশীল হতে হবে। প্রতি বিষয়ে শিক্ষার্থীর শিখনদূর্বলতা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থী জ্ঞানমূলক ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল করলেও উপলব্ধি ও প্রয়োগমূললক প্রশ্ন বোঝা ও উত্তর দেয়ার ক্ষেত্রে ভালো করতে পারেনা। তাই তাদেরকে এসকল যোগ্যতা ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করতে হবে। পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য পাঠ্য বিষয় ছাড়াও তাদের বেশি করে গল্প, কবিতা, ছড়া, পত্রিকা প্রভৃতি পড়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। ঝরে পড়া রোধে বিশেষ যতœ নিতে হবে। বিদ্যালয়ের সাথে অভিভাবক ও এলাকাবাসির নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে।বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দিবসে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে।

জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে প্রাপ্ত ফলাফল সুপারিশমালা:

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান ও শিক্ষার্থীদের অর্জিত যোগ্যতা যাচাইকরণ এবং প্রাপ্ত ফলাফল কাজে লাগিয়ে দূর্বলতা সমূহ কাটিয়ে উঠতে জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়ে থাকে। এর সাধারণত ৫টি উদ্দেশ্য থাকে। যথা:-

১. নীতি প্রনয়ণ এবং অন্য তথ্যের সাথে এতে প্রাপ্ত তথ্যকে তুলনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

২. মান নির্ধারণ করা।

৩. বিদ্যালয়ে সহায়ক উপকরণ সরবরাহ করা।

৩. শিক্ষাক্রমে পরিমার্জণ ও পরিবর্তণে সহায়তা করা এবং

৫. পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাক্রমকে পুন:বিন্যাস করা।

দেশব্যাপী জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করা হয় সীমিত পরিসরে। বেশিরভাগ শিক্ষক ও শিক্ষক কর্মকর্তা এ সমীক্ষা পরিচালনার সাথে পরিচিত নন। সুতরাং তাদেরকে আরও ব্যাপকভাবে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। তাহলে জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বিষয়টি আরও সফল হবে। লেখক: প্রধাণ শিক্ষক, ফিংড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সদর, সাতক্ষীরা