সর্বসাধারণের দাবি: উচ্ছেদ অভিযান যেন লোক দেখানো না হয়


প্রকাশিত : নভেম্বর ৪, ২০১৯ ||

শ্যামনগর প্রতিনিধি: সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারি সম্পত্তি থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারনের চলমান কার্যক্রম যেন লোক দেখানো অভিযানে পরিনত না হয় সে দাবি জানিয়েছে সাধারন মানুষ। কোটি টাকা আর হাজার হাজার কর্ম ঘন্টা ব্যয় করে পরিচালিত এ অভিযানের দীর্ঘমেয়াদী সুফল যেন এলাকাবাসী ভোগ করতে পারে সেজন্য কতৃপক্ষের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছে সর্বস্তরের জনগণ।

উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক গত কয়েক মাসজুড়ে সারা দেশব্যাপী সরকারি সম্পত্তি থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারনের কার্যক্রম শুরু হয়। যার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, বিআইডব্লিউটিএ এবং রেল কতৃপক্ষ অবৈধ দখলদারদের কবল হতে প্রচুর পরিমানে সরকারি সম্পত্তি নিজেদের জিম্মায় নিয়েছে।

এদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত সুন্দরবনকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং সাতক্ষীরাকে বাসউপযোগী একটি পরিচ্ছন্ন জনপদে পরিণত করতে সম্প্রতি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনও বেশকিছু উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যার অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে সওজ কর্তৃপক্ষ যশোর থেকে মুন্সিগঞ্জ ও ভেটখালী পর্যন্ত বিস্তৃত আঞ্চলিক মহাসড়কের দু’পাশের যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা অপসারণের কাজ শুরু করেছে।

রাস্তার দু’পাশ থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের এ কার্যক্রমকে ইতোমধ্যে সাধুবাদ জানিয়েছে সর্বস্তরের জনগণ। ফুটপাথ দখল করে কাঁচা-পাকা স্থাপনা তৈরীসহ নানা প্রকারের মালামাল স্তুপাকারে রাখায় এতদিন আঞ্চলিক এ মহাসড়ক নামমাত্র চলাচলের রাস্তা হিসেবে সাধারণের কাছে পরিচিত ছিল। আর সওজ এর অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তিসহ ফুটপাত পর্যন্ত দখল হয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনা ছিল নিত্যকার ঘটনা। তাই দীর্ঘদিন পরে হলেও সওজ এর জায়গা উন্মুক্ত করাসহ যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা অপসারণ কার্যক্রম শুরু হওয়াতে দুর্ঘটনা কমে যাবে বলে প্রত্যাশা সাধারণ পথচারীসহ সর্বমহলের।

পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িত সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-ই এলাহী বলেন, মূল সড়ক ছাড়া অবশিষ্ট সরকারি সম্পত্তি এতদিন অবৈধ দখলদারদের কব্জায় ছিল। অনেকে আবার রাস্তার পাশ ঘেঁষে স্থাপনা গড়ে তুলেছে। যে কারনে সংকুচিত হয়ে পড়া রাস্তা ছাড়াও বিভিন্ন ঘনবসতিপুর্ন এলাকার সড়কে মৃত্যুর মিছিল দিনে দিনে দীর্ঘায়িত হচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের সহায়তায় সওজ কতৃপক্ষ সড়কের দু’পাশের যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়ায় নিশ্চিতভাবে দুর্ঘটনা কমবে। একই সাথে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় থাকা সুন্দরবন দর্শনে আসা মানুষের কাছে পরিচ্ছন্ন এবং  চমকপ্রদ একটি জনপদ হিসেবে সাতক্ষীরা উপস্থাপিত হবে।

অভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেন অধ্যাপক নুরুল আফছার, প্রভাষক দেবাশীষ মিস্ত্রি আর শহিদুল ইসলামের মতো আরও অসংখ্য মানুষ। তাদের সকলেরই অভিমত দুর্ঘটনা কমানোর পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোসহ পরিচ্ছন্ন সাতক্ষীরা গড়তে সড়কের পাশের অবৈধ স্থাপনা অপসারণের বিকল্প নেই। অন্যান্যবারের চেয়ে এবারের অভিযান ফলপ্রসু হবে বলে মনে হচ্ছে জানিয়ে তারা বলেন, উদ্ধারকৃত জায়গায় সবুজ বনায়ন করে পুনরায় অবৈধ স্থাপনা তৈরীর পথ বন্ধ করতে হবে।

এদিকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের চলমান অভিযান নিয়ে নিজেদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে বিদ্যালয় পড়–য়া শিশু শিক্ষার্থীরাও। নকিপুর এইচ সি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ইয়াছিন আকরাম নিয়াজি, তামিম ও নাহিদসহ অনেকে জানায় রাস্তার দু’পাশ দখল হয়ে যাওয়ায় তারা বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে সার্বক্ষণিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকে। ফুটপাতের কোলঘেঁষে অনেকে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলায় ফাতিমা নামের এক শিশুসহ বসতি স্থাপনকারী পরিবারেরও অনেক সদস্য মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হয়। বাসযোগ্য সুন্দর একটি জনপদ উপহার দেয়ার জন্য মাননীয় জেলা প্রশাসকসহ সওজ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও রাখেন তারা।

এদিকে নকিপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন তাদের বিদ্যালয়ের প্রবেশ পথের বিপরীত অংশে রাস্তার কোলঘেঁষে শত শত অবৈধ স্থাপনা। আর ঐসব স্থাপনার কারণে দুরপাল্লাসহ আঞ্চলিক রুটে চলাচলরত বাস অনেকক্ষেত্রে দৃষ্টি সীমায় না আসার কারনে তাদের বহনকারী ভ্যানসহ ছোট যানসমুহ প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে তারা বিদ্যালয়ের প্রবেশপথসহ সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ উন্নত করার দাবি জানান।

এদিকে চলমান উচ্ছেদ অভিযান মাঝপথে আটকে যাওয়াসহ উদ্ধার হওয়া জায়গাসমুহে নির্দিষ্ট সময় পরে নুতন করে স্থাপনা গড়ে ওঠা নিয়ে অনেকে তাদের সংশয়ের কথা জানিয়েছে। প্রভাষক ধনঞ্জয় মল্লিক ও সংবাদকর্মী মোস্তফা কামালসহ নকিপুর এবং বাদঘাটা গ্রামের কয়কজন বলেন, আগেও এমন উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। তবে যথারীতি কিছুদিন পার হতেই পুরানো স্থাপনাসমুহ আবারও যথাস্থানে ফিরে এসেছে। তাই চলমান উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পর উদ্ধারকৃত জায়গায় যাতে নুতন করে স্থাপনা গড়ে না ওঠে সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরেজমিনে আঞ্চলিক এ মহাসড়কের শ্যামনগর ও বংশীপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সওজ কর্তৃপক্ষের প্রচারনার পর বেশকিছু পাকা স্থাপনা নিজ উদ্যোগে অপসারণ করেছে অনেকে। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও অদ্যাবধি কোন কাঁচা স্থাপনা কেউ অপসারন করেনি। বরং অপসারিত পাকা স্থাপনার জায়গা ঘেরাবেঁড়া দিয়ে ঘিরে রাখার চেষ্টা করছে উদ্ধার অভিযান শেষে ঐসব জায়গা নিজেদের দখলে নেয়ার অভিপ্রায়ে।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ধারনা অভিযান স্বল্প সময় ধরে চলবে। বিশেষ বিশেষ কিছু স্থানে কতকগুলো পাঁকা স্থাপনা অপসারিত করেই অভিযানের সমাপ্তি ঘটবে। যে কারনে তারা নিজেদের কোন কাঁচা স্থাপনা অপসারণ করছে না। যদিও কয়েকজনের দাবি রাস্তার দুপাশে শত শত কাঁচা স্থাপনা রয়েছে। অন্যরা সেসব স্থাপনা অপসারণ করছে না, বরং অভিযান বন্ধের চেষ্টা চলছে বলে জানানোর কারণে তারাও নিজেদের স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছে না।

তবে আবুল বাসার ও কেরামত আলীসহ উত্তর বাদঘাটা কলোনী পাড়ার কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, আপাতত টিভি ফ্রিজ আর আলমারীসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনিসপত্র তাদের পুরানো বাড়িতে রেখে দিয়েছে। কাঁচা ঘর ও প্রতিষ্ঠানসহ টল দোকাসমুহ উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় আসবে কিনা তা নিশ্চিত না হয়ে নিজেদের এসব অবৈধ স্থাপনা সরাতে নারাজ স্থানীয়রা।

আয়েশা বেগম, শারমিন সুলতানা ও আব্দুল জলিল এবং খোকন গাজীসহ অনেকের দাবি রাস্তার পাশে দীর্ঘদিন ধরে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছিলেন। এ উচ্ছেদ অভিযানে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোপুর্বেকার অভিযানের পরপরই সরকারি জায়গা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হলে তারা দ্বিতীয়বার ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না বলে জানান।

এদিকে উচ্ছেদ কার্যক্রম যেন লোক দেখানো অভিযানে পরিনত না হয়-এমন দাবি জনিয়ে স্থানীয়রা বলছে অভিযানকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে। সাতক্ষীরা এবং দেবহাটা এলাকার সফল উচ্ছেদ অভিযানের পরপরই শ্যামনগরের বেশকিছু অবৈধ দখলদার দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে বলেও দাবি তাদের। সরকারি সম্পত্তিতে গড়ে তোলা নিজেদের অবৈধ স্থাপনা রক্ষার জন্য তারা সর্বাত্বক চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও তথ্য মিলেছে।

তবে সওজ এর দায়িত্বশীল একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদকসহ সংবাদকর্মীদের নিশ্চিত করেছে সওজ এর জায়গা উদ্ধারে কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের আপোষ করবে না।