খোলা কলাম: ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনে গোবর কি অপরিহার্য?


প্রকাশিত : নভেম্বর ৬, ২০১৯ ||

কামারুজ্জামান: শরীফ সাহেব সত্যিকার একজন শরীফ আদমী। মার্জিত স্বভাবের ভদ্রলোক; বেশ সৌখিন, পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন। এই লোকটিই ভোরবেলায় আমার দ্বারে হাজির। উদ্দেশ্য, তার কিছু গোবর চাই। উল্লেখ্য, তার বাড়ি গরু নেই, আমার বাড়িতে আছে। কিন্তু কেন ? তার বাড়িতে ডিপ টিউবওয়েল বসানো হচ্ছে, অনেক গোবর দরকার। আমি একটু থমকে গেলাম। কারণ গোবর দিয়ে টিউবওয়েল বসানোর পক্ষে আমি নই। কিন্তু উনাকে ‘না’ বলাও আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া আমি না দিলেও ‘বাই হুক অর বাই ক্রুক’ গোবর তাকে ম্যানেজ করতেই হবে। অতএব আমি তাকে পুরো এক ভ্যান গোবর দিলাম। অত:পর তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে তার বাড়ির দিকে রওনা হলাম। দূর থেকে বাঁশের টাওয়ার ও লোকজনের কোলাহল ডিপ টিউবওয়েলের আগমনী জানান দিতে লাগল। আমি সেখানে পৌঁছে গোবরের স্তুপ দেখতে পেলাম। শরীফ সাহেবের বাড়ি রেডিও আছে। তখন সকাল সাতটার বাংলা সংবাদের পর দেশাত্ববোধক গান সম্প্রচারিত হচ্ছেÑ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি …।’ এর পরের লাইনটি আমি যোগ করে দিলাম। সেখানে হেডমিস্ত্রিকে পাওয়া গেল। তাকে গোবর দেওয়ার হেতু জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি যা বললেন, তার সারমর্ম মোটামুটি এই, গোবরের তেলতেলে নাল-নাল ভাব নাকি পাইপ-বোরিং করার সময় ইঞ্জিন-অয়েল, মোবিল বা গ্রিজের মতো কাজ করে। এরচেয়ে বেশি আর কোন যুক্তিনির্ভর, বিজ্ঞানসম্মত বা সন্তোষজনক উত্তর তার জানা ছিল না। একটু পরে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আসলেন। তিনিও ওই একই ধরনের উত্তর দিলেন এবং এও নিশ্চিত করলেন যে, সরকারি নির্দেশিকায় কোথাও এভাবে গোবর দেওয়ার নির্দেশনা নেই। অথচ সারা বাংলাদেশে সম্ভবত এমন একটি ডিপ টিউবওয়েলও নেই, যেটা গোবর ছাড়া বসানো হয়েছে। এখান থেকে কিছুকাল আগেও প্রতিটা ডিপ টিউবওয়েলের জন্য অন্তত টন খানেক করে গোবর পাইপের গোড়া দিয়ে ভূগর্ভে প্রেরণ করা হতো। এখন অবশ্য কিছুটা কম, তবে একবারে কম নয়। যদি কেউ তর্কের খাতিরে দাবী করে যে, খুব সামান্যই দেওয়া হয়, তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায়, যেখানে সরকারি নির্দেশনায় মোটেই নেই, সেখানে সামান্যই বা কেন, বিশেষ করে পেয় পানির কূপে! গোবরের সবচেয়ে বড় পরিচয়, এটা বিষ্ঠা আর বিষ্ঠা মানেই অত্যন্ত ঘৃণ্য বস্তু, যার সামান্য পরিমাণও পানিতে মিশ্রিত হয়ে গলাধঃ হওয়া কল্পনাও করা যায় না। একটা বিশেষ ধর্মে গরু আরাধ্য ও পূজ্য জীব; গোবর পবিত্র, সেব্য ও তাদের ভাষায় ‘পঞ্চগব্যে’র মধ্যে অন্যতম এবং গো-চোনাও অতি পবিত্র পানীয়। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে তা তো নয়। অত:পর স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মতে গোবর ভক্ষণ মানেই কলেরা-ডাইরিয়ায় আক্রান্ত হওয়া। এতদ্সত্ত্বেও, গোবর তো বটেই, এমন কি কুকুরের বিষ্ঠা, বিড়ালের মল, শিয়ালের পুরিষ, হাঁসের পায়খানা, মুরগীর… কিংবা এর চেয়েও ঘৃণ্য কিছু প্রয়োগ করার স্বীকৃত বিধান থাকলে, তা শিরোধার্য। কিন্তু না থাকলে, ডিজিটাল বাংলাদেশে গোবর মেরে এনালগ পদ্ধতিতে বিষ্ঠা-চর্চা করা বড়ই বিস্ময়ের। ডিপ টিউবওয়েল তো শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র বিশ্বে পোঁতা হয়। সেখানেও কি গোবর দেওয়া হয়? কখনোই না। এদেশের রাষ্ট্রধর্ম নাকি ইসলাম। সেই ইসলামের বিধানে গোবর ও মানুষের পায়খানা নাপাকির বিচারে সমান। দুটোই নাজাসাতে গলীজা বা বড় নাপাকি। কিন্তু গরু গৃহপালিত প্রাণি হওয়ার কারণে গোবর আস্তে আস্তে গা-সহা হয়ে গেছে। তাই বলে গোবর কস্তূরী হয়ে যায়নি; বিষ্ঠা বিষ্ঠাই রয়ে গেছে। শরয়ী বিধান হচ্ছে, প্রবাহিত পানিতে নাপাকি পড়লে, ওই পানি নাপাক হয় না, যেমন জোয়ার-ভাটার খাল, নদ-নদী বা সাগরের পানি। তাই বলে কি তুরাগ বা বুড়িগঙ্গার চরম দূষিত পানি আমরা পান করি ? কখনোই না। পেটের পীড়া হয়ে মরার ভয়ে পান তো দূরের কথা, ওই পানি মুখেও নিই না। অনুরূপভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ‘জারী-পানি’র অন্তর্ভূক্ত। তাই সেখানে কোন নাপাকি প্রবেশ করালেও, সে পানি নাপাক হয় না এবং পান করতে নিষেধ নেই। তাই বলে বিনা প্রয়োজনে মনগড়া খেয়াল-খুশীর বশবর্তী হয়ে ভূগর্ভস্থ নির্মল পানিতে মল প্রয়োগ করা কি কোন বিবেকসম্পন্ন দায়িত্বশীল মানুষের কাজ হতে পারে? কখনোই না। যে কূপে বিষ্ঠা প্রয়োগ করছি, সেই নলকূপ থেকেই আবার পানি তুলে বেদম খাচ্ছিÑএটা কি কোন রূচিশীল জ্ঞানবান লোকের কাজ হতে পারে? কখনোই না। এর সুদূরপ্রসারী স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে। কারণ ভূগর্ভে পচনক্রিয়া কম। সেখানে যে কোন দ্রব্য যুগ যুগ ধরে অবিকৃত অবস্থায় থাকে। তাই তথায় গোবর ঢোকানো হলে, দীর্ঘদিন যাবৎ সেই গোবর ক্রমমৃদু মাত্রায় হলেও, পানির সাথে মিশে ‘গোবর-গোলা পানি’ হয়ে উপরে উঠে আসবেÑএটাই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, গোবর ঢেলে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের পর প্রথম কয়েক দিন পানিতে গোবরের গন্ধ পাওয়া যায়। অতএব বিষয়টা যে ক্লিন-সাতক্ষীরা বা ক্লিন-বাংলাদেশের সাথে সাংঘর্ষিক, এতে কোন সন্দেহ নেই। যে দেশ অচিরেই উন্নত বিশ্বের কাতারে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে, সেখানে এখনো কেন গোবরে কারবার ? সঠিক নির্দেশনা মেনে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপিত হোকÑএটাই কাম্য। মনুষ্য-বর্জ্যরে চাপে মহাসমুদ্রের পানিও যেমন ক্রমশ দুষিত হয়ে পড়ছে, মহাকাশেও ভেসে বেড়াচ্ছে বিজ্ঞান-গবেষণার পরিত্যক্ত বর্জ্য, তেমনিভাবে এভাবে চলতে থাকলে, ভূগর্ভস্থ পানির ভা-ারও হয়ত একদিন দুষিত হয়ে পড়বে, যা সময়ের ব্যাপার মাত্র। লেখক: কামারুজ্জামান, রতেœশ্বরপুর, দেবহাটা, সাতক্ষীরা