খোলা কলাম: সুস্থ দেশীয় সংস্কৃতি চর্চায় তরুণদের ভূমিকা


প্রকাশিত : নভেম্বর ৮, ২০১৯ ||

খাদিজা ইসলাম মেঘনা: একটি জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের অভিজ্ঞতা তার সংস্কৃতি। এই অভিজ্ঞতা জনগোষ্ঠী অর্জন করে তার জীবনযাপনের নানাবিধ উপাদানের মধ্য দিয়ে। এসব উপাদানের মাত্রা ব্যাপক। এই ব্যাপক মাত্রার উপাদান জনগোষ্ঠীর জীবনে সবসময় একরকম থাকে না। উপাদানের সঙ্গে নারী-পুরুষের সম্পর্কের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইতিবাচক ও নেতিবাচক ভাবনার সংমিশ্রণ ঘটে-তা বহুবিধ চেতনার একটি স্রোতে প্রবাহিত হয়। ফলে তা হতে পারে দুর্বল, অসুস্থ; হতে পারে পরিশীলিত, হতে পারে রুচি ও অরুচীশীল। এটি নির্ভর করে, সেই জনগোষ্ঠীর তরুণরা কীভাবে নিজেদের গড়ে তুলছে তার মৌল সত্যের ওপর।

সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনা একটি জাতির জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সহায়ক শক্তি। এ শক্তি ছাড়া মানুষের জীবনযাপন ¤্রীয়মাণ হয়ে পড়ে-উপলব্ধিতে, আচার-আচরণে এবং মৌলিক সত্যে। সংস্কৃতি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের মূলসূত্র নির্ধারণ করে। ভালোমন্দ বোধ তৈরির মাপকাঠিও সংস্কৃতি। সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ছাড়া জনগোষ্ঠী তার জীবনপ্রবাহকে সচল রাখতে পারে না। সংস্কৃতির প্রবাহ অসুস্থ হলে চোরাবালিতে পথ হারায় জীবনদর্শন। এর ফলে জনগোষ্ঠী যাযাবর মানুষের মতো উদ্বাস্তু শরণার্থী জাতিতে পরিণত হয়।

সংস্কৃতির নানা উপাদন থাকে এবং তা গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। এক সময় এ দেশে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পরে জীবিত নারীকে সহমরণের জন্য চিতায় তুলে দেয়া হতো। শাস্ত্রের বিধান এমন কঠিন ছিল। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাগ্রসর চেতনার মানুষ এই ব্যবস্থা আইন করে নিষিদ্ধ করেছেন। তাতে শাস্ত্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। আলোকিত হয়েছে নারীর জীবন।

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে একসময় অগ্রহায়ণ ছিল শুরুর মাস। এখন বাংলা বর্ষশুরুর মাস বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ শুধু বাংলা ক্যালেন্ডারের একটি দিন মাত্র নয়। এর নানামুখী মাত্রা আছে, আছে গভীর ব্যাপক অর্থবহ শেকড়-সন্ধানী অনুপ্রেরণা। বাংলা সন বাঙালির দিনযাপনের সঙ্গে যতটা না সম্পৃক্ত তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পৃক্ত জাতিগোষ্ঠীর মানবিক বোধের সাধনা-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দীপশিখায়।

মাতৃভাষা সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে কোনো জাতি তার গৌরবের জায়গা তৈরি করতে পারে না। সংস্কৃতি পরিশীলিত হয় ভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত করে। আর তাই মায়ের মুখের ভাষাকে ভূলুন্ঠিত হতে দেয়নি বাংলার তরুণরা। বাংলাদেশের তরুণরা ভাষা আন্দোলনে জীবন দান করে ছিনিয়ে এনেছিল মাতৃভাষাকে। জাতির পিতা যেমন বিশ^সভায় একটি নতুন দেশের হাজার বছরের চলমান ও রক্তমাখা বাংলা ভাষা’য় ভাষণ দিয়ে চির জাগরুক করে রেখেছন বাংলা ভাষা আর বাঙালি পোশাক।

গণমাধ্যম সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে সময় ও জীবনের প্রয়োজনে রুখে দাঁড়িয়েছিল গণমাধ্যম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবরুদ্ধ দেশবাসী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বিবিসি শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতো। দুটো বেতার কেন্দ্রে থেকে প্রচারিত খবরের প্রতিটি অক্ষর, এমন কি সংবাদ পাঠকের কন্ঠস্বর এবং নি:শ্বাস পর্যন্ত মানুষের বিশ্বাসের জগতে থিতু হয়ে থাকতো।

বাঙালির ঐক্যের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল একাত্তর। সেসময় গ্রামেগঞ্জে, শহরে গৃহবন্দি নারী-পুরুষ কান পেতে রাখতো মুক্তিযোদ্ধার পায়ের শব্দ শোনার জন্য। মুক্তিযোদ্ধার আগমনকে ঘিরে প্রতীক্ষার অবসান ঘটতো নারীর। শত্রু সেনার ভয় উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের আলোয় ঘরের দরজা খুলে দিত নারী। যোদ্ধা ছেলেরা যদি বলতো-মা ভাত দাও! তখন প্রবল দখিনা বাতাসে উড়ে যেতো নারীর ভয়। স্বপ্ন ফুটে উঠতো ঘরের চালে, যেন পূর্ণিমার আলোতে স্নান করার অলৌকিক কাজ সম্পন্ন হতো নারীর জীবনে। এক আশ্চর্য সময়ের বিশাল ব্যাপ্তি ছিল জীবনে। সংস্কৃতি হয়ে উঠেছিল অবিনাশী জীবনের বাতিঘর।

এখনও মানুষ আছে মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য। এখনও সঙ্গীত-নাটক-সাহিত্য-শিল্প আছে মানুষকে উজ্জীবিত রাখার জন্য। এখনো বাংলা নববর্ষ, নবান্ন উৎসব আছে মানুষকে ঐক্যের ডাক দেয়ার জন্য। এখনো অমর একুশের চেতনা আছে পথ নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য। এখনো শহীদ মিনার আছে মানুষকে সংগ্রামের পথে ডেকে তোলার জন্য। একাত্তরের গৌরব আছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য।

মৌলবাদী জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা যখন ভাস্কর্য ভাঙে, তার বিপরীতে তরুণ ছেলেমেয়েরা সাংস্কৃতিক গণজাগরণে প্রতিরোধের অবিনাশী আয়োজন করে। এখনো শান্তির পক্ষে আছে নাটক, গণসঙ্গীত, অবিনাশী কবিতার পংক্তিমালা, পেমের পল্লীগীতি, ইতিহাস ও সামাজিকতার যাত্রাপালা, জারি সারি কবিগান ওয়াজ মাহফিল। এ জাতির হাজার বছরের এসব সংস্কৃতির চর্চা দিয়েই তরুণরা জয় করতে পারে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মানবতার হৃদয়কে। এ বাংলাদেশে তারুণ্যের শক্তির আছে নানা উদাহরণ। তারুণ্যের শক্তিই পারে এই আয়োজনকে মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে এবং অপসংস্কৃতি প্রতিরোধের বিশাল দেয়ালটি গড়ে তুলতে। হে তরুণ তোমাদের প্রতি রইল জাতির সাদর সম্ভাষণ।