আধ্যাতিœক লালনের কিছু অলৌকিকতা


প্রকাশিত : নভেম্বর ৮, ২০১৯ ||

জি.এম.এমদাদ
লালন নিঃসন্দেহ একজন আধ্যাতিœক মানুষ এ ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ নেই। কারণ মানুষ তার জীবনের কোনো না কোনো অবস্থায় নিজের মধ্যে এ অনুভূতির সন্ধান লাভ করতে পারে। বিশেষ করে ধর্মের মৌল অনুভূতি মানুষ এই আধ্যাতিœক মানস দ্বারাই অনুধাবন করতে শেখে। আধ্যাতœাবাদের লক্ষ্যে পরম সত্ত্বাকে চেনা বা জানা এ আকাঙ্খা মানষের চিরন্তন। মানুষ ত আশা আকাঙ্খা চরিতার্থ করার মানসে হদয়ের মধ্যে সেই পরম সত্ত্বার সন্ধান লাভ করে তার সাথে নিবিড় যোগসূত্রে মিলিত হয়।
মানুষের মনের কালিমা, আবিলতা, জটিলতা, কুটিলতা, লোভ- লালসা, হিংসা, দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, কাম-ক্রোধ প্রভৃতি নীচতা দূর করে পরম সত্ত্বার সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং তার প্রেম ও সান্নিধ্য লাভের জন্য সদা সচেষ্ট থাকতে হবে এবং সকল পাশরিকতা বিসর্জন দিয়ে স্রষ্টার গুনে বিভূষিত হওয়ার মধ্যেই মনুষ্য জীবনের সার্থকতা। তাইতো যুগে যুগে আধ্যাতিœক সাধকগণ মেন জ্ঞান সাধনায় মশগুল থেকেছেন,তেমনি তাদের উপলব্ধ জ্ঞান বিশ্ববাসীকে জানাবার প্রয়াস পেয়েছেন।লালনও এদিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। আধ্যাত্ববাদের গন্ধ তার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করি। যখন লালন বলেন,
“সময় গেলে সাধন হবে না
দিন থাকতে দিনের সাধন
কেন করলে না।”
আধ্যাত্বিকতার পাশাপাশি অলৌকিকতারও সন্ধান লাভ করি লালনের ভিতর। তার জীবনটাই যেন অলৌকিতায় মোড়া। তাইতো এখনো আমাদের খুজে ফিরতে হয় লালন হিন্দু না মুসলিম। লালনের ধর্ম কি ? সককিছুর উর্ধ্বে মানবধর্ম । এই মানবধর্মকে উদ্বে রাখতে গিয়ে নিজেে সেভাবেই তৈরী করেছেন। যার জন্য তিনি আজগবেষনার বস্তুতে পরিনত হয়েছেন। আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তর তিনি তার অসংখ্য গানে প্রকাশ করেছেন। জাতের বিচার করতে গিয়ে বলেন,
“সব লোকে কয় লালন ফকির
কোন জাতের ছেলে
লালন কয় জাতের কিরূপ
দেখলাম না নজরে।”

এখন আমর তার কিছু অলৌকিতার বিবরণ তুলে ধরবো। জনশ্রুতি আছে,সাত বছর ধরে লালন পদ্নাবতীর গৃহে কাটান। পদ্নাবতীর গৃহে যাবার সময় সাধুদের একটি সভায় লালন যোগদেন।সভায় পন্ডিত সাধু জনেরা লালনের কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন জানতে চান। লালন যেসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। এরপর খাবার সময় এলে সেখানকার সাধুরা লালনকে মুসলমান বলে দূরে বসিয়ে আলাদাভাবে খেতে দেন।একসময় সাধুগণ আশ্চার্য হয়ে লক্ষ্য করলেন যে,তাদের দু’ জনের মধ্যে একজন করে লালন বসে আছেন এবং লালন তাদের সঙ্গেই বসে খবার খাচ্ছেন।সাধুগণ হতবাক হয়ে যান এ কান্ড দেখে। যে লালন কে তারা দূরে সরিয়ে রাখলেন অবঙ্গ করে সেই লালনই তাদের পাশে বসে আছেন।তখন সবাই মাথানত করে তার পায়ের কাছে পড়লেন এবং কান্নাকাটি করতে লাগলেন,ভুলের জন্য বারবার ক্ষমা চাইতে লাগলেন।লালন তাদের গানে বোঝালেনÑ
“তিন দিনের তিন মর্ম জেনে
রসিক সাধন ধরে এক দিনে।”
জানা যায় বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে কালীগঙ্গা নদীর তীরে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় লালনকে উদ্ধার করেন মলম বিশ্বাস নামের একজন কারিগর। একমাস অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থেকে মলম ও তার স্ত্রীর সেবা শুশ্রুষায় সুস্থ হয় উঠেন। সুস্থ হবার পর মলম কারিগরের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন।কিন্তু মলম ও তার স্ত্রী লালনকে ছেড়ে দিতে নারাজ।এমন অবস্থায় লালন তাদের সাথে দূর্ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হচ্ছে না দেখে একরকম জোর করেই রেগে-মেগে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হন। এসময় মলম বাড়ি ছিল না তার স্ত্রী পথ আগলে দাড়ালে লালন আরো রেগে যান।এমন সময় মলম বিশ্বাস বাড়ি এসে হাজির হন। লালনের মতিগতি দেখে মলম ভাবলেন কোন কিছুতে যখন কাজ হলনা তখন আর একটা ফন্দি আটা যাক।মলম তখন লালনকে বললেন এতোদিন আমার বাড়িতে তোমার যে সেবাযতœ করলাম এর মূল্য দিয় যাও।লালনের কাঁধে একট ঝুলি ছিল, তখনই তিনি ঝুলিতে হাত ডুকিয়ে একটা সোনার মোহর বের করে দেন।
মনিরুদ্দিন নামের একজন জোতদার ছিলেন। তিনি লালনের বাউল মতবাদ ও গান বাজনা করা খোদা ভজনার বিরোধী ছিলেন। একদিন তিনি মনস্থির করেন যে, ছেঁউড়িতে এসে যে কোন প্রকারে লালনকে এসব বন্ধ করবেন। ঘোড়ায় চড়ে এসে জানতে চান-কোথায় সে ফকির ? আমি আজ তাকে দেখ নেবো। একথা শুনে লালন স্বভাবসুলভ আখড়া থেক বেড়িয়ে এসে বললেন,এই যে বাবা মনিরুদ্দিন তুম এসেছ? আমি তো তোমার জন্য কতদিন অপেক্ষা করে আছি। লালনের মুখের দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত ক্রোধ পানি হয়ে গেল।তিনি তার শিয্যত্ব গ্রহণ করলেন এবং বাকি জীবন লালনের সঙ্গে কাটিয়ে দেন। এই মনিরুদ্দিনই মনির শাহ।
তেমনি কুষ্টিয়ার কুমার খালি একটি বাউল সংঘ লালন ফকিরকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসে।সেখানে চাঁদ আলী গাজী ও ফরাহতউল্লাহ-নামের দু’ জন ব্যক্তি লালনের সাথে অযথা তর্ক শুরু করেন। এক পর্যায়ে লালনের মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করার জন্য উদ্যত হন। ঠিক তখনই তাদের বাড়ি ঘরে আগুন ধরে যায়।অতপর তারা লালনের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হন এবং তার শিয্যত্বা গ্রহণ করেন। পরে লালন এদেরকে চক্কর শাহ ও ফক্কর শাহ বলে ডাকতেন।
মৌলবি দবীরউদ্দীন এক মহিষের গাড়ি বোঝাই হাদিস দলিল-ফতোয়ার কেতাব নিয়ে পন্ডিত হাজী হাসান কে সঙ্গে নিয়ে বাহাছ করতে আসেন লালনের কাছে। দবিরউদ্দীন লালন শাহর কাছে এলে শর্ত স্থির হলো তর্ক-বিতর্ক চলাকালে কেহই কোন কাজে উঠতে পারবে না। এমন কি খাওয়া-দাওয়া, গোসল, পায়খানা-প্রস্রাবের জন্যও না। এভাবে দু’ সপ্তাহ পর্যায়ক্রমে তর্কে অবতীর্ন হয়ে লালনের কাছে পরাজয় স্বীকার করেন। এরপর তারা দু’জনেই লালনের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে দীক্ষার জন্য ভিক্ষাপ্রার্থী হন।পরে এই দবিরউদ্দীন ‘দুদ্দু শাহ’নাম ধারন করে লালনের একান্ত শিয্য হয়ে যান।দুদ্দু শাহ নিজেই স্বীকার করেছেন-
“বাহাছ করিতে গিয়া বায়াৎ হনু
আমি অতি অভাজন লালন সাই বিনু।”
জানা যায়, একদিন লালন শাহ বর্তমানে নদীয়া জেলার অন্তর্গত বানপুর মাটিয়ারী এলাকায় এক সাধু সংঘে যোগ দেবার জন্য যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে শশ্বানে একটি মেয়ের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।শশ্বানে উপস্থিত লোকদের কাছে জানতে পরেন, সাপের কামড়ে মেয়েটির মৃত্যু হয়েছে। তিনি তাদের মতামত নিয়ে মৃত দেহটির পরীক্ষা করেন। তাকে বাঁচাতে পারলে চিরদিনের জন্য তাঁকে দিবেন কি-না এ ব্যাপারে মেয়েটির অভিভাবকদের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করেন। তারা সম্মতি হলে লালন শাহ মেয়েটির পায়ের আঙ্গুলের ক্ষতস্থানে মুখ লাগিয়ে বিশ তুলে এনে তাকে বাঁচিয়ে তোলেন। মেয়েটির নাম ছিল শ্রীমতি।তিনি ছিলেন ব্রাম্মণ কন্যা।মৃত্যুর পর নবজীবন লাভ করে শ্রীমতি -‘মতিবিবি’ হয়ে লালনের সাধন সঙ্গিনী হিসেবে আজীবন কাটিয়ে দেন।এসব অলৌকিক ঘটনা অনেকেই বিশ্বাস করেন আবার অনেকেই করেন না। ঘটনা সত্য হোক আর মিথ্যা হোক সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা লালনের সময় এখানকার মানুষের মধ্যে মানুষের জাতিভেদ ছিল প্রচুর।হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদ ছিল। লালন ফকির সে সমস্ত ভেদাভেদ দূর করার জন্য মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং মানুষের আস্থা অর্জন করেছন।