গোপন কথা


প্রকাশিত : নভেম্বর ৮, ২০১৯ ||

শরীফ সাথী
বিকালে তীরধরা দ্বীপের মায়াবী পরিবেশে দাদু ও নাতির মজাদার আড্ডার মাঝে হঠাৎ নাতি বলল,
দাদু তুমি আজ বহু পুরোনো রুপ কথার গল্প শোনাও না? বাস্তবতার দিন-কাল ঠেলে।
-নাতি ভাই, তাহলে আমি আমার দাদুর কাছে যে গল্প শুনেছিলাম দর্শনা কেরুর কেন্টিনে বসে চা খেতে খেতে সেই গল্পটিই আজ তোকে বলে শোনায়Ñ।
দিন আনা দিন খাওয়া যার সংসার, ব্যাথায় যার কুঠার বসায় বুকে তার নাম ব্যথু হলে দোষ কী? হাবাগোবা ভ্যান চালক কার্পাসডাঙ্গা বাজারের। পাঁচ বছরের ঘর-সংসারে আজও প্রদ্বীপ জ্বালাতে পারিনি। বউটার সুরোত ভালো। তাইতো বাপু পড়শীর মনটা আলো।
সকালে ঘুম থেকে ওঠা মাত্র বাড়িয়ালা (বউ) ঝোলা ধরে দিল ব্যথুর হাতে, সাথে দিল পাঁচ টাকা। এই শোন, (কর্কশ কন্ঠে বলে) পাঁচ টাকার কিছু খেয়ে নেবে? আর বাড়ি আসার সময় অবশ্যই দুই কেজি চাল আর সাথে বাজার থাকে যেন?
কুল আটি ভরা পায়ে ভ্যান চালকের কষ্ট হয় বৈকি । কি আর করা বউ তাড়া দেয়। কার্পাসডাঙ্গা বাজারে এসে ব্যথু ভাবছে, থাক এ টাকা আর খাবো না, যদি ভাড়া না হয়। ভাবতে ভাবতে এক ফট্কা বাজের আবির্ভাব ঘটলো । বলে, এই চুয়াডাঙ্গা যাবে ? ব্যাথু বলল, যাব মিয়া সাব, ভাড়া কিন্তু ত্রিশ টাকা দেওয়া লাগবে। পকেট যার ফাঁকা, তার কি আর হয় চোখ বাঁকা। ভ্যানে চেপে বসে চলল দুজন ।

পথি মধ্যে ব্যথুর প্রশ্ন Ñমিয়া সাব কী করেন?
-সোজা সাপ্টা উত্তর-কথা বেঁচে খাই।
-সে আবার কেমন কথা?
-তুমি যদি জানতে চাও প্রতি কথার দাম দশ টাকা লাগবে। শুনবে তুমি?
ব্যথু মনে মনে ভাবলো ত্রিশ টাকার মধ্যে দশ টাকা যায় যাক। শুনিই না একটি কথা। ফটকাবাজের প্রথম কথা
-ফেলিসতো দেখে শুনে ফেলিস।
কথাটা শুনে ব্যথু মুখস্ত করতে করতে চুয়াডাঙ্গা পৌছে গেল। লোকটি তো খুবই চিন্তিত। বাকি দশ টাকা কিভাবে দেবে। পকেট তো পুরো ফাঁকা।
ব্যথু আবার বলল, মিয়াসাব ভাড়া আর দিতে হবে না। আর একটি কথা শুনাওনা।
লোকটি হাসতে হাসতে বলল, বন্ধুদের সাথে মিশে গোপন কথা বলিও না।

লোকটি চলে যাওয়া মাত্র ব্যথুর মাথায় চিন্তার ভার বেড়ে গেল। কিভাবে যে আজকের বাজার হবে। বউতো আচ্ছা বকুনী দেবে। কথা শুনে তো এ ভাড়া মারা ত্রিশ টাকাও গেল। যাহোক মনের দুঃখে পাঁচ টাকা খেয়ে বড় বাজার ঘুরে ফিরে আসছে । ভ্যান ঘুরিয়ে চুয়াডাঙ্গার কোর্টের কাছে আসা মাত্রই কিছু লোক থামিয়ে তাকে বলল,
-এই এখানে এক বুড়ি মারা গেছে। দুইশত টাকা সবার কাছ থেকে তোলা হয়েছে তোমাকে দিচ্ছি যেখানে সেখানে ভাগাড়ে ফেলে চলে যেও?
কথা মতো ভাবলো, দুশো টাকা যদি হয়। এখানে কেউ তো আর আমার চেনেনা, বুড়ির তুলে নিয়েই যায়। বহু পুরোনো লেপ বালিশ সহ জড়িয়ে তুলে দিল সবাই মিলে।
পথিমধ্যে নদীর তীরে এসে ভ্যান ভিড়িয়ে বুড়িকে লেপ সহ টেনে ফেলে দিল। বুড়িতো গড়াতে গড়াতে নদীতে গেল। এদিকে ভ্যানের চাকার নাটে গেল বালিশের কোণা ছিড়ে আটকে । টানা হেঁচড়া করতেই কিছু পয়সা গড়িয়ে পড়লো।
ব্যথুর মনে হলো সেই কথা-ফেলিস তো দেখেশুনে ফেলিশ। ব্যথু বালিশ নাড়াতেই টাকা পয়সার আলামত বুঝে বালিশটা ভ্যানে রাখলো। পড়ে যাওয়া পয়সা গুলো রাখলো পকেটে। বুড়ির সারাজীবনের জমানো অর্থ বোঝাই বালিশ এখন ব্যথুর দখলে। ময়লা যুক্ত বালিশ ভ্যানে কেউ সন্ধেহ করবে না, এতে কী আছে। বাড়ি পৌছে ঘরের কোণের মাটি দিয়ে তৈরী কোলার ভিতর রাখলো সমস্ত টাকা পয়সা।

ব্যথু এখন প্রতিদিন বউয়ের কথা মতো ভালো ভালো বাজার করে। কিন্তু ভ্যান চালক আর ভ্যান ঠেলে না। রুপসী বউয়ের কথায় এনেছে এবার শ্যাম্পু , সুগন্ধি বাসনা তেল আরো অনেক পারফিউম। বউ নদীতে যায় তেল শ্যাম্পু নিয়ে। হঠাৎ এত সব পরিবর্তন দেখে ছিচকে চোরের বউ ভ্যান চালক ব্যথুর বউকে বলল,
-হ্যারে তোদের তো খুব অভাব ছিল , এসব কী ভাবে হলো?
ব্যথুর বউ বলল, আমার স্বামী আর ভ্যান চালায় না। তবে যা বলি তাই কিনে আনে ?
-তোর কথা সব শোনে বুঝি?
-হ্যাঁ ।
জবাব শোনা মাত্র চোরের বউটা বলল, তোর গলাটা বড্ড ফাঁকা লাগে, সোনার হার নিতে পারিসনে?
রাতে ব্যথুর কাছে আবদার করে বলল ,
-আমার সোনার হার কিনে দিবা কালকে?
যেমন কথা তেমন কাজ। পরেরদিন ঘাটে ব্যথুর বউয়ের গলায় পাঁচ ভরি ওজনের হার দেখে, চোখ উলটিয়ে কপালে গেল ছিচকে চোরের বউটার ।
পরদিন আবার বলল , তোর কান দুটি বড্ড ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে, সোনার দুল হলে ভাল হয়।
তার পরের দিন আবার দুল কানে ঘাটে ¯œান সারতে গেছে।
চোরের বউটা আবার বলল, হাত দু’টি একদম ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সোনার চুড়ি হলে তোর এই সুন্দর হাতে ভালোই মানায়।
কথা মতো পরের দিনই সোনার চুড়ি হাজির।
এত সব পরিবর্তন দেখে চোরের বউটা বলল, তোর স্বামী এত টাকা পায় কোথায়? তুই জিজ্ঞাসা করেছিস কনোদিন ? তুইতো ব্যথুর ঝলমলে টলমলে লক্ষি বউ। জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারিসনে?
এমন মিষ্টি করে বলা কথা শুনে ব্যথুর বউ বেজায় খুশি হয়ে রাত্রে ব্যথুকে আদর করতে করতে ঘটনা শুনতে চাইলে ব্যথু সরল সোজা মনে সব খুলে বলল। মাটির ঐ কোলার ভিতর টাকা পয়সা ভর্তি, সব সাজানে গোছানো।
পরদিন বাসনা তেল মাথায় দিতে দিতে চোরের বউ সব ঘটনা শুনে নিল। পরের রাত্রে যা হবার তাই হলো। কোলা সোজা বড় সিঁদ কেটে কোলা সহ সবকিছু চোর চুরি করে নিয়ে চলে গেল। ব্যথু ঘুম থেকে উঠে বউয়ের কথা মতো বাজারের ব্যাগ নিয়ে, পয়সা নিতে গিয়ে দেখতে পেল মাটির কোলাটি নেই। দেয়ালে সিঁদকাটা ।
-হায়! হায়! করে ব্যথু কেঁদে উঠল। বউটাও হাজির। দু’জনেই কাঁদতে লাগলো। ব্যথু গালে হাত দিয়ে ভাবতে লাগলো সেই কথা। গোপন কথা কাউকে বলিসনে। ব্যথু ঘরের বাতা থেকে নেকড়া টেনে ভ্যান মুছে আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো চিন্তার কাছে জীবন সঁপেÑ।
সত্যিই দাদুভাই, গোপন কথা বউকে না জানালে এমন ফল হতো না।
-হ্যাঁ নাতি ভাই? আজ উঠা যাক? তোর মা আবার তোকে খোঁজা খুঁজি করবে?
-চলো দাদু ভাই।