নিরব কান্না উপকূলের জেলে পল্লীতে: তিনদফা পাশ বন্ধের পর বুলবুলে পথে বসেছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ (ভিডিও)


প্রকাশিত : November 13, 2019 ||

সামিউল মনির, শ্যামনগর: তিন দফা সুন্দরবনে যেতি না দেয়ায় আমরা পথে বসে গেছি। এখন আবার বুলবুল এর কারনে মাছ কাঁকড়া ধরার পথ বন্ধ করলি আমরা সর্বশান্ত হবো। দয়া করে তোমরা একটু জানিয়ে দেও যেন সুন্দরবনে যাবার অনুমতি অন্তত মেলে।
সুন্দরবন তীরবর্তী মথুরাপুর জেলে পল্লীতে পৌছানোর পর কথাগুলো বলেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী মনসা মন্ডল। তিনি জানান স্বামীর একার উপার্জনে সংসার চলে না বলে তাকেও সুন্দরবনে যেতে হয় মাছ কাঁকড়া শিকারে। কিন্তু জুলাই থেকে বিভিন্ন কারণে তিন দফায় সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি না মেলায় এখন তারা তীব্র অর্থ কষ্টে ভুগছে।
তার উপর সদ্য ঘটে যাওয়া বুলবুল এর কারনে যদি আবার উপকুলবর্তী জনপদে বসবাসরত এ জেলে পরিবারগুলোকে বনে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করা হয় তাহলে “না খেয়ে মরার উপক্রম হবে” বলে দাবি তাদের।
প্রায় অভিন্ন কথা জানালেন কদমতলা ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন গ্রামের জেলে ফজের আলী মোল্যা। তিনি বলেন, জুলাই আগস্ট মাসে বনে যাওযার অনুমতি দেয়নি বনবিভাগ। পরে ইলিশ সংরক্ষণের কথা বলে সেপ্টেম্বর মাসেও পাশ দেয়া হয়নি। সর্বশেষ রাস মেলাকে কেন্দ্র করে নভেম্বরের ১২ তারিখ পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এখন যদি বুলবুল তান্ডবের কারনে আবারও মাছ কাঁকড়া ধরার কাজে বাঁধা দেয়া হয় তবে বাড়িঘর ফেলে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে।
‘হয় বনে যাবার অনুমতি দেক, না হয় লাইনে দে গুলি করে মেরে ফেলুক’- সংবাদকর্মী পরিচয় পেয়েই হন্তদন্ত হয়ে প্রতিবেদকের সামনে হাজির হয়ে কথাগুলো বলেন উত্তর কদমতলা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রউফ মোল্যা। ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত ওই বৃদ্ধ আরও বলেন, এক টানা চার মাস বনে যাতি না পেরে ধার দেনা করে চলতিছি, এখন আবার বনে যাবা আটকালি আমরা বাঁচবো কি করে’।
তবে এমন অভিযোগ আর আকুতি কেবল রউফ মোল্যা, মনিরুল, মাকফিজুল, সত্তোরর্ধ্ব নুরুল হক, বা মনসা মন্ডলের না। বরং মথুরাপুর জেলে পল্লী, সাধুপাড়া জেলে পল্লীসহ কদমতলা গ্রামের ফিরোজ, কেনা রাম ও হরশিদ মন্ডলসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিটি জেলে পল্লী হাজারও জেলের।
উপকুল ঘুরে দেখা গেছে সর্বত্রই এখন তীব্র অভাব আর অনটন শুরু হয়েছে। নিদারুন অর্থকষ্টে জীবনের কঠিন সময় পার করছে অসহায় দরিদ্র পরিবারগুলো। একাধারে প্রায় চার মাস তারা সুন্দরবনে প্রবেশ করতে না পারার দরুন আয় উপার্জন এর ক্ষেত্র হারিয়ে মোটের উপর সর্বশান্ত হয়ে গেছে এসব জেলেরা। তাদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে এবার নুতন করে যদি বুলবুলকে পুঁজি করে আবারও তাদের সুন্দরবনে যাওয়ার পথ আটকানো হয় সেক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে গোটা উপকূলজুড়ে।
সরেজমিনে মঙ্গলবার দুপুরে মথুরাপুর, কালিঞ্চি, কদমতলাসহ কয়েকটি জেলে পল্লীতে যেয়ে দেখা যায় বুলবুল এ বিধ্বস্থ ঘরবাড়ি ফেলে অলস সময় পার করছেন এসব জেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘদিন ধরে কোন আয় উপার্জন না থাকায় তীব্র অর্থকষ্টে ভুগতে থাকা এসব পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্থ ঘরবাড়ি মেরামত পর্যন্ত করতে পারছে না। তাদের দাবি “ঘরবাড়ি মেরামতে টাকা লাগে, আয় রোজগার না থাকলি সে টাকা আসবে কোথা থেকে’।
উল্লেখ্য আগামী জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারি দুই মাস সুন্দরবনে জেলেদের প্রবেশ করতে দেয়া হবে না কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুমের কারণে। এর আগে গত জুলাই আগষ্ট দুই মাস মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সুন্দরবনে জেলেদের প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে ইলিশের বংশ বিস্তারকে কেন্দ্র করেও জেলেদের সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে যাওয়া আটকে দেয় বনবিভাগ। যদিও সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীতে কোন ইলিশ থাকে না। এসময় ইলিশ শিকারের সাথে জড়িত জেলেদের সরকারি বিশেষ প্রণোদোনা দেয়া হলেও দক্ষিণ-পশ্চিম এ উপকুলীয় জনপদের একটি জেলে পরিবারও সে সুবিধা ভোগ করতে পারেনি। পরবর্তীতে হঠাৎ করেই বনবিভাগের আকস্মিক সিদ্ধান্তে ইলিশ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা হঠতে না হঠতেই রাস মেলাকে কেন্দ্র করেও জেলেদের সুন্দরবনে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বনবিভাগ।
এভাবে একের পর এক ঘোষনা দিনের পর দিন ধরে সুন্দরবনে যেতে না পারার দুরন পুর্বপুরুষদের মাধ্যমে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া এ উপকূলীয় জনপদের প্রায় তিরিশ হাজার জেলে পরিবার মারাত্মক দুরাবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছে।
এসব এলাকার জেলেরা জানায় তারা সুন্দরবনে যায় মাছ কাঁকড়া শিকারের জন্য। এখন উপকুলীয় জনপদের সিংহভাগ মানুষ সাশ্রয়ী চুলা অথবা সিলিন্ডার গ্যাস দিয়ে রান্নার কাজ করে। ফলে তারা কেউ আর সুন্দরবনের কাঠ ব্যবহার করে না। তাদের অভিযোগ যদি কাঠ কাটার সুযোগই না থাকে তবে বংশ পরম্পরায় চলে আসা সুন্দরবনে তাদের মাছ কাঁকড়া শিকারের ক্ষেত্রে বনবিভাগের আপত্তির কারন তাদের কাছে অজানা।
এদিকে উপকুলীয় জনপদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু জেলে অভিযোগ করেছে যে পাশ নিয়ে বনে প্রবেশের অনুমতি না দিলেও বনবিভাগের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা চুক্তিতে কোন কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও জেলেকে সুন্দরবনে যাওয়ার সুযোগ দেয়। তাদের অভিযোগ পাশ করে বনে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় সরকার রাজস্ব হারালেও কতিপয় বনরক্ষীর আয় উপার্জনে কোন ধরনের ঘাটতি থাকছে না। এসব জেলে দাবি জানিয়ে বলেন, যদি বনে যাওয়ার সুযোগ দেয়া না হয় তবে সুন্দরবনকে নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করে এখানে কর্মরত বনরক্ষীদের অন্যত্র সংযুক্ত করা হলে বনজীবিদের পাশাপাশি বনরক্ষীদের উপার্জনও বন্ধ হয়ে যেত।
তবে বুলবুলকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনে জেলেদের প্রবেশে নুতন করে কোন নিষেধাজ্ঞার জারির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি বনবিভাগ। এবিসয়ে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তাকে মুটোফোনে পাওয়া না গেলেও কদমতলা ষ্টেশন অফিসার বলেন, ১৩ নভেম্বর থেকে জেলেদের নুতন করে পাশ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বুলবুল এর আঘাতের পর জেলেদের বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। সুন্দরবনপ্রেমী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এ বনবিভাগ কর্মকর্তা আরও বলেন, মঙ্গলবার রেঞ্জ অফিসে যেয়ে জেলেদের জন্য ভাল কোন খবর পাওয়া যায়নি। উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ মাননীয় মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে সুন্দরবনে জেলেদের প্রবেশের অনুমতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে তিনি জেলেছেন।