আগরদাঁড়ি কামিল মাদ্রাসার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পালটাপালটি ৩ মামলা: আদালতের শো’কজ


প্রকাশিত : December 2, 2019 ||

নিজস্ব প্রতিনিধি: আগরদাঁড়ি কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতে আরও একটি মামলা হয়েছে। সাতক্ষীরা সদর সহকারি জজ আদালতে মামলাটি দাখিল করেছেন অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম কাশেমী। এতে বিবাদী করা হয়েছে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম মোর্শেদসহ ১৩ জনকে। আদালত শুনানিঅন্তে সকল বিবাদীদের শো’কজ করেছেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ৯ অক্টোবর হত্যার হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক মাদ্রাসার সভাপতিসহ কয়েকজন অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম কাশেমীর নিকট থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। উক্ত পদত্যাগপত্রটি অকার্যকরী ও অধ্যক্ষ পদে বহাল থাকার পক্ষে আদেশ প্রাপ্তির জন্য অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম এ মামলাটি দাখিল করেন। যার নং দেং-১৯৬/১৯। মামলার অপর আসামীরা হচ্ছে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আব্দুল খালেক। বিদ্যোৎসাহী সদস্য যথাক্রমে হাবিবুর রহমান, আবু সাইদ ও মাহফুজার রহমান। শিক্ষক প্রতিনিধি যথাক্রমে হাবিবুর রহমান, ক্বারী মিজানুর রহমান ও মল্লিক হাবিবুর রহমান। অভিভাবক সদস্য যথাক্রমে নাজমুল আহছান, আক্তার ফারুক ও মফিজুল ইসলাম। চিকিৎসক সদস্য ডাক্তার শেখ ফয়সাল আহম্মেদ ও দাতা সদস্য আব্বাস আলী।
প্রসঙ্গত: মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম কাশেমীকে গত ৯ অক্টোবর মাথায় পিস্তল ও গলায় চাকু ধরে জোরপূর্বক তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগে বাধ্য করায় তিনি গত ৫ নভেম্বর সাতক্ষীরার আমলি আদালতে একটি ফৌজদারী মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্ত করতে সিআইডিতে হস্তান্তর করেন। এ মামলা দাখিলের ১২দিন পর মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে সাতক্ষীরার বিজ্ঞ সিনিয়র স্পেশাল ট্রাইবুনালে অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম কাশেমী ও ২ জন শিক্ষক মো. মাহফুজুর রহমান ও ক্বারী মিজানুর রহমানকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজসে মাদ্রাসার বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। উল্লেখ্য গত ৩ নভেম্বর অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট বরাবর সভাপতি গোলাম মোর্শেদ এবং অধ্যেক্ষের বিরুদ্ধে মামলার বাদী হাবিবুর রহমান, আক্তার ফারুক ও মফিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি দিয়ে পদত্যাগে স্বাক্ষর করানো, চাঁদা দাবী ও চাঁদা আদায়ের বিষয়ে একটি অভিযোগ করেন।
আগরদাঁড়ী কামিল মাদ্রাসার অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে শিবপুর ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি শওকত হোসেন বলেন, ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় (সংশোধন) আইন ২০১০ এ মাদ্রাসার গভর্নিং বডির ক্ষমতা ও দায়িত্ব হচ্ছে, ‘মাদ্রাসার নির্বাহী সংগঠন হিসাবে এর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও তহবিল রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থকমিটি গঠন করা। অর্থ কমিমিটির সুপারিশ সমূহ অনুমোদন করা এবং এ কমিটি প্রতি মাসে কমপক্ষে একবার মাদ্রাসার হিসাব পরীক্ষা করা। মাদ্রাসা পরিচালনার জন্য নিয়মিতভাবে সভায় উপস্থিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং মাদ্রাসার বার্ষিক আয়-ব্যায় ও হিসাব নিরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা’। অথচ আগরদাঁড়ী কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডি ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের ওই নিয়ম ভঙ্গ করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। যার প্রমাণ হিসেবে অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম কর্তৃক মাদ্রাসার সভাপতি গোলাম মোরশেদ, আ’লীগ নেতা হাবিবুর রহমান হবিসহ অন্যান্য সদস্যসের বিরুদ্ধে আদালতে সিআর-৬৭৫/১৯ নং মামলা করা ও আ’লীগের নেতা হাবিবুর রহমান হবি কর্তৃক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও দু’জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৩/১৯ নং মামলা উল্লেখ্যযোগ্য তিনি আরও বলেন, মাদ্রসার অর্থ আত্মসাৎ হয়ে থাকলে গভর্নিং বডি এতদিন কোথায় ছিল? প্রতি বছর ঈছালেছওয়াবের পর হিসাব হয়। বিধি অনুযায়ী ওই টাকা মাদ্রাসার ফান্ডে (ব্যাংকে) জমা হওয়ার কথা। কিন্তু না হয়ে থাকলে ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? না কি আদায়কৃত টাকা সবাই ভাগযোগ করে খেয়ে এখন শুধু অধ্যক্ষের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে! তাছাড়া অধ্যক্ষকে দায়িত্বে রেখে কেন অভিযোগ বা মামলা করা হয়নি? আসলে অধ্যক্ষ আব্দুল সালাম দায়িত্ব থাকাবস্থায় অভিযোগ করলে গভর্নিং বডির দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের বিষয় ফাস হওয়ার ভয়ে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে এলাকাবাসী মনে করেন।
নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক এক মুসুল্লি বলেন, নব্য আ’লীগ নেতা আখতার ফারুক নিজেকে মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ভাল মানুষ সাজতে এলাকার সরদারপাড়া জামে মসজিদ, কারিগরপাড়া জামে মসজিদ, আগরদাঁড়ী মাদ্রাসা জামে মসজিদ, আগরদাঁড়ী মাঝেরপাড়া জামে মসজিদে নামাজের পূর্বে ওই নেতা উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন বক্তব্য পেশ করছেন। বক্তব্যে তিনি বলেছেন, আ’লীগ নেতা ও মাদ্রাসার সদস্য হাবিবুর রহমান হবি মাদ্রাসার কোন টাকা আত্মসাৎ করেনি। তিনি একজন ভালো মানুষ। মাদ্রাসার সকল টাকা অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম কাশেমী ভুয়া ভাউচার করে আত্মসাত করেছেন। আমরা তার বিচার চাই। একজন মুসুল্লি জানান, অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম মাদ্রাসায় থাকাবস্থায় তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিল না। তাকে তাড়িয়ে দিয়ে তার অবর্তমানে তার বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানো হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম যেন আরও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মাদ্রাসায় বা মাদ্রাসা এলাকায় না আসতে পারে সেজন্য আ’লীগের ওই নব্য নেতা জনগণকে উসকে দিচ্ছেন। বর্তমান অবস্থা এমন যে, অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম মাদ্রাসায় আসলে দারুণ রক্তপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে আব্দুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী ও করেছেন।
আগরদাঁড়ী কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য হাবিবুর রহমান হবি, গোলাম ফারুক ও মফিজুল ইসলাম নিজেদেরকে নির্দোষ বলে দাবি করেন এবং মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি গোলাম মোরশেদ দৈনিক পত্রদূতকে জানান, অনিয়ম ও দুর্নীতি তার সময় হয়নি। হয়েছে ২০১৩ সালের পর থেকে। তখন আমি ছিলাম না। আমি বর্তমান গভর্নিং বডিকে দেখতে বলেছিলাম। তাঁরা দেখে শুনে অধ্যক্ষসহ অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আব্দুস সালাম কাশেমী জানান, মাদ্রাসার গভর্নিং বডি যদি আমার স্বাক্ষর জাল-জালিয়তি করে ভুয়া ভাউচার তৈরি না করে থাকে তবে, আমি সঠিক হিসাব দিতে পারব।
এলাকার একজন আইনজ্ঞ ব্যক্তি বলেন, আগরদাঁড়ী কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল মাদ্রাসার স্থাবর-অস্থবর সম্পদ রক্ষ করা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা, অর্থ কমিটি গঠন করে নিয়মিত তা অনুমোদন করা ও সকল বিষয় তদারকী করা। কিন্তু গভর্নিং বডি তা না করে বরং নিজেরাই অর্থ আতœসাত ও তছরুপ করেছেন এবং অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। একারণে ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক গভর্নিং বডি বাতিল হতে পারে।