গল্প:পরিস্থিতির স্বীকার তুহিন
আজহারুল ইসলাম সাদী
এক বাপের এক ছেলে তুহিন।
সবে একুশে পা দিয়েছে। এলাকার পরিবেশ ভালো না থাকায় পিতা তাকে ব্যবসা দেখাশোনা করতে কাজে লাগিয়ে দেয়। নাদুস নুদুস ফর্সা আর লম্বা চওড়া চেহারা দেখে আশ পাশে ঘুর ঘুর করতে থাকে প্রতিবেশী ইদ্রিস নামে এক ব্যক্তি। সে ক্রমশই তুহিন এর সাথে খাতির জমিয়ে ফেলে।
একটা সময় তার শালিকে দেখিয়ে বলে, বিয়ে করবে? আমার শালি নোভা দেখতে ভালো শিক্ষিত শুধু একটু সর্ট আরকি। ইদ্রিস নামীয় লোকটা তার শালিকে লেলিয়ে দেয় তুহিন এর পেছনে।
বিষয়টি জানতে পেরে নোভা’র প্রতিবেশী ভাই আব্দুল হান্নান মিষ্টি মধুর ভাষায় তুহিন কে জানান দেয় যদি নোভাকে বিয়ে করো তবে তোমার সকল সমস্যা আমি দেখবো। সুবিধা অসুবিধা সব আমি দেখবো।
কেউ কিছু বললে আপদে বিপদে পড়লে আমাকে জানাবে আমি সমাধান করে দেবো।
এভাবে ইদ্রিস ও পরে আব্দুল হান্নান একুশ বছরের ছেলে তুহিন কে নানান স্বপ্ন দেখিয়ে নোভা’র প্রতি আসক্ত করে ফেলে। নোভা ও নোভা’র পরিবার এবং তুহিন কে পৃথক পৃথক ভাবে বিভিন্ন লোভাতুর আশায় আস্বস্ত করে বিয়ের বন্দোবস্তের ফন্দি আঁটতে থাকে। একপর্যায়ে যে তুহিন কখনো পিতা মাতার চোখে চোখ রেখে কথা বলতো না? সেই তুহিন দিন কে দিন কেমন যানি বদলিয়ে যেতে থাকে।
তুহিন এর পিতা মাতা লক্ষ্য করতে থাকেন প্রায়ই আব্দুল হান্নান তুহিনকে বারংবার মোবাইল করে, দিনে ৫/৭ বার মোবাইল করে তুহিন কে অতিষ্ঠ করে তুলতো। আব্দুল হান্নান ও ইদ্রিস তুহিনকে বলতো তোমার আব্বা আম্মা কে বলো ভালো একটা মেয়ে দেখেছি দেখে আসো। তুহিন আব্বা আম্মার সাথে বলতে সাহস পায়না। নাছোড় বান্দার মতো আব্দুল হান্নান ও ইদ্রিস আলী দিনের মধ্যে বহু বার সরাসরি ও মোবাইলে তুহিনকে অতিষ্ঠ করে তুলতো ওর আব্বা আম্মাকে বিয়ের কথা বলতে বলতো, বাধ্য হয়ে, একপর্যায়ে ওদের অতিষ্টতায় তুহিন মানুষিক ভাবে বিচলিত হয়ে যেতে থাকে। প্রতিদিন বারংবার বলতে থাকায় একদিন আম্মার সাথে বলে আম্মা একটা মেয়ে আছে দেখে আসেন?
তুহিন এর আব্বা আম্মা তুহিন এর মুখে এমন কথা শুনে যেনো আকাশ থেকে পড়লেন!
তাদের বুঝতে আর বাকি থাকেনা প্রতিদিন কারা বারংবার তুহিন কে মোবাইল করে কারা সবসময় অতিষ্ট করে। এক দিন নোভা’র ভাই ও বোন আসে তুহিনদের বাড়ি বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে। তুহিন এর পিতা মাতা ও স্বজনরা জানায় তুহিন পিতার ছোট খাটো একটি ব্যবসা দেখাশোনা করে। ও বিয়ে করে বৌকে খেতে দেবে কি? নোভা’র ভাই হান্নান বলেন রুজির মালিক আল্লাহ, সেই চালিয়ে নেবে। হান্নান আরো বলেন ছেলে মেয়ে যখন রাজি তাহলে বিয়ের ব্যবস্থা করা ভালো, দেন মোহর কত হবে ঠিক করেন।
তুহিন এর প্রতিবেশী হিরা আপা বলেন তুহিন বেকার আর আপনারা যখন এতো উঠে পড়ে লেগেছেন দেন মোহর কুঁড়ি হাজার টাকা করেন, কারণ সে এখন বেকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি? নোভা’র গার্জেন পক্ষ তাহাতেই রাজি হয়ে যায়। হান্নান বারংবার মোবাইল করে তুহিন কে বলতে থাকেন দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করো।
আব্বা আম্মা কে বলো। পরদিন হান্নান তুহিন কে বলেন পাঁচ শত টাকা ও আড়াইশত টাকার নন জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্প নিয়ে কাজি অফিসে চলে যাও?
তুহিন টাকা ও ষ্ট্যাম্প নিয়ে কাজী অফিসে যায় এবং হান্নান এর থা মতো কাজী আবুল হোসেন কে দেন।
হান্নান তার কয়েকজন বোন সহ নোভাকের কাজী অফিসে নিয়ে আসে। তুহিন কে বলে কারা কারা বিয়ের স্বাক্ষী হবে দ্রুত নাম লিখিয়ে দেও! তাদের নাম লিখিয়ে তাদের হাজির করতে বলে।
সেদিন ঝুটিতলা মোড়ের কাজী আবুল হোসেন এর মাধ্যমে তুহিন ও নোভার বিয়ে সম্পন্ন করেই, বিয়ের স্বাক্ষী আসার পূর্বেই বিয়ের কনে নোভা ও তাদের বোনদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন হান্নান।
এভাবে প্রায় জিম্মি ও ব্যধ্য করে তুহিন এর বিবাহ সম্পন্ন করে। কয়েকজনকে দাওয়াত করে নিয়ে যায় এবং সেই সাথে নোভাকে তুহিন এর সাথে পাঠিয়ে দেন। তুহিন এর আব্বা বাড়ি ছিলেন না। দু’দিন থেকে নোভা মায়ের বাড়ি ফিরে যায়। কিছুদিন পর আবার আসেন। এবং প্রতি সপ্তাহে নোভা তুহিনকে সাথে নিয়ে মায়ের বাড়ি যেতে বাধ্য করেন। নোভা র ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু হলে নিজে নিজেই চলে যান মায়ের বাড়ি?
নোভার ইচ্ছার গরমিল হলে তুহিন এর সাথে তুই তুকারী করে ঝগড়া করে মায়ের কাছে চলে যায়।
কখনো মোবাইল ফোন রেখে গেলে ভাই হান্নান কে পাঠিয়ে জোর করে মোবাইল নিয়ে যান।
কিছু দিন পর আবার তুহিনকে বাধ্য করে নোভা কে তার বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য।
তুহিন বলেন প্রতি বার ই আমিসহ আমার পিতা মাতার কথার তোয়াক্কা না করে আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। এক পর্যায়ে মুনজিৎপুর নিবাসী শেখ সিদ্দিকুর রহমান তুহিন এর আব্বাকে ফোন দিয়ে জানান ছেলে বিয়ে দিয়েছেন তো বৌমাকে নির্যাতন করেন কেন?
সমস্যায় পড়বেন তো? আমার বাসায় একদিন আসেন মিমাংসা করে বৌমাকে নিয়ে যান।
তুহিন এর আব্বা বলেন, কে জানালো আপনাকে এসব কথা? বললো হান্নান এর ভাই কলিংস।
আপনারা বৌমাকে অত্যাচার করেন কেন, পরের মেয়ের সাথে এমন অত্যাচার করতে নেই?
দ্রুত বসাবসি করে মিটিয়ে ফেলেন নয়তো সমস্যায় পড়বেন?
এভাবে কয়েকদিনে কুঁড়ি পঁচিশ বার ফোন দিয়ে বাধ্য করেন তুহিন এর আব্বাকে শেখ সিদ্দিকুর রহমান এর বাড়ি। সেখানে হান্নান জানান তুহিন এর আব্বা লোকজন ডেকেছেন কি করতে চাচ্ছেন?
প্রতিবেশী বিল্লাহ কে বলেন তোমার দুলাভাই পুলিশ অফিসার না, বিষয়টিকে একটু আমলে নিতে বলোতো?
তুহিন এর আব্বা বলেন, কে ডাকলো শালিশ এবং টিনের আলোচনা হবে বলেন?
তারা বলেন বৌমাকে বাড়ি নিয়ে যান না কেনো??
তুহিন এর আব্বা বলেন, আমাকে এখন জড়িয়ে কৈফিয়ত তলব করা হচ্ছে কি কারণে আমার ও আমার স্ত্রীর কথা কি আপনাদের মেয়ে শুনেছে যখনই ইচ্ছে তুহিন কে বাধ্য করেছে নিয়ে যেতে।
আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কখনো প্রশ্রয় দেয়নি কেউ, তুহিন এর সাথে যখন তখন আপনাদের মেয়ে বাপের বাড়ি এসেছে, কখনো আমাদের কথা বা ইচ্ছা কে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি?
এখন তুহিন বাসায় আনতে চাচ্ছেন তো ওর সাথে আসে না কেনো?
এখন আমাদের প্রয়োজন কেনো?
আমাদের কখনো মূল্যায়ন করেনিননি আপনারা বা আপনাদের মেয়ে।
নোভার মেজো বোন বলেন ঠিক আছে নোভা কে নিয়ে যান ও আর প্রতি সপ্তাহে মার কাছে প্রতি সপ্তাহে আর যাবেনা?
নোভা’র মেজো বোনের কথায় আসস্ত হয়ে পুনরায় আপোষ মিমাংসা হয়ে যায়।
নোভা তুহিন এর সাথে শ্বশুরবাড়ি চলে আসে বেশ কয়েকদিন থাকে ভালোভাবে, কিছু দিন পর অসুস্থথার কথা বলে মায়ের বাসায় যান।
এক দিন দুই দিন, এ ভাবে সপ্তাহ, পক্ষকাল এমনকি একমাস পেরিয়ে গেলেও নোভা আর শ্বশুরবাড়িতে আসার নাম করেনা?
স্বামী তুহিনকে বিভিন্ন ভাবে বুঝিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিজেদের সকল আসবাবপত্র মায়ের বাড়ি নিয়ে যেতে বাধ্য করে, বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে। কিছুদিন পর তুহিনকে ঘরভাড়া নিতে বলে।
মায়ের বাড়ির আশেপাশে কয়েক জায়গায় ঘরভাড়া নিয়ে বসবাস করতে থাকে ওরা।
তুহিন এর পিতা প্রথমে তার ব্যবসা তুহিনকে দিয়ে বলেন এখন ব্যবসায় এক লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার টাকা আছে। কোন হিসাব নেবো না ও খরচ ও চাইবো না?
তুমি আমার একটাই ছেলে ব্যবসার পুঁজি বৃদ্ধি করতে থাকো। আলাদা ভাড়া বাড়িতে থাকতে থাকতে ওদের একটি মৃত্যু পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। এরপর একবছর পর নোভা একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। তুহিন এর আব্বা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তার ছেলের ব্যবসায় পুঁজি নেই!!
তুহিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো যায়না?
তুহিন এর আব্বা কিছু পুঁজি দিয়ে আবার ও ব্যবসা চাঙ্গা করতে বলেন। কয়েকমাস না যেতে আবার ও তুহিন এর ব্যবসায় ধ্বস নামে, এভাবে ছয়টি বছরে প্রায় তিন লক্ষাধিক টাকা তুহিন পিতার কাছ থেকে নিলেও কুঁড়ি হাজার টাকার ও বুঝ দিতে পারেনা? সংসারে অভাব অনটন দেখা দিলে তুহিন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। সে পিতা মাতার কাছে যেমন ভালোবাসা পায়না এখন নিজের ব্যবসার পুঁজি না থাকায় বৌ নোভা বা শ্বাশুড়ির বাড়ির কারো ভালোবাসা পায়না?
একদিন গভীর রাতে বাসায় ফেরায় তুহিনকে ঘরে ঢুকতে দেয়নি নোভা, সারারাত বাহিরে মসার কামড় খেয়ে বাকি রাত পার করে। সকালে তুহিন এর সকল কাপড় চোপড় আসবাবপত্র ও হাজার পাঁচেক টাকার ব্যবসার মালপত্র সহকারে মা বাবার কাছে চলে যেতে বাধ্য করে। তুহিন দিন দিন দুশ্চিন্তা ও হতাশাগ্রস্থতার কবলে পড়ে নিঃস্বেস হতে থাকে। একটা সময় পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে বৌ ও শ্বশুরবাড়ির সকলের অতি ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে সেখানে বসবাস করতে থাকায় কয়েকবছর পর ব্যবসার পুঁজি যখন না থাকে তখন কারো মন যোগাতে পারেনা?
পাঁচ বছর পূর্বে নোভা মায়ের কাছে গিয়েছে এর মধ্যে মাঝে মাঝে যখন শ্বশুরবাড়ি এসেছে তখন সকাল ১১ টার সময় এসে দুপুরে খেয়ে ২ টা ৩ টার মধ্যে মায়ের বাসায় দ্রুত ফিরে গিয়েছে।
কখনো স্বামীর বাড়িতে ধৈর্য্য সহকারে থাকার চেষ্টা করেনি?
একটা পুরুষ মানুষের উন্নতি যেমন একজন নারীর ভালোবাসার মাধ্যমে হতে পারে ঠিক তেমনি একটা নারীর দুর্ব্যবহার ও তাচ্ছিল্যের কারণে পুরুষের উন্নতি না হয়ে ধ্বংস হতে যথেষ্ট। যেমন পরিস্থিতির স্বীকার তুহিন। যারা বা যাদের বিসস্থতার কারণে তুহিন এতো সব করলো সেই বিসস্থ ভাইরা ভাই ইদ্রিস ও কোন আপস এর উদ্যোগ নেয়া তেমনি বৌ নোভার গার্জেন প্রতিবেশী ভাই আব্দুল হান্নান ও তার ওয়ালার বরখেলাপ করে তুহিনকে আরো হতাশার মাঝে নিমজ্জিত করে। তুহিন সারারাত জেগে থাকে কি করলাম, কি করলাম। যাদের আসস্তততায় আমি নিঃস্বেস হ ইসলাম আজ তারা আমার বিপক্ষে??









