শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩

চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ
চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শুক্রবার চীনের স্থানীয় সময় সকাল ১০ টার দিকে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ বৈঠকটি শুরু হয়।
এর আগে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে চীনের ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে দেশটির বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়।

পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে চীনের বিপ্লবী বীরদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন প্রমুখ।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ জুন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফর শুরু করেন। পরে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস ২০২৬-এ অংশ নিতে চীনের দালিয়ান শহরে যান। সেখানে দুই দিন বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর বুধবার বিকেলে বেইজিং পৌঁছান।

বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। বৈঠকটি গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়।

একই দিনে বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া চীনের পানি সম্পদমন্ত্রী লি গোয়িং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে বক্তব্য দেন, যা যৌথভাবে আয়োজন করে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রোমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিংয়ের সঙ্গেও দলীয় পর্যায়ে বৈঠক করেন।

চীনে অবস্থানকালে বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নির্বাহী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দেশের উন্নয়নযাত্রায় আরও কার্যকর অবদান রাখার বিষয়ে আলোচনা করেন।

বেইজিংয়ে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনাসহ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানানো হয়। মালয়েশিয়া সফর ও সামার দাভোসে অংশগ্রহণের মতো এই সফরেও তিনি মাত্র ২৫ সদস্যের একটি ছোট প্রতিনিধিদল নিয়ে সফর করছেন, যার মধ্যে ১১ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা রয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা আজ বিকেল ৫টায় বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।

Ads small one

সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের সঙ্গে গোলাগুলি চলছে, বাহিনী প্রধান আটক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ২:৫৯ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের সঙ্গে গোলাগুলি চলছে, বাহিনী প্রধান আটক

পত্রদূত ডেস্ক: সুন্দরবনের বনদস্যু দুলাভাই বাহিনীর সঙ্গে কোস্টগার্ডের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার রাতে বনবিভাগের কয়রা টহল ফাঁড়ির আওতাধীন ময়দাফেসা খাল এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গুলি লেগে সাকাত সরদার নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন।

 

এছাড়া দুলাভাই বাহিনী প্রধান রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে কোস্টগার্ড। শুক্রবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে দুলাভাই বাহিনীর প্রধান রবিউল ইসলামকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় কোস্টগার্ড। চিকিৎসা শেষে তাকে আবার সঙ্গে নিয়ে গেছে কোস্টগার্ডের সদস্যরা।

নিহত সাকাত সরদার ৩ নং ওয়ার্ড মহেশ্বরীপুর এলাকার ইজহার সরদারের ছেলে। থাকতেন ৬নং ওয়ার্ড তেতুল তলা গুচ্ছপাড়ায়।

হাসপাতালের চিকিৎসা নথিতে দেখা গেছে, কয়রা মহেশ্বরীপুর গ্রামের মানিক গাজীর জেলে রবিউল ইসলাম (৫০) কে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়। তার হাতসহ শরীরে গুলির ক্ষত ছিল।

মহেশ্বরীপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মানিক গাজীর জেলে রবিউল ইসলামই বনদস্যু দুলা ভাই বাহিনী প্রধান। একসময় সুন্দরবনের ত্রাস ছিল ‘ইলিয়াস বাহিনী’। তিনি মারা যাওয়ার পর ২০২৪ সালে ইলিয়াসের বোনের স্বামী রবিউল নতুন দল গড়ে তুললে স্থানীয় লোকজন এর নাম দেন ‘দুলাভাই বাহিনী’।

কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শাহ আলম বলেন, বনের মধ্যে গোলাগুলি ও এক দস্যু নিহতের খবর শুনেছি। কিন্তু আমাদের কাছে এ বিষয়ে তথ্য নেই। কোস্টগার্ড বিষয়টি দেখছে।

সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের সহকারি বন সংরক্ষক শরিফুল ইসলাম জানান, আমরাও বিষয়টি শুনেছি। কোস্টগার্ড বিস্তারিত বলতে পারবে।

 

শুক্রবার ২৬ জুন ২০২৬ দুপুরে কোস্ট গার্ড এর মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ‘দুলাভাই বাহিনী’র সঙ্গে কোস্ট গার্ডের গোলাগুলি হয়েছে, অভিযান এখনো চলমান।

 

তিনি বলেন, গত ২৫ জুন ২০২৬ খুলনা জেলার কয়রা থানার বনপাড়া সংলগ্ন সুন্দরবনের গহীনে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে কুখ্যাত ডাকাত ‘দুলাভাই বাহিনী’র সদস্যদের সঙ্গে রাতব্যাপী গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

 

বোটে অবস্থানরত ডাকাতদল কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে অতর্কিত গুলি চালানো শুরু করে এবং আত্মরক্ষার্থে কোস্ট গার্ড সদস্যরাও ডাকাতদের বোট লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। চলমান এ অভিযানে এখন পর্যন্ত তিনজন ডাকাত সদস্যকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ করা হয়েছে।

 

তিনি আরও বলেন, ডাকাতদলের সদস্যরা সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং নিকটবর্তী লোকালয়ে আশ্রয় নেবার চেষ্টা করতে পারে বিধায় সকলকে সতর্ক থাকা এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য অনুরোধ করা হলো। কোস্ট গার্ডের নিকট তথ্য প্রদানকারীর বিষয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে এবং পুরষ্কৃত করা হবে।

খেলাধূলা হতে পারে পরিবার ও সমাজে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ২:০৬ অপরাহ্ণ
খেলাধূলা হতে পারে পরিবার ও সমাজে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

নিকোলাস বিশ্বাস

খেলাধূলা যুগে যুগে মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম এবং সামাজিক সংযোগের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গণ্য হয়েছে। খেলার মাঠের রোমাঞ্চ শুধুমাত্র শারীরিক সক্ষমতার প্রদর্শনী নয়, এটি মানব সম্পর্কের জটিল রসায়নকে সহজ উপায়ে মানুষের সামনে তুলে ধরে। খেলাধূলার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নিরপেক্ষতা-এটি ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের ধার ধারে না। বরঞ্চ, একটি দলের বিজয় বা একটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ কোটি কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখতে পারে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের ২৩তম আসর, যা ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারই প্রথমবারের মতো রেকর্ড ৪৮টি জাতীয় দল অংশ নিচ্ছে, যার ফলে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সর্বমোট ১০৪টিতে। উত্তর আমেরিকার মোট ১৬টি দৃষ্টিনন্দন শহরে এই ম্যাচগুলো আয়োজন করা হচ্ছে। টুর্নার্মেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচটি মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও অ্যাজটেকাতে অনুষ্ঠিত হয় এবং আগামী ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক-এর নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে জমকালো ফাইনাল খেলার মধ্য দিয়ে এই বিশ্বমঞ্চের পর্দা নামবে।

বিশ্বকাপের এই জোয়ার বাংলাদেশেও আছড়ে পড়েছে। সম্প্রতি মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ৭৮ নং রামারপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের রাস্তায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য ধরা পড়েছে, যা ফুটবলপ্রেমী বাংলাদেশের সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। সেখানে দুটি বড় মাপের পতাকা-একটি ব্রাজিলের এবং অন্যটি আর্জেন্টিনার-পাশাপাশি টাঙানো হয়েছে। এই ছবি শুধুমাত্র দুটি ফুটবল দলের প্রতীক নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক বার্তা বহন করছে। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব কিভাবে এই ধরনের প্রতীকী সম্প্রীতি এবং সামগ্রিকভাবে খেলাধূলা পরিবার, সমাজ, ধর্ম এবং রাজনীতির মতো মৌলিক সামাজিক কাঠামোগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে; পাশাপাশি এর বিপরীত পিঠের উগ্রতা কীভাবে সমাজকে ধ্বংস করে।

কালকিনির দৃশ্যপট এবং এর গুরুত্ব: মাদারীপুরের কালকিনিতে দেখা এই দৃশ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে, বিশেষ করে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাজ করে, তা অনেক সময় উগ্র রূপ ধারণ করে। বিশ্বকাপ মৌসুমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলে তর্ক-বিতর্ক, যা কখনো কখনো ঝগড়া বা মারামারিতে রূপ নেয়। এই প্রেক্ষাপটে যখন কালকিনির রাস্তায় আড়াআড়িভাবে গাছের সঙ্গে উভয় দলের পতাকা পাশাপাশি টাঙানো হয়, তা একটি নীরব অথচ শক্তিশালী ঘোষণা: প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু তা যেন ঘৃণা বা বিভেদে পরিণত না হয়। এই পদক্ষেপটি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় বাসিন্দারা বোঝেন-বড় উৎসব বা আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন আমরা একে অপরের মত ও পছন্দকে সম্মান করি। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা মানেই অন্য দলের সমর্থকদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া নয়। এই শান্ত সহাবস্থানের প্রতীক সামাজিক শান্তি ও সৌহার্দ্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

দেলদুয়ারের সহিংসতা-ক্রীড়া সংস্কৃতির অন্ধকার দিক: কালকিনির সেই সম্প্রীতির ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ক্রীড়া সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিককে উন্মোচন করে। সেখানে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সামান্য কথা কাটাকাটি চরম রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে লাঠিসোঁটা, রামদা এবং দা নিয়ে উন্মত্ত জনতা একটি টিনের বসত-বাড়িতে আক্রমণ চালায় এবং বেপারোয়াভাবে বাড়িটি ভাঙচুর করে। খেলার মতো একটি বিনোদনমূলক বিষয়কে কেন্দ্র করে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এমন ধ্বংসাত্মক ও হিংস্্র তান্ডব কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নেয়নি, বরং স্থানীয়দের মনে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

এই দুঃখজনক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, খেলাধূলার প্রতি অতি-আবেগ যখন অন্ধত্বে রূপ নেয়, তখন তা সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করে। যে দলগুলো হাজার মাইল দূরে খেলছে, যাদের অধিকাংশ খেলোয়াড় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত নয়, তাদের জন্য নিজের প্রতিবেশী বা দেশের মানুষের ওপর চড়াও হওয়া অত্যন্ত হীন মানসিকতার পরিচয় দেয়। দেলদুয়ারের এই সংঘর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, খেলাধূলাকে উপভোগের অনুষঙ্গ হিসেবে না দেখে উগ্রতা ছড়ালে তা পরিবার ও সমাজকে কতটা বিপর্যস্ত করতে পারে। এলাকাবাসী ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত এই সংঘাতের সুষ্ঠু সমাধান ও জড়িতদের শাস্তি দাবি করছেন।

পরিবারে খেলাধূলার প্রভাব: পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। খেলাধূলা পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি ম্যাচে যখন পুরো পরিবার একসাথে বসে খেলা দেখে, তখন তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়। এটি প্রজন্ম ব্যবধান (Generation Gap) কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। আমরা অনেক সময় দেখি, বাবা ব্রাজিল এবং ছেলে আর্জেন্টিনা সমর্থক। কালকিনির উদাহরণের মতো, পরিবারগুলো যদি শিখতে পারে যে, এই ভিন্নতা শুধুমাত্র একটি খেলা নিয়ে এবং এটি পারিবারিক ভালোবাসার উপরে স্থান পেতে পারে না, তবে পরিবারে শান্তি ও বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। পারিবারিক আড্ডায় সুস্থ আলোচনা এবং সুস্থ কৌতুক পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করে। এটি শিশুদেরকে শিক্ষা দেয় যে, জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অপর পক্ষের সাথে শত্রুতা করতে হবে। খেলাধূলার এই নিরপেক্ষ প্রকৃতি পরিবারগুলোকে সুস্থ মানসিকতা নিয়ে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

সমাজে খেলাধূলার প্রভাব: সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং সৌহার্দ্য স্থাপনে খেলাধূলার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি গ্রামে বা শহরে যখন স্থানীয় খেলাধূলার আয়োজন করা হয়, তখন তা সমগ্র সম্প্রদায়কে এক জায়গায় নিয়ে আসে। এটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা দলীয় কোন্দল ভুলে একটি সুস্থ বিনোদনের ক্ষেত্র তৈরি করে। কালকিনির ঘটনাটি সামাজিক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে, সমাজকে বিভক্ত করার বদলে, একটি অভিন্ন সংস্কৃতি আমাদের একত্রিত করতে পারে। এই ধরনের প্রতীকী পদক্ষেপ সামাজিক অসহিষ্ণুতা কমাতে সাহায্য করে। মানুষ যখন দেখে যে তাদের গ্রামের রাস্তায় দুটি দলের পতাকা শান্তিতে পাশাপাশি অবস্থান করছে, তখন তাদের মনেও এই বার্তা পৌঁছায় যে, ভিন্নমতের সাথে বসবাস করা সম্ভব। এটি সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ বিনোদন ও অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। এই ধরনের পদক্ষেপ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ঐক্য জোরদার করে।

রাজনীতি এবং খেলাধূলা: রাজনীতি বা রাজনৈতিক দিক থেকে চিন্তা করলে, খেলাধূলা প্রায়শই কূটনীতির একটি অংশ হয়ে ওঠে। যেমন ‘পিং-পং ডিপ্লোম্যাসি’ বা ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ। কালকিনির এই দৃশ্য স্থানীয় রাজনীতিতে না হলেও, সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। আমরা দেখি রাজনৈতিক কারণে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি হয়। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ এমন একটি সময় যখন রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে মানুষ একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যে বা একটি অভিন্ন আবেগে উদ্বুদ্ধ হয়। কালকিনির প্রতীকী সম্প্রীতি আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সহাবস্থান সম্ভব। যদি দুটি ভিন্ন দেশের সমর্থক (যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম) শান্তিতে থাকতে পারে, তবে কেন একই দেশের রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষেরা ভিন্নমত সত্ত্বেও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতে পারবে না? এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে উদারতা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব দূর করতে একটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, খেলাধূলা শুধুই একটি বিনোদন নয়, এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা বাহক। মাদারীপুরের কালকিনিতে পাশাপাশি টাঙানো ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার পতাকা শুধুই একটি বিশ্বকাপ মৌসুমে তৈরি হওয়া সাময়িক দৃশ্য নয়; এটি একটি উন্নত এবং শান্তিকামী মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে, দেলদুয়ারের সহিংসতা আমাদের জন্য এক সতর্কবার্তা।

এই চিত্রগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভিন্নতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই, কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই একটি মানব সম্প্রদায়ের অংশ। এই প্রতীকী সম্প্রীতি যদি আমরা আমাদের পরিবার, সমাজ, ধর্ম এবং রাজনীতির মতো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি, তবে একটি শান্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের সকলের উচিত কালকিনির এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া, দেলদুয়ারের মতো উগ্রতা পরিহার করা এবং দৈনন্দিন জীবনে ভিন্নমতের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা। খেলাধূলা হোক সম্প্রীতির প্রতীক, বিভেদের নয়।

নিকোলাস বিশ্বাস: একজন ডেভেলপমেন্ট প্রাক্টিশনার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল মিডিয়া এ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com 

 

পাইকগাছায় নার্সারীতে জোড় কলম তৈরীতে ব্যস্ত শ্রমিক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১:৫১ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় নার্সারীতে জোড় কলম তৈরীতে ব্যস্ত শ্রমিক

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): বর্ষার শুরুতে পাইকগাছায় নার্সারীতে চারা উৎপাদনে জোড় কলম তৈরীতে শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছে। তীব্র গরম ও রোদের মধ্যে শ্রমিকরা মাথার উপর ছাতা দিয়ে কাজ করছে। মে থেকে জুলাই পর্যন্ত কলম করার উপযুক্ত সময়। কারণ এ সময় বাতাসের আদ্রতা ও গাছের কোষের কার্যকারিতা বেশি থাকে। তাড়াতাড়ি জোড়া লাগে এবং সফলতার হারও বেশি থাকে।

মাতৃগুণ বজায় রাখা, দ্রুত ফলন, রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বাড়ানো এবং অধিক ফলন পেতে অঙ্গজ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। গাছের চারা তৈরীর পদ্ধতির নাম কলম। এ কলম তৈরীতে রয়েছে নানা নাম ও পদ্ধতি। যেমন, গুটি কলম, শাখা কলম (কাটিং), চোখ কলম বা বাডিং। তবে কলম তৈরীতে গ্রাফটিং বা জোড় কলম, কাটিং বা উপজোড় কলম উল্লেখযোগ্য পদ্ধতি। এ কলম তৈরী করতে গ্রাফটিং চাকু, ব্লেড, সিকাচার, পলিথিন ক্যাপ, পলিথিন ফিতা, সুতলী, গাছের ডগা বা সায়ন এবং কলম তৈরীতে দক্ষ কারিগর বা মালির প্রয়োজন হয়।

উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়ন ও পাশের বিভিন্ন গ্রামে ছোট-বড় প্রায় ৫ শতাধিত নার্সারী গড়ে উঠেছে। যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যা রয়েছে গদাইপুর গ্রামে। মৌসুম শুরুতে চারা তৈরীর জন্য নার্সারী মালিক ও কর্মচারীরা ব্যস্ত হয়ে ওঠে। জোড় কলম তৈরী করতে গাছের ডালের সঙ্গে গাছের ডাল জোড়া লাগিয়ে জোড় কলম তৈরী করা হয়।

 

তেজপাতার সঙ্গে কাবাবচিনি, আম সঙ্গে আম, ছবেদার সঙ্গে খিরখাজুর, আতা সঙ্গে দেশী আতা জোড় দিয়ে জোড় কলম তৈরী করা হয়। কাঁটা জাতীয় কুল সহ বিভিন্ন ফলের চারা চোখ বসিয়ে বাডিং কলম তৈরী করা হয় এবং ফুল জাতীয় গাছের ডাল কেঁটে সরাসরি মাটিতে পুতে কমল তৈরী করা হয়।

জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন নার্সারীতে চলতি মৌসুমে আম, পেয়ারা, জামসহ বিভিন্ন ফলের ১০ লাখ ও কুলের প্রায় ১৫ লাখ কলম তৈরী হচ্ছে। গদাইপুর গ্রামের নার্সারী মালিক সামসুর রহমান জানান, এ বছরও তিনি নার্সারীতে ৬০ হাজার চারা উৎপাদনে ব্যস্ত রয়েছে। হিতামপুর গ্রামের রজনীগন্ধা নার্সারীর মালিক সুকনাথ পাল জানান, তার নার্সারীতে প্রায় ৪০ হাজার কলম তৈরীর কাজ চলছে। গদাইপুর গ্রামের অবস্থিত সততা নার্সারীর মালিক অশোক কুমার পাল জানান, তার নার্সারীতে বিভিন্ন জাতের কুলের প্রায় এক লাখ কলম তৈরী করছেন।

 

শ্রমিকের অভাবে কলম তৈরী করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে কলম তৈরীর সময় পার হয়ে গেলে এ মৌসুমের আর কলম তৈরী করা যাবে না। সে কারনে কলম তৈরীতে অধিক পয়সা খরচ হচ্ছে। নার্সারীতে বিভিন্ন জাতের হাইব্রীড জাত কাটিমন আম, মাল্টা, পিয়ারা, সফেদা, জামরুল। তাছাড়া এ সব কলমের মধ্যে থাই পেয়ারা, জামরুল, কুল, মালাটা, কদবেল, কমলালেবু, আমসহ বিভিন্ন জাতের কলম রয়েছে।

পাইকগাছা উপজেলা নার্সারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন জানান, বিগত বছর আশানারুপ চারা বিক্রি হয়নি, এতে নার্সারী মালিকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে এবছর চারার চাহিদা প্রচুর, তাই কলমও তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছে শ্রমিক। কলম তৈরীর শ্রমিক ঠিকমত না পাওয়ায় উচ্চ মূল্যে শ্রমিক নিয়ে কলম তৈরী করতে হচ্ছে। কারণ সময় চলে গেলে এ মৌসুমে আর জোড় কলম তৈরী করা যাবে না।

গদাইপুর এলাকার তৈরী কলম দেশের চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। তবে ঠিকমত বাজার দর না পাওয়ায় নার্সারী মালিকরা আশানারুপ ব্যবসা করতে পারছে না। নার্সারী ব্যবসায়ীরা জানান, চারা উৎপাদনে সরকারি ভাবে লোনের ব্যবস্থা করলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নার্সারী শিল্প আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান, পাইকগাছার নার্সারী শিল্প খুলনা জেলা শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। নার্সারী ব্যবসায়ীরা চারা বিক্রি করার আশানারুপ বাজার ধরতে না পারায় তারা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। নার্সারী ব্যবসা করে মালিক ও ব্যবসায়ীরা সাবলম্বী হচ্ছে, তেমনি নার্সারীতে নিয়জিত হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। নার্সারীতে উৎপাদিত চারা সবুজ বননায়নে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা রেখে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে। তেমনি ভাবে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে।