বাবা, আমি বাসায় যাব/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
‘বাবা, আমি বাসায় যাব।’ সাত বছরের শিশু অনুশ্রী দাসের এই শেষ কথাটি এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ডেঙ্গু মোকাবিলা এবং শিশুদের চিকিৎসাসেবার বাস্তবতা নিয়ে বড় একটি প্রশ্নও ছুড়ে দেয়। আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকা একটি শিশু যখন বাবাকে দেখে বাড়ি ফেরার কথা বলে, তখন সেই কথার মধ্যে থাকে শিশুর নিরাপত্তার আকাক্সক্ষা, পরিবারের প্রতি নির্ভরতা এবং অসুস্থতার গভীর অসহায়তা।
চট্টগ্রামের পহাড়তলীর রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুশ্রী ছিল সুবল চন্দ্র দাস ও লিপি দম্পতির দুই সন্তানের ছোট। গত ১৪ সেপ্টেম্বর জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর পরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। শুরুতে পরিস্থিতি খুব খারাপ মনে হয়নি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সে দুর্বল হয়ে পড়ে, খাওয়া-দাওয়া কমে যায়। এরপর দ্রুত অবনতি। প্লাটিলেট নেমে আসে ২৩ হাজার ৫০০-তে। আক্রান্ত হয় লিভার ও কিডনি। শেষ পর্যন্ত লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয় তাকে। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শনিবার বিকেলে চলে যায় সাত বছরের শিশুটি।
অনুশ্রীর মৃত্যু আমাদের আবার মনে করিয়ে দিলÑডেঙ্গু শুধু একটি মৌসুমি জ্বর নয়। এটি এমন একটি রোগ, যা শিশুদের ক্ষেত্রে খুব দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে। তাই জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি ‘সাধারণ জ্বর’ ভেবে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। বিশেষ করে শিশুর খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, পেটের সমস্যা, বমি, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা অন্য কোনো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অনুশ্রীর পরিবারের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল আইসিইউ বেড খোঁজা। মেয়ের অবস্থা খারাপ হওয়ার পর বাবা চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করেছেন। একাধিক হাসপাতালে খোঁজ করেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শিশু আইসিইউ বেড পাননি বলে জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় অনুশ্রীকে। এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। একটি শিশুর অবস্থা যখন দ্রুত অবনতির দিকে যায়, তখন চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন হয় সময়ের। আর সেই সময় যদি পরিবারের সদস্যদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে আইসিইউ বেড খুঁজতে ছুটতে হয়, তাহলে সংকট আরও গভীর হয়ে ওঠে।
চিকিৎসাব্যবস্থায় শুধু হাসপাতাল থাকা যথেষ্ট নয়; সংকটাপন্ন রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় বেড, প্রশিক্ষিত জনবল, শিশুদের নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হয়। অনুশ্রীর গল্পের আরেকটি দিক আমাদের ভাবায়। মেয়ের অসুস্থতার সময় বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবার কাছে প্রার্থনা চেয়েছেন। মুসলিম বন্ধুদের মসজিদে গিয়ে দোয়া করার অনুরোধ করেছেন। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে চেয়েছেন দোয়া ও আশীর্বাদ।
একটি শিশুকে বাঁচানোর আকুতিতে তখন ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো দেয়াল ছিল না। ছিল শুধু একজন বাবার অসহায় আবেদনÑআমার সন্তানকে বাঁচতে দিন।এই মানবিক দৃশ্যটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি শিক্ষা। রোগের সামনে মানুষ আগে মানুষ। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুর কোনো ধর্মীয় পরিচয় চিকিৎসার প্রয়োজনকে আলাদা করে না। ডেঙ্গুর মশাও ধর্ম দেখে কামড়ায় না। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্বও কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা সম্প্রদায়ের নয়; এটি সবার। অনুশ্রীর সপ্তম জন্মদিনও খুব বেশি দূরের ঘটনা নয়। গত ২ আগস্ট পরিবারের সঙ্গে জন্মদিন পালন করেছিল সে। বাবা তাকে বলেছিলেন নিজের ‘বেঁচে থাকার প্রেরণা’।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই সন্তানকে নিজের হাতে শেষ বিদায়ের জন্য সাজাতে হয়েছে বাবাকে। জীবনের এই নির্মম পরিণতি কোনো পরিবারের জন্যই কাম্য নয়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় তাই শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না। রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বৃষ্টির পানি জমে থাকা বন্ধ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, পরিবার ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। জ্বর কমে গেলেই যে বিপদ কেটে গেছেÑএমন ধারণা ভুল হতে পারে।
ডেঙ্গুর রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দ্রুত নজরে রাখা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার না করা এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি। তবে সব দায় পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলেই রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি শিশুর বাবা যদি সংকটময় সময়ে একাধিক হাসপাতালে ফোন করে আইসিইউ বেড খুঁজতে বাধ্য হন, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা সুবিধার প্রাপ্যতা, হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং জরুরি বেডের তথ্য দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকরÑএগুলো পর্যালোচনা করা দরকার।
অনুশ্রীর মৃত্যু হয়তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তার বাবা-মায়ের শূন্যতা কোনো শব্দে পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু একটি শিশুর মৃত্যু যদি আমাদের ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, তাহলে সেই শোক থেকে অন্তত ভবিষ্যতের জন্য কিছু শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। ‘বাবা, আমি বাসায় যাব’Ñএই চারটি শব্দ যেন শুধু অনুশ্রীর শেষ কথা হয়ে না থাকে। এটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হাসপাতালের বিছানায় প্রতিটি শিশু কারও সন্তান, কারও স্বপ্ন, কারও বেঁচে থাকার প্রেরণা।
একটি শিশুকে বাঁচাতে শুধু চিকিৎসকের হাত নয়, দরকার প্রস্তুত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দ্রুত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত আইসিইউ এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। অনুশ্রীর বাবা মেয়েকে বাঁচাতে পারেননিÑএ কথা একজন বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, অনুশ্রীর মতো আর কোনো শিশুকে যেন একইভাবে হারাতে না হয়, সে জন্য আমরা কী করছি? শোকের পর সবচেয়ে জরুরি কাজ তাই কান্না থামানো নয়; ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খুঁজে বের করা। কারণ একটি শিশুর শেষ আকুতি যদি আমাদের বিবেককে নাড়া না দেয়, তাহলে আর কী আমাদের নাড়া দেবে? ‘বাবা, আমি বাসায় যাব’Ñঅনুশ্রীর এই কথাই হোক ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের নতুন করে ভাবার ডাক।
লেখক: সচ্চিদানন্দ দে সদয়









