বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

মুক্তমত: মাইকের ডাক পৌঁছায় না মনে : ‘বৃক্ষমেলা প্রসঙ্গ’

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৭ অপরাহ্ণ
মুক্তমত: মাইকের ডাক পৌঁছায় না মনে : ‘বৃক্ষমেলা প্রসঙ্গ’

আখলাকুর রহমান

একটা ইজিবাইক। ছাদে দুটো মাইক বাঁধা। ড্রাইভার ছেলেটার নাম হয়তো রহিম কিংবা করিম, নাম দিয়ে কিছু যায় আসে না। সে প্রতিদিন সকালবেলা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘোষণা দিয়ে বেড়ায়, আসুন, আসুন, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে চলছে বৃক্ষমেলা। নানা রকমের ফলদ, ঔষধি ও বনজ গাছের চারা পাওয়া যাচ্ছে।

মাইকের শব্দ মিলিয়ে যায় বাতাসে। মানুষজন ঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখে, তারপর আবার নিজের কাজে মন দেয়। কেউ কেউ ভাবে, ও, মেলা হচ্ছে বুঝি। ব্যস, এইটুকুই। এরপর আর কিছু নেই।

এই দৃশ্যটা আমার কাছে বড় করুণ লাগে। একটা সুন্দর উদ্যোগ, একটা মহৎ চিন্তা, অথচ তার পরিণতি একটা ইজিবাইকের মাইকের আওয়াজে আটকে গেছে। যেন কেউ একজন বিরাট এক প্রেমপত্র লিখেছে, তারপর সেই পত্র একটা কাগজের ঠোঙায় মুড়িয়ে ফেলে দিয়েছে ডাস্টবিনে।

আমরা বাঙালিরা বড় অদ্ভুত জাতি। আমরা গাছ ভালোবাসি বলে দাবি করি, অথচ গাছ কিনতে গেলে আমাদের হাত কাঁপে। আমরা বৃষ্টির গান গাই, নদীর গল্প লিখি, বটগাছের ছায়ায় বসে আড্ডা দিই, কিন্তু যখন একটা চারাগাছ কিনে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন আসে, তখন আমরা হিসেব করি, এটা দিয়ে কী হবে?
এই কী হবে প্রশ্নটাই আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।

শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে যে ছেলেমেয়েরা নার্সারি নিয়ে বসে আছে, তাদের মুখের দিকে তাকালে মনটা খারাপ হয়ে যায়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বসে থাকে, রোদে পুড়ে, গাছের পাতায় পানি দেয়, যতœ করে সাজিয়ে রাখে টবগুলো। অথচ সন্ধ্যা নামলে দেখা যায়, বিক্রি হয়েছে দুই তিনটা মাত্র চারা।

একজন নার্সারি মালিক আমাকে বলছিলেন, স্যার, আমরা তো গাছ বিক্রি করি না, আমরা যেন ভিক্ষা চাই। কথাটা শুনে বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল।

অথচ ভাবুন তো, একটা আমগাছের চারা, দাম হয়তো পঞ্চাশ কি ষাট টাকা। এই টাকায় আজকাল একটা ভালো সিঙ্গাড়া চা ও হয় না ঠিকমতো। অথচ এই ছোট্ট চারাটা যদি বেঁচে থাকে দশ বছর, পনেরো বছর, তাহলে একদিন সে ছায়া দেবে, ফল দেবে, পাখিদের বাসা দেবে, বাতাস দেবে বিশুদ্ধ অক্সিজেন। এমন লাভজনক বিনিয়োগ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু আমরা এই হিসেবটা করি না। আমরা তাৎক্ষণিক লাভের হিসেব করি। আজকের বাজারে আলুর দাম কত, পেঁয়াজের দাম কত, এই নিয়ে আমাদের যত মাথাব্যথা। গাছের কথা মনে পড়ে শুধু তখনই, যখন রোদে হাঁটতে হাঁটতে ছায়ার খোঁজে আমরা কোনো এক অচেনা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে পড়ি।

তাহলে প্রশ্ন হলো, এই মেলাকে বাঁচানো যায় কীভাবে। এই ইজিবাইকের মাইকের বাইরে গিয়ে মানুষের মনে গাছের প্রতি একটা টান তৈরি করা যায় কীভাবে!

আমার মনে হয়, এখানে সবচেয়ে বড় ভুলটা হচ্ছে, আমরা গাছ বিক্রি করার চেষ্টা করছি, কিন্তু গাছের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছি না। মানুষ জিনিস কেনে যখন সেই জিনিসের সাথে তার একটা আবেগের যোগ তৈরি হয়। শুধু ঘোষণা দিয়ে জিনিস বিক্রি হয় না, গল্প দিয়ে জিনিস বিক্রি হয়। তাই প্রথম কাজ, গল্প তৈরি করা।

এক. গাছের নামকরণ উৎসব। প্রতিটি চারার সাথে একটা করে ছোট কার্ড ঝুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে, যেখানে লেখা থাকবে, আমাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে একটা নাম দাও। আমি তোমার সন্তানের বয়সী হয়ে বড় হবো তোমার সাথে। এই ছোট্ট কথাটা একটা শিশুর মনে যে প্রভাব ফেলবে, তা হাজার বিজ্ঞাপনেও হবে না। বাচ্চারা বাবা মাকে জোর করে নিয়ে আসবে গাছ কিনতে, শুধু নিজের গাছটার নাম রাখার জন্য।

দুই. জন্মদিনের গাছ। কারো জন্মদিন হলে কেক কাটার পাশাপাশি একটা গাছ রোপণের প্রচলন শুরু করা যেতে পারে। মেলায় এসে ঘোষণা করা যায়, আপনার সন্তানের জন্মদিনে তার বয়সের সমান উচ্চতার একটা গাছ উপহার দিন। প্রতি জন্মদিনে গাছটাও বড় হবে, আপনার সন্তানও বড় হবে। এই ধারণাটা মানুষকে ছুঁয়ে যাবে, কারণ এখানে গাছ আর সন্তানের ভাগ্য একসূত্রে বাঁধা পড়ে যায়।

তিন. বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতা। স্কুলে স্কুলে প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা যেতে পারে, কোন শ্রেণি সবচেয়ে বেশি গাছ রোপণ করে তার যতœ নিতে পারে। ছাত্রছাত্রীরা যখন প্রতিযোগিতায় নামবে, তখন তাদের পরিবারও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। বিজয়ী শ্রেণিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া যেতে পারে।

চার. মাইকের বদলে মানুষের মুখ। ইজিবাইকের মাইক আর যান্ত্রিক ঘোষণার বদলে দরকার মানুষের মুখ। স্থানীয় কোনো শিক্ষক, কোনো প্রবীণ ব্যক্তি, কিংবা কোনো পরিচিত মুখ যদি ভিডিও বার্তা দেন, আমি চল্লিশ বছর আগে একটা কড়ই গাছ লাগিয়েছিলাম আমার বাড়ির উঠোনে, আজ সেই গাছের ছায়ায় আমার নাতি নাতনিরা খেলা করে, এই ধরনের সত্যিকারের গল্প মানুষের মনে দাগ কাটবে। এই ভিডিওগুলো ফেসবুকে, ইউটিউবে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে দিতে হবে।

পাঁচ. হাটবাজারে উপস্থিতি। মানুষ মেলায় আসতে চায় না, কিন্তু হাটে তো আসেই। সপ্তাহের হাটবারে সাতক্ষীরার বিভিন্ন হাটে ছোট ছোট স্টল বসানো যেতে পারে। মানুষ যখন সবজি মাছ কিনতে আসবে, তখন পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে একটা চারাগাছ তার চোখে পড়বে, হাতে নিয়ে দেখবে, দাম জিজ্ঞেস করবে। এটাই আসল প্রচার, মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার পথে গাছকে নিয়ে যাওয়া।

ছয়. বিনিময়ের সংস্কৃতি। শুধু টাকার বিনিময়ে বিক্রি নয়, বিনিময়ের একটা মজার নিয়ম চালু করা যেতে পারে। পুরনো প্লাস্টিকের বোতল বা অব্যবহৃত জিনিস জমা দিলে একটা করে চারা ফ্রি। এতে পরিবেশ রক্ষার দুটো কাজ একসাথে হবে, প্লাস্টিক কমবে, গাছ বাড়বে। মানুষ বিনামূল্যের জিনিসের প্রতি সবসময় একটু বেশি আগ্রহী থাকে।

সাত. ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষঙ্গ। আমাদের সমাজে ধর্মীয় কথার একটা আলাদা শক্তি আছে। গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়ার সাথে যুক্ত করে প্রচার করা যেতে পারে। একটা গাছ যতদিন বাঁচবে, তার ছায়ায় যে বসবে, তার ফল যে খাবে, তার সওয়াব গাছ লাগানো মানুষটার আমলনামায় যোগ হতেই থাকবে। এই কথাটা ইমাম সাহেবরা জুমার নামাজের পরে বললে তার প্রভাব অন্যরকম হবে।

আট. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার। মেলার একটা দিন সরাসরি ফেসবুক লাইভ করা যেতে পারে, যেখানে দেখানো হবে কোন গাছের কী উপকারিতা, কীভাবে যতœ নিতে হয়, কোন গাছ কম জায়গায় লাগানো যায়। মানুষ তথ্য পেলে আগ্রহী হয়। শুধু গাছ কিনুন বললে মানুষ আগ্রহী হয় না, কিন্তু এই গাছটা আপনার ছাদবাগানের জন্য একদম উপযুক্ত, তিন বছরেই ফল দেবে, এই কথাটা শুনলে মানুষ এগিয়ে আসে।

আসলে সমস্যাটা গাছের নয়, সমস্যাটা আমাদের মনের। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যেখানে সবকিছু তাৎক্ষণিক হতে হবে। আজ টাকা দিলে আজই ফল চাই। কিন্তু গাছ তো এমন জিনিস নয়। গাছ ধৈর্যের ফসল। গাছ ভালোবাসার প্রতিদান দেয় বছরের পর বছর ধরে, ধীরে ধীরে, নীরবে।

একটা গাছ কখনো অভিযোগ করে না। রোদ পড়ুক, ঝড় আসুক, অবহেলা হোক, গাছ শুধু বেড়ে ওঠে। আর একদিন হঠাৎ দেখা যায়, সেই ছোট্ট চারাগাছটা বিশাল হয়ে গেছে, তার নিচে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে ক্লান্ত পথিক, তার ডালে বাসা বেঁধেছে কোনো এক অচেনা পাখি।

আমার মনে হয়, সাতক্ষীরার এই বৃক্ষমেলাকে বাঁচাতে হলে আমাদের প্রথমে এই গল্পগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, একটা গাছ কেনা মানে শুধু একটা চারা কেনা নয়, একটা ভবিষ্যৎ কেনা, একটা ছায়া কেনা, একটা প্রজন্মের জন্য একটা উপহার রেখে যাওয়া।

জেলা প্রশাসন, সামাজিক বন বিভাগ, স্কুল কলেজ, স্থানীয় সাংবাদিক, ইমাম সাহেব, শিক্ষক, সবাইকে একসাথে নেমে আসতে হবে এই কাজে। শুধু একটা ইজিবাইকের মাইক দিয়ে এই বিশাল কাজ হবে না। এর জন্য দরকার মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর মতো ভাষা, গল্প বলার মতো ধৈর্য, আর ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো আন্তরিকতা।

আমি জানি না এই লেখাটা পড়ে কজন মানুষ গাছ কিনতে যাবেন। কিন্তু যদি একজনও যান, যদি একটা শিশু তার বাবাকে ধরে বলে, বাবা, আমার একটা গাছ চাই, আমি তার নাম দেব, তাহলেই এই লেখা সার্থক।

শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের সেই নার্সারি মালিকদের চোখে যে হতাশা দেখেছি, সেই হতাশা কেটে গিয়ে যদি একটা হাসি ফোটে, তাহলে বুঝব, গাছেরাও এবার অভিমান ভুলে গেছে। আর অভিমান ভাঙানোর সবচেয়ে ভালো উপায় তো একটাই, ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নেওয়া।

গাছ যেমন নীরবে ভালোবাসে, আমাদেরও শেখা উচিত তেমন নীরবে ভালোবাসতে। একটা চারা হাতে নিয়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার মুহূর্তটা যদি আমরা একবার অনুভব করি, তাহলে বুঝব, এই ছোট্ট কাজটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে বড় এক আনন্দ।

মেলা শেষ হয়ে যাবে কয়েকদিন পরে। কিন্তু গাছ লাগানোর কাজ তো শেষ হওয়ার নয়। এই মেলা শুধু একটা শুরু হোক, সাতক্ষীরার প্রতিটা বাড়ির উঠোনে, প্রতিটা স্কুলের মাঠে, প্রতিটা রাস্তার ধারে যেন একদিন সবুজের সমারোহ দেখা যায়। এই স্বপ্নটাই তো ছিল আয়োজকদের মনে। এখন প্রয়োজন শুধু সেই স্বপ্নটাকে মানুষের মনের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া।

লেখক: উদ্যোক্তা

 

Ads small one

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুযোগ, নাকি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুযোগ, নাকি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি?

গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‎সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ইতিপূর্বে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই জোটকে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যে এক বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর ঢাকার পক্ষ থেকে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের যে স্বাধীন ও সুষম পররাষ্ট্রনীতি, তার আলোকেই এই জোটে অংশগ্রহণের অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও নিরাপত্তাজনিত লাভ-ক্ষতি গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ হলো “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়। একটি বহুজাতিক সামরিক বা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এই নীতিনির্ধারণী ভিত্তিকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

‎এ ধরনের চুক্তিতে সরাসরি যোগ দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে ধারণা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে, যেখানে মক্কা চুক্তিতে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো ‘একজনের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ’ নীতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সংঘাতের জটিলতায় জড়িয়ে বাংলাদেশের সৈন্যদের অন্য দেশের যুদ্ধে নিয়োজিত করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সাথে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স এবং বিভিন্ন প্রধান শক্তির সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক। কোনো সামরিক ব্লকে জড়ানোর ফলে যদি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

আঞ্চলিক পরাশক্তি, সামরিক বাজার ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ
‎দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান এবং শক্তিশালী সামরিক প্রবিধিসম্পন্ন তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনো সামরিক সম্পৃক্ততা প্রতিবেশীদের দৃষ্টিতে একটি নতুন কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি বাংলাদেশের সীমানা সংলগ্ন অঞ্চলে কৌশলগত চাপ বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে ঢাকার পথ জটিল করে তুলতে পারে। পাশাপাশি তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের উদীয়মান প্রসার ও বাণিজ্যিক স্বার্থও এখানে স্পষ্ট। তুরস্কের সামরিক আধুনিকায়ন প্রকল্প ‘ঋড়ৎপবং এড়ধষ ২০৩০’-এর আওতায় তাদের আধুনিক ড্রোন, প্রযুক্তিসম্পন্ন নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় বড় বাজার হতে পারে।

‎বৈশ্বিক মঞ্চে ইতিবাচক কূটনীতি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঢাকার কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাবকেই পুনর্ব্যক্ত করে। বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের এই বর্ধিত দরকষাকষির ক্ষমতাকে সামরিক জোটে যোগ না দিয়ে বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও সুষম কূটনীতির কাজে ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। বাংলাদেশ ইতিপূর্বে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন ১৪টি দেশের ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’-এ যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ওই জোটের উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি বাণিজ্যিক নিরাপত্তা দেওয়া, যা দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে, সরাসরি কোনো বহুজাতিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যাওয়া ভিন্ন হিসাব-নিকাশের বিষয়।

‎বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রভাব, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য ও কূটনৈতিক সম্ভাবনা
‎১. অর্থনৈতিক রূপরেখা: মক্কা চুক্তির মতো জোটে যোগ দিলে স্বল্পমেয়াদে সৌদি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা মিললেও, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখে জ্বালানি আমদানির খরচ ও শিপিং বীমা ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অক্ষুণœ রাখা।

‎২. ত্রিমুখী কৌশলগত ভারসাম্য (ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্র): বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সফলভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তানের উপস্থিতি এবং তুরস্কের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঢাকার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক অবস্থানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
‎৩. জাতিসংঘ ও বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে ভূমিকা: সরাসরি কোনো সামরিক বলয়ে না গিয়ে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের মধ্যস্থতাকারী ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী ভাবমূর্তিকে জোরদার করা প্রয়োজন। এতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি উভয়ই সুরক্ষিত থাকবে।

লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা।

 

শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কারাগারে থাকায় প্রশাসক নিয়োগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কারাগারে থাকায় প্রশাসক নিয়োগ

সংবাদদাতা: চাঁদাবাজির মামলায় কারাগারে থাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলামের পক্ষে ফেসবুকে সরব হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে তাকে সরিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

গত ২৪ আগস্ট সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ স্বাক্ষর করা এক চিঠিতে শ্যামনগর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনকে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম কারাগারে থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাকে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে।

এর আগে গত ১২ আগস্ট সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হাজী নজরুল ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পোস্ট দেন। চেয়ারম্যানকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকে তিনি ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে শ্যামনগরবাসীকে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

গাজী নজরুল ইসলাম তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ‘দুবারের সফল চেয়ারম্যান’ হাজী নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার নয়, হাইকোর্টের দেওয়া জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো এবং তার বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা মুখরোচক অপপ্রচার’ প্রতিপক্ষের ‘কঠিন চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ফল’। তিনি ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের’ মাধ্যমে নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন।

তবে যে মামলায় হাজী নজরুল ইসলাম কারাগারে রয়েছেন, সেই মামলার এজাহারে চাঁদা দাবি, প্রকল্পের কাজে বাধা, হামলা ও হত্যার হুমকির অভিযোগ রয়েছে। হাজী নজরুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাইকার অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে চাঁদাবাজি, হামলা ও কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগে গত ২৫ মে রাতে শ্যামনগর থানায় মামলাটি করেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলামকে। তাঁর ছেলে আব্দুর রহমান, স্থানীয় বিশ্বজিৎ মন্ডলসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত বছরের আগস্ট থেকে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে চাঁদা দাবি করে কাজ বন্ধের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। চাঁদা না দেওয়ায় ১৪ এপ্রিল থেকে প্রকল্পের কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯ মে রাতে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে হাজী নজরুল ইসলাম ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং কাজ চালিয়ে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়।

এরপর ২৩ মে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে মারধর এবং তাঁকে রক্ষা করতে গেলে কিউরিং ম্যান ফেরদৌসকেও মারধরের অভিযোগ আনা হয়। প্রকৌশলী জাহিদের একটি অ্যাপল স্মার্টওয়াচ ও মানিব্যাগ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তবে শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন হাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর দাবি, অভিযোগগুলো মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হামলার অভিযোগের সময় তিনি ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট অধিবেশনে ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এর আগে উচ্চ আদালত থেকে হাজী নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগী বিশ্বজিৎ মন্ডল ছয় সপ্তাহের জামিন পেয়েছিলেন। জামিনের মেয়াদ শেষে গত ১০ আগস্ট তাঁরা সাতক্ষীরার আদালতে হাজির হয়ে পুনরায় জামিন আবেদন করেন।

শুনানি শেষে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুর রহমান তাঁদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এর কয়েক দিনের মধ্যেই হাজী নজরুলের পক্ষে ফেসবুকে সরব হন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। তার বক্তব্যে চেয়ারম্যানের কারাগারে যাওয়ার ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এদিকে জেলা প্রশাসনের চিঠিতে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম কারাগারে থাকায় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ফলে চাঁদাবাজির মামলায় চেয়ারম্যান কারাগারে যাওয়ার পর এবার তার দায়িত্বে প্রশাসক বসানোর মধ্য দিয়ে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার নতুন ব্যবস্থা করা হলো।

 

 

শ্যামনগরে পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদযাপন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ
শ্যামনগরে পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদযাপন

শ্যামনগর প্রতিনিধি: শ্যামনগর উপজেলার জসনে জুলুস এর আয়োজনে পবিত্র ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সাঃ) উদযাপন উপলক্ষে শ্যামনগরে উপজেলা জসনে জুলুস এর র‌্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতি ছিলেন মাস্টার মোঃ রিয়াজুল ইসলাম (হেলাল)। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন মাওলানা বেলাল হোসেন। পবিত্র কুরআন তেলওয়াত এর মাধ্যমে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। সভাপতি বক্তব্য শুরুতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত নবী প্রেমিক মুসল্লীদেরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং জসনে জুলুস এর উপর গুরুত্বারোব করে এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি বলেন, অত্র সংগঠনটি একটি অ-রাজনৈতিক সংগঠন।

 

হুজুর পাক (সাঃ) এর আবির্ভাবের মূহুর্তে সমগ্র সৃষ্টিকুলের মধ্যে যে জাগরণ, শিহরণ ও উচ্ছাস সৃষ্টি হয়েছিল সেই দিনের অনুসরণে নবী প্রেমিকদের নিয়ে র‌্যালি, যাহা জসনে জুলুস র‌্যালী নামে আখ্যায়িত।

 

এই র‌্যালী অনন্তকাল ব্যাপী জারি থাকবে ইনশাআল্লাহ। সভায় হায়বাতপুর শেখ পাড়া জামে মসজিদের প্রধান উপদেষ্টা ও খায়রিয়া আজিজিয়া ফাউন্ডেশনের সুজগ্য সভাপতি আলহাজ্ব শেখ মোস্তাক আহম্মাদ জসনে জুুলুস উদযাপন সুশৃঙ্খল ও সুন্দর করার জন্য উপস্থিত সকলকে পরামর্শ পদান করেন। পর্যায়ক্রমে উপজেলা ব্যাপী বিভিন্ন মসজিদ ও সংগঠন থেকে র‌্যালী সহকারে উপজেলা ঈদগাহ ময়দানে আলোচন সভায় মিলিত হয়।