শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

মুক্তমত: মাইকের ডাক পৌঁছায় না মনে : ‘বৃক্ষমেলা প্রসঙ্গ’

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৭ অপরাহ্ণ
মুক্তমত: মাইকের ডাক পৌঁছায় না মনে : ‘বৃক্ষমেলা প্রসঙ্গ’

আখলাকুর রহমান

একটা ইজিবাইক। ছাদে দুটো মাইক বাঁধা। ড্রাইভার ছেলেটার নাম হয়তো রহিম কিংবা করিম, নাম দিয়ে কিছু যায় আসে না। সে প্রতিদিন সকালবেলা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘোষণা দিয়ে বেড়ায়, আসুন, আসুন, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে চলছে বৃক্ষমেলা। নানা রকমের ফলদ, ঔষধি ও বনজ গাছের চারা পাওয়া যাচ্ছে।

মাইকের শব্দ মিলিয়ে যায় বাতাসে। মানুষজন ঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখে, তারপর আবার নিজের কাজে মন দেয়। কেউ কেউ ভাবে, ও, মেলা হচ্ছে বুঝি। ব্যস, এইটুকুই। এরপর আর কিছু নেই।

এই দৃশ্যটা আমার কাছে বড় করুণ লাগে। একটা সুন্দর উদ্যোগ, একটা মহৎ চিন্তা, অথচ তার পরিণতি একটা ইজিবাইকের মাইকের আওয়াজে আটকে গেছে। যেন কেউ একজন বিরাট এক প্রেমপত্র লিখেছে, তারপর সেই পত্র একটা কাগজের ঠোঙায় মুড়িয়ে ফেলে দিয়েছে ডাস্টবিনে।

আমরা বাঙালিরা বড় অদ্ভুত জাতি। আমরা গাছ ভালোবাসি বলে দাবি করি, অথচ গাছ কিনতে গেলে আমাদের হাত কাঁপে। আমরা বৃষ্টির গান গাই, নদীর গল্প লিখি, বটগাছের ছায়ায় বসে আড্ডা দিই, কিন্তু যখন একটা চারাগাছ কিনে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন আসে, তখন আমরা হিসেব করি, এটা দিয়ে কী হবে?
এই কী হবে প্রশ্নটাই আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।

শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে যে ছেলেমেয়েরা নার্সারি নিয়ে বসে আছে, তাদের মুখের দিকে তাকালে মনটা খারাপ হয়ে যায়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বসে থাকে, রোদে পুড়ে, গাছের পাতায় পানি দেয়, যতœ করে সাজিয়ে রাখে টবগুলো। অথচ সন্ধ্যা নামলে দেখা যায়, বিক্রি হয়েছে দুই তিনটা মাত্র চারা।

একজন নার্সারি মালিক আমাকে বলছিলেন, স্যার, আমরা তো গাছ বিক্রি করি না, আমরা যেন ভিক্ষা চাই। কথাটা শুনে বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল।

অথচ ভাবুন তো, একটা আমগাছের চারা, দাম হয়তো পঞ্চাশ কি ষাট টাকা। এই টাকায় আজকাল একটা ভালো সিঙ্গাড়া চা ও হয় না ঠিকমতো। অথচ এই ছোট্ট চারাটা যদি বেঁচে থাকে দশ বছর, পনেরো বছর, তাহলে একদিন সে ছায়া দেবে, ফল দেবে, পাখিদের বাসা দেবে, বাতাস দেবে বিশুদ্ধ অক্সিজেন। এমন লাভজনক বিনিয়োগ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু আমরা এই হিসেবটা করি না। আমরা তাৎক্ষণিক লাভের হিসেব করি। আজকের বাজারে আলুর দাম কত, পেঁয়াজের দাম কত, এই নিয়ে আমাদের যত মাথাব্যথা। গাছের কথা মনে পড়ে শুধু তখনই, যখন রোদে হাঁটতে হাঁটতে ছায়ার খোঁজে আমরা কোনো এক অচেনা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে পড়ি।

তাহলে প্রশ্ন হলো, এই মেলাকে বাঁচানো যায় কীভাবে। এই ইজিবাইকের মাইকের বাইরে গিয়ে মানুষের মনে গাছের প্রতি একটা টান তৈরি করা যায় কীভাবে!

আমার মনে হয়, এখানে সবচেয়ে বড় ভুলটা হচ্ছে, আমরা গাছ বিক্রি করার চেষ্টা করছি, কিন্তু গাছের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছি না। মানুষ জিনিস কেনে যখন সেই জিনিসের সাথে তার একটা আবেগের যোগ তৈরি হয়। শুধু ঘোষণা দিয়ে জিনিস বিক্রি হয় না, গল্প দিয়ে জিনিস বিক্রি হয়। তাই প্রথম কাজ, গল্প তৈরি করা।

এক. গাছের নামকরণ উৎসব। প্রতিটি চারার সাথে একটা করে ছোট কার্ড ঝুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে, যেখানে লেখা থাকবে, আমাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে একটা নাম দাও। আমি তোমার সন্তানের বয়সী হয়ে বড় হবো তোমার সাথে। এই ছোট্ট কথাটা একটা শিশুর মনে যে প্রভাব ফেলবে, তা হাজার বিজ্ঞাপনেও হবে না। বাচ্চারা বাবা মাকে জোর করে নিয়ে আসবে গাছ কিনতে, শুধু নিজের গাছটার নাম রাখার জন্য।

দুই. জন্মদিনের গাছ। কারো জন্মদিন হলে কেক কাটার পাশাপাশি একটা গাছ রোপণের প্রচলন শুরু করা যেতে পারে। মেলায় এসে ঘোষণা করা যায়, আপনার সন্তানের জন্মদিনে তার বয়সের সমান উচ্চতার একটা গাছ উপহার দিন। প্রতি জন্মদিনে গাছটাও বড় হবে, আপনার সন্তানও বড় হবে। এই ধারণাটা মানুষকে ছুঁয়ে যাবে, কারণ এখানে গাছ আর সন্তানের ভাগ্য একসূত্রে বাঁধা পড়ে যায়।

তিন. বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতা। স্কুলে স্কুলে প্রতিযোগিতা ঘোষণা করা যেতে পারে, কোন শ্রেণি সবচেয়ে বেশি গাছ রোপণ করে তার যতœ নিতে পারে। ছাত্রছাত্রীরা যখন প্রতিযোগিতায় নামবে, তখন তাদের পরিবারও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। বিজয়ী শ্রেণিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া যেতে পারে।

চার. মাইকের বদলে মানুষের মুখ। ইজিবাইকের মাইক আর যান্ত্রিক ঘোষণার বদলে দরকার মানুষের মুখ। স্থানীয় কোনো শিক্ষক, কোনো প্রবীণ ব্যক্তি, কিংবা কোনো পরিচিত মুখ যদি ভিডিও বার্তা দেন, আমি চল্লিশ বছর আগে একটা কড়ই গাছ লাগিয়েছিলাম আমার বাড়ির উঠোনে, আজ সেই গাছের ছায়ায় আমার নাতি নাতনিরা খেলা করে, এই ধরনের সত্যিকারের গল্প মানুষের মনে দাগ কাটবে। এই ভিডিওগুলো ফেসবুকে, ইউটিউবে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে দিতে হবে।

পাঁচ. হাটবাজারে উপস্থিতি। মানুষ মেলায় আসতে চায় না, কিন্তু হাটে তো আসেই। সপ্তাহের হাটবারে সাতক্ষীরার বিভিন্ন হাটে ছোট ছোট স্টল বসানো যেতে পারে। মানুষ যখন সবজি মাছ কিনতে আসবে, তখন পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে একটা চারাগাছ তার চোখে পড়বে, হাতে নিয়ে দেখবে, দাম জিজ্ঞেস করবে। এটাই আসল প্রচার, মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার পথে গাছকে নিয়ে যাওয়া।

ছয়. বিনিময়ের সংস্কৃতি। শুধু টাকার বিনিময়ে বিক্রি নয়, বিনিময়ের একটা মজার নিয়ম চালু করা যেতে পারে। পুরনো প্লাস্টিকের বোতল বা অব্যবহৃত জিনিস জমা দিলে একটা করে চারা ফ্রি। এতে পরিবেশ রক্ষার দুটো কাজ একসাথে হবে, প্লাস্টিক কমবে, গাছ বাড়বে। মানুষ বিনামূল্যের জিনিসের প্রতি সবসময় একটু বেশি আগ্রহী থাকে।

সাত. ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষঙ্গ। আমাদের সমাজে ধর্মীয় কথার একটা আলাদা শক্তি আছে। গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়ার সাথে যুক্ত করে প্রচার করা যেতে পারে। একটা গাছ যতদিন বাঁচবে, তার ছায়ায় যে বসবে, তার ফল যে খাবে, তার সওয়াব গাছ লাগানো মানুষটার আমলনামায় যোগ হতেই থাকবে। এই কথাটা ইমাম সাহেবরা জুমার নামাজের পরে বললে তার প্রভাব অন্যরকম হবে।

আট. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার। মেলার একটা দিন সরাসরি ফেসবুক লাইভ করা যেতে পারে, যেখানে দেখানো হবে কোন গাছের কী উপকারিতা, কীভাবে যতœ নিতে হয়, কোন গাছ কম জায়গায় লাগানো যায়। মানুষ তথ্য পেলে আগ্রহী হয়। শুধু গাছ কিনুন বললে মানুষ আগ্রহী হয় না, কিন্তু এই গাছটা আপনার ছাদবাগানের জন্য একদম উপযুক্ত, তিন বছরেই ফল দেবে, এই কথাটা শুনলে মানুষ এগিয়ে আসে।

আসলে সমস্যাটা গাছের নয়, সমস্যাটা আমাদের মনের। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যেখানে সবকিছু তাৎক্ষণিক হতে হবে। আজ টাকা দিলে আজই ফল চাই। কিন্তু গাছ তো এমন জিনিস নয়। গাছ ধৈর্যের ফসল। গাছ ভালোবাসার প্রতিদান দেয় বছরের পর বছর ধরে, ধীরে ধীরে, নীরবে।

একটা গাছ কখনো অভিযোগ করে না। রোদ পড়ুক, ঝড় আসুক, অবহেলা হোক, গাছ শুধু বেড়ে ওঠে। আর একদিন হঠাৎ দেখা যায়, সেই ছোট্ট চারাগাছটা বিশাল হয়ে গেছে, তার নিচে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে ক্লান্ত পথিক, তার ডালে বাসা বেঁধেছে কোনো এক অচেনা পাখি।

আমার মনে হয়, সাতক্ষীরার এই বৃক্ষমেলাকে বাঁচাতে হলে আমাদের প্রথমে এই গল্পগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, একটা গাছ কেনা মানে শুধু একটা চারা কেনা নয়, একটা ভবিষ্যৎ কেনা, একটা ছায়া কেনা, একটা প্রজন্মের জন্য একটা উপহার রেখে যাওয়া।

জেলা প্রশাসন, সামাজিক বন বিভাগ, স্কুল কলেজ, স্থানীয় সাংবাদিক, ইমাম সাহেব, শিক্ষক, সবাইকে একসাথে নেমে আসতে হবে এই কাজে। শুধু একটা ইজিবাইকের মাইক দিয়ে এই বিশাল কাজ হবে না। এর জন্য দরকার মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর মতো ভাষা, গল্প বলার মতো ধৈর্য, আর ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো আন্তরিকতা।

আমি জানি না এই লেখাটা পড়ে কজন মানুষ গাছ কিনতে যাবেন। কিন্তু যদি একজনও যান, যদি একটা শিশু তার বাবাকে ধরে বলে, বাবা, আমার একটা গাছ চাই, আমি তার নাম দেব, তাহলেই এই লেখা সার্থক।

শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের সেই নার্সারি মালিকদের চোখে যে হতাশা দেখেছি, সেই হতাশা কেটে গিয়ে যদি একটা হাসি ফোটে, তাহলে বুঝব, গাছেরাও এবার অভিমান ভুলে গেছে। আর অভিমান ভাঙানোর সবচেয়ে ভালো উপায় তো একটাই, ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নেওয়া।

গাছ যেমন নীরবে ভালোবাসে, আমাদেরও শেখা উচিত তেমন নীরবে ভালোবাসতে। একটা চারা হাতে নিয়ে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার মুহূর্তটা যদি আমরা একবার অনুভব করি, তাহলে বুঝব, এই ছোট্ট কাজটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে বড় এক আনন্দ।

মেলা শেষ হয়ে যাবে কয়েকদিন পরে। কিন্তু গাছ লাগানোর কাজ তো শেষ হওয়ার নয়। এই মেলা শুধু একটা শুরু হোক, সাতক্ষীরার প্রতিটা বাড়ির উঠোনে, প্রতিটা স্কুলের মাঠে, প্রতিটা রাস্তার ধারে যেন একদিন সবুজের সমারোহ দেখা যায়। এই স্বপ্নটাই তো ছিল আয়োজকদের মনে। এখন প্রয়োজন শুধু সেই স্বপ্নটাকে মানুষের মনের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া।

লেখক: উদ্যোক্তা

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এম শফিকুল ইসলাম: পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। অসতর্কতার কারণে শিশুদের অকাল মৃত্যু নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ডিজাস্টার ফোরাম জেলা ভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে।

 

পরিসংখ্যানে তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ দেবাহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের একটি মাছের ঘেরের পানিতে পড়ে আসমাউল হুসনা (২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ১৪ জুলাই তালা উপজেলার ধামসা ঢ্যামসাখোলা গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে রুমানা খাতুন (৫) নামক এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে পৃথক দুটি ঘটনায় শান্ত (৫) এবং ফাহিম (৩) নামের দুটি শিশুর পুকুর ও বেতনা নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

 

২২ মে কালীগঞ্জ উপজেলার মাগরি গ্রামে পুকুরে গোসল করতে নেমে জান্নাতুল (১১) নামে এক শিশু প্রাণ হারায়। একই উপজেলার ২৩ মার্চ সন্ন্যাসীচক গ্রামের নানা বাড়িতে এসে মাছের ঘেরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে একই দিনে পৃথক ঘটনায় ৪টি শিশু ও ১ জন কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রান হারিয়েছে। ডুবে মৃত্যুর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন ছেলে ও কন্যাশিশু রয়েছে। ডিজাস্টার ফোরামের আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৪ জন। যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

 

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল,’ ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইট’ বাস স্্েরাতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান”।

 

ডব্লিউএইচও এর পরিসংখ্যান বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, গ্রাম, শহর ও নগরকেন্দ্রীক পরিবারদের সচেতনতার অভাব, গাফিলতি, অন্যমনস্ক এবং অজ্ঞতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী