বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

শঙ্খের চোখে জল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ
শঙ্খের চোখে জল

সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ
কবি শঙ্খ ঘোষ। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো কবি-লেখক বা পাঠকের কাছে নামটি অপরিচিত নয়। সে কারণে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেবারও কোনো প্রযৈাজন আছে বলে আমার মনে হয় না। তিনি ছিলেন বাংলা কবিতার বাতিঘর। তাঁকে নিয়েই আজকের লেখা। কবি শঙ্খ ঘোষ এখন অনেকের কাছে কলকাতার মানুষ হিসেবে সু-পরিচিত হলেও মনে-প্রাণে তিনি এখনও বাংলাদেশের মানুষ। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা এই বাংলাদেশেই। বাংলাদেশের বৃহত্তর কুমিল্লার চাঁদপুর শহরে মামাবাড়িতে জন্ম হলেও বরিশালের বানারিপাড়ার পৈত্রিক বাড়ির ছৈলেবেলার হাজারো সুখস্মৃতি এখনও কবির হৃদয়ে জাজ্বল্যমান। ব্যস্তশহর কলকাতার শত কোলাহলের মধ্যেও সেই ছেলেবেলায় ফেলে আসা স্মৃতি, নিজের জন্মস্থান চাঁদপুরের সেই সব প্রাণের মানুষগুলো, বানারিপাড়ার বিস্মৃতপ্রায় বন্ধুদের অস্পষ্ট ঝাপসা ভাসা ভাসা মুখগুলো ঘুরেফিরেই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়। সে সব দিনের কথা ভাবতে ভাবতে নস্টালজিক হয়ে পড়েন। সে কতদিন আগের কথা! আবার ফিরে যেতে চান সেই সে ছোট্টবেলায়। যদিও আজ ছেলেবেলাকার বন্ধুদের অনেকের নাম মনেও করতে পারেন না। কেউ বেঁচে আছেন কিনা সেটাও জানেন না। কলকাতায় যাচ্ছি সেই চুরানব্বই সাল থেকে । মূলত: লেখালেখির কারণেই অসংখ্যবার গিয়েছি অথবা বলা যেতে পারে যেতে হয়েছে বা হচ্ছে। যতবারই গিয়েছি প্রতিবারই প্রিয় কবির সাথে দেখা করার সুপ্ত বাসনা নিয়ে গেলেও যাই যাচ্ছি করেও বিভিন্ন কারণে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এ বছর বাংলাদেশ লেখক পরিষদ’র একটি টিম নিয়ে কলকাতা বইমেলায় যাওয়া ঠিক হলে নিজেই নিজের মনের কাছে ‘ধনুকভাঙা পণ’ করে বসলাম, যাই ঘটুক এবার প্রিয় কবির সাথে দেখা না করে ফিরব না।
সেবার কলকাতার সাতটা দিন আমাদের ভীষণ ব্যস্ততায় কাটে। আগের দিন টিম বাংলাদেশ লেখক পরিষদের সাথে বোলপুর শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম। পরদিন ১১ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বইমেলার শেষ দিন। আমাদের টিম রাতে শান্তিনিকেতনে থেকে গেলেও কলকাতার কবি-লেখকবন্ধুদের সাথে শেষ দিনের পুরোটা সময় বইমেলায় কাটানোর জন্য আমি এবং ও বাংলার কবি সূর্য ঘোষ সন্ধ্যের ট্রেন ধরে কলকাতায় ফিরে আসি। এর সাথে কবি শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টাও মাথায় রাখি। কবি সূর্য ঘোষ বন্ডেল নেমে গেলেও হাওড়া নেমে কলেজ স্ট্রিট অবধি আসতে আমার রাত ১১টা বেজে যায়।
পরদিন খুব সকালে বন্ধুজন প্রবীন কবি শ্যামল সোম ফোন দিলেন। হ্যালো, হোটেলে আছেন তো?
আমি বললাম- হ্যাঁ আছি, হোটেলেই আছি। এই ভোর সকালে হোটেল ছেড়ে যাব কোথায়?
উনি বললেন- ঠিক আছে, আপনি হোটেলেই থাকুন, আমি আসছি। এই ধরুন, ঘন্টাখানেকের মধ্যে আপনার রুমে পৌঁছে যাব। আমি বললাম- ঠিক আছে, আমি রুমেই আছি আপনি চলে আসুন ।
এক ঘন্টা নয়, মিনিট চল্লিশেকের মধ্যে এসে গেলেন কবি শ্যামল সোম। বয়স্ক মানুষ। এবারে পঁচাত্তরে পা দিয়েছেন। তবে মনের দিক দিয়ে বয়স পঁচিশও পেরোয়নি। খুবই আন্তরিক ও বন্ধুবৎসল একজন মানুষ।
আমি তাকে চা খেতে বললাম। হোটেলের রুমেই হিটার, চা-কফি-বিস্কুটের ব্যবস্থা ছিল। তিনি রাজি হলেন না।
বললেন- এখানে নয়, চলুন নিচে গিয়ে চা-বিস্কুট খাই। জানেন তো, কলকাতার স্ট্রিট ফুড খুবই পপুলার। সব পাওয়া যায়। অনেক মানুষ তো সকালের নাস্তাটা রাস্তায়ই সেরে নেয়।
আমার তাতে মোটেও আপত্তি ছিল না। কলকাতার কলকাতার স্ট্রিট ফুড আমারও খুব পছন্দ। কলকাতায় গেলে রাস্তার খাবার খেতে খেতে পেট ভরে যায়। বিশেষ করে কলকাতার পেয়ারা, চারা গজানো কাঁচা ছোলা আর ভাঁড়ের চা। ভাঁড়ের চা তো সামনে পড়লে সহসা মিস করি না। দিনে যে কতবার খাওয়া পড়ে তার ইয়ত্বা নেই। চুরানব্বই সাল থেকে কতবার, কত শত কাপ যে ভাঁড়ে চা খেয়েছি আর কত শত ছবি তুলেছি তারও ইয়াত্বা নেই। যতবার খেয়েছি ততবারই ছবি তুলেছি। সুতরাং নিচে চা খেতে যেতে আপত্তি থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না।
আমরা দুজন নিচে এলাম। বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে কলেজ স্কোয়ারের ভেতর দিয়ে শর্টকাট রাস্তায় কলেজ স্ট্রিটের ট্রাম রোডের ফুটপাতের চায়ের দোকানে যাবার পথে সানুর সাথে দেখা। ঝুবফধ জঁশযংধহধ তধসধহ ঝযধহঁ (সৈয়দা রুখসানা জামান সানু) আমাদের টিমের সদস্য। তার অন্য একটা প্রোগ্রাম থাকায় কাল শান্তিনিকেতনে যায়নি। আমরা চা খেতে যাচ্ছি শুনে সেও আমাদের সঙ্গী হল।
শ্যামল সোম বললেন- চলুন, আমি আপনাদের পুটিরামের একটা জলের সন্দেশ খাওয়াব। একশো বছরের পুরনো মিষ্টির দোকান। এখানকার জলের সন্দেশ খুব নামকরা।
আমি আপত্তি করলাম-খালি পেটে মিষ্টি খাব না। তার ওপরে আমার আবার সুগার লেবেল হাই। প্রতিদিন দুই বেলা সুঁই নিতে হয়।
তিনি শুনলেন না। খেতেই হবে। তবে আমাদের ভাগ্য প্রসন্নই বলতে হবে। পুটিরাম তখনও খোলেনি। কলকাতার দোকান-পাট আমাদের দেশের মতো সাতসকালে খোলে না। মার্কেট খুলতে বেলা বারটাও বেজে যায়। আমরা ট্রাম রোড পার হয়ে ওপারের একটা চায়ের দোকানে বসলাম। যদিও এখন কলকাতার রাস্তায় ট্রাম চলে না। আমাদের দেশে রাস্তার খাবার খেতে অনেকের অনীহা দেখা গেলেও কলকাতার স্ট্রিট ফুড খুবই পপুলার। অনেকেই খাচ্ছে। আমারও খুব পছন্দ। প্রচুর লোক স্ট্রিট ফুড খায়। পেঁপে, পেয়ারা, কলা, তরমুজ, ডাব, মিক্সড ফুড থেকে শুরু করে ওমলেট, চিকেন, ভেজিটেবল আইটেম সব পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষ থেকে বিত্তশালী সবাই খায়। বিদেশিরাও। দইবড়া, ওমলেট আর কচুরি খেয়ে ভাঁড়ের কাপে চুমুক দিলাম। যথারীতি ক্যামেরায় ক্লিক। শ্যামল সোম বললেন- এখান থেকে জোড়াসাঁকো রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কাছেই। যাবেন নাকি? আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সানু বললেনÑ এটা আবার জিজ্ঞেস করতে হয় নাকি? চলেন, চলেন। শ্যামল সোম একটা ট্যাক্সি ডাকলেন। চল্লিশ টাকা ভাড়া শুনেই বুঝলাম খুব কাছেই। সত্যিই তাই। ওয়ার্কি ডিসট্যান্স। জোড়াসাঁকোয় এর আগেও অনেকবার এসেছি। গেটের সামনে থেকে আরো একবার ভাঁড়ের চা খেয়ে ঢুকে পড়লাম জোড়াসাঁকো রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছবি তোলার জন্য টিকিট কাটতে হল। আমাদের ভাগ্য প্রসন্ন বলতে হবে। একই সময়ে ফ্রান্সের একটা লেখক টিম (ফ্রান্সের টিম হলেও টিমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি ও আফ্রিকারও কয়েকজন কবি-লেখক-প্রাবন্ধিক ছিলেন) আসে জোড়াসাঁকোয়। তাদের সাথে আমরা ঘুরে-ছবি তুলে জোড়াসাঁকো দেখা হল। বেশ এনজয় হল অনেকটা সময়।
ফেরার পথে আমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে এলাম প্রেসিডেন্সি কলেজ চত্বরে। এই প্রেসিডেন্সি কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল ছিলেন আমার নানাশশুর প্রফেসর ওয়ালিউল্লাহ। সেটাও বৃটিশ আমলের শেষ দিকের কথা। ফলে আমার স্ত্রীকে দেখানোর জন্য এখানেও অনেকগুলো ছবি তুললাম।
প্রেসিডেন্সি কলেজে কবিতা কর্ণারের একটা কবিতার অনুষ্ঠানের বিলবোর্ড টাঙানো ছিল। প্রধান অতিথি কবি শঙ্খ ঘোষ। সেটাতে চোখ পড়তেই কবি শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে যাবার কথা মনে পড়ে গ্যালো। এতদিন দৌঁড়াদৌঁড়িতে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। সাথে সাথে কবির বাসায় ফোন করলাম। ভুল নাম্বার। এ কারণে কল গ্যালো না। ফারুককে ফোন করলাম। উদার আকাশ পত্রিকার সম্পাদক ঋধৎঁয়ঁব অযধসবফ (ফারুক আহমেদ)। একাধারে কবি, লেখক, সম্পাদক ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত।খুবই সজ্জ্বন এবং আন্তরিক একজন মানুষ। হেল্পফুলও। আমার খুব প্রিয় এবং স্নেহজন। সে নাম্বার দিলে দেখলাম, নাম্বার তোলার সময় একটা ডিজিট ভুল হয়েছিল। দুইয়ের জায়গায় তিন। আবার ফোন করলাম। এবার ফোন রিসিভ হল। শঙ্খ ঘোষ নিজেই ফোন রিসিভ করলেন। নমস্কার জানিয়ে এবং ঢাকা থেকে এসেছি বলে আমি ওনার সাথে দেখা করতে চাই সেটা জানালাম। শুনে তিনি বললেন- সাড়ে বারোটার মধ্যে আসতে পারলে দেখা হবে তা না পারলে আজ আর দেখা হবে না। আমাকে একটা অনুষ্ঠানে যেতে হবে। সাড়ে বারটায় আমি বাসা থেকে বেরিয়ে যাব। আমরা তো জানি, কোথায় যাবেন। আমরা তো সেখানেই দাঁড়িয়ে। তখন সাড়ে এগারোটা বাজে। হাতে সময় এক ঘন্টা। এর মধ্যে রেডি হয়ে উল্টোডাঙা যেতে হবে। হোটেলে ফিরে পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে শ্যামল সোমসহ বেরিয়ে পড়লাম। রিসিভশনে গিয়ে দেখলাম সানু আমাদের আগেই এসে বসে আছে। মেয়েরা যে এত তাড়াতাড়ি রেডি হতে পারে আমার জানা ছিল না। নিচে নেমে একটা উবের (আমরা আবার বললেও কলকাতার মানুষেরা উবের বলে। নিলাম । গন্তব্য কলেজ স্ট্রিট টু উল্টোডাঙা। বিভিন্ঠিন কবি-সাহিত্যিকদের লেখার কারণে উল্টোডাঙা বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে একটি সুপরিচিত নাম। আমাদেরকে যেতে হবে উল্টোডাঙা। শুধু এ টুকুই জানতাম। লোকেশনটা ঠিক মতো বলতে পারলাম না বলে অনেকটাই ঘুরতে হল, ফলে অনেকটা সময় নষ্ট হল । কবির বাসা খুঁজে পাওয়ার আগে যারা কবি সম্পর্কে কম জানেন তাদের উদ্দেশে আরো একবার বলা যেতেই পারে। ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলা শহরে জন্ম বাংলাসাহিত্যের অন্যতম সেরা কবি, সাহিত্য সমালোচক ও রবীন্দ্র-গবেষক শঙ্খ ঘোষের। পৈত্রিক বাড়ি বরিশালের বানারিপাড়ায়। তাঁর প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। শঙ্খ ঘোষের স্কুল জীবন কাটে কুষ্টিয়ার পাকশির চন্দ্রপ্রভা বিদ্যানিকেতনে। এরপর বাংলাদেশের পাঠ চুকিয়ে পরিবারের সাথে কলকাতায় পাড়ি জমান। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইন্টরমিডিয়েট এবং ১৯৫১ সালে বাংলায় স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বঙ্গবাসী কলেজ, কলকাতা সিটি কলেজ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, শিমলার ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ আডভান্স স্টাডিজ ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি ১৯৯২ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানেন। ১৯৬০ সালে তিনি মাত্র ৩২ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে আইওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেন। স্ত্রী প্রতিমা বসু ও দুই মেয়ে শ্রাবন্তি ও সেবন্তিকে ঘিরেই কেটেছে কবির জীবন।
১৯৭৭ সালে ‘মূর্খ বড়, সামাজিক নয়’ বইয়ের জন্য নরসিংহ দাস পুরস্কার পান কবি শঙ্খ ঘোষ। একই বছর ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে ‘ধুম লেগেছে হৃদকমলে’ বইয়ের জন্য লাভ করেন রবীন্দ্র পুরস্কার ও ‘গন্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’র জন্য সরস্বতী পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে ‘রক্তকল্যাণ’ অনুবাদের জন্য আবার সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে পান বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম পুরস্কার। ২০১১ সালে তাকে দেয়া হয় ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ পুরস্কার’ এবং ২০১৬ সালে লাভ করেন ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার’।
পুরস্কার পাওয়া বইগুলো ছাড়াও তাঁর খুব উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে: মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে, এ আমির আবরণ, উর্বশীর হাসি, ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ অন্যতম।
আবার ফিরে আসি মূল আলোচনায়। অনেক ঘুরে-টুরে, অনেক খোঁজাখুজির পর শেষতক কবির উল্টোডাঙার হাটকো মোড়ের বাসায় পৌঁছালাম। তখন বাগে দেড়টা। এক ঘন্টা লেট। তিন তলায় কবি থাকেন। আমরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম। বেল বাজাতেই কবি নিজে এসে দরজা খুললেন। আমরা প্রিয় কবিকে প্রণাম জানিয়ে আমরা তিনজন ভেতরে ঢুকলাম। কবির বৈঠকখানায় ঢুকতেরই মনটা ভর গ্যালো। বই আর বই। শঙ্খ ঘোষের বাড়ির বইয়ের কথা আগেই অনেকবার অনেকের মুখে শুনেছিলাম। এবার তা নিজের চোখে দেখলাম। দেখে চোখ জুড়িয়ে গ্যালো। কবির বাসায় দেখা হল ‘মাঝি’ পত্রিকার সম্পাদক প্রশান্ত রায়ের সাথে। খুবই সজ্জ্বন। কবি আমাদেরকে বসতে বললেন। বসার পর আমি বিনয় করেই বললাম- আমাদের আসতে একটু দেরি হয়ে গ্যালো। উত্তরে কবি বললেন- একটু নয়, অনেকটাই দেরি হয়ে গ্যাছে। এক ঘন্টা। আজ আর বেশি সময় দিতে পারব না। আমাকে তাড়াতাড়ি বেরুতে হবে। একটা অনুস্ঠানে যেতে হবে। আমি সাধারণত কোন অনুষ্ঠানে দেনি করে যাই না। আজ দেরি হবে।
কবিকে উৎসর্গ করা আমার ‘নস্টালজিক পোয়েম’ এবং আমার জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে লেখা ‘দীপ্তিময় ব্যাপ্তি’ বই ২খানা ওনার হাতে দিলাম। তিনি ‘এ্যাট এ্য গ্লেন্স’ উল্টেপাল্টে দেখলেন। সানু নিজের একটা বই আর বাংলাদেশের পতাকা সম্বলিত একটি ব্যাজ কবির হাতে পরিয়ে দিলেন। সেটা হাতে পরে কবির দু’চোখ খুশিতে চিক্চিক্ করে উঠল। হয়ত ক্ষণিকের তরে ফিরে গেলেন ফেলে আসা শৈশবে। সন্দেশ, সিঙাড়া, আঙুর আর বিস্কুটের সাথে ধোয়া ওঠা চায়ের পাশাপাশি কবির সাথে ছোট্ট আলাপচারিতায় মেতে উঠলাম আমরা চারজন। কবির মতো আমাদেরও ব্যস্ততা ছিল। আমাদেরও বইমেলায় যেতে হবে আর কবির প্রোগাম থাকায় মন না চাইলেও আলাপারিতা সংক্ষেপ করতে হল।
ওঠার প্রাক্কালে আমি বললাম- আমার তো দু’বছর বয়সে বাবা মারা গ্যাছে। বাবার স্নেহ কী সেটা আমি জানি না। বাবার কোন স্মৃতিও মনে পড়ে না। আজ আপনাকে দেখে আমার বাবার কথা খুব করে মনে পড়ছে। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমার বাবার কথা মনে করেই আমি একবার আপনার পা স্পর্শ করব। আমার যেমন দুই মেয়ে, কবিরও তেমনি দুই মেয়ে। কোন পুত্রসন্তান নেই। যদিও তাতে আমার যদিও কোন আক্ষেপও নেই। বরং স্বস্তি আছে। আমার কথা শুনে কী হল জানি না। কবির দু’চোখ ছাপিয়ে জলে এসে ভরে গ্যালো। তিনি আমার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন। অশ্রুসজল চোখে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন। জ্ঞান হবার পর এই প্রথম একজন বাবার বুকে মাথা রাখার সুখ অনুভব করলাম। বাবার বুকের উষ্ণতা কী জানতাম না। একবারের জন্য, একটুখানি হলেও সেটা জানলাম। আমার বুকটা ভরে গ্যালো। কবির মনে কী হল জানি না। তখন কবি শঙ্খ ঘোষের চোখে জল। কবির চোখে জল দেখে আমারও মনের অজান্তে দু’চোখ ভিজে গ্যালো। অন্য তিনজনের অবস্থাও তথৈবচ।
আমরা কবির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম । কবি দাঁড়িয়ে রইলেন দরজার ওপাশে। তখনও কবির দু’চোখের কোণে অশ্রু চিক্চিক্ করছে। আমি বারবার ফিরে ফিরে তাকালাম। কবি তখনও দাঁড়িয়ে আছেন। হাত নেড়ে আরো একবার বিদায় জানালাম। তিনিও হাত নাড়লেন। আমরা নিচে নামার পর দরোজা বন্ধের শব্দ শুনলাম। আমরা হাঁটা শুরু করলাম গেটের দিকে। পেছনে পড়ে রইল কিছু সময়ের অবিস্মরণীয় স্মৃতি। এরপর আরো কয়েকবার কলকাতায় গিয়েছি। যাই যাব করেও প্রিয় কবির সাথে আর দেখা করা হয়ে ওঠেনি। ২০২০ সালে শুরু হয় করোনাকালীন সময়। করোনার কারণে সারা পৃথিবী ওলোট-পালট হয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষ মারা যায়।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ২১ এপ্রিল ৮৯ বছর বয়সে কবি শঙ্খ ঘোষ ইহলোক ত্যাগ করেন। এরপর আক্রান্ত হলেন কবিপতœী প্রতিমা ঘোষ। শঙ্খবাবুর প্রয়াণের ঠিক আটদিনের মাথায় জীবনাবসান হল জলপাইগুড়ির মেয়ে এবং বিদ্যাসাগর মর্নিং কলেজের অধ্যাপক প্রতিমাদেবীর। ৬৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে কাটিয়েছিলেন শঙ্খবাবু এবং প্রতিমাদেবী। প্রতিমা দেবীর লেখা অসংখ্য বইও আছে। আজ তাদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি…

Ads small one

অসময়ে হলুদ তরমুজ চাষে স্বাবলম্বী সাতক্ষীরার কৃষকেরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ
অসময়ে হলুদ তরমুজ চাষে স্বাবলম্বী সাতক্ষীরার কৃষকেরা

মীর মোস্তফা আলী: প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় চিংড়ি ঘেরের আইল ও পতিত জমিতে আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে শুরু হয়েছে অসময়ের বা বর্ষাকালীন তরমুজ চাষ। সবজির পাশাপাশি এখন ক্ষেতজুড়ে শোভা পাচ্ছে বাংলালিংক ও আকর্ষণীয় হলুদ জাতের তরমুজ। চলতি মৌসুমে জেলার ১০৮ হেক্টর জমিতে এই তরমুজের সফল আবাদ হয়েছে।
উপকূলীয় সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলাতেই এখন ঝুলছে মিষ্টি ও রসালো এই ফল। বিশেষ করে তালা, কলারোয়া, কালিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলায় বাংলালিংক ও হলুদ তরমুজের ফলন বেশি হয়েছে।
তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের ২৮ জন কৃষক বেসরকারি সংস্থা ‘উন্নয়ন প্রচেষ্টা’ ও পিকেএসএফের সহযোগিতায় ২১ বিঘা জমিতে প্রথম এই হলুদ তরমুজের আবাদ শুরু করেন। মাত্র ৬৫ দিনে ফলন আসায় অল্প খরচে অধিক মুনাফা পাচ্ছেন চাষিরা।
উপজেলার কৃষক ইকবাল, শিপন ও হান্নান জানান, জমি প্রস্তুত, সার, মালচিং পেপার, মাচা ও জাল বাবদ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হলেও এই ফল বিক্রি করে বিঘা প্রতি ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তারা। অল্প সময়ে ফলন পাওয়ায় একই জমিতে বছরে দুইবার তরমুজ চাষ করা সম্ভব।
উন্নয়ন প্রচেষ্টার কৃষিবিদ নয়ন হোসেনের মতে, সাতক্ষীরার মাটি অসময়ের তরমুজ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। চাকরির পেছনে না ঘুরে শিক্ষিত তরুণরা কৃষি উদ্যোগে যুক্ত হলে নিজেদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে বড় অবদান রাখতে পারবেন।

বইয়ের বিকল্প কেবল বই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ
বইয়ের বিকল্প কেবল বই

 

‎তারিক ইসলাম
‎সভ্যতার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতির জ্ঞানচর্চা, মননশীলতা এবং উৎকর্ষ সাধনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত বাহন হলো বই। প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল মাধ্যমের অভূতপূর্ব বিপ্লবের যুগে আজ চারদিকে নানা প্রশ্ন ও সংশয় দানা বাঁধছে—ডিজিটাল স্ক্রিন, ই-বুক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়েও কি বইয়ের আবেদন অপরিবর্তিত থাকবে? নাকি এর কোনো বিকল্প চলে এসেছে? গভীর ও সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করলে একটি সত্যই সামনে ভেসে ওঠে—তা হলো, বইয়ের বিকল্প কেবল আরেকটি বই-ই হতে পারে, অন্য কিছু নয়।
‎আজকের দিনে তথ্য প্রাপ্তির পথ অত্যন্ত সহজলভ্য। ইন্টারনেটের এক ক্লিকেই হাজারো তথ্য, নিবন্ধ ও সারসংক্ষেপ চোখের সামনে চলে আসে। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। তথ্য আমাদের সাময়িক কৌতূহল মেটায় বা কাজের সুবিধা করে দেয়, আর জ্ঞান আমাদের ভেতরটাকে সমৃদ্ধ করে, চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে এবং জীবনদর্শনের ভিত্তি গড়ে দেয়। এই পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানলাভের একমাত্র এবং প্রধান মাধ্যম হলো বই পড়া। একটি পূর্ণাঙ্গ বইয়ের পাতায় পাতার সঙ্গে যখন একজন পাঠকের চোখ ও মনের সংযোগ ঘটে, তখন সেখানে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা শুরু হয়, যা কোনো টুকরো তথ্য বা ডিজিটাল স্ক্রিনের ক্ষণস্থায়ী স্ক্রোলিংয়ে পাওয়া অসম্ভব।
‎বই পড়ার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গভীর ও ইন্দ্রিয়গ্রাহী। কাগজের ঘ্রাণ, পাতা উল্টানোর শব্দ এবং একটি আস্ত কাহিনীর ভেতরে ডুবে যাওয়ার অনুভূতি কেবল একটি বস্তুগত বইই দিতে পারে। এর বিপরীতে, ডিজিটাল মাধ্যমে পড়ার সময় মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেশি থাকে। নোটিফিকেশন, পপ-আপ বিজ্ঞাপন বা ইন্টারনেটের নানা প্রলোভন পাঠকের মনোযোগকে বারবার ছিন্ন করে। ফলে লেখকের মূল ভাবনার গভীরে পৌঁছানো বা তার সাথে মানসিক ঐক্য স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বই আমাদের এক ধরনের একাগ্রতা শেখায়, যা আজকের দ্রুতগতির বিক্ষিপ্ত যুগে বড় বেশি দুর্লভ।
‎অনেকে মনে করেন, ই-বুক বা অডিওবুক বইয়ের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। নিঃসন্দেহে এগুলো প্রযুক্তির চমৎকার উপহার এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত উপযোগী। কিন্তু এগুলোকে বইয়ের পরিপূরক বলা চলে, বিকল্প নয়। অডিওবুক শোনার সময় আমাদের কল্পনাশক্তির ওপর শ্রোতা হিসেবে একধরনের সীমাবদ্বতা তৈরি হয়, কারণ কথক বা কণ্ঠশিল্পীর উচ্চারণের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। অথচ নিজে বই পড়ার সময় পাঠক নিজেই তার কল্পনার রঙে চরিত্র ও দৃশ্যপটকে জীবন্ত করে তোলেন। বই পড়ার এই সৃজনশীল প্রক্রিয়াটি একান্তই পাঠকের নিজস্ব।
‎সবশেষে বলা যায়, সমাজ পরিবর্তনশীল, প্রযুক্তির রূপ বদলায়, বিনোদনের মাধ্যমও নতুন থেকে নতুনতর হয়; কিন্তু মানুষের মননশীলতার খোরাক জোগাতে বইয়ের আসন চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকে। একটি ভালো বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, সুসময়ের আনন্দ এবং দুর্দিনের সান্ত¡না। তাই যত আধুনিকতাই আসুক না কেন, মানুষের বিবেক, বুদ্ধি ও আবেগের সঠিক বিকাশ ঘটাতে বইয়ের স্থান কেউ দখল করতে পারবে না। বইয়ের বিকল্প কেবল বই-ই। লেখক: তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

 

কলারোয়ায় হাজী কল্যাণ সংস্থার মতবিনিময় সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ
কলারোয়ায় হাজী কল্যাণ সংস্থার মতবিনিময় সভা

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরায় আগামী ২২ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য হাজী সম্মেলন উপলক্ষে কলারোয়ায় এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে কলারোয়ার মরহুম ডাক্তার আনিসুর রহমান ভবনের দ্বিতীয় তলায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। কলারোয়া উপজেলা হাজী কল্যাণ সংস্থার সভাপতি ও কলারোয়া সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবু নসরের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা হাজী কল্যাণ সংস্থার সভাপতি আলহাজ মো. দ্বীন আলী। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলহাজ গোলাম মোস্তফা। উপজেলা হাজী কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক কাজী শামসুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইউনুস আলী, শাহীনুর রহমান ও আব্দুর রউফ উপস্থিত ছিলেন।