সম্পাদকীয়/ স্থায়ী জলাবদ্ধতায় সাতক্ষীরা: অপরিকল্পিত ঘের ও উদাসীনতার মাশুল
টানা কয়েক দিনের স্বাভাবিক বর্ষণে তলিয়ে গেছে সাতক্ষীরার শহর থেকে প্রত্যন্ত এলাকা। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, কয়েক দিনে সেখানে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। কিন্তু কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাকে এই চরম দুর্ভোগের একমাত্র কারণ বলা চলে না। মূলত মানুষের তৈরি প্রতিবন্ধকতা, অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের এবং নিষ্কাশনব্যবস্থার চরম অকার্যকারিতাই জেলাজুড়ে এ কৃত্রিম ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের শৈলকুর বিলের চিত্রটি বর্তমান সংকটের এক প্রকট উদাহরণ। সেখানে গুটি কতক প্রভাবশালী ব্যক্তির অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের এবং উঁচু বেড়িবাঁধের কারণে বিলের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ গেটের খাল ও বেতনা নদীর সংযোগস্থলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ইউপির অন্তত ১০টি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। জনজীবন আজ সম্পূর্ণ স্তব্ধ। সড়ক, কৃষিজমি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বসতবাড়িতে জমে রয়েছে দূষিত পানি। দীর্ঘসময় ধরে পানিবন্দী থাকার ফলে চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশনব্যবস্থা। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন নারী, শিশু এবং নি¤œ আয়ের দিনমজুরেরা, যাঁদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে জেলাজুড়ে নদীর নাব্যতা সংকট ও তীর ভাঙনের চিত্রও বেশ আশঙ্কাজনক। বেতনা নদীর ওপর সবেমাত্র নির্মিত গোবিন্দপুর-মাটিয়াডাঙ্গা সেতুর পিলারের গোড়া ও তীর ধসে চরম হুমকির মুখে পড়েছে কোটি কোটি টাকার সরকারি অবকাঠামো, মসজিদ ও বসতবাড়ি। অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে সড়কের পাশে ঘের করায় সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়ক ও বাইপাস সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। একদিকে কৃষি জমির ধান ও চিংড়ি ঘের ভেসে গিয়ে লাখ লাখ টাকার ক্ষতি, অন্যদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অচল অবস্থাÑসব মিলিয়ে এটি কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারই চরম বহিঃপ্রকাশ।
এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। সদর উপজেলা প্রশাসন যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ঘেরের বেড়িবাঁধ কেটে পানি অপসারণের যে আশ্বাস দিয়েছে, তা যেন শুধু মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। কোনো ব্যক্তিস্বার্থ যেন হাজার মানুষের জীবনের জিম্মি হওয়ার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি ভিজিএফ চাল, নিরাপদ পানীয় জল এবং চিকিৎসা সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে।
তবে সংকট নিরসনে দরকার একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পরিকল্পনা। নদী ও খালগুলোর পুনঃখনন, অবৈধ দখলদার মুক্তকরণ এবং পরিবেশসম্মত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে না পারলে প্রতি বর্ষাতেই এভাবে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষকে ডুবতে হবে। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা আশা করি, তারা জনদুর্ভোগ লাঘবে অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।









