সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

সুরের সমুদ্রে এক আজন্ম নাবিক: আবু আফ্ফান রোজবাবু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ণ
সুরের সমুদ্রে এক আজন্ম নাবিক: আবু আফ্ফান রোজবাবু

এসএম শহীদুল ইসলাম

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। রূপসা-কপোতাক্ষ-ইছামতীর হাওয়ায় ভেসে আসা নদী আর ম্যানগ্রোভের যে অনন্য সুর, সেই সুরকে আপন প্রাণের মধ্যে ধারণ করে যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সঙ্গীতের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তিনি আবু আফ্ফান রোজবাবু। একাধারে সুরকার, গীতিকার, অভিনেতা, উপস্থাপক এবং প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পীÑ বহুমুখী গুণী এই মানুষটি সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দীর্ঘ পথচলার পর সম্প্রতি তাঁর বর্ণাঢ্য সঙ্গীত জীবনের মুকুটে যুক্ত হয়েছে আরও এক নতুন পালক। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-র আধুনিক গানের ‘ক’ শ্রেণি থেকে পদোন্নতি পেয়ে তিনি উন্নীত হয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘উচ্চ’ শ্রেণিতে।

১৯৬৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা পৌরসভার মুনজিৎপুরের ১৩৩৮ নম্বর বাসায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন রোজবাবু। তাঁর পিতা মরহুম শেখ হামিদুর রহমান এবং মাতা ছকিনা রহমান (ম্যাজিস্ট্রেট রেকর্ডে মিসেস ছকিনা বেগম)। ১ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের তৃতীয় সন্তান।

শৈশব থেকেই রূপসী সুরের ভুবন তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করত। তবে সুরের পিছে ছুটলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে তিনি অবহেলা করেননি। ১৯৮৪ সালে সফলতার সঙ্গে বি.এ (স্নাতক) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তবে ডিগ্রি অর্জনের চেয়েও তাঁর মনপ্রাণ মজে ছিল সপ্তসুরের মূর্ছনায়।
সঙ্গীতের প্রতি অদম্য অনুরাগের কারণে ছাত্রজীবন থেকেই সুরের তালিম নেওয়া শুরু করেন রোজবাবু। সঙ্গীতের ব্যাকরণ ও শাস্ত্রীয় দক্ষতার গভীরে প্রবেশের জন্য তিনি প্রখ্যাত ওস্তাদদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।

তিনি প্রথম তালিম নেন ওস্তাদ আমজাদ হোসেনের কাছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ওস্তাদ অপূর্ব রায় এবং রুবিনা আহমেদের কাছে সুরের ভিত্তি শক্ত করেন।

১৯৮৯ সালে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী রাসবিহারী এভিনিউয়ের ‘ইন্ডিয়ান মিউজিক্যাল একাডেমি’-তে বিশিষ্ট সুরসাধক ওস্তাদ কল্যাণ সেন বরাটের কাছে সাধারণ ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে নিবিড় তালিম গ্রহণ করেন।

১৯৯৩ থেকে ২০০০ সালÑ দীর্ঘ সাত বছর তিনি ঢাকার বিখ্যাত সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক প্রয়াত ওস্তাদ প্রণব ঘোষের অধীনে আধুনিক ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ওপর কঠোর সাধনা করেন।
২০০২ সালে সাতক্ষীরা জেলা শিল্পকলা একাডেমির বিশেষ আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ঢাকার ওস্তাদ রুবিনা আহমেদ ও সাজাহান কবীরের কাছে পুনরায় উচ্চতর সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নেন।

পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী হলেও তাঁর মূল পরিচয় ও জীবনের একমাত্র ব্রত বা সাধনা হয়ে ওঠে সংস্কৃতিচর্চা।

রোজবাবুর সঙ্গীত জীবনের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয় ১৯৮২ সালে খুলনা বেতারে আধুনিক গান পরিবেশনের মাধ্যমে। এরপর ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্রের নিয়মিত তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ বেতারের ‘স্পেশাল গ্রেড’-এর বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী এবং মিউজিক প্রডিউসার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
শুধু গায়কিতেই থেমে থাকেননি তিনি। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘আপনাদের চিঠি পেলাম’ সফলতার সঙ্গে সঞ্চালনা ও পরিচালনা করেন।

অভিনয় জগতেও নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন এই গুণী শিল্পী। ১৯৯৯ সালে এটিএন বাংলায় প্রচারিত জনপ্রিয় প্যাকেজ নাটক ‘বিনিময়ে তুমি’-তে নায়ক চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসিত হন। উক্ত নাটকে তাঁর বিপরীতে নায়িকা হিসেবে ছিলেন তানিয়া রহমান। এ ছাড়া নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি; ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জোৎস্না রাতে’ ছায়াছবির চলচ্চিত্রে যৌথ কণ্ঠে গান পরিবেশন করেন তিনি।
শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থান করে নিতে তিনি উপহার দিয়েছেন একের পর এক মন ছুঁয়ে যাওয়া গান। এ পর্যন্ত একক ও যৌথ মিলিয়ে তাঁর ২১টি আধুনিক গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অডিও ক্যাসেট ও অ্যালবামগুলো হলোÑনীল নয়না, অনেক রাত, দুঃখ, দুঃখ পেওনা বন্ধু।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তালিকাভুক্ত এই সঙ্গীতশিল্পী দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আন্তর্জাতিক যুব ১৯৮৫ বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সম্মেলনসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে গান গেয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। বর্তমানেও তিনি দেশী-বিদেশী বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে সরাসরি লাইভ সঙ্গীতানুষ্ঠানে পারফর্ম করে সঙ্গীতপ্রেমীদের মন জয় করে চলেছেন।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্কৃতি অঙ্গনে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অগণিত সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন আবু আফ্ফান রোজবাবু। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন: আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গুণীজন সংবর্ধনা (২০২৬): সম্প্রতি তিনি এই ভূষণে ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক (২০১৩): সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য অর্জিত বিটিভি ও শিল্পকলার অনন্য সম্মান। জাতীয় গণসঙ্গীত প্রতিযোগিতা (২০১২): সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে গণসঙ্গীতে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের গৌরব লাভ করেন। মাদার তেরেসা মঞ্চ পদক (১৯৯৯): সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ‘মাদার তেরেসা ট্রাস্ট ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক সম্মানিত। সত্যজিৎ রায় সম্মাননা (১৯৯৭): কলকাতার বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’-র উদ্যোগে আয়োজিত বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করেন এবং পুরস্কার লাভ করেন। সাতক্ষীরা থিয়েটার-৯৩ সম্মাননা: স্থানীয় নাট্যচর্চায় অনন্য অবদানের জন্য এই সম্মাননা অর্জন।

শুধু নিজে গান গেয়ে বা অভিনয় করেই ক্ষান্ত হননি, নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন অবিরাম। তিনি সাতক্ষীরার খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘লিনেট ফাইন আর্টস একাডেমি’-র অধ্যক্ষ ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি পরিবেশ ও সামাজিক আন্দোলন জোরদারে তিনি সামাজিক সংগঠন ‘গ্রীন জোট/কোয়ালিশন’-এর সভাপতির দায়িত্ব সফলভাবে সামলাচ্ছেন।

বিটিভির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন ও ‘উচ্চ’ শ্রেণিতে পদোন্নতি: সঙ্গীত জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশ টেলিভিশন তাঁর এই দীর্ঘ সাধনাকে আরও একবার আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করল।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের গ্রেডেশন/পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালার আওতায় বোর্ডের সুপারিশক্রমে তাঁকে আধুনিক গানের সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে “ক” শ্রেণি হতে মর্যাদাপূর্ণ “উচ্চ” শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে।

বিটিভির কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজার (সংগীত) ও গ্রেডেশন বোর্ডের সদস্য-সচিব মোহাম্মদ মনিরুল হোসেন স্বাক্ষরিত সরকারি দাপ্তরিক পত্রে (স্মারক নং: বিটিভি/সংগীত-১২ (অংশ-০৩)/অডিশন-গ্রেডেশন/২০২৩/৬৮ (৭০), তারিখ: ২৩-০৬-২০২৬খ্রি.) আবু আফ্ফান রোজবাবুর অব্যাহত সাফল্য কামনা করে বলা হয়, “ভবিষ্যতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠানমালাকে আরও মানসম্পন্ন ও সমৃদ্ধকরণে আপনার সৃজনশীল সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করছি।”

সাতক্ষীরার এই কৃতি সন্তান নিজের সাধনা, ত্যাগ এবং সঙ্গীতের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসার মাধ্যমে আজ এক বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছেন। ‘উচ্চ’ শ্রেণিতে বিটিভির এই নতুন পদোন্নতি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়, এটি সাতক্ষীরা অঞ্চলের সমগ্র সাংস্কৃতিক জগতের জন্য এক বিশাল গৌরব ও আনন্দের বিষয়। সুরের প্রতি আবু আফ্ফান রোজবাবুর এই আজন্ম ভালোবাসা ও আত্মনিবেদন আগামী প্রজন্মের সঙ্গীতসাধকদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

Ads small one

সাতক্ষীরা ২০৩৫: একটি জেলার নতুন অর্থনীতির স্বপ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরা ২০৩৫: একটি জেলার নতুন অর্থনীতির স্বপ্ন

মো. মামুন হাসান

একটি জেলার ভবিষ্যৎ কি শুধু তার মানচিত্রে লেখা থাকে? নাকি ভবিষ্যৎ তৈরি হয় মানুষের চিন্তা, নদীর গতিপথ, মাটির গন্ধ, সীমান্তের ব্যস্ততা, তরুণদের স্বপ্ন এবং সময়কে বুঝে নেওয়ার সক্ষমতায়? সাতক্ষীরার দিকে তাকালে মনে হয়, এই জেলার সবচেয়ে বড় সম্পদ এখনো পুরোপুরি আবিষ্কৃত হয়নি। সুন্দরবন, সমুদ্র, নদী, চিংড়ি, কাঁকড়া, মধু, কৃষি, সীমান্ত বাণিজ্য, লোকসংস্কৃতি এবং বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে আলাদা আলাদা সম্পদ হিসেবে দেখলে সাতক্ষীরার গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এগুলোকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে ২০৩৫ সালের সাতক্ষীরা আজকের সাতক্ষীরার মতো থাকবে না।

 

আমরা সাধারণত জেলার উন্নয়ন বলতে নতুন সড়ক, সেতু, ভবন কিংবা কোনো বড় প্রকল্পকে বুঝি। কিন্তু আগামী দিনের অর্থনীতি শুধু অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না। ভবিষ্যতের অর্থনীতি দাঁড়াবে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, স্থানীয় সম্পদ, সৃজনশীলতা এবং মানুষের অংশগ্রহণের ওপর। সেই জায়গা থেকে সাতক্ষীরাকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে একই সঙ্গে রয়েছে সুন্দরবন এবং সমুদ্র উপকূল, নদী ও সীমান্ত, কৃষি ও মৎস্য, গ্রাম ও বন্দর। এমন ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বাংলাদেশের খুব বেশি জেলার নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বৈচিত্র্যের মধ্যে এখনো একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক গল্প তৈরি হয়নি।

সাতক্ষীরার অর্থনীতির একটি বড় অংশ চিংড়ি, কাঁকড়া, কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাঁচামাল উৎপাদন করে থেমে গেলে একটি জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সীমিত থাকে। একই সম্পদকে যদি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্র্যান্ডিং, রপ্তানি, খাদ্যসংস্কৃতি, পর্যটন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে একই সম্পদ থেকে একাধিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হতে পারে।ধরা যাক, সাতক্ষীরার চিংড়ি শুধু একটি রপ্তানি পণ্য নয়। এটি হতে পারে একটি গ্যাস্ট্রোনমিক পরিচয়। স্থানীয় চিংড়িকে কেন্দ্র করে খাবারের উৎসব হতে পারে। স্থানীয় রেস্তোরাঁয় সাতক্ষীরার নিজস্ব খাদ্য ব্র্যান্ড তৈরি হতে পারে। কৃষি ও মৎস্য খামারকে ঘিরে শিক্ষামূলক ভ্রমণ হতে পারে। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে অভিজ্ঞতা পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খল তৈরি করা সম্ভব।একইভাবে সাতক্ষীরার মধু, কাঁকড়া, খেজুরের গুড়, স্থানীয় কৃষিপণ্য কিংবা সুন্দরবনসংলগ্ন জীবনের গল্পও অর্থনীতির অংশ হতে পারে। পর্যটক শুধু একটি জায়গা দেখতে আসে না। সে একটি গল্প কিনতে আসে, একটি অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যায়। সাতক্ষীরার কাছে সেই গল্পের অভাব নেই। অভাব রয়েছে গল্পগুলোকে অর্থনৈতিক পণ্যে রূপ দেওয়ার উদ্যোগের।

সুন্দরবনকে ঘিরে সাতক্ষীরার সম্ভাবনা আরও বড়। কিন্তু সুন্দরবনকে শুধু বাঘ দেখার জায়গা হিসেবে উপস্থাপন করলে এর বিশাল মানবিক ও সাংস্কৃতিক গল্প আড়ালে থেকে যায়। মৌয়াল, বাওয়ালি, জেলে, বনজীবী মানুষ, বনবিবির সংস্কৃতি, নদী, নৌকা, মধু সংগ্রহ, কাঁকড়া ধরা, স্থানীয় খাবার এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রা মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ কমিউনিটি ট্যুরিজম মডেল তৈরি করা সম্ভব।শ্যামনগরের একটি সাধারণ বাড়ি যদি পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও আতিথেয়তার মান বজায় রেখে পর্যটকের থাকার জায়গা হয়, স্থানীয় পরিবারের আয় বাড়তে পারে। পর্যটক স্থানীয় খাবার খাবে, নৌকায় ঘুরবে, স্থানীয় গাইড নেবে, হস্তশিল্প কিনবে, স্থানীয় সংস্কৃতি দেখবে। অর্থাৎ একজন পর্যটকের ব্যয় একাধিক পরিবারের কাছে পৌঁছাবে। এটিই পর্যটনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি।

মান্দারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, জামতলা, দুবলার চর কিংবা আলোরকোলকে বিচ্ছিন্ন গন্তব্য হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর উপকূলীয় পর্যটন নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে ভাবতে হবে। সাতক্ষীরা শহর থেকে সুন্দরবন ও উপকূল পর্যন্ত একটি সুপরিকল্পিত পর্যটন করিডোর তৈরি করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতিশীলতা তৈরি হতে পারে।এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ভোমরা স্থলবন্দর। ভোমরা শুধু বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সাতক্ষীরার যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা। সীমান্ত বাণিজ্য, ব্যবসায়িক ভ্রমণ, খাদ্য, সংস্কৃতি এবং সীমান্তভিত্তিক পর্যটনকে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করা গেলে ভোমরা থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোরের ধারণা বাস্তব রূপ পেতে পারে।

তবে সাতক্ষীরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়তো এর তরুণ জনগোষ্ঠী। আগামী দিনের সাতক্ষীরার অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী হবে, তার বড় অংশ নির্ভর করবে তরুণদের আমরা কীভাবে প্রস্তুত করছি তার ওপর। শুধু সরকারি চাকরির প্রস্তুতি দিয়ে একটি জেলার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পর্যটন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, এভিয়েশন, ক্রুজ, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফুড প্রসেসিং, কৃষি উদ্যোক্তা, গাইডিং, ট্রাভেল ব্যবসা এবং বিদেশের দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের জন্য তাদের প্রস্তুত করতে হবে।সাতক্ষীরার একটি তরুণ যদি নিজের গ্রামে একটি হোমস্টে পরিচালনা করতে পারে, অন্য একজন যদি সুন্দরবনের প্রশিক্ষিত গাইড হয়, কেউ যদি স্থানীয় খাবারের ব্র্যান্ড তৈরি করে, কেউ যদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাতক্ষীরার পর্যটন বিক্রি করে এবং আরেকজন যদি আন্তর্জাতিক হোটেলে দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে কাজ করে, তাহলে কর্মসংস্থানের সংজ্ঞাই বদলে যাবে।

এখানেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা শুধু চাকরির প্রস্তুতি দেবে না, উদ্যোক্তা তৈরির সক্ষমতাও তৈরি করবে। বিশেষ করে পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্য, খাদ্য প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে।সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় জলবায়ুকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও পানির সংকট এই জেলার বাস্তবতা। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকিকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। জলবায়ু অভিযোজন, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান, ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং জলবায়ু গবেষণাকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা একটি নতুন ধরনের অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে পারে।

২০৩৫ সালের সাতক্ষীরাকে কল্পনা করলে তাই শুধু নতুন ভবন বা নতুন সড়কের ছবি দেখা উচিত নয়। দেখা উচিত এমন একটি জেলা, যেখানে সুন্দরবনের মধু স্থানীয় ব্র্যান্ডে বিক্রি হচ্ছে, গ্রামের বাড়ি পর্যটকের থাকার জায়গায় পরিণত হয়েছে, তরুণরা স্থানীয় সম্পদকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করছে, ভোমরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক যোগাযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, নদী ও উপকূল পর্যটনের নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করছে এবং প্রযুক্তি সাতক্ষীরার প্রতিটি সম্ভাবনাকে দেশের বাইরেও পরিচিত করছে।

 

এই পরিবর্তনের জন্য হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নতুন কোনো প্রকল্প নয়, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। সাতক্ষীরাকে পিছিয়ে থাকা উপকূলীয় জেলা হিসেবে দেখার অভ্যাস বদলে সম্ভাবনাময় বহুমাত্রিক অর্থনীতির জেলা হিসেবে দেখতে হবে।২০৩৫ এখনো অনেক দূরের কোনো সময় নয়। একটি প্রজন্মের কর্মজীবন শুরু হয়ে শেষ হওয়ার আগেই সেই সময় এসে যাবে। প্রশ্ন হলো, তখন সাতক্ষীরা কী হবে? শুধু সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার? নাকি সুন্দরবন, সমুদ্র, কৃষি, সীমান্ত, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের শক্তিতে তৈরি একটি নতুন অর্থনীতির পরীক্ষাগার?

সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ হয়তো কোনো একক শিল্পে লুকিয়ে নেই। ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে তার বিচ্ছিন্ন সম্ভাবনাগুলোকে এক সুতোয় গাঁথার মধ্যে। ২০৩৫ সালের সাতক্ষীরা তাই কেবল একটি উন্নত জেলার স্বপ্ন নয়। এটি হতে পারে এমন একটি জেলার গল্প, যে নিজের সম্পদকে নতুন চোখে দেখে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই লিখতে শেখে।

লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।

এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ
এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে

ন্যাম ভবন থেকে দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে ব্রিফ করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও জোনের ডিসি ইবনে মিজান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করেছি। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। মরদেহটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।’ এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা তদন্ত শেষে বলা যাবে বলেও জানান তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নং ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান ভবনটির লোকজন। এসময় শেরেবাংলা নগর থানায় ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়। এরপর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং ডিএমপি তেজগাঁও জোনের ডিসি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে জানালা দিয়ে মরদেহ দেখে পিবিআই এবং সিআইডি’র ফরেনসিক টিমকে আসতে বলেন।

ব্রিফিংয়ে ইবনে মিজান জানান, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার সময় এই দুজন ওই ফ্ল্যাটে ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে।’

প্রসঙ্গত, গত ২১ জুলাই এক তরুণীর সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হলে জামায়াতে ইসলামী ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। বহিষ্কার আদেশে দলীয় তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং তারা চলতি বছরের ১৭ জুন বিয়ে করেছেন।

বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। জামায়াত তাকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে জানালেও দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় তার এমপি পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়নি। এ নিয়ে সংসদীয় কমিটিতেও বিতর্ক হয় এবং একটি কমিটি থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়।

সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, বহিষ্কারের পরও ‘খাতা-কলমে’ তিনি জামায়াতের সদস্য। এ বক্তব্য নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা হয়।

সাড়ে ৫ বছর পর ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হলো টাকা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৪০ পূর্বাহ্ণ
সাড়ে ৫ বছর পর ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হলো টাকা

দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর পর ডলারের বিপরীতে অবমূল্যায়নের ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশি টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত গত এক বছরের হিসাবে টাকার মান বেড়েছে দশমিক ০৬ শতাংশ। আর ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হয়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে। এই সময়ে এক ডলারের বিপরীতে টাকার দর ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় ওঠে। অর্থাৎ এই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ৩৮ টাকা ২০ পয়সা বা ৪৫ দশমিক ০৫ শতাংশ।

তবে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ৩০ আগস্ট ডলারের দাম সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় ওঠার পর ১৭ সেপ্টেম্বর তা কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। ফলে ওই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে ৯৫ পয়সা।

যেভাবে কমেছে টাকার মান

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় নামে। অর্থাৎ এক বছরে ডলারের দাম কমেছিল ১০ পয়সা। বিপরীতে টাকার মান বেড়েছিল দশমিক ১২ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কম থাকা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে ওই সময়ে ডলারের চাহিদা ও সংকট তুলনামূলক কম ছিল। ফলে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছিল।

কিন্তু ২০২১ সাল থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে আমদানিও বাড়ে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে ৮৫ টাকা ৮০ পয়সায় ওঠে। ওই বছর টাকার মান কমে যায় ১ দশমিক ১৮ শতাংশ।

এরপর ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। একই সময়ে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় দেশে ডলারের সংকট আরও তীব্র হয়।

ফলে ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫ টাকা ৮৫ পয়সায়। এক বছরে ডলারের দাম বেড়েছিল ২০ টাকা ৫ পয়সা বা ২৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই হারে কমে যায় টাকার মান।

এরপরও টাকার ওপর চাপ অব্যাহত ছিল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে ১১০ টাকা হয়। ওই বছর ডলারের দাম বাড়ে ৪ টাকা ১৫ পয়সা বা ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম আরও ১০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় ওঠে। এক বছরে টাকার মান কমে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ।

২০২৫ সালেও টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত ছিল। ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে ১২২ টাকা ৩৩ পয়সায় দাঁড়ায়। এক বছরে ডলারের দাম বেড়েছিল ২ টাকা ৩৩ পয়সা বা ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

এবার উল্টো চিত্র

তবে চলতি বছর এসে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনের ধারায় পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসাবে টাকার মান কমার পরিবর্তে বেড়েছে দশমিক ০৬ শতাংশ।

এরপর আগস্টের শেষ দিকে ডলারের দর আবার কিছুটা বাড়লেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তা কমে আসে। ৩০ আগস্ট প্রতি ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর তা কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, এই সময়ে টাকার মান বেড়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ।

আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতিও তুলে ধরা হয়েছে। গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের জুনে বেশ কয়েকটি দেশের মুদ্রার মান কমেছে।

এ সময়ে ভারতের রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার মুদ্রার মান কমেছে ১০ শতাংশের বেশি। ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহর মান কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।

অন্যদিকে একই সময়ে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত ও চীনের ইউয়ানের মান বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ করে। পাকিস্তানি রুপির মান বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।

অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে অবমূল্যায়নের পর চলতি সময়ে বাংলাদেশি টাকা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে।

টাকার মান কমলে যে চাপ বাড়ে

ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়ের ওপর। আমদানিকারকদের বেশি টাকা দিয়ে একই পরিমাণ ডলার কিনতে হয়। এতে আমদানি করা জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের খরচ বাড়ে।

এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে। পণ্যের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়ে।

এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণের বিপরীতে বেশি টাকা পরিশোধ করতে হয়। ফলে টাকার অবমূল্যায়নের সঙ্গে দেশের বৈদেশিক ঋণের টাকার অঙ্কের দায়ও বাড়ে।

অন্যদিকে টাকার মান শক্তিশালী হলে আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ কিছুটা কমে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে টাকার হিসাবে চাপ কমতে পারে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করে আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর।