বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রতিরক্ষায় ৪২ হাজার কোটি টাকা: আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে কতটা?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ৪:১১ অপরাহ্ণ
প্রতিরক্ষায় ৪২ হাজার কোটি টাকা: আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে কতটা?

নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭) প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। অঙ্কটি বড়। তবে এই অর্থের কতটা নতুন যুদ্ধাস্ত্র, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যাবে, আর কতটা ব্যয় হবে বিদ্যমান বাহিনীর বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে— এ প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিরক্ষা বাজেটকে শুধু ‘অস্ত্র কেনার বাজেট’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একইসঙ্গে সামরিক প্রস্তুতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, সমুদ্রসীমা সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত একটি বড় রাষ্ট্রীয় ব্যয়।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের ধরন বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি এখন ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, সাইবার প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং তথ্যযুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের মূল প্রশ্ন— সশস্ত্র বাহিনী কি প্রচলিত কাঠামো থেকে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে যথেষ্ট দ্রুত এগোতে পারছে?

প্রতিরক্ষা বাজেট কোথায় ব্যয় হয়

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা আছে—প্রতিরক্ষা বাজেট মানেই যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্র কেনা। বাস্তবে বাজেটের বড় অংশই যায় বাহিনীগুলোর নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে। প্রতিরক্ষা ব্যয় সাধারণত দুই ভাগে দেখা হয়। প্রথমটি পরিচালন বা রেভিনিউ ব্যয়। এর মধ্যে থাকে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের বেতন-ভাতা, রেশন, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, মহড়া, জ্বালানি, পরিবহন, অস্ত্র ও সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঘাঁটি ও অবকাঠামো পরিচালনা। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে এই খাতেই ব্যয় হয়ে থাকে।

দ্বিতীয় অংশটি উন্নয়ন বা আধুনিকায়ন ব্যয়। এতে থাকে নতুন যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহ, যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার কেনা, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সাইবার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি, সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কোনও দেশের সামরিক সক্ষমতা মূল্যায়নে শুধু মোট বাজেটের অঙ্ক দেখলেই যথেষ্ট নয়। বরং দেখতে হয়, সেই বাজেটের কতটা বাস্তব আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতা তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে।

‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ কতটা এগোচ্ছে

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা অনুসরণ করছে। এর লক্ষ্য সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে যুগোপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপান্তর করা। এই পরিকল্পনার আওতায় বিমানবাহিনীর বহুমাত্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌবাহিনীর ব্লু ওয়াটার সক্ষমতা অর্জন, সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ সক্ষমতা, সমন্বিত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে মূল্যবৃদ্ধি আধুনিকায়নের গতিকে প্রভাবিত করছে। ফলে বড় অঙ্কের বাজেট থাকলেও নতুন ক্রয় ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনেক সময় ধীর হয়ে যায়।

কেন বাড়ছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়

গত এক দশকে বাংলাদেশের তিন বাহিনীতে বেশ কিছু আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন, রাডার ব্যবস্থা, সাঁজোয়া যান, প্রশিক্ষণ বিমান, হেলিকপ্টার, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও নজরদারি ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে বাহিনীগুলোর সক্ষমতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরই ব্যয় শেষ হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয় শুরু হয় ক্রয়ের পর। একটি আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থা সচল রাখতে নিয়মিত স্পেয়ার পার্টস, ওভারহলিং, প্রযুক্তিগত আপগ্রেড, সফটওয়্যার আপডেট, গোলাবারুদ, প্রশিক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞ জনবল প্রয়োজন হয়।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ভাষায়, একটি যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ বা রাডার ব্যবস্থা কেনার চেয়ে সেটি বছর বছর সচল রাখা অনেক সময় বেশি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ফলে বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন সক্ষমতা তৈরির বদলে বিদ্যমান সক্ষমতা ধরে রাখতেই ব্যয় হয়। এ কারণেই ৪২ হাজার কোটি টাকার বাজেট বড় হলেও প্রশ্ন থাকে—এই বরাদ্দের কতটা ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে যাচ্ছে, আর কতটা যাচ্ছে বর্তমান কাঠামো টিকিয়ে রাখতে।

আকাশ প্রতিরক্ষা ও ড্রোন

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আকাশ প্রতিরক্ষা বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে— কম খরচের ড্রোনও যুদ্ধক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আগে আকাশ প্রতিরক্ষা বলতে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডারকেই বেশি বোঝানো হতো। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ড্রোন শনাক্তকরণ, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক জ্যামিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই খাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমিত বাজেটের মধ্যেও তুলনামূলক কম ব্যয়ে ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানঘাঁটি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, সীমান্ত ও সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তায় এসব প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ যুদ্ধের বড় অংশ হবে তথ্য, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে। তাই প্রতিরক্ষা বাজেটে সাইবার সুরক্ষা, এআইভিত্তিক নজরদারি এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা

বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা, অফশোর গ্যাস ব্লক, সমুদ্রবন্দর, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এবং ব্লু ইকোনমি সুরক্ষায় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। দেশের অর্থনীতি আমদানি-রফতানি ও সমুদ্রপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে সমুদ্রসীমা শুধু প্রতিরক্ষার বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও অংশ। বঙ্গোপসাগরে জ্বালানি অনুসন্ধান, মৎস্যসম্পদ, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং কৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় নৌ-সক্ষমতা এখন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাস্তবতা ভারত বা পাকিস্তানের মতো নয়। বাংলাদেশের অগ্রাধিকার মূলত সীমান্ত নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সম্পদ সুরক্ষা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বাজেটের মূল্যায়নও সেই বাস্তবতার আলোকেই করতে হবে।

আধুনিকায়ন বনাম পরিচালন ব্যয়

৪২ হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ যাবে সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয়ে। এর বাইরে যে অংশ থাকবে, সেটি দিয়ে ধাপে ধাপে আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ এগিয়ে নিতে হবে।

প্রশ্ন হলো, সীমিত উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ কোন খাতে অগ্রাধিকার দেবে? প্রচলিত ভারী অস্ত্র, নাকি প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা? বড় প্ল্যাটফর্ম, নাকি ছোট কিন্তু কার্যকর স্মার্ট সিস্টেম? যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ, নাকি ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা ও নজরদারি প্রযুক্তি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এতে প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা থাকবে, তবে তার সঙ্গে যুক্ত হবে সাইবার, ড্রোন, এআই, রাডার, তথ্য বিশ্লেষণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা যা বলছেন

প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার ওয়ারফেয়ার, ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার এবং ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। তার মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে—তুলনামূলক স্বল্প ব্যয়ের ড্রোন ও প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতাও আধুনিক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।’’

আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ বলেন, ‘‘বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতা বিবেচনায় সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন অব্যাহত রাখা জরুরি। বিশেষ করে ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, সাইবার প্রতিরক্ষা, এআইভিত্তিক নজরদারি প্রযুক্তি এবং বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ভবিষ্যতের যুদ্ধ ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।’’

‘এটি শুধু খরচ নয়, বিনিয়োগও’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রতিরক্ষা খাতের ৪২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে হবে না। সশস্ত্র বাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। দেশের নিরাপত্তা, আকাশ প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে এই বাজেট প্রয়োজন।’’

তিনি বলেন, ‘‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিতে সেনাসদস্যদের নিরাপত্তার জন্য আধুনিক যানবাহন, সুরক্ষিত আর্মার্ড ভেহিকল, অস্ত্র, ড্রোন, এয়ারক্রাফট ও অন্যান্য সরঞ্জাম দরকার হয়। একটি সুরক্ষিত যানবাহনের দাম ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। শুরুতে এসব সরঞ্জাম রাষ্ট্রকে কিনতে হয়—তবে মিশনে ব্যবহারের পর জাতিসংঘ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এর বড় অংশ ফেরত দেয়। ফলে এটি শুধু খরচ নয়, এক ধরনের বিনিয়োগও।’’

ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ বলেন, ‘‘শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে হলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যানবাহন ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতেই হবে। এসব সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণেও বড় ব্যয় আছে— স্পেয়ার পার্টস, টায়ার, ওভারহলিং ও নিয়মিত মেরামতে অর্থ লাগে। তবে এই ব্যয়ের একটি অংশও জাতিসংঘের মাধ্যমে সমন্বয় বা ফেরত পাওয়া যায়।’’

তার মতে, বর্তমান বিশ্বে আকাশ প্রতিরক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই বিমানবাহিনী, এয়ার ডিফেন্স, ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন সক্ষমতায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্রতিরক্ষা বাজেটকে অপচয় হিসেবে না দেখে দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

Ads small one

ঢাকায় রমিজ হত্যা মামলায় নজরুল ইসলাম কারাগারে, রিমান্ড শুনানি আজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
ঢাকায় রমিজ হত্যা মামলায় নজরুল ইসলাম কারাগারে, রিমান্ড শুনানি আজ

নিজস্ব প্রতিনিধি: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় কারওয়ান বাজার এলাকায় এক শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে তাঁর রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালত এ আদেশ দেন বলে নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফ রেজা।
এর আগে সোমবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাঁকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন আহমেদ রূপ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আসামির সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। তবে মঙ্গলবার তিনি আদালতে উপস্থিত না থাকায় বিচারক রিমান্ড শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কারওয়ান বাজার এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন রূপ। বিকেলবেলা মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে আসামিদের ছোড়া গুলি তাঁর ডান চোখে লাগে। আন্দোলনকারীরা রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে কাঁঠালবাগানের একটি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহত রূপের বাবা এ কে এম রকিবুল আহম্মেদ তেজগাঁও থানায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যসংকটে সুন্দরবনের বাঘ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১:৪০ পূর্বাহ্ণ
জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যসংকটে সুন্দরবনের বাঘ

নিজস্ব প্রতিনিধি: আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস উপলক্ষে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বন বিভাগ। বনে ‘বাঘের কেল্লা’ নির্মাণ ও ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও গবেষকেরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং খালের নাব্য হ্রাসের ফলে মিঠাপানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে হরিণসহ তৃণভোজী প্রাণীদের সংখ্যা কমায় বাঘের খাদ্যশৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের বনজীবী নুর ইসলাম ও হরিনগর এলাকার জেলে আকবর আলী জানান, আগের মতো বনে হরিণ বা বাঘের বিচরণ এখন আর দেখা যায় না। তা ছাড়া বনদস্যু ও চোরাশিকারিদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় বন্যপ্রাণী শিকারের ঘটনা ঘটছে। শিকারের কারণে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনে বাঘের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় বাঘ মাঝেমধ্যেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যা মানুষ-বাঘ সংঘাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সাতক্ষীরা উপকূলে বাঘের আক্রমণে ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই কাঠুরে, জেলে ও মৌয়াল।

জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ বলেন, বাঘকে শুধু একটি প্রাণী হিসেবে দেখলে হবে না। বাঘ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষ শিকারি। লবণাক্ততা বাড়া ও মিঠাপানির অভাবের পাশাপাশি মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বাঘের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাই পরিবেশ ও স্থানীয়দের জীবিকাÑ সব মিলিয়েই সমন্বিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুন্দরবনে ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা সুলজ কুমার দ্বীপ বলেন, “মিঠাপানির সংকট দূর করতে বনের ভেতরে কৃত্রিম পুকুর খনন করা হয়েছে। চোরাশিকার প্রতিরোধে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপে বাঘের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১২৫টিতে পৌঁছেছে।”

 

 

 

 

 

চিকিৎসকের অবহেলায় যমজ সন্তানের মায়ের জীবন সংকটাপন্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
চিকিৎসকের অবহেলায় যমজ সন্তানের মায়ের জীবন সংকটাপন্ন

মো. জাবের হোসেন: যমজ সন্তান প্রসবের পর জরায়ুতে গর্ভফুলের (ফুল) অংশবিশেষ রেখেই প্রসূতিকে ছাড়পত্র দেওয়ার চরম অভিযোগ উঠেছে তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে। পর্যাপ্ত তদারকি ও চিকিৎসার গাফিলতিতে প্রসূতি রিমা খাতুন (১৮) প্রসব-পরবর্তী মারাত্মক রক্তক্ষরণে (সেকেন্ডারি পিপিএইচ) আক্রান্ত হয়েছেন। এতে ইতোমধ্যে তাঁর এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে রিমা নিজেও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। গত ৫ জুলাই সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মেলা বাজারে অবস্থিত তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে এই ঘটনা ঘটে।
মেডিকেল রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রসবের পর গর্ভফুল বা প্রসবসংক্রান্ত উপাদান সম্পূর্ণ অপসারণ না করেই প্রসূতিকে ছাড়পত্র দেয় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। ফলে জরায়ুতে অবশিষ্ট অংশ থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং তিনি মারাত্মক রক্তস্বল্পতায় (অ্যানিমিয়া) ভোগেন। পরবর্তীতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর জরায়ু পরিষ্কার ও রক্ত সঞ্চালন করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসবের পর প্রসূতির জরায়ু সঠিকভাবে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া চরম চিকিৎসাগত অবহেলা, যা রোগীর জীবন বিপন্ন করতে পারতো।
রিমা খাতুনের বাবা শুকুর আলী সরদার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ৪ জুলাই তাঁর মেয়ে রিমা ও জামাতা মো. সেলিম খাঁ পরামর্শের জন্য তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে যান। পরদিন ৫ জুলাই শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভর্তি করা হয়। ক্লিনিকটির স্বত্বাধিকারী বিধান বাবুর পরামর্শে স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিধান নিজে উপস্থিত থেকে এক নার্সকে দিয়ে এপিসিওটমি (সাইট কাটা) ও সেলাইয়ের কাজ করান। ওই দিনই রিমা দুটি যমজ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।
জন্মের পরপরই নবজাতকরা অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তাদের খুলনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠায়। অন্যদিকে ৭ জুলাই রিমা খাতুনকে ক্লিনিক থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলে তিনিও খুলনায় সন্তানদের কাছে চলে যান। সেখানে পৌঁছানোর পরদিন রিমা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানকার চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, তাঁর জরায়ুতে গর্ভফুলের অংশ রয়ে গেছে। পরে জরুরি চিকিৎসার মাধ্যমে জরায়ু পরিষ্কার করা হয়।
রিমার স্বামী সেলিম খাঁ আক্ষেপ করে বলেন, “ডাক্তারের বদলে ক্লিনিক মালিক নিজে উপস্থিত থেকে নার্সকে দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। এই ভুল চিকিৎসার জন্যই আমার স্ত্রীর আজ এই অবস্থা, আর আমাদের একটি সন্তানও মারা গেছে। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।”
এদিকে ২৫ জুলাই সকালে তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে গেলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ব্যাপক অসঙ্গতি দেখা যায়। প্রসূতির চিকিৎসায় গাফিলতির চিত্রটি সেখানে পরোক্ষভাবে উঠে আসে। স্বত্বাধিকারী বিধান কখনো নিজেকে ‘মালিক’ আবার কখনো ‘ম্যানেজার’ পরিচয় দেওয়ায় কারণ জানতে চাইলে ম্যানেজার মশিউর রহমান দাবি করেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আমরা মানসিকভাবে চাপের মধ্যে রয়েছি, তাই হয়তো তিনি এমন বলছেন।”
জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হলে প্রসূতির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সাত হাজার টাকা দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে প্রসূতির পরিবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে, প্রসবের কাজে যুক্ত নার্স রিমা খাতুন পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এছাড়া ছাড়পত্র দেওয়ার পর রোগীর জীবনঝুঁকির কথা জেনেও কেন তাঁর কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেনি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।