সম্ভাবনা ও সংকটের দেবহাটা: পাঁচ ইউনিয়নের মানুষের প্রত্যাশা
কেএম রেজাউল করিম, দেবহাটা: ইছামতী নদী, সবুজ প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও সীমান্তঘেঁষা অবস্থানের কারণে সাতক্ষীরার দেবহাটা একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় জনপদ। কুলিয়া, পারুলিয়া, সখিপুর, নওয়াপাড়া ও দেবহাটাÑএই পাঁচ ইউনিয়নের মানুষের মূল জীবন-জীবিকা কৃষি ও মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও বিভিন্ন পেশায় যুক্ত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ।
সম্ভাবনার পাশাপাশি এই অঞ্চলে কিছু সংকটও রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মাদকের বিস্তার রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশÑএসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, এখানকার সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে এলাকার অর্থনীতি ও জনজীবনের মান অনেকটাই বদলে যাবে।
বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মতামত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ওমর ফারুক মুকুল কৃষি ও মৎস্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের পাশাপাশি উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, পণ্যের ন্যায্যমূল্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেন। পারুলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ইমরান হোসেন গাজী শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোর অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তরুণদের জন্য খেলাধুলা ও কাজের সুযোগ তৈরির দাবি জানান।
সখিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল কাদের রাস্তাঘাট, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতের মানের ধারাবাহিক উন্নতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। অন্যদিকে নওয়াপাড়া ইউনিয়নের দেব কুমার কর্মকার কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্যের পাশাপাশি সমাজকে মাদকমুক্ত করতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর আহ্বান জানান। পর্যটনের সম্ভাবনা তুলে ধরে দেবহাটা রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি ও স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ রেজাউল করিম বাপ্পা বলেন, ইছামতী নদীকে ঘিরে দেবহাটায় পর্যটনের বড় সুযোগ রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গতি আনতে পারে।
যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিপণ্যের দর এবং মাদকমুক্ত সমাজের অভিন্ন দাবির বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিলন সাহা বলেন, স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাস, মাদক, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নিয়মিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
উন্নয়ন ভাবনার পাশাপাশি দেবহাটার রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক অতীত। খুলনা বিভাগীয় শহর হওয়ারও আগে, ব্রিটিশ আমলে ১৮৬৭ সালে দেবহাটাকে পৌরসভা ঘোষণা করা হয়েছিল, যার কার্যালয় ছিল টাউনশ্রীপুর গ্রামে। পরে ১৯৫০-৫১ সালের দিকে পৌরসভাটি বিলুপ্ত করা হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, একসময় দেবহাটার টাউনশ্রীপুর ও সুশীলগাঁতী গ্রামে ১৮ জন জমিদারের বসবাস ছিল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান চন্দ্র রায় এবং ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান শঙ্কর রায় চৌধুরীর আদি ভিটাও এই এলাকায় অবস্থিত। ইছামতী নদীর ওপারে ভারতের হাসনাবাদ রেল স্টেশন থাকায় ব্রিটিশ আমলে কলকাতার সঙ্গে দেবহাটার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল বেশ সুদৃঢ়।
স্থানীয় অধিবাসীদের প্রত্যাশা, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে ধারণ করে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করা গেলে সীমান্তঘেঁষা দেবহাটা একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে গড়ে উঠবে।









