আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস: শান্তির জন্য প্রতিদিন বিনিয়োগ
সাকিবুর রহমান বাবলা
বিজয়ের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের জীবনে ফিরে আসে নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার ও স্বস্তি। তাই শান্তি শুধু যুদ্ধ না থাকার নাম নয়Ñশান্তি হলো মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ ও সহযোগিতার পরিবেশ।
বিশ্বব্যাপী শান্তি ও অহিংসার আদর্শকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৩৬/৬৭নং প্রস্তাবের মাধ্যমে ১৯৮১ সালে দিবসটির সূচনা হয়। ২০০১ সালে ৫৫/২৮২নং প্রস্তাবের মাধ্যমে ২১ সেপ্টেম্বরকে স্থায়ীভাবে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং দিনটিকে বৈশ্বিক যুদ্ধবিরতি ও অহিংসার দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম শান্তি দিবস পালিত হয় ১৯৮২ সালে। শুরুতে দিবসটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালের সিদ্ধান্তে ২১ সেপ্টেম্বর নির্দিষ্ট তারিখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের আহ্বান হলোÑএই দিনে সংঘাতরত পক্ষগুলো যেন অন্তত এক দিনের জন্য শত্রুতা বন্ধ করে এবং শিক্ষা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে শান্তির মূল্যবোধকে এগিয়ে নেয়।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শান্তিতে বিনিয়োগ করুনÑসবার জন্য, সব জায়গায়, প্রতিদিন।’ এবারের বার্তা বিশেষভাবে তুলে ধরছে শান্তির ‘দৈনন্দিন কারিগরদের’Ñযারা পরিবার, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, গ্রাম-মহল্লা ও সমাজে বিভেদ কমিয়ে সংলাপ, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তুলছেন। জাতিসংঘ মতে, শান্তি কেবল কূটনৈতিক সম্মেলনের টেবিলে তৈরি হয় না; মানুষের দৈনন্দিন আচরণ ও স্থানীয় উদ্যোগেও শান্তির ভিত্তি নির্মিত হয়।
‘শান্তিতে বিনিয়োগ’ কথাটি শুধু অর্থ ব্যয়ের বিষয় নয়। এর অর্থ হলো যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে সংঘাতের মূল কারণগুলো আগে থেকেই মোকাবিলা করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, জলবায়ু সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বিনিয়োগ শান্তির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি করে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের বার্তাতেও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, মানবাধিকার, কূটনীতি, সংলাপ, আলোচনা ও শান্তিরক্ষায় বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘সবার জন্য’ মানে শান্তি কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা আর্থিক অবস্থার মানুষের একচেটিয়া অধিকার নয়। ‘সব জায়গায়’ মানে একটি অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মানবিক পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। আর ‘প্রতিদিন’ মনে করিয়ে দেয়Ñশান্তি কোনো এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রতিদিনের চর্চা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংঘাতের ক্ষেত্রে সংলাপ ও মধ্যস্থতা, শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাÑএসবের মাধ্যমে সংস্থাটি শান্তির ভিত্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। শান্তিরক্ষা মিশনগুলো সংঘাতপূর্ণ দেশে বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে কাজ করে।
২০২৬ সালের মে মাসে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষার হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে ১১টি সক্রিয় শান্তিরক্ষা মিশন রয়েছে। এগুলো হলোÑপশ্চিম সাহারায়- মিনুরসো, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে- মিনুসকা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে- মনুস্কো, গোলানে- আনডফ, সাইপ্রাসে- আনফিসাইপ, লেবাননে- ইউনিফিল, আবেইয়ে- ইউনিসফা, কসোভোতে- ইউনমিক, দক্ষিণ সুদানে- ইউনমিস, ভারত-পাকিস্তান এলাকায়- ইউনমোগিপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে- আনটসো।
কিন্তু জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম নানা কাঠামোগত ও রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়ে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের ভেটো ক্ষমতার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংকটে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। আবার জাতিসংঘের নিজস্ব স্থায়ী সেনাবাহিনী না থাকায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জনবল ও সম্পদের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে দ্রুত সেনা মোতায়েন সবসময় সম্ভব হয় না। সীমিত ম্যান্ডেট ও শক্তি প্রয়োগের বিধিনিষেধের কারণে কিছু ক্ষেত্রে বেসামরিক জনগণকে কার্যকরভাবে সুরক্ষা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি অর্থায়নের ঘাটতি, লজিস্টিক সংকট এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সম্মতির বিষয়টি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তোলে।
এ সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের বিকল্প কোনো কার্যকর বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কূটনীতি, মধ্যস্থতা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে সংস্থাটি বড় ধরনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কম্বোডিয়া, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন ও পূর্ব তিমুরের মতো দেশে শান্তিরক্ষা মিশন সংঘাত-পরবর্তী স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, শরণার্থীদের সহায়তা, নির্বাচন আয়োজন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করতেও জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের হাজারো শান্তিরক্ষী ঝুঁকি নিয়ে এসব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে বিশ্বশান্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অবদান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যাত্রা শুরু। ২০২৬ সালের জুনে জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত ২,০৬,৪৭৬ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ৯টি মিশনে ৪,২১২ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কর্মরত ছিলেন। একই তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সাল থেকে ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন দিয়েছেন এবং ২৮৭ জন আহত হয়েছেন।
নারী শান্তিরক্ষীর অংশগ্রহণও বাংলাদেশের অবদানের গুরুত্বপূর্ণ দিক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরা প্রায় ১১ শতাংশ নারী মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নারী ও শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ, সুরক্ষা ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেও আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতি উন্নয়নের অঙ্গীকার রয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় মানবিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো; শান্তি কেবল রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক কিংবা শান্তিরক্ষীদের দায়িত্ব নয়। পরিবারে সহনশীলতা, সমাজে সম্প্রীতি, মতভেদে সংলাপ, দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং ঘৃণা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান, এসব ছোট ছোট কাজই বৃহত্তর শান্তির ভিত্তি তৈরি করে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ‘শান্তির ঘণ্টা’ প্রতি বছর এই দিবসের প্রতীকী আহ্বানকে সামনে আনে। ২০২৬ সালেও শান্তির ঘণ্টা বাজিয়ে বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছেÑশান্তি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
আজকের সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে তাই ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’ কোনো আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য একটি বাস্তব কর্মসূচি। অস্ত্রের প্রতিযোগিতার বদলে শিক্ষা, বৈষম্যের বদলে সমতা, ঘৃণার বদলে সংলাপ এবং সংঘাতের বদলে সহযোগিতাকে বেছে নেওয়ার মধ্যেই শান্তির পথ নিহিত। সবার জন্য, সব জায়গায়, প্রতিদিনÑশান্তিতে বিনিয়োগই হতে পারে মানবতার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।






