আন্তর্জাতিক সাংকেতিক ভাষা দিবস : ভাষায় রূপ
সাকিবুর রহমান বাবলা
মানুষের ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়; ভাষা হলো ভাবনা, অনুভূতি, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও অধিকার প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বধির মানুষের জন্য সাংকেতিক ভাষা সেই প্রকাশের পূর্ণাঙ্গ স্বাভাবিক ভাষা। তাই এটি কোনো দয়া বা বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা নয়Ñএটি ভাষাগত পরিচয়, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাংকেতিক ভাষা দিবস পালিত হয়। ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতভাবে এ/আরইএস/৭২/১৬১ গ্রহণ করে দিনটি ঘোষণা করে; ২০১৮ সালে প্রথম দিবসটি পালিত হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর বেছে নেওয়া হয়, কারণ ১৯৫১ সালের এই দিনে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব দ্য ডেফ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যÑ’বধির ব্যক্তিদের মানবাধিকার ঘোষণা’। এবারের আহ্বান হলো জাতীয় সাংকেতিক ভাষার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বধির মানুষের পূর্ণ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। ২০২৬ সালে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব দ্য ডেফ-এর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ সনদ গ্রহণের ২০ বছর পূর্তিও হচ্ছে। একই প্রতিপাদ্যে ২১–২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ।
সাংকেতিক ভাষা হাত, আঙুল, মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের ভঙ্গি ও স্থানিক গতিবিধির সমন্বয়ে দৃশ্যমানভাবে ব্যবহৃত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা। এর নিজস্ব ব্যাকরণ, শব্দভা-ার ও বাক্যগঠন রয়েছে এবং এটি কথ্য ভাষার সরাসরি অনুবাদমাত্র নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় সাংকেতিক ভাষা গড়ে উঠেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৭০ মিলিয়নেরও বেশি বধির মানুষ রয়েছেন এবং তাঁরা ৩০০টিরও বেশি সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ব্যবহৃত ইন্টারন্যাশনাল সাইন তুলনামূলকভাবে সীমিত শব্দভা-ারের একটি পিজিনধর্মী রূপ; এটি কোনো একটি দেশের জাতীয় সাংকেতিক ভাষার বিকল্প নয়।
ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সাংকেতিক ভাষা মানুষের ভাষা অর্জনের স্বাভাবিক সক্ষমতারই একটি প্রকাশ। এটি কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা জিনের মাধ্যমে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভাষা নয়; বরং শিশুর সামাজিক পরিবেশ, পরিবার, শিক্ষা ও ভাষাগত সম্প্রদায়ের মধ্যে শেখা ও বিকশিত হয়। তাই বধির শিশুর শৈশবেই সাংকেতিক ভাষায় প্রবেশাধিকার পাওয়া তার জ্ঞানীয়, ভাষাগত, সামাজিক ও শিক্ষাগত বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘও প্রাথমিক পর্যায়ে সাংকেতিক ভাষা ও মানসম্মত সাংকেতিক-ভাষাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করেছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘ভাষা’র সংজ্ঞায় স্পোকেন ল্যাঙ্গুয়েজ-এর পাশাপাশি সাইনেড ল্যাঙ্গুয়েজ-ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশ, তথ্যপ্রাপ্তি ও সরকারি যোগাযোগে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহারের অধিকার সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ শিক্ষা ক্ষেত্রে সাংকেতিক ভাষা শেখার সুযোগ ও উপযুক্ত সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরে। আর ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ বধির মানুষের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয়, বিশেষত সাংকেতিক ভাষা ও ডেফ কালচার-এর স্বীকৃতি ও সমর্থনের কথা বলে।
অতএব, সাংকেতিক ভাষার অধিকার মানে শুধু যোগাযোগের সুবিধা নয়; এর সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিচার, কর্মসংস্থান, তথ্যপ্রাপ্তি, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার সরাসরি যুক্ত। ‘আমাদের বাদ দিয়ে আমাদের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নয়’Ñএই নীতিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ২(১৬) ধারায় বাংলা ইশারা ভাষাকে শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত, অন্যান্য ভাষার মতো গতিশীল ও পরিবর্তনশীল ভাষা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই আইনের ১৬ ধারায় শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে আইন স্বীকৃতি দেওয়ার পরও বাস্তব প্রয়োগই বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষক ও দোভাষী, হাসপাতাল ও আদালতে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা, সরকারি তথ্য ও গণমাধ্যমে সাংকেতিক ভাষার প্রবেশগম্যতা এবং প্রশিক্ষিত দোভাষীর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা জরুরি।
শ্রবণহানি ও বধিরতার বিষয়টি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৪৩০ মিলিয়ন মানুষ এমন মাত্রার শ্রবণহানিতে রয়েছেন যার জন্য পুনর্বাসন প্রয়োজন; ২০৫০ সালের মধ্যে কোনো না কোনো মাত্রার শ্রবণহানি নিয়ে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ২.৫ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে। তবে শ্রবণহানি এবং বধির সাংকেতিক-ভাষী জনগোষ্ঠী একই পরিসংখ্যানগত শ্রেণি নয়Ñএই পার্থক্যটিও বোঝা জরুরি।
সুতরাং ২৩ সেপ্টেম্বরের তাৎপর্য কেবল একটি দিবস পালন নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়Ñভাষার অধিকার থেকেই জ্ঞানার্জনের অধিকার, আর জ্ঞান ও যোগাযোগের অধিকার থেকেই পূর্ণ মানবিক অংশগ্রহণের পথ তৈরি হয়। জাতীয় সাংকেতিক ভাষার স্বীকৃতি, প্রাথমিক বয়সে ভাষা শেখার সুযোগ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য, বিচার ও সরকারি সেবায় কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই ‘মানবাধিকার সবার জন্য’Ñএই নীতির বাস্তব অর্থ প্রতিষ্ঠিত হবে।












