শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

আশাশুনিতে জমি নিয়ে বিরোধে বাড়ি ঘর ভাংচুর শেষে ছয়জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ণ
আশাশুনিতে জমি নিয়ে বিরোধে বাড়ি ঘর ভাংচুর শেষে ছয়জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম

পত্রদূত রিপোর্ট: জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষরা বাড়ি ঘরে হামলা ও ভাংচুর শেষে একই পরিবারের চারজন নারীসহ ছয়জনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করেছে। সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ঝিকরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত তিনজনকে খুলনা ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চারজনকে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

আশাশুনি উপজেলার ঝিকরা গ্রামের মনোরঞ্জন ম-ল জানান, ৪৭ শতক ভিটা জমি নিয়ে তাদের সাথে প্রতিপক্ষ গোবিন্দ ম-ল, সুরঞ্জন ম-ল, শম্ভু ম-লসহ কয়েকজনের ১৯৮৮ সাল থেকে বিরোধ রয়েছে। ওই জমি তার (মনোরঞ্জন) নামে বর্তমান হাল রেকর্ড হলেও জোরপূর্বক দাবি করে আসছিলো তার শরিক সুরঞ্জন ম-লসহ অন্যরা। এ নিয়ে প্রতিপক্ষরা ১৯৮৮ সালে আশাশুনি উপজেলা আদালতে মামলা করে। ১৯৯৫ সালে রায় তারে বিপক্ষে গেলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করে তারা। সেখানে হেরে যাওয়ায় ২০০৮ সালে মহামান্য হাইকোর্টে আপিল করে তারা। বর্তমানে ওই জমির উপর স্থিতাবস্থা জারির নির্দেশ থাকলেও প্রতিপক্ষরা বিভিন্ন অজুহাতে তাদের জমি দখল ও পুকুরের মাছ লুটপাট করে আসছিলো। স্থানীয়ভাবে কয়েকবার শালিসি বৈঠক হলেও তারা সে সিদ্ধান্ত মানেনি।

 

এমনকি ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল আশাশুনি থানায় উভয়পক্ষকে নিয়ে বসাবসি করে ১০জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে আপোষনামা তৈরি হলেও ২৮ এপ্রিল দুটি গরু উঠানে যাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ গোবিন্দ ম-ল, সাগর ম-ল সহ কয়েকজন পুত্রবধু রিতা রানী ম-ল, শিখা রানী ম-লকে পিটিয়ে জখম করে। ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি পুতনী পুজা ম-লকে পিটিয়ে জখম করে। এসব নিয়ে থানায় মামলা না হওয়ায় প্রতিপক্ষরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

মনোরঞ্জন ম-ল আরো জানান, সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে প্রতিপক্ষ গোবিন্দ ম-ল, সুরঞ্জন ম-লসহ তাদের পরিবারের ৮/১০ জন তাদের দখলীয় ও রেকডীয় জমিতে ঢুকে কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে থাকে। বাধা দেওয়ায় তার ছেলে পলাশ ম-লকে দা, লোহার রড ও কোদাল নিয়ে ধাওয়া করে গোবিন্দ, সুরঞ্জন, শম্ভু, কালিপদ, সুভাষ, চিত্তরঞ্জন, মিলন, তারামনি, কমলা, ফুলমতি ও কবিতা ম-লসহ কয়েকজন। পলাশ দৌড়ে ঘরের ভিতর ঢোকার চেষ্টা করলে হামলাকারিরা তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে উঠানে এনে মারপিট করতে থাকে। তাকে রক্ষায় এগিয়ে এলে পুতনী কলেজ ছাত্রী সুপ্রিয়া ম-ল, কলেজ ছাত্রী পূজা ম-ল, পুত্রবধু শিখা ম-ল, রিতা ম-ল ও পৌত্র ১০ম শ্রেণীর ছাত্র রাজু ম-লকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করা হয়।

 

এ সময় তাদের ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র ভাংচুর করা হয়। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হওয়ায় শিখা রানী ম-ল, পুজা রানী ম-ল ও সুপ্রিয়া ম-লকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে সুপ্রিয়া ম-লকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলেও তাকে সোমবার রাতে খুলনা সিটি মেডিকেলে ভর্তি করা হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুরঞ্জন ম-ল বলেন, সোমবার দুপুরে পলাশ ম-লসহ অন্যরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মা কবিতা ম-লকে ধরে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার খবর পাই। এরপর তাদের বাড়ির লোকজনকে নিয়ে কবিতা ম-লকে উদ্ধারে গেলে তাদের সঙ্গে হাতহাতি হয়। নিজেদের অস্ত্র নিজেদের গায়ে লেগে জখম হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, তার মাকেও আশাশুনি থেকে মেডিকেলে ভর্তি করা হবে।

তবে সোমবার দুপুর আড়াইটায় এ প্রতিবেদক আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে সমগ্র হাসপাতালে খুঁজে কবিতা ম-লকে পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, সুপ্রিয়া ম-ল ও শিখা ম-লকে ধারালো জিনিস দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়েছে। তা ছাড়া সুপ্রিয়া, শিখা ও পুজাকে ভারী জিনিস দিয়ে হাত ও পা, পিঠ জখম করা হয়েছে। বার বার বমি হওয়ায় অবস্থার অবনতি হলে সুপ্রিয়াকে খুলনায় ভর্তি করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আশাশুনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শামীম খান সুমিত্রা ম-লসহ কয়েকজনের উপর প্রতিপক্ষের গুরুতর হামলার কথা নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় পঙ্কজ কুমার ম-ল বাদি হয়ে সোমবার রাতে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছন। এঘটনায় মামলা রেকর্ড করা হবে। গ্রেপ্তার করা হবে আসামীদের।

 

Ads small one

মুক্তমত: সাতক্ষীরায় উন্নয়ন অদৃশ্য-দৃশ্যমানটা কী?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
মুক্তমত: সাতক্ষীরায় উন্নয়ন অদৃশ্য-দৃশ্যমানটা কী?

মোঃ হাফিজুল ইসলাম

সাতক্ষীরার মানুষের প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত সংসদ সদস্য এলাকার উন্নয়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান ভূমিকা রাখবেন। সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড-সবখানেই তাঁদের সক্রিয় উপস্থিতি থাকবে। সাধারণ মানুষের সমস্যা, রাস্তা-ঘাটের দুরবস্থা, জলাবদ্ধতা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের সংকট নিয়ে তাঁরা কথা বলবেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা কতটা দৃশ্যমান-সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার বিষয়।

একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব কেবল নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার অর্থ হলো, জনগনের কল্যাণে সংসদে আইন প্রণয়ন করা, মানুষের প্রত্যাশা পূরণে দায়িত্বশীল থাকা এবং এলাকার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা। বিশেষ করে সরকারি সভা-সেমিনার, উন্নয়ন পর্যালোচনা সভা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মসূচিতে জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি জনস্বার্থে সমন্বয় বাড়াতে পারে। সেখানে সংসদ সদস্যের উপস্থিতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাঁর অনুপস্থিতির কারণ জানাটাও জরুরি।

প্রশ্ন হচ্ছে, সাতক্ষীরার উন্নয়ন নিয়ে যখন জনমনে নানা প্রশ্ন, তখন উন্নয়নের অগ্রগতি তুলে ধরার উদ্যোগ কতটা দৃশ্যমান? সরকারি অনুষ্ঠানগুলোতে তাঁদের উপস্থিতি কম থাকলে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানে তাঁর সক্রিয়তা কতটা-সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।

অবশ্য, সব উন্নয়ন একজন সংসদ সদস্যের একক সিদ্ধান্তে হয় না। প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। একইভাবে, প্রতিটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকাই একজন জনপ্রতিনিধির কর্মদক্ষতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। তবে জনগণের কাছে কাজের অগ্রগতি তুলে ধরা, নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া তাঁর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই প্রশ্নটা ব্যক্তিগত আক্রমণের নয়, জনস্বার্থের-সাতক্ষীরার উন্নয়নে কী কাজ হচ্ছে, কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং তার সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাচ্ছে?

উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্র কোথায়? সরকারি অনুষ্ঠানেও অনুপস্থিতি কেন? আর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সংসদ সদস্যের সক্রিয় ভূমিকা কোথায়?

উন্নয়নও যদি চোখে না পড়ে, জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিও যদি অনুভব করা না যায়-তাহলে সাতক্ষীরার মানুষ দৃশ্যমান হিসেবে কী দেখবেন? এ প্রশ্নের উত্তর বক্তব্যে নয়, কাজের মাধ্যমেই দেওয়া উচিত।

এটি নিছক ব্যঙ্গ নয়; বরং একজন জনপ্রতিনিধির ভূমিকা, দায়িত্ব ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনার আহ্বান। এ প্রশ্নের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তর হবে এমন কিছু কাজ, যার সুফল সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ নিজেরাই অনুভব করতে পারবেন।

মোঃ হাফিজুল ইসলাম, সংবাদকর্মী

শারদীয় দুর্গোৎসব: মহাসপ্তমীতে সাতক্ষীরার মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের আরাধনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ
শারদীয় দুর্গোৎসব: মহাসপ্তমীতে সাতক্ষীরার মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের আরাধনা

নিজস্ব প্রতিনিধি: ঢাকে কাঠি পড়ার পর মায়ের নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের মধ্য দিয়ে আজ শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা। শুভ মহাসপ্তমীর ভোর থেকেই সাতক্ষীরার ৬১২টি পূজা মণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আগমন ঘটতে থাকে। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের পর থেকেই ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত রূপসী মণ্ডপগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখ পড়ার মতো। বিশেষ করে বুড়িয়ার আকর্ষণীয় প্রতিমা দর্শনে ভক্তদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ দেখা গেছে।

 

সাতক্ষীরার কাটিয়া সরকারপাড়া শ্রী শ্রী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে মহাসপ্তমীর প্রাতে ভক্তদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত মাধব দত্ত মহাসপ্তমীর বিশেষ মাহাত্ম্য তুলে ধরে বলেন, “আজকের এই তিথি ভক্তদের মাঝে এক নতুন ভক্তি ও চেতনার সঞ্চার করে।” মণ্ডপটির পূজার আনুষ্ঠানিকতা পরিচালনাকারী পুরোহিত হরিদাস ব্যানার্জি সবাইকে শান্তিতে ও শৃঙ্খলায় বসবাসের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

 

মণ্ডপে আগত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাগরিকা সাহা নারীর নিরাপত্তা, জানমালের সুরক্ষা ও বিশ্বশান্তি কামনা করেন। একই সাথে সার্বিক নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে স্থানীয় দর্শনার্থী উৎপল সাহা বলেন, “পূজার শুরু থেকে যে সুন্দর শৃঙ্খলা গড়ে উঠেছে, তা যেন শেষ পর্যন্ত অটুট থাকে।”

 

শিক্ষিকা মানসী মজুমদার বিরাজমান অস্থিরতা দূর হওয়ার আকুতি জানিয়ে বলেন, “সর্বত্র যে অস্থিরতা চলছে, তা দূর হয়ে মানুষের মধ্যে স্থিরতা আসুক। প্রভুর প্রতি ভক্তের ভালোবাসার পাশাপাশি ভক্তদের জন্য জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি হোক।” অন্যদিকে, শিক্ষক উত্তম মণ্ডল শিক্ষা ও জ্ঞান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “জীবন আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। শান্তির সমাজ বিনির্মাণে সকলকে একত্রিত হয়ে মায়ের আশীর্বাদ ও করুণা প্রার্থনা করতে হবে।”

 

পূজা উপলক্ষে বিভিন্ন মণ্ডপে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নানা লোকজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যা উৎসবের আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

অর্থনীতির তৃতীয় শক্তি হতে পারে পর্যটন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
অর্থনীতির তৃতীয় শক্তি হতে পারে পর্যটন

মো: মামুন হাসান

একটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার আয়ের উৎসের বৈচিত্র্যের ওপর। বাংলাদেশের বহির্খাত দীর্ঘদিন দুটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে, তৈরি পোশাক রপ্তানি আর প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতা এখন দুটিকেই একসঙ্গে চাপে ফেলেছে। জ্বালানি ও জাহাজভাড়া বেড়েছে, পশ্চিমা ক্রেতারা ক্রয়াদেশ ধরে রাখছেন, আর শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটে একটি প্রশ্ন গুরুত্ব পাচ্ছে: যে খাত আমাদের নদী, সমুদ্র, বন আর আতিথেয়তাকে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করতে পারে, সেই পর্যটন কি হতে পারে পরবর্তী অর্থনৈতিক শক্তি?

 

বিশ্ব অর্থনীতির হিসাব এ প্রশ্নের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেয়। ডব্লিউটিটিসির তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত বিশ্ব অর্থনীতিতে রেকর্ড ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার যোগ করেছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির ৯.৮ শতাংশ। খাতটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.১ শতাংশ, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি বেড়েছে ২.৮ শতাংশ হারে। এই খাত বিশ্বজুড়ে ৩৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জুগিয়েছে এবং নতুন সৃষ্ট প্রতি তিনটি চাকরির একটি এসেছে এখান থেকে। ইউএন ট্যুরিজমের হিসাবে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটক ছিলেন প্রায় ১৫২ কোটি, পর্যটকদের খরচ ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিবহন যোগ করলে পর্যটনের মোট রপ্তানি আয় ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার। দৃষ্টান্ত হিসেবে স্পেনে পর্যটন জাতীয় জিডিপির ১৫.৩ শতাংশ, আর সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় ১৩০ বিলিয়ন ডলার। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে খাতটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ বিশ্ববাজার শুধু বড় নয়, আমাদের অঞ্চলেই সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে।

 

এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো বিনয়ী। সরকারি ভাষ্যে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ, যা ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষিত হয়েছে। ডব্লিউটিটিসির হিসাবে ২০২৩ সালে খাতটির অর্থনৈতিক অবদান ছিল প্রায় ৯.৫ বিলিয়ন ডলার এবং কর্মসংস্থান ছিল প্রায় ২১ লাখ ৪০ হাজার, যা মোট কর্মসংস্থানের ৩ শতাংশ। অবদান জিডিপির ৬ শতাংশে পৌঁছালে, বর্তমান ভিত্তি ধরে মোটা দাগে বছরে আরও ৯ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হয়। এটি একটি সরল প্রক্ষেপণ মাত্র, পূর্বাভাস নয়। তবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দিকটি আরও লক্ষণীয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন আয় ছিল মাত্র ৩৯১ মিলিয়ন ডলার, আর ২০২০ সালে তা নেমে আসে ২১৮ মিলিয়নে। এর বিপরীতে ২০২৫ সালে প্রবাসী আয় এসেছে রেকর্ড ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার। পর্যটনের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক আয় এখনো প্রবাসী আয়ের ২ শতাংশেরও কম। এই ব্যবধানই সম্ভাবনার পরিমাপ। একটি সহজ হিসাব ধরা যাক: বছরে যদি আরও ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক এসে গড়ে হাজার ডলার করে খরচ করেন, তবে অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে, যা ২০১৯ সালের মোট পর্যটন আয়ের আড়াই গুণেরও বেশি।

 

পর্যটনকে “অদৃশ্য রপ্তানি” বলা হয়, কারণ এখানে ভোক্তা পণ্যের কাছে যান না, পণ্যই ভোক্তার কাছে আসে। এতে বন্দরজট, জাহাজভাড়া বা সামুদ্রিক পথের ঝুঁকি নেই। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বৈশিষ্ট্য মূল্যবান। দেশের রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর, আর সেই খাতই এখন চাপে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫.৫১ শতাংশ, মার্চে মোট রপ্তানি আয় আগের বছরের মার্চের চেয়ে কমেছে ১৮.০৭ শতাংশ। বিজিএমইএর হিসাবে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত পোশাক রপ্তানি ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩.৪১ শতাংশ কম। পোশাক শিল্পের মুনাফার হারও ৪ শতাংশের নিচে, ফলে খরচ বাড়লে তা শোষণের সক্ষমতা সীমিত। প্রবাসী আয়েও ঝুঁকি আছে। ২০২৪- ২৫ অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয়ের ৪৫.৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এডিবি সতর্ক করেছে, সংঘাতে অঞ্চলটির শ্রমবাজার দুর্বল হলে এই আয় চাপে পড়তে পারে। তুলনায় পর্যটনে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের প্রয়োজন কম, ফলে আয়ের বড় অংশ দেশের ভেতরেই থাকে। হোটেলের খাবার, পরিবহন, হস্তশিল্প, নৌযান, গাইড ও স্থানীয় বাজারে এই অর্থ ঘুরে গুণক প্রভাব তৈরি করে। এভাবে এক ডলারের বৈদেশিক ব্যয় অর্থনীতিতে একাধিকবার হাত বদলায় এবং কারখানাহীন উপকূল, হাওর ও পাহাড়ি জনপদে আয় ও কর্মসংস্থান ছড়িয়ে দেয়।

 

তবে বিপুল সম্ভাবনাকে আয়ে রূপ দিতে হলে কয়েকটি কাঠামোগত বাধা সরাতে হবে। পর্যটনের প্রথম শর্ত আস্থা, আর বিদেশি পর্যটকের কাছে নিরাপত্তার অর্থ শুধু অপরাধ না থাকা নয়। হয়রানি, প্রতারণা, অস্বচ্ছ ভাড়া, ভাষাগত বাধা ও জরুরি সহায়তার নিশ্চয়তাও এর অংশ। এর সঙ্গে আছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি, জটিল ভিসা প্রক্রিয়া, উচ্চ বিমানভাড়া ও কর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব। সবচেয়ে অবহেলিত সমস্যা দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি। ভালো হোটেল গড়া সহজ, ভালো আতিথেয়তা গড়া কঠিন। শিক্ষক হিসেবে দেখি, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসূত্র এখনো দুর্বল।

 

এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন প্রচলিত পথের বাইরের ভাবনা। প্রথমত, নিরাপত্তাকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে একটি ডিজিটাল ট্যুরিস্ট পাস চালু করা যায়। এক কিউআর কোডে নিবন্ধন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা, বহুভাষিক সহায়তা এবং জরুরি নাম্বারের মাধ্যমে ট্যুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকবে। এতে পর্যটকের ঝুঁকিবোধ কমবে, আর সরকার পাবে রিয়েল টাইম পর্যটন তথ্য, যা পর্যটন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির ভিত্তি হবে। দ্বিতীয়ত, বিপণনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাজে লাগানো যায়। বিদেশে থাকা পরিবারগুলো ইতিমধ্যে দেশের সঙ্গে আবেগে যুক্ত, তাই তাঁদের জন্য “দেশে ছুটি” প্যাকেজ এবং বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আসার প্রণোদনা কম খরচে বড় বাজার তৈরি করতে পারে। প্রবাসী আয়ের একটি অংশ পর্যটন অবকাঠামোয় টানতে একটি ডায়াসপোরা ট্যুরিজম বন্ডও ভাবা যায়। তৃতীয়ত, ঋতুভিত্তিক চাহিদার ঢেউ সামলাতে গতিশীল মূল্যনির্ধারণ ও অফ সিজন প্রণোদনা দরকার। কক্সবাজারে বর্ষায় ও হাওরে শুষ্ক মৌসুমে আবাসন ফাঁকা থাকে। সম্মেলন পর্যটন ও ইভেন্ট আয়োজনে সারা বছরের আয়ের ধারা তৈরি করা যায়, যা বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশিত প্রতিদান বাড়ায়।

 

চতুর্থত, পর্যটককে ভোক্তা থেকে স্থানীয় শিল্পের ক্রেতায় রূপান্তর করা জরুরি। জামদানি, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, চা ও মৎস্যজাত পণ্যকে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডের অধীনে আনলে পর্যটকের ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনে যাবে। বিদেশি পর্যটকদের কেনাকাটায় আগমনকালীন কর ফেরত চালু করলে হস্তশিল্পের বিক্রি বাড়বে। হোটেল ও রিসোর্টে স্থানীয় কৃষিপণ্য কেনা বাধ্যতামূলক বা প্রণোদনার আওতায় আনলে কৃষির সঙ্গে পর্যটনের পশ্চাৎ সংযোগ শক্ত হবে। পঞ্চমত, সুন্দরবন, হাওর ও পাহাড়ের মতো পরিবেশগতভাবে মূল্যবান এলাকায় কমিউনিটি মালিকানাধীন হোমস্টে ও ইকো লজ গড়া যায়, যেখানে আয়ের একটি অংশ স্থানীয় সমবায়ের হাতে যাবে। পরিবেশ সংরক্ষণে একটি সবুজ উপকর বসিয়ে তার পুরো অর্থ ওই এলাকার সংরক্ষণেই ব্যয় করলে পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে টেকসই ভারসাম্য থাকবে। ম্যানগ্রোভ ও বনভিত্তিক কার্বন ক্রেডিটের আয় এই তহবিলের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।

 

ষষ্ঠত, আকাশপথ ও ভিসা নীতি বিনিয়োগের নিয়ামক। নির্বাচিত বাজারের জন্য অনলাইন ও আগমনকালীন ভিসা, মৌসুমি চার্টার ফ্লাইটে প্রণোদনা এবং বিমান জ্বালানির ওপর করের যৌক্তিকীকরণ আনলে আসনপ্রতি খরচ কমবে। ডিজিটাল নোম্যাড ভিসার মতো দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের সুযোগ দিলে অবস্থানকালভিত্তিক মাথাপিছু আয় বাড়বে, কারণ পর্যটন অর্থনীতিতে পর্যটকের সংখ্যার চেয়ে মাথাপিছু ব্যয় ও থাকার মেয়াদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তমত, বিনিয়োগে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও আমদানি শুল্ক সুবিধার মাধ্যমে ঝুঁকি ভাগাভাগি করা যায়। সবশেষে মানবসম্পদে বিনিয়োগ, অর্থাৎ পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে আতিথেয়তা শিক্ষা সম্প্রসারণ, হোটেল ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে সরাসরি শিক্ষানবিশি চুক্তি এবং ভাষাশিক্ষার ওপর জোর। মানসম্মত সেবা দিতে পারলে একই গন্তব্য থেকে বেশি মূল্য আদায় করা যায়, যা সরাসরি লাভজনকতা বাড়ায়।

 

সরকার জাতীয় পর্যটন পরিষদ গঠন করেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মহাপরিকল্পনার কাজ চলছে। কাঠামো তৈরি হয়েছে, এখন চাই ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। পর্যটন রাতারাতি পোশাক খাতের বিকল্প হবে না, হওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আজকের অনিশ্চিত বিশ্বে অর্থনীতির শক্তি নিহিত তার বৈচিত্র্যে। যে দেশ শুধু কারখানা আর প্রবাসী শ্রমের ওপর নির্ভর করে, সে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটে কাঁপে। সুপরিকল্পিত পর্যটন নীতি, নিরাপদ পরিবেশ ও স্থানীয় মূল্য সংযোজনের সমন্বয়ে পর্যটন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য অদৃশ্য রপ্তানি খাত।

 

লেখক: মো: মামুন হাসান, বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ।