প্রকাশ ঘোষ বিধান
ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের ঢল ও জনস্্েরাত বাংলাদেশের অন্যতম বড় উৎসবের অংশ। প্রতি বছরই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের এই চাপে ঢাকা ও এর আশেপাশের মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের তীব্র চাপ ও যানজট তৈরি হয়।
উৎসবকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলো ফাঁকা হতে থাকে, আর মহাসড়কগুলো পরিণত হয় মানুষের স্্েরাতে। লাখো মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামের পথে ছুটে যায়। ঈদে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উচ্ছ্বাস এবং নাড়ির টানে ঘরে ফেরার ব্যস্ততা।
কিন্তু প্রতি বছর উৎসবের সময় অতিরিক্ত যাত্রীচাপ এবং বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। আনন্দের এই যাত্রা রূপ নেয় শোকের মিছিলে। অতিরিক্ত গতি, বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণহীন মোটরসাইকেল, ক্লান্ত চালকের ঘুম, অব্যবস্থাপনা ও আইন অমান্য করার প্রবণতা অসংখ্য প্রাণ কেড়ে নেয়।
নবীনগর-চন্দ্রা, ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি যানবাহনের চাপ থাকে। গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির অতিরিক্ত চাপে কিছু কিছু পয়েন্টে ধীরগতি ও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সদরঘাটের মতো টার্মিনালগুলোতে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। লঞ্চ ও ফেরিগুলোতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। কমলাপুর স্টেশনসহ অন্যান্য স্টেশনে যাত্রীদের প্রচন্ড জনস্্েরাত লক্ষ্য করা যায়।
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হলো অতিরিক্ত যাত্রীচাপ। ঈদের আগে কয়েক দিন শহর ছেড়ে মানুষ গ্রামের বাড়িতে রওনা দেয়। ফলে সড়কে যানবাহনের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, সিএনজি, নসিমন-করিমনসহ সব ধরনের যানবাহন একসঙ্গে সড়কে নেমে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনও চলাচল করে। পরিবহনের চাহিদা বাড়ায় যাত্রী পরিবহনে মালবাহী ট্রাক পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সড়ক ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সড়ক, যানবাহন ও চালকের শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন মহাসড়কে ত্রুটিপূর্ণ এবং লাইসেন্সহীন গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। ওভারস্পিডিং বা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো বন্ধে স্পিড গান ও সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা। চালকদের বিশ্রাম নিশ্চিত করতে একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো বন্ধ করে বিকল্প চালকের ব্যবস্থা রাখা। ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং রোধে মহাসড়কে বিপজ্জনকভাবে লেন পরিবর্তন ও ওভারটেকিং করা কঠোরভাবে বন্ধ করা।
মোটরসাইকেলে চালকসহ সর্বোচ্চ দুজন আরোহী এবং মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধ করতে বাস, ট্রেন বা লঞ্চের ছাদে অতিরিক্ত যাত্রী বহন ঠেকাতে টার্মিনালগুলোতে কড়া নজরদারি করা। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ এবং চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
চালকদের বেপরোয়া মনোভাবও দুর্ঘটনার বড় কারণ। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং প্রবণতা, মোবাইল ফোন ব্যবহার, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা ঈদযাত্রায় ভয়াবহ রূপ নেয়।
পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা, হঠাৎ রাস্তা পার হওয়া কিংবা মহাসড়কে হাঁটার প্রবণতাও দুর্ঘটনা ঘটায়। একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে অনেক চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে রাতের বেলায় ঘুমঘুম অবস্থায় চালানো যানবাহন বড় ধরনের দুর্ঘটনার জন্ম দেয়।
ঈদযাত্রাকে আনন্দময় করতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য। ফিটনেসবিহীন গাড়ি এড়িয়ে চলা। যানজট এড়াতে ভ্রমণের জন্য অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে রওনা হওয়া উচিত। চরম ভিড়ের মাঝে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ সঙ্গে রাখা আবশ্যক।
সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যানজট নিরসনে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় ও নজরদারি বাড়াতে হবে। বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত তদারকি বৃদ্ধি করা। টোল প্লাজায় বুথ বাড়িয়ে দ্রুত গাড়ি পারাপারের ব্যবস্থা করা, যাতে দীর্ঘ যানজট ও চালকদের ক্লান্তি না বাড়ে। মহাসড়কের মোড় বা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার ও স্ট্যান্ড দ্রুত অপসারণ করা। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট