বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

খোকাখুকুর কোরবান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ
খোকাখুকুর কোরবান

জাহাঙ্গীর চৌধুরী
খোকাখুকুর ইচ্ছে এবার
কোরবান দিবে লাল ষাঁড়,
দেখতে হবে নাদুসনুদুস
উঁচু হবে তার ঘাড়।

বলবে ওরা বাবার কাছে
মনকে শুদ্ধ করতে,
আল্লার নামে শপথ করে
হালাল টাকায় কিনতে।

তিন ভাগ করে একভাগ মাংস
বিলি করবে গাঁয়ে,
আত্মীয় স্বজন সবাই খাবে
থাকবে না আর দায়ে।

কোরবান হল মন পরীক্ষা
শুদ্ধ হলে সে পাশ,
আল্লার দিদার পেতে হলে
নিয়ত থাকবে তার খাস।

Ads small one

শ্যামনগরে কিশোরীদের জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে কর্মশালা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৪:১০ অপরাহ্ণ
শ্যামনগরে কিশোরীদের জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে কর্মশালা

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার শ্যামনগর সার্ভিস এন্ড ভিশনফর এডিফাই (সেভ) এর উদ্যোগে এবং বান্ধব ডেনমার্ক ও সিআইএসইউ এর সহযোগিতায় ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশিল কিশোরদের ক্ষমতায়ন প্রকল্পের আওতায় শ্যামনগরে সচেতনতামূলক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২১ জুলাই সকাল ১০টায় শ্যামনগর উপজেলা হলরুমে এ কর্মশালা অনুষ্ঠানে সেভ এর নির্বাহী পরিচাল আয়শা সিদ্দিকার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজসেবা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন।

 

আয়শা সিদ্দিকা স্বাগত বক্তব্যে কর্মশালার লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন উপজেলা রিপটার্স ইউনিটের সভাপতি গাজী আল ইমরান, গোবিন্দপুর কলেজের প্রিন্সিপল গাজী শফিকুর রহমান, ভুরুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম, কাঠালবাড়িয়া এজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজহারুল ইসলাম, বুড়িগোয়ালিনি ইউপি চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম, যুবউন্নয়ন কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

 

এসময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ও সেভ এর সদস্যসদস্যাগণ উপস্থিত ছিলেন। সার্বিক ব্যাস্থাপনায় ছিলেন প্রোজেক্ট ম্যানেজার ফারুক আহম্মেদ।

‘বহিপীর’ থেকে সাতক্ষীরা-৪: ধর্ম, ক্ষমতা ও নারী শোষণের এক অপরিবর্তিত সমীকরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৪:০৭ অপরাহ্ণ
‘বহিপীর’ থেকে সাতক্ষীরা-৪: ধর্ম, ক্ষমতা ও নারী শোষণের এক অপরিবর্তিত সমীকরণ

‎তারিক ইসলাম

‎বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী নাট্যকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘বহিপীর’ নাটকের কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। সেখানে বয়োবৃদ্ধ ও প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা বহিপীর তার ক্ষমতার দাপট ও ধর্মের দোহাই দিয়ে এক অল্পবয়সী তরুণী তাহেরাকে জোরপূর্বক বিয়ে করতে চেয়েছিল। সমাজের অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় অন্ধতা এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দাপট ছিল সেই নাটকের মূল উপজীব্য। বহিপীর ভেবেছিল ধর্মের আবরণ আর সামাজিক প্রভাব দিয়ে একজন নারীর অনিচ্ছাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়।
‎‎ওয়ালীউল্লাহর সেই রূপক কাহিনী যে আজ একুশ শতকে এসে আমাদের বাস্তবতার আয়নায় এভাবে ফুটে উঠবে, তা হয়তো সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে ছিল। সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্যের বিতর্কিত নারীঘটিত ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও জনমনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতি নৈতিকতাহীনতা এবং নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণের এই ঘটনা যেন ‘বহিপীর’-এর আধুনিক রূপায়ণ।

‎বহিপীর আর বর্তমানের ক্ষমতার রাজনীতি-দুয়ের মধ্যে দৃশ্যত সময়ের তফাত অনেক হলেও মূল জায়গায় কোনো তফাত নেই। বহিপীর ব্যবহার করেছিল ধর্মীয় প্রভাব ও অন্ধবিশ্বাসকে, আর আধুনিক যুগের প্রতিনিধিরা ব্যবহার করেন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক আধিপত্যকে। দুই ক্ষেত্রেই অস্ত্র ভিন্ন, কিন্তু শিকার একই-নারী, এবং পরিণতি একই-নৈতিকতার চরম অবক্ষয়।
‎একজন সংসদ সদস্য একটি সংসদীয় আসনের কোটি মানুষের অভিভাবকতুল্য। জনগণ তাকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠায় আইন প্রণয়ন, এলাকার উন্নয়ন এবং নৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে যখন সেই পদের মর্যাদা ধূলোয় লুটিয়ে পড়ে এবং নারীঘটিত কেলেঙ্কারি লোকচক্ষুর সামনে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে-আমরা কি তবে এখনও সেই ‘বহিপীর’-এর যুগেই বাস করছি?

‎সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর নাটকে তাহেরা নামের সেই তরুণী অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেনি; সে পালিয়ে এসে নিজের অধিকারের জন্য প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আজকের সমাজেও নারীরা আর নীরব দর্শক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন আর ক্ষমতার অপব্যবহারের কাছে নারী ও সমাজের নীতি-নৈতিকতা জিম্মি থাকবে?

‎বহিপীরের মতো মানসিকতা যখন কোনো জনপ্রতিনিধির পোশাকে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির ব্যর্থতা থাকে না, তা পুরো রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার জন্য এক লজ্জাজনক সংকেত বহন করে। সময় এসেছে এই ‘আধুনিক বহিপীরদের’ বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার, যেন ক্ষমতার গরম আর অনৈতিকতা কোনো পদের আড়ালে ঢাকা না পড়তে পারে।

লেখক: তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

উল্টো রথ: শিকড়ে ফেরার চিরন্তন আহ্বান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৪:০১ অপরাহ্ণ
উল্টো রথ: শিকড়ে ফেরার চিরন্তন আহ্বান

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

শুক্রবার জগন্নাথ দেব মাসির বাড়ী থেকে নিজ গৃহে ফিরবেন। মানুষের জীবন মূলত এক অন্তহীন যাত্রা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই পথচলায় মানুষ কখনো সাফল্যের শিখরে ওঠে, কখনো ব্যর্থতার অতলে হারিয়ে যায়; কখনো অর্জনের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়, আবার কখনো প্রাপ্তির মধ্যেও অপূর্ণতার বেদনা অনুভব করে। এই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষ অনেক সময় নিজের শিকড়, নিজের মূল্যবোধ এবং নিজের আত্মিক পরিচয় থেকে দূরে সরে যায়। তাই সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু ধর্মীয় উৎসবের জন্ম হয়েছে, যা মানুষকে শুধু আনন্দ দেয় না, বরং তাকে নিজের ভেতরে ফিরে তাকাতেও শেখায়।

 

শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথ বা বাহুদা যাত্রা তেমনই একটি উৎসব। এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং প্রত্যাবর্তনের দর্শন, আত্মশুদ্ধির আহ্বান এবং শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য প্রতীক। রথযাত্রা সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানেন। আষাঢ় মাসে জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রা রথে চড়ে শ্রীমন্দির থেকে গু-িচা মন্দিরে, অর্থাৎ ভক্তদের ভাষায় ‘মাসির বাড়ি’ যান। সেখানে নয় দিন অবস্থানের পর তাঁরা আবার নিজ আবাসে ফিরে আসেন। এই ফিরে আসার যাত্রাই উল্টো রথ বা বাহুদা যাত্রা। বাইরে থেকে দেখলে এটি দেবতার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের ঘটনা মাত্র। কিন্তু ধর্মীয় দর্শন ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির আলোকে দেখলে এটি মানুষের নিজের শিকড়ে ফিরে আসার এক গভীর প্রতীক।

 

পৌরাণিক কাহিনিতে বলা হয়, ভক্তদের সান্নিধ্য গ্রহণ এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার জন্য জগন্নাথদেব গু-িচা মন্দিরে গমন করেন। নির্ধারিত সময় শেষে তিনি আবার শ্রীমন্দিরে ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন যেন একটি চিরন্তন সত্যকে সামনে আনেÑজীবনে যত দূরেই যাওয়া হোক, শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয় নিজের মূল ঠিকানায়। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। কর্মজীবন, প্রতিযোগিতা, অর্থ-সম্পদ কিংবা ভোগবাদের মোহে আমরা যত দূরেই ছুটে যাই না কেন, একসময় আমাদের ফিরে আসতে হয় পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি এবং আত্মিক মূল্যবোধের কাছে।

 

উড়িষ্যার পুরীধামে উল্টো রথযাত্রা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়েছে। লাখো মানুষ সেখানে একত্রিত হন। জগন্নাথদেবের নন্দীঘোষ, বলরামের তালধ্বজ এবং সুভদ্রার দর্পদলন রথ ভক্তদের টানে আবার শ্রীমন্দিরের পথে এগিয়ে চলে। এই রথের দড়িতে হাত রাখার জন্য মানুষের যে আবেগ, তা কেবল অলৌকিক আশীর্বাদের প্রত্যাশা নয়; বরং ঈশ্বরের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে নতুন করে অনুভব করার আকাক্সক্ষা। রথ টানার সময় ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, জাতি-গোত্রের সব বিভাজন যেন মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায়। এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñধর্মের প্রকৃত শক্তি বিভাজনে নয়, মিলনে।

 

বাংলাদেশেও উল্টো রথযাত্রার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। ঢাকার শাঁখারীবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী, দিনাজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোরসহ দেশের নানা প্রান্তে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উল্টো রথ উদ্যাপিত হয়। সাতক্ষীরার বিভিন্ন মন্দির, বিশেষ করে কাটিয়া, আশাশুনি ও আশপাশের এলাকায় এই উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের বিপুল সমাগম ঘটে। বহু স্থানে কয়েক দিনের মেলা বসে। মাটির খেলনা, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, হস্তশিল্প, মিষ্টান্ন, স্থানীয় কৃষিপণ্যÑসব মিলিয়ে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

 

ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতিরও এক প্রাণবন্ত প্রকাশ ঘটে।এই সম্প্রীতির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি আমাদের বহুত্ববাদী সমাজের একটি ইতিবাচক দিক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য বাংলাদেশ বহন করে, উল্টো রথ তারও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। উৎসবের প্রস্তুতিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রথ পরিষ্কার করা হয়, দেবমূর্তিকে নতুন বস্ত্রে সজ্জিত করা হয়, বিশেষ পূজা, আরতি ও ভোগ নিবেদন করা হয়। অনেকে উপবাস পালন করেন, মানত করেন, দান-ধ্যান করেন। ভোর থেকেই ভক্তরা রথ টানার অপেক্ষায় মন্দির প্রাঙ্গণে সমবেত হন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথের দড়িতে স্পর্শ করার মধ্য দিয়ে পুণ্য অর্জন হয়। কিন্তু এই বিশ্বাসের বাইরেও একটি সামাজিক শিক্ষা রয়েছেÑএকটি মহৎ কাজে সবার অংশগ্রহণই সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে।

 

আজকের পৃথিবীতে মানুষের জীবনে গতি বেড়েছে, কিন্তু শান্তি কমেছে। প্রযুক্তি আমাদের হাতে পুরো পৃথিবী এনে দিয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে নিজের পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধুর ভিড়ে প্রকৃত সম্পর্কগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভোগবাদ ও প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি মানুষকে ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। এই বাস্তবতায় উল্টো রথ যেন নতুন করে প্রশ্ন তোলেÑআমরা কোথায় যাচ্ছি? আমাদের এই যাত্রার শেষ গন্তব্য কোথায়? উল্টো রথের মূল দর্শন এখানেই। এটি মানুষকে শেখায়, কেবল সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই জীবন নয়; প্রয়োজন হলে পেছনেও ফিরে তাকাতে হয়।

 

নিজের ভুলকে স্বীকার করতে হয়, শিকড়কে স্মরণ করতে হয়, সম্পর্ককে নতুন করে মূল্য দিতে হয়। যে সমাজ তার ইতিহাস ভুলে যায়, যে মানুষ নিজের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে, সে কখনোই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। তাই প্রত্যাবর্তন মানে পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে আবার নতুন করে এগিয়ে চলা। উল্টো রথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো বিনয়। ঈশ্বর নিজেই যখন মানুষের মাঝে আসেন, আবার সময় হলে নিজ আবাসে ফিরে যান, তখন মানুষেরও উচিত অহংকার ত্যাগ করা।

 

ক্ষমতা, অর্থ কিংবা খ্যাতি কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। স্থায়ী হলো মানুষের কর্ম, মূল্যবোধ এবং মানবিকতা। ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেইÑমানুষকে আরও বিনয়ী, সহনশীল এবং মানবিক করে তোলা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিকতার প্রবল স্রোতে অনেক ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। শহরকেন্দ্রিক জীবন, প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কারণে অনেক তরুণ-তরুণী উল্টো রথের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য সম্পর্কে তেমন জানেন না। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা। অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের দর্শন, সংস্কৃতি ও মানবিক শিক্ষার অমূল্য ভা-ার।

 

এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের সচেতন মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানানো উচিত। স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণা, তথ্যসংরক্ষণ ও প্রকাশনার উদ্যোগও বাড়াতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে।

 

বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্যতম শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। এখানে ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন কিংবা রথযাত্রাÑপ্রতিটি উৎসবই কোনো না কোনোভাবে মানুষের মিলনের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি। কারণ, বিভাজনের পৃথিবীতে সম্প্রীতির প্রতিটি উৎসবই মানবতার জন্য আশার আলো। উল্টো রথ আমাদের আরেকটি গভীর সত্য শেখায়Ñপ্রত্যাবর্তন কখনো পরাজয় নয়। বরং নিজের ভেতরে ফিরে আসাই সবচেয়ে বড় বিজয়। মানুষ যখন নিজের বিবেক, মানবিকতা ও নৈতিকতার কাছে ফিরে আসে, তখনই তার প্রকৃত মুক্তি ঘটে। জগন্নাথদেবের শ্রীমন্দিরে ফিরে আসা তাই কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি প্রতীক হয়ে ওঠে মানুষের আত্মজাগরণের।

 

আজ যখন সমাজ নানা সংকট, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, তখন উল্টো রথের এই দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রয়োজন আরও বেশি মানবিক হওয়া, আরও বেশি সহনশীল হওয়া এবং নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা। কারণ, শিকড় যত শক্তিশালী হবে, ভবিষ্যতের পথচলাও তত দৃঢ় হবে। উল্টো রথ তাই কেবল রথের চাকা ঘোরার উৎসব নয়। এটি মানুষের হৃদয়ের চাকা ঘুরিয়ে দেওয়ার আহ্বান। এটি মনে করিয়ে দেয়Ñযাত্রা যত দীর্ঘই হোক, একদিন না একদিন সবাইকে ফিরে আসতে হয়। সেই ফিরে আসা যদি হয় সত্য, মানবিকতা, আত্মবিশ্বাস এবং ঈশ্বরচেতনার পথে, তবে জীবনই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় তীর্থযাত্রা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট