নিজস্ব প্রতিনিধি: ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের বড় শান্তা গ্রামে ওয়াহিদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম (৩৮) নামের এক ব্যক্তির বাড়ি ভাঙচুর করে তিন দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ওয়াহিদুজ্জামানকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহত ওয়াহিদুজ্জামান সানা মৃত শামছুর রহমান সানার ছেলে।
নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল জানান, সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের গালিগালাজ করেন মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ওই অডিওতে কটূক্তি সংক্রান্ত কথা রয়েছে দাবি করে দেবহাটার ফজলুল হক আমিনী ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ফেসবুকে লাইভ করে জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর ক্ষুব্ধ জনতা ওয়াহিদুজ্জামানের বাড়ির গেট ভাঙচুর করে সুবর্ণাবাদ বাজারে নিয়ে মারধর করে। পরে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে এসে তিনি বিষপান করেন। রাতে তাকে কুলিয়া এলাকায় গ্রাম্য চিকিৎসক এম এ সবুরের চেম্বারে নিয়ে ওয়াশ করানোর পর সুস্থ হয়ে ওঠেন। মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক আমিনীসহ বিক্ষুব্ধরা চিকিৎসাধীন শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে গণপিটুনি দেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এরপর ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি লোক সখীপুর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদুজ্জামানকে দেয়ালে আছাড় মারে এবং বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ফেলে রেখে চলে যায়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মব সৃষ্টির মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নিয়ে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আব্দুল জলিল।
ঘটনার বিষয়ে ফজলুল হক আমিনী বলেন, ধর্ম নিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান দীর্ঘ ছয় মাস ধরে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছিল। ‘তৌহিদী জনতা’ গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করেছে।
নিহতের ছোট ভাই জেলা রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও সুবর্ণাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তাহসিভ রহমান সাগর জানান, তারা পাঁচ ভাই এবং শামীম চতুর্থ। সে মাদ্রাসা থেকে কামেল পাস এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছে। পারিবারিক সমস্যার কারণে সে ১০-১২ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসক ধীরাজ মোহনের কাছে চিকিৎসাধীন ছিল। অসুস্থ অবস্থায় সে কোনো কথা বলে থাকলে তার আইনগত বিচার হতে পারত, কিন্তু এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা অত্যন্ত মর্মান্তিক।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের মনিরুজ্জামান জানান, ওয়াহিদুজ্জামান তার বোনের দেবর। কবর খুঁড়তে ও জানাজা পড়তে দেবে না বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ময়নাতদন্তের পরও লাশ আটকে রাখার আশঙ্কা প্রকাশ করে পরিবার প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা দাবি করেছে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক দীপঙ্কর ম-ল জানান, মঙ্গলবার রাতে ওয়াহিদুজ্জামানকে জরুরি বিভাগে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সদর হাসপাতালের আরাফাত হোসেন জানান, ভারী বস্তু দিয়ে আঘাতের ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম শাহীন জানান, ওয়াহিদুজ্জামানের কিছু অডিও ক্লিপ ভাইরাল হওয়ার পর জনতা উত্তেজিত হয়ে তাকে মারধর করে। পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করার পর পুনরায় হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছিল।