বিচারপ্রার্থী মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, সময় ও অর্থ অপচয় এবং বিচার বিভাগের ওপর ক্রমবর্ধমান মামলাজটের বোঝা লাঘবে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা যে কতটা কার্যকর হতে পারে, তার বাস্তব ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সাতক্ষীরা জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যস্থতার মাধ্যমে ১,৪৬৫টি বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি ১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ভুক্তভোগীদের আদায় করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। লিগ্যাল এইডের এই কার্যকর পদক্ষেপের ফলে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও পারিবারিকÑতিন খাতেই আদালতে নতুন মামলা দায়েরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা নিঃসন্দেহে দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার জন্য এক আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে।
আমাদের দেশের সনাতন বিচারপ্রক্রিয়া প্রায়শই দীর্ঘসূত্রী ও ব্যয়বহুল। ফলে ছোটখাটো বিরোধ বা পারিবারিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে আদালত পর্যন্ত পৌঁছানো মামলাগুলো বিচারপ্রার্থীদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ ডেকে আনে। এই প্রেক্ষাপটে ‘মামলা নয়, সমঝোতার মাধ্যমে ন্যায়বিচার’Ñএই দর্শনকে মূল চালিকাশক্তি করে জেলা লিগ্যাল এইড যে ভূমিকা রাখছে, তা কেবল আইনি সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সামাজিক স্থায়িত্ব ও শান্তি বজায় রাখতেও অমূল্য অবদান রাখছে। বিশেষ করে, জমিজমা বা পারিবারিক ঝগড়াঝাঁটির মতো বিষয়ে সরাসরি মামলা না ঢুকে ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’-সহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আইনের আলোকে আইনি পরামর্শ প্রদান এবং বিকল্প সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া বিচারপ্রার্থীদের অযাচিত হয়রানি থেকে রক্ষা করছে।
তবে মুদ্রার অপর পিঠও উপেক্ষার সুযোগ নেই। সীমিত সম্পদ ও কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই এ সাফল্য অর্জিত হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো বেঞ্চ সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর ও অফিস সহায়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ১১টি শূন্য পদ রয়েছে। স্পেশাল মিডিয়েটর বা বিশেষ মধ্যস্থতাকারীর অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি নিজস্ব ভবনের অনুপস্থিতি ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের সংকট তাদের সার্বিক কর্মক্ষমতাকে পূর্ণতায় পৌঁছাতে বাঁধা দিচ্ছে। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনে সাময়িক স্থান বরাদ্দ কিংবা নিজস্ব ভবনের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির এই সাফল্যকে একটি সাময়িক অর্জনে সীমাবদ্ধ না রেখে টেকসই কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো প্রয়োজন। এর জন্য লিগ্যাল এইড অফিসের বিদ্যমান জনবল ও অবকাঠামোগত ঘাটতিগুলো জরুরি ভিত্তিতে দূর করতে হবে। একই সঙ্গে স্পেশাল মিডিয়েটর নিয়োগ এবং প্রযুক্তি সুবিধা জোরদার করা গেলে জেলা পর্যায়ে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। সাতক্ষীরার এই সফল মডেলটি যদি দেশজুড়ে যথাযথভাবে বিস্তৃত করা যায়, তবে তা কেবল আদালতগুলোর মামলাজটই কমাবে না, বরং সাধারণ মানুষের মাঝেও সমঝোতা ও দ্রুত আইনি সুফল পাওয়ার বিশ্বাস তৈরি করবে।