মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

রাষ্ট্র-পুনর্গঠনের অভিযাত্রা: তারেক রহমান ও বিএনপির প্রস্তাবিত কর্মসূচীর প্রাসঙ্গিকতা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫২ অপরাহ্ণ
রাষ্ট্র-পুনর্গঠনের অভিযাত্রা: তারেক রহমান ও বিএনপির প্রস্তাবিত কর্মসূচীর প্রাসঙ্গিকতা

এড. সৈয়দ ইফতেখার আলী

যেকোনো স্বাধীন জাতির ইতিহাসে কিছু সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মুহূর্ত তৈরি হয়, যা রাষ্ট্রের বিদ্যমান সার্বভৌম শক্তি এবং রাজনৈতিক সমাজভাবনাকে মৌলিকভাবে পুনর্সংজ্ঞায়িত করে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিবর্তনের ধারায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তেমনি দুটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি ঘটনার সময়কাল, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং দৃশ্যমান শত্রু ভিন্ন বলে মনে হলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই দুই অভূতপূর্ব নাগরিক জাগরণ মূলত একই আদর্শিক ও রাজনৈতিক সুতোয় গাঁথা। আর এই দুই ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্যবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ এবং রূপান্তরকালীন রাষ্ট্র পুনর্গঠনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তারেক রহমানের প্রস্তাবিত কর্মসূচি এক অপরিহার্য ও দূরদর্শী অনুঘটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের মূল তত্ত্বগত ভিত্তি লুকিয়ে ছিল ‘জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ এবং একটি সাম্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষায়। তৎকালীন পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী যেভাবে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও মৌলিক নাগরিক অধিকার নস্যাৎ করেছিল, তার বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ জীবনপণ সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক ‘সামাজিক চুক্তি’ স্বাক্ষরের অঙ্গীকার, যার মূল স্তম্ভ ছিল-সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। কিন্তু স্বাধীন্যোত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় এবং বিশেষ করে গত দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সেই একাত্তরের মূল চেতনার চরম বিচ্যুতি ঘটে। গণতান্ত্রিক ব্যাকস্লাইডিং, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অতি-রাজনীতিায়ন এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছিল।

এই প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও নাগরিক অধিকার হরণের প্রেক্ষাপটেই সূচনা ঘটে ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের। একাত্তরে যেমন পাকিস্তান রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষ গর্জে উঠেছিল, ঠিক তেমনি ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা রাষ্ট্রযন্ত্রের একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী তার প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা ((Institutional Legitimacy)  হারিয়ে কেবল ভয় ও নিপীড়নের মাধ্যমে শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখে, তখন নাগরিক সমাজের চরম প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান ছিল সেই ঐতিহাসিক প্রতিরোধেরই প্রস্ফুটিত রূপ। সুতরাং, ২৪-এর অভ্যুত্থান হলো একাত্তরের মূল আকাক্সক্ষাকে উদ্ধার করার একটি ‘দ্বিতীয় প্রাতিষ্ঠানিক মুক্তিসংগ্রাম’।

এই দুটি ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সেতু তৈরি করার ক্ষেত্রে তারেক রহমান এবং বিএনপির নীতিগত প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানÑউভয় আন্দোলনের মূল নির্যাস ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সাম্যভিত্তিক সমাজ নির্মাণ। তারেক রহমান তাঁর উপস্থাপিত ‘৩১ দফা’ রূপরেখার মাধ্যমে একাত্তরের মূল চেতনা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের জনদাবিকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে রূপান্তর করার চেষ্টা করেছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি অভ্যুত্থান তখনই স্থায়ী সুফল বয়ে আনে যখন তা প্রাতিষ্ঠানিক ডেমোক্রেটাইজেশনে রূপ নেয়। তারেক রহমান ও বিএনপির ৩১ দফা-একাত্তরের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা এবং ২৪-এর স্বৈরাচারবিরোধী দাবিরই এক আধুনিক রাষ্ট্রীয় সংশ্লেষণ। একাত্তরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেভাবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর মাধ্যমে একটি বিভাজিত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, তারেক রহমান সেই দর্শনকেই আধুনিক ‘সিভিক ন্যাশনালিজম’ বা নাগরিক জাতীয়তাবাদে রূপান্তর করে ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনাÑ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বে এক নজিরবিহীন যুগসন্ধিক্ষণের সূচনা করেছে। এই অভ্যুত্থান কেবল একজন ব্যক্তির পতন বা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার অপসারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে গড়ে ওঠা একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন, গণতান্ত্রিক ব্যাকস্লাইডিং এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অতি-রাজনীতায়নের বিরুদ্ধে জনগণের চরম ক্ষোভের বিস্ফোরণ।

বাংলাদেশের প্রথাবদ্ধ রাজনীতিতে রাজনৈতিক রূপান্তর বা ‘প্যারাডাইম শিফট’ খুব কমই নীতিগত ও কাঠামোগত বিতর্কের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটায়নি, বরং তা রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও সংবিধানের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের মূল ভিত্তিগুলো ভেঙে নতুন করে চিন্তা করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, একে একটি স্পষ্ট সংবিধান পুনর্গঠনের মুহূর্ত বলা চলে, যেখানে পুরোনো ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে, আন্দোলন-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রস্তাবিত কর্মসূচি ও রাষ্ট্রচিন্তা কীভাবে মেলাচ্ছেÑতা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিপরীতে নাগরিক কেন্দ্রিক এক নতুন জাতীয়তাবাদের উত্থান। দীর্ঘ ১৫ বছরের একনায়কত্বে রাষ্ট্রযন্ত্রকে যে পন্থায় ব্যবহার করে বিরোধী মত দমন করা হয়েছিল, তাতে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পরে একটি বড় ধরনের ‘পদ্ধতিগত প্রতিশোধ’ বা প্রতিহিংসার রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে আমরা ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ বা সংক্রামক ন্যায়বিচার বলি, সেখানে তারেক রহমান এক বিপরীতমুখী ও প্রাজ্ঞ রাজনীতির উদাহারণ স্থাপন করেছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন যে, বিএনপির কাছে ‘প্রতিশোধ’ মানে কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলীয় প্রতিশোধ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সফল বাস্তবায়নই হবে ফ্যাসিবাদের ওপর প্রকৃত রাজনৈতিক বিজয়। এই রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনীতির ইতিহাস থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ডেমোক্রেটাইজেশন বা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যে জটিল প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়Ñরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রীভবন প্রতিরোধ করা। এই ক্রান্তিলগ্নে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অর্ন্তর্বতীকালীন সরকার এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রস্তাবিত রূপরেখাÑবিশেষ করে তাঁর উপস্থাপিত ‘৩১ দফা’Ñরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিন্যাসে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অভ্যুত্থান-উত্তর প্রথম পর্বে অর্ন্তর্বতীকালীন সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠনে বেশ কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সফলতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা, অর্থনৈতিক খাত ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অলিগার্কিক চক্র থেকে মুক্ত করার প্রাথমিক প্রয়াস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা পুনরুদ্ধারÑড. ইউনূসের সরকারের অন্যতম অর্জন হিসেবে গণ্য করা যায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, সংস্কার কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যায়াম নয়; এর জন্য প্রয়োজন জেনুইন পলিটিক্যাল লেজিটিমেসি বা রাজনৈতিক বৈধতা। একটি অনির্বাচিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত রূপান্তর বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়, কারণ গণসম্মতি ব্যতিরেকে প্রণীত সংস্কার নীতি প্রায়শই ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের আমলে স্থায়িত্বের সংকটে পড়ে।

ইউনূস সরকারের অন্যতম প্রধান ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা এখানেই দৃশ্যমানÑরাজনৈতিক অংশীজনদের সাথে কৌশলগত বোঝাপড়া এবং একটি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরিতে তারা কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরিচয় দিয়েছিল। আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে বিলম্ব এবং অর্থনৈতিক সামষ্টিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে না পারা তাদের প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছিল। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই তারেক রহমানের উদ্ভাবিত ‘৩১ দফা’ রূপরেখার গুরুত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। একটি গণঅভ্যুত্থান তখনই সফল রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যখন বিপ্লবোত্তর উচ্ছ্বাসকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে রূপান্তরিত করা যায়।

 

তারেক রহমান প্রস্তাবিত কর্মসূচীতে এই পরিবর্তনের একটি আধুনিক কাঠামোগত বিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন, দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গঠন এবং বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার প্রস্তাবনা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে সুশীল সমাজ, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও দলনিরপেক্ষ চিন্তাবিদদের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি হবে, যা গণতন্ত্রের গুণগত মান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

 

এছাড়া নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের জোর দাবি, মুক্ত গণমাধ্যম এবং মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা সুসংহত করার প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করে যে, দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক স্থায়িত্ব কেবল নির্বাচনী ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের ওপরই নির্ভরশীল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি কার্যকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাজনৈতিক শাসনকাঠামোর সংস্কারই যথেষ্ট নয়, বরং এর পাশাপাশি প্রয়োজন ‘সোশ্যাল কনট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির নবায়ন।

তারেক রহমানের কর্মসূচীতে কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথাই বলা হয়নি, বরং একটি টেকসই কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনেরও বিশদ পরিকল্পনা রূপায়ন করা হয়েছে। বাজার ব্যবস্থার অনিয়ম, মেগা-প্রজেক্ট নির্ভর দুর্নীতির মডেল এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণের ফলে সাধারণ মানুষ যে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। তারেক রহমান প্রস্তাবিত যুব সমাজের জন্য বেকার ভাতা, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কার্ড এবং স্বাস্থ্য খাতের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি জনকল্যাণমূলক ফ্রেমওয়ার্ক নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

 

এটি রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সাথে সামাজিক-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের একটি সুষম সংমিশ্রণ ঘটাতে চায়। তদুপরি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নির্মাণ। তারেক রহমান যেভাবে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণাকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক জাতীয়তাবাদ বা ‘সিভিক ন্যাশনালিজম’-এ পুনর্বিন্যাস করার প্রয়াস পেয়েছেন, তা জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ধর্মীয়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সকল নাগরিককে সমান রাষ্ট্রীয় অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদানের যে অঙ্গীকার বিএনপির নীতিমালায় উঠে এসেছে, তা সমাজে বিদ্যমান মেরুকরণ দূরীকরণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এটি স্পষ্ট যে, জুলাই অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করছে একটি জবাবদিহিতামূলক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর। ইউনূস সরকারের সংস্কারমূলক সূচনার সাথে তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিএনপির প্রস্তাবিত রাষ্ট্র-পুনর্গঠনের কর্মসূচীর সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হবে। তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ৩১ দফা কোনো সাময়িক রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুণগত রূপান্তর এবং একটি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্লুপ্রিন্ট। এই কর্মসূচিগুলোর সফল ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়নই পারে ২৪-এর ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে।

এড. সৈয়দ ইফতেখার আলী, সাবেক আহবায়ক, সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় প্রকাশনা উৎসব ও কাব্য আবৃত্তির সাহিত্যসন্ধ্যা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় প্রকাশনা উৎসব ও কাব্য আবৃত্তির সাহিত্যসন্ধ্যা

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরায় বর্ণাঢ্য প্রকাশনা উৎসব, গল্পপাঠ, কবিতা আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে এক সাহিত্যসন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে কাব্যতীর প্রকাশনী, বিশ্বভরা প্রাণ ও প্রথম আলো বন্ধুসভা সাতক্ষীরার যৌথ আয়োজনে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে এবং কবি শিরিন সাদীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যশোর এম এম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল হাশেম, সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর বাসুদেব বসু, যশোর সরকারি সার্ভে ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. এম এম নজমুল হক, অধ্যক্ষ আশেক-ই এলাহি, জেলা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি শহীদুর রহমান, লেখক ও সম্পাদক কবি সৌহার্দ সিরাজ, অধ্যাপক কবি শুভ্র আহমেদ এবং সুরকার ও বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী আবু আফ্ফান রোজবাবু।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির প্রয়াত গুণিজনদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর গল্পগ্রন্থ ‘মাটির আর্তনাদ’, ‘গল্পপুঞ্জ’, কাব্যগ্রন্থ ‘শহর ছেড়ে শান্তিপুরে’, ‘সুতোয় বোনা কবিতা’, ‘কাব্যপুঞ্জ’, ‘কাব্যলিপি’, ‘হৃদয় পত্র’, ‘মেঘের খামে কবিতা’, ‘বুনো বাতাসের কবিতা’ এবং কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

অনুষ্ঠানে লেখক শেখ সিদ্দিকুর রহমান, মৃত্যুঞ্জয় কুমার বিশ্বাস ও শেখ মনিরুল ইসলামের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করা হয়। রাইন চৌধুরীর নেতৃত্বে সব্যসাচী আবৃত্তি পরিষদের শিশুরা, দিলরুবা রুবী ও কাব্য সাদী অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন।
আলোচনা পর্বে শিক্ষাবিদ ড. মিজানুর রহমান জানান, একসঙ্গে এতগুলো কাব্যগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব সাতক্ষীরাবাসীর জন্য গৌরবের। অন্যান্য বক্তারাও নতুন লেখকদের সাহিত্যচর্চার প্রতি শুভকামনা ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধারার শতাধিক কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মী উপস্থিত ছিলেন।

কলারোয়ায় মিথ্যা মামলায় ভ্যানচালক পরিবারসহ এলাকাছাড়া, বিচারের দাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ণ
কলারোয়ায় মিথ্যা মামলায় ভ্যানচালক পরিবারসহ এলাকাছাড়া, বিচারের দাবি

কলারোয়া প্রতিনিধি: কলারোয়ায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মানিকনগর গ্রামের শামছুল গাজীর ছেলে জিয়ারুল গাজী (৫০) নামে এক হতদরিদ্র ভ্যানচালক ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হয়রানীমূলক মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর থেকে মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, মামলার বাদী আব্দুর রশিদ গাজীর মেয়ে ফাতেমা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে জিয়ারুলদের জমি দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে এই মামলা করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে মারামারি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে ফাতেমা খাতুন মামলাটি করেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানান, নিরাপত্তাহীনতার কারণে আসামিরা সাত মাস আগেই উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের খোর্দ গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করেছেন। ঘটনার দিন তাঁরা এলাকায় ছিলেন না। কম মূল্যে জমি বিক্রি না করায় ক্ষিপ্ত হয়ে এই মিথ্যা মামলা করা হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও হয়রানি বন্ধসহ দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

মামলার সাক্ষী খোর্দ বাটরা গ্রামের বাসিন্দা কিনা মজুমদার এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে মামলার বাদী ফাতেমা খাতুন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রতিবন্ধী স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে রওশন শেখের যাবজ্জীবন, ১ লাখ টাকা জরিমানা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৯ অপরাহ্ণ
প্রতিবন্ধী স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে রওশন শেখের যাবজ্জীবন, ১ লাখ টাকা জরিমানা

শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের রায়
বদিউজ্জামান: সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা উপজেলায় শারীরিক প্রতিবন্ধী সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে রওশন শেখ (৫৭) নামে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদ- দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সাতক্ষীরার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবু বক্কর সিদ্দিক প্রকাশ্য আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি রওশন শেখ আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, পাটকেলঘাটার গণেশপুর গ্রামের ভ্যানচালক কামরুল শেখের ১৩ বছর বয়সী শারীরিক প্রতিবন্ধী কন্যা খলিশখালী উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। স্কুলে যাতায়াতের পথে আসামি বিভিন্ন সময় খাবার দেওয়ার কথা বলে ওই শিশুর সঙ্গে অনৈতিক আচরণের চেষ্টা করত বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
২০২৫ সালের ২২ মে বিকেলে প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়ি ফেরার পথে আসামি ৫ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই শিশুকে তার মুদি দোকানের পেছনে একটি পরিত্যক্ত মুরগির ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। পরে বাড়িতে ফিরে শিশুটি তার মাকে বিষয়টি জানালে পরিবারের পক্ষ থেকে পাটকেলঘাটা থানায় মামলা করা হয়।
মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচারকালে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পিপি শেখ আলমগীর আশরাফ।

মামলার নথি অনুযায়ী, আসামি ঘটনার বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। অপরদিকে ভুক্তভোগী শিশুর বক্তব্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রেকর্ড করা হয়।

আদালত সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা, নথিপত্র ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে মর্মে সিদ্ধান্তে পৌঁছে রওশন শেখকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ও ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাকে আরও ৬ মাসের কারাদ- ভোগ করতে হবে।