সাতক্ষীরা ২০৩৫: তরুণদের হাতে নতুন অর্থনীতি
মো. মামুন হাসান
একটি জেলার ভবিষ্যৎ কী দিয়ে তৈরি হয়? সেতু, সড়ক, শিল্পকারখানা আর বড় বড় অবকাঠামো দিয়ে? অবশ্যই এগুলো প্রয়োজন। কিন্তু ২০৩৫ সালের সাতক্ষীরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়তো ইট পাথরের হবে না। হবে দক্ষ, সৃজনশীল ও উদ্যোক্তা তরুণদের একটি প্রজন্ম।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন কর্মসংস্থান। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করেছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ, কিন্তু নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ। অর্থাৎ শ্রমবাজারে প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক তরুণ পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়নি।এই বাস্তবতায় সাতক্ষীরার উন্নয়ন পরিকল্পনাকে শুধু চাকরির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন এমন একটি স্থানীয় অর্থনীতি, যেখানে তরুণরা চাকরি খোঁজার পাশাপাশি নিজেরাই কাজ তৈরি করবে।সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তার বৈচিত্র্য। সুন্দরবন, উপকূল, নদী, চিংড়ি, কৃষি, সীমান্ত বাণিজ্য, গ্রামীণ জীবন, লোকসংস্কৃতি এবং ভোমরা স্থলবন্দর এক জেলার ভেতরেই রয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এসবকে বিচ্ছিন্ন সম্পদ হিসেবে দেখব, নাকি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত করব?
সাত উপজেলা, সাত অর্থনৈতিক পরিচয়
২০৩৫ সালের পরিকল্পনায় সাতক্ষীরার সাত উপজেলাকে একইভাবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিটি উপজেলার নিজস্ব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি পরস্পর সংযুক্ত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে।
শ্যামনগর হতে পারে প্রকৃতি ও জলবায়ু পর্যটনের কেন্দ্র: সুন্দরবন, উপকূল, নদী ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে হোমস্টে, স্থানীয় খাবার, নৌভ্রমণ, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও প্রশিক্ষিত পর্যটন গাইডের বাজার তৈরি করা যায়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন পর্যটন, যেখানে পর্যটকের ব্যয়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়। সুন্দরবন সংরক্ষণ ও স্থানীয় জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও এই মডেলের শর্ত।
আশাশুনি হতে পারে জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতির পরীক্ষাগার: লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতাকে শুধু দুর্যোগ হিসেবে না দেখে লবণসহিষ্ণু কৃষি, নিরাপদ পানি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌরশক্তি, বিকল্প জীবিকা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের কেন্দ্র করা যেতে পারে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জীবিকা তৈরিতে দক্ষতা, উদ্যোক্তা সহায়তা ও অর্থায়ন একসঙ্গে দেওয়ার মডেল এখন বাংলাদেশে উন্নয়ন কার্যক্রমেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কালীগঞ্জ হতে পারে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র: কৃষিপণ্য কাঁচা অবস্থায় বিক্রি না করে সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে মূল্য বাড়াতে হবে। স্থানীয় তরুণদের খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল বিপণন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে কৃষির সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান যুক্ত হবে।
তালা হতে পারে কৃষি ও গ্রামীণ পর্যটনের পরীক্ষাক্ষেত্র:- একটি কৃষিখামার শুধু উৎপাদনের স্থান নয়, পর্যটকের অভিজ্ঞতার জায়গাও হতে পারে। স্থানীয় খাবার, মাছ, কৃষিকাজ, জলাভূমি ও গ্রামীণ জীবনকে কেন্দ্র করে ছোট পরিসরে কৃষি পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব। এর সঙ্গে স্থানীয় নারী ও তরুণদের যুক্ত করা গেলে আয় ছড়িয়ে পড়বে পরিবার পর্যন্ত।
কলারোয়া হতে পারে সীমান্তভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্র:- সীমান্ত বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সেবা যেমন পরিবহন, প্যাকেজিং, গুদাম ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, খাদ্যসেবা ও ডিজিটাল বাণিজ্যে স্থানীয় তরুণদের দক্ষ করে তোলা দরকার। এতে সীমান্তের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের একটি অংশ স্থানীয় দক্ষ জনবলের হাতে থাকবে।
দেবহাটা হতে পারে নদী, সীমান্ত ও প্রকৃতি পর্যটনের সংযোগস্থল:- স্থানীয় নদী ও গ্রামীণ পরিবেশকে কেন্দ্র করে ছোট পর্যটন করিডর, হোমস্টে, স্থানীয় খাবার ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা তৈরি করা যেতে পারে। দেবহাটা ও সদরকে সংযুক্ত করে একটি পরীক্ষামূলক পর্যটন রুটও তৈরি করা সম্ভব।
সাতক্ষীরা সদর হতে পারে জ্ঞান ও ডিজিটাল অর্থনীতির কেন্দ্র:- জেলার তরুণদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বিপণন, ইংরেজি যোগাযোগ, ফ্রিল্যান্সিং, গ্রাফিকস, ভিডিও নির্মাণ, পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও অনলাইন ব্যবসার প্রশিক্ষণ এখানে কেন্দ্রীভূত করা যেতে পারে। ফলে তরুণকে কাজের জন্য ঢাকায় যাওয়ার পাশাপাশি সাতক্ষীরায় বসেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
কাগজে পরিকল্পনা নয়, ১০ বছরের কর্মসূচি
সাতক্ষীরা ২০৩৫ বাস্তবায়নের জন্য নতুন কোনো বিশাল প্রকল্পের আগে একটি জেলা তরুণ অর্থনীতি কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রতিটি উপজেলায় অর্থনৈতিক সম্পদের একটি ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। কোথায় কী কৃষিপণ্য, কোথায় কী পর্যটন সম্পদ, কোথায় কী দক্ষতা, কোথায় কী ক্ষুদ্র শিল্প, কোথায় কী বাজার, তার তথ্য একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে রাখতে হবে।২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ হবে চাকরির পরীক্ষার জন্য নয়, স্থানীয় বাজারের জন্য। পর্যটন এলাকায় পর্যটন দক্ষতা, কৃষি এলাকায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সীমান্ত এলাকায় লজিস্টিকস এবং শহরকেন্দ্রিক এলাকায় ডিজিটাল দক্ষতা।
২০২৯ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ, স্টার্টআপ সহায়তা, ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং বাজার সংযোগ একসঙ্গে দিতে হবে। শুধু ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি হয় না। প্রশিক্ষণ, মূলধন, পরামর্শ এবং বাজার চারটিকেই একসঙ্গে দিতে হয়। বাংলাদেশের রেইজ প্রকল্পে প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও অর্থায়ন একত্রে দেওয়ার ফলে অংশগ্রহণকারীদের কর্মসংস্থানের ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
২০৩২ থেকে ২০৩৫ হবে সম্প্রসারণের সময়। স্থানীয় সফল উদ্যোগগুলোকে জাতীয় বাজারে নেওয়া, পর্যটন ব্র্যান্ড তৈরি, রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি এবং ডিজিটাল সেবা বিদেশে বিক্রির দিকে যেতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হবে নতুন হাতিয়ার
২০৩৫ সালের অর্থনীতির পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে লাভ নেই। সাতক্ষীরার বাস্তব সমস্যায় প্রযুক্তির ব্যবহার শেখাতে হবে। কৃষক বাজার ও আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণে প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন। পর্যটন উদ্যোক্তা বিদেশি পর্যটকের জন্য বহুভাষিক প্রচারণা তৈরি করবেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসাব ও বাজার বিশ্লেষণ করবেন। শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত শিক্ষার সহায়ক হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করবে।অর্থাৎ প্রযুক্তি হবে স্থানীয় অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার হাতিয়ার।
সবচেয়ে জরুরি বিনিয়োগ তরুণদের মধ্যে
বাংলাদেশে তরুণদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি ও দক্ষতা এবং চাকরির চাহিদার অমিল একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। সাতক্ষীরার জন্য তাই প্রশ্নটি শুধু কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো, তা নয়। প্রশিক্ষণের ছয় মাস পর কতজন কাজ পেল, এক বছর পর কতজন আয় করছে, কতজন উদ্যোক্তা হয়েছে, কতজন অন্যকে কাজ দিয়েছে, সেটিই হতে হবে সাফল্যের মাপকাঠি। এখানেই আমাদের প্রচলিত প্রকল্প চিন্তার পরিবর্তন দরকার। একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাফল্য হবে না কতজন সনদ পেল। সাফল্য হবে কতজনের আয় বাড়ল।একটি পর্যটন প্রকল্পের সাফল্য হবে না কতজন পর্যটক এলো। সাফল্য হবে স্থানীয় মানুষের আয় কত বাড়ল এবং পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল।একটি উদ্যোক্তা প্রকল্পের সাফল্য হবে না কতজন ঋণ পেল। সাফল্য হবে কতটি ব্যবসা টিকে থাকল।
২০৩৫ সালের সাতক্ষীরা
কল্পনা করা যাক, ২০৩৫ সালের একটি সকাল। শ্যামনগরের একজন তরুণ সুন্দরবন ভ্রমণ পরিচালনা করছেন। সদর উপজেলার একজন তরুণ অনলাইনে তার ব্যবসার বিপণন করছেন। তালার একটি পরিবার কৃষি পর্যটন থেকে আয় করছে। কালীগঞ্জের একটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বাজারে বিক্রি করছে। কলারোয়ার একজন তরুণ সীমান্ত বাণিজ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন। আশাশুনির একজন উদ্যোক্তা জলবায়ু সহনশীল কৃষি নিয়ে ব্যবসা করছেন। দেবহাটার তরুণেরা নদী ও প্রকৃতি পর্যটন পরিচালনা করছেন।এটি কোনো কল্পবিলাস নয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, স্থানীয় নেতৃত্ব, দক্ষতা উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং তরুণদের উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া।
সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ শুধু কতটি নতুন রাস্তা হলো, তা দিয়ে মাপা যাবে না। মাপতে হবে কতজন তরুণ দক্ষ হলো, কতটি নতুন ব্যবসা তৈরি হলো, কত পরিবার পর্যটন অর্থনীতিতে যুক্ত হলো, কত স্থানীয় পণ্য ব্র্যান্ড হলো এবং কত তরুণ সাতক্ষীরায় বসে বৈশ্বিক বাজারে কাজ করল।একটি জেলার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মাটির নিচে নয়, মানুষের দক্ষতার মধ্যে থাকে।
তাই সাতক্ষীরা ২০৩৫ কোনো কল্পিত ভবিষ্যতের নাম নয়। এটি হতে পারে আজ থেকেই শুরু করা একটি বাস্তব কর্মসূচির নাম।যেখানে সুন্দরবন হবে সংরক্ষণ ও জীবিকার সেতু, উপকূল হবে জলবায়ু উদ্ভাবনের পরীক্ষাগার, ভোমরা হবে বাণিজ্যের দরজা, উপজেলা হবে অর্থনৈতিক বিশেষায়নের কেন্দ্র এবং তরুণেরা হবে সেই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।সাতক্ষীরা ২০৩৫ এর সবচেয়ে বড় অবকাঠামো হবে দক্ষ তরুণ। আর সেই অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে এখনই। লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা












