সৃষ্টিশীল মানুষ তৈরী করাই হোক শিক্ষার প্রাথমিক লক্ষ্য
বাবুল চন্দ্র সূত্রধর
সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, এ নিয়ে সর্বত্রই নানা ধরনের আলোচনা চলছে । পাশের হার, জিপিএ, শিক্ষাক্রম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের মান, শিক্ষার্থীর মেধা- কত ধরনের আলোচনা যে হচ্ছে, এর কোন ইয়ত্তা নেই। যারা ভাল ফলাফল করেছে তারা পক্ষে আবার যারা খারাপ ফলাফল করেছে তারা নানা ধরনের নেতিবাচক বিষয় তুলে ধরছে। এমনকি, একটি প্রতিষ্ঠানের খুব ভাল ফলাফল র্কর্তৃপক্ষের নিকট ‘অস্বাভাবিক’ মনে হওয়ায় কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। যারা কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করেছে, তাদের মান বা স্বচ্ছতা নিয়েও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক তথ্য বা মন্তব্য পাওয়া যায়।
আবার, বিগত কয়েক মাস ধরে শিক্ষানীতি নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। পাঠ্যসূচীতে কি কি বিষয় নতুনভাবে যুক্ত হতে পারে, কি কি বিষয় চলমান পাঠ্যসূচী থেকে বাদ পড়তে পারে, পরীক্ষা পদ্ধতি কেমন হতে পারে ইত্যাদি নানা বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এসব আলোচনা বা সমালোচনার একট বড় অংশে পরিলক্ষিত হয় বস্তগত হিসাব-নিকাশ, কর্মক্ষেত্রের উপযোগিতা, আর্থিক উন্নয়ন, সামাজিক মর্যাদা এবং অনুরূপ আরোও অনেক কিছু। অর্থাৎ, জীবনের প্রতিষ্ঠা বলতে সাধারণ বিচারে যা আসে তার সমাহারকেই ধরা হয় শিক্ষা লাভের আসল উদ্দেশ্য হিসেবে। তবে যেহেতু শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, তাই বস্তুগত বিষয়াদি সাথে আরোও কিছু উপাদান বিবেচনায় চলেই আসে। এখানে সেসব উপাদানের কথাই বলা হচ্ছে যেগুলো একজন শিক্ষার্থীর আদর্শিক চেতনা তথা বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা ও চিন্তাচেতনাকে সুসমৃদ্ধ করে থাকে। নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে কোন কোন লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, সেটা সময়মত বুঝা যাবে।
শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যসূচী নিয়ে কিছু কথা না বললেই হয না। বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণীতে যে পাঠক্রম চালু রয়েছে তা বহন করার ক্ষমতা শিক্ষার্থীর নেই, একথা বলাই বাহুল্য। এর একটি সাক্ষাৎ প্রমাণ হচ্ছে কোচিং সেন্টারের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। নগর বা শহরাঞ্চল তো বটেই, গ্রামে পর্যন্ত কোচিং সেন্টারের রমরমা বাণিজ্য চলছে। এ জন্য কি কোচিং সেন্টারের উদ্যোক্তারাদেরকে দায়ী করা যায়? আমার জবাব হচ্ছে ‘না’। আমাদের দেখতে হবে উদ্যোক্তাদের এহেন পরিবেশ তৈরী করে দিল কে, কারা ও কিভাবে?
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর ভাল ফলাফল মানেই আগে গৃহশিক্ষক এবং/ অথবা কোচিং, বিদ্যালয় পরের ভাবনা। আর উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বারে প্রবেশমাত্রই বিষয়ভিত্তিক আলাদা আলাদা শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান। কোচিং-সংস্কৃতির এক প্রধান বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঐ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। আবার, শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরুর প্রথম দিকেই বিষয়ভিত্তিক গাইড বই কেনার জন্য শিক্ষকরা পরামর্শ ও তাগিদ দিয়ে থাকেন। একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর টেবিলের বইয়ের স্তুপ দেখলে আমি কিছৃটা ভয়ই পেয়ে যাই। এভাবে ছাত্রদেরকে অসহায় ও পরনির্ভর করে তোলা হচ্ছে; তাদের সৃষ্টিশীল মেধায় অঙ্কুরেই কুঠারাঘাত করা হচ্ছে। তাদের আত্মোপলব্ধি, উদ্ভাবনী চিন্তা, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত বাস্তব জ্ঞান- এগুলো বিকশিত হওয়ার পথ সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ছে।
সহজ কথায়, শিক্ষা ব্যবস্থাকে দেখতে হবে একটি সর্বাত্মক প্রপঞ্চ হিসেবে। কর্মসংস্থান ভাল হোক, তার চেয়েও ভাল হোক শিক্ষার্থীর নৈতিক আদর্শের ভিত। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শিক্ষাসূচীকে করে তুলতে হবে জীবনমুখী। নিজের সমাজ ও সর্ংস্কৃতিতে শিক্ষার্থীরা সচরাচর যা দেখে এবং যা যেভাবে দেখা উচিৎ, তার ওপর ভিত্তি করেই পাঠদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এজন্যই তো প্রখ্যাত ফরাসী সমাজ-দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো বলেছেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুর সহজাত প্রবৃত্তির বিকাশ সাধন’। সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে বিকশিত সহজাত প্রবৃত্তি সর্বদাই মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলে, কাজ করে।
পাঠ্যসূচী কখনো মানুষের জীবনের সার্বিক দিক অন্তর্ভৃক্ত করতে পারে না। এসএসসি’র বর্তমান কোর্সগুলোকে যদি দ্বিগুণ বা ত্রিগুণও করা হয়, তবুও শিক্ষার্থীর জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক শিক্ষা বাকী থেকে যাবে। অশিক্ষিত গৃহবাসীকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য কোন প্রশিক্ষণ নিতে হয় না। কোন বোতাম কিভাবে টিপলে কি ফল হবে এটি সে আপনা থেকেই শিখে ফেলে। একজন শিক্ষার্থী যাতে সহজাতভাবে ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার উপযুক্ত পরিবেশ পেতে পারে, সেরূপ ক্ষেত্র প্রস্তুত করা জরুরী। শিক্ষার্থী যেন কোনোভাবেই নিজেকে পরনির্ভর বা অসহায় মনে না করে, সে বিষয়টিও গুরুতে¦র সাথে ভাবা দরকার। স্বাধীন চিন্তা থেকেই আসে সৃষ্টিশীলতা ও দায়িত্ববোধ, যা শিক্ষার্থীকে সামাজিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে তুলতে পারে। বাবুল চন্দ্র সূত্রধর, মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক












