স্বচ্ছ সমাজের প্রত্যাশায়
নাসরিন সুলতানা
রাষ্ট্র আজ সন্তানদের নিয়ে বিব্রত, চিন্তিত ও অসহায়ত্বের কবলে পড়েছে। কিন্তু আমরা কি উপলব্ধি করছি এ সবের জন্য সবার আগে পরিবারই সবকিছুর জন্য দায়ী। বাবা মায়ের ভুমিকা কি সেটা আগে জানতে ও বুঝতে হবে।বাবা মা কে হতে হবে সৎ ও উন্নত চিন্তার অধিকারী। সন্তানদের আমরা এ্যাকাডেমিক বই ছাড়া কোন সাহিত্য, ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতি, বৈজ্ঞানিক, কল্পকাহিনী বা ইতিহাস পড়তে উৎসাহিত করছি কি? বরং অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে ভাবছি সন্তানকে উন্নত জীবন উপহার দিতে পারছি। তাকে বাইক, ফোন ,প্রচুর হাত খরচের টাকা, নিত্য পোশাক, বাহিরের নামীদামী হোটেলের খাবার সরবরাহ করে ভাবছি সমাজে আমাদের ও সন্তানের একটা পরিচিতি ও মর্যাদা গড়ে উঠছে। ফেসবুকে এই আমরা বাবা-মায়েরা এসবের ছবি পোস্ট করে জানান দিচ্ছি আমার টাকা আছে, আমার বড় ব্যবসা আছে,আমি বড় পোষ্টে চাকরি করছি। এসব দেখে সন্তানরাও ঠিক একই মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে। সে বাবা মায়ের টাকা নিয়ে বন্ধুদের মাঝে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করে যা অন্য হত দরিদ্র বন্ধুদের মাঝে ঈর্ষার জন্ম দিচ্ছে আর তাদের মাঝে অজান্তেই বৈরিতার সৃষ্টি হচ্ছে।অভিবাবকরাই সন্তানের মাঝে এ বোধ সৃষ্টি করতে পারছে না যে সবাই মানুষ। মানুষ মানেই সহমর্মিতা, মানুষ মানেই মানবিকতা, মানুষ মানেই মানুষ সহ এ পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকে ভালোবাসা আর মানুষ মানেই কেবল ভোগ না। নিজের যা কিছু আছে তা দেখানোর নয় বরং তা স্বাভাবিক জীবনের একটা অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। সন্তানদের মাঝে আমরা এটা সৃষ্টি করতে পারছি না আমাদের যা কিছু আছে তার একটা অংশের দাবিদার আমাদের আশেপাশের অনেকেই যারা দুর্ভাগ্যক্রমে অসহায়, দুস্থ। বরং তারা সেটাকে উপভোগ করে আর প্রকাশ করতে ব্যস্ত থাকে আমি ধনীর দুলাল বা দুলালী। এতে করে সমাজে হিংসা, লোভ, বিদ্বেষ ইত্যাদি সর্বদা বিস্তার ঘটছে। এরপর আসে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও আইন প্রয়োগের যথার্থ প্রয়োগ। কিন্তু সবার আগে অভিবাবকদের নিজেদের সচেতন হতে হবে যাতে সন্তান একটা সুন্দর মনস্তত্ত্বিক চেতনা নিয়ে নিজেকে মেলে ধরতে পারে পরিবারে, সমাজে সর্বোপরি রাষ্ট্রে। কোন সন্তানের মৃত্যু আর দেখতে চাই না, কোন সন্তান যেন আর ধর্ষিত না হয় বা বলাৎকারের স্বীকার না হয় বা কোন সন্তান যেন আত্মহত্যা আর না করে সেইসাথে মানসিক বিপর্যয় নিয়ে জীবনে বেঁচে না থাকে। কোন মাকে যেন সন্তানের মৃত্যুর কষ্টে বলতে না হয় আমি কি নিয়ে বাঁচবো বা বিচার চাই না, দেশ ধ্বংস হয়ে যাক। এগুলো কারোরই কাম্য নয়। আমরা অভিভাবকেরা দায়িত্বশীল হই, নিজেদের ভুলটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি আর সন্তান হারানোতে সকল মায়ের দুঃখে দুঃখিত হই।
সমাজে আরেক শ্রেণীর বাবা-মা আছেন যারা সন্তানকে অর্থের লোভে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করেন। কিছু নি¤œবিত্ত অভিবাবক অর্থের লোভে মেয়ে সন্তানকে ধনী পরিবারের বখাটে, নেশাখোর সন্তানের সাথে বিয়ে দেন ,অনেক সময় বয়সে ছয়গুন বড় বয়সী বৃদ্ধের সাথে ঘর বাঁধতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বা বিপতিœক বৃদ্ধের ঘরে পাঠান সেবা যতেœর জন্য বৈধ বিবাহের মাধ্যমে বা সাময়িক আনন্দের জন্য নিশ্চিতমনে পাঠিয়ে দেন। এতে করে সে মেয়ে সন্তানটি না পায় শারীরিক সুখ, না পায় স্ত্রীর মর্যাদা, না পায় তার কল্পনার স্বর্গের সংসার। বরং প্রতিনিয়ত কপালে জোটে মারধোর, সতীনের গালিগালাজ, আগের পক্ষের সন্তানদের অপমান ও নির্যাতন। একসময় দেখা যায় নেশাখোর স্বামীর ঘর থেকে বা বৃদ্ধ স্বামীর মৃত্যুতে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে ছিটকে পড়েছে কল্পনার সংসার থেকে। সন্তানটির জায়গা হয়না সমাজের কোথাও। তখন নিজের ও সন্তানের পেটের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে বেছে নেয় অনৈতিক পথ যার প্রক্ষিতে সমাজের পরিবেশ হয়ে পড়ছে ভীষণ রকমই দূষিত, পঙ্কিল,অপবিত্র, কলঙ্কিত ও অশুদ্ধ বা কোন পথ না পেয়ে জীবনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিচ্ছে কোন এক অভিমানে। আরেক ধরনের লোভ এখন সমাজকে ভয়ংকরভাবে থাবা মেরেছে যেটা সৃষ্টি হয়েছে মূলত ধর্মীয় অজ্ঞানতার কারণে ।ধর্মের সংজ্ঞার সঠিক ব্যাখ্যার অভাব বা উপলব্ধির অভাবে অনেক অভিভাবক সন্তানকে কেবলই ধর্মের শিক্ষাদানরে জন্য মাদ্রাসাতে পাঠিয়ে থাকেন। জীবনের যে এক বিশাল দিগন্ত , বিশালতা ও অসীম পরিধি আছে তা থেকে সন্তানরা অন্ধকারে থাকছে। জীবন হয়ে পড়ৎেছ স্বল্প পরিসরে বদ্ধ ঠিক খাঁচার পাখিটির মতো। তারা বলাৎকারের স্বীকার হচ্ছে, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিচ্ছে নতুবা রাষ্ট্রের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাবাপন্ন হয়ে পড়ছে। এতে করে সমাজ ও রাষ্ট্র ভাংগনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এখনই যদি সচেতন না হয় তাহলে হয়তো খুব অচিরেই দেশটি প্রাচীন যুগে ফিরে যাবে। যে যুগে হয়তো পশুর মতো মানুষ একে অপরকে কেবলই হত্যা করবে, হিংসাত্মক আনন্দে মেতে উঠবে আর নিজের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টায় লিপ্ত থাকবে। সেখানে থাকবে না কোন আবেগ, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও জীবনের প্রতি আগ্রহ। এমনকি ধনী ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তানরাও বাবা মায়ের ইচ্ছার স্বীকার হয় পরিবার, সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের কারনে। তাই এই অন্ধকারের অবসান ঘটাতে পারে কেবলই বাবা মা যারা একমাত্র ভালোবাসার ও নিরাপদ আশ্রয় কোমলমতি সন্তানদের।












