বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

হারিয়ে যাবে সেন্টমার্টিন?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
হারিয়ে যাবে সেন্টমার্টিন?

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের সীমান্তঘেঁষা জনপদ টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। সাগর ও নদীভাঙনের অব্যাহত আঘাতে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও জীবিকার উৎস। গত এক দশকে এই দুই দ্বীপে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক জোয়ার এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে দ্বীপ দুটির চারপাশে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিনে গত দশ বছরে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত ভূমি সাগরে বিলীন হয়েছে। এতে দ্বীপের আয়তন যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি কমে যাচ্ছে কৃষি ও বসবাসের উপযোগী জমির পরিমাণ। শুধু ভাঙনই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে সুপেয় পানির ওপর।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে লবণাক্ততার মাত্রা। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক পরিবারকে দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন অংশে ভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। কোথাও সাগরের গর্ভে বিলীন হয়েছে ঘরবাড়ি, কোথাও হারিয়ে গেছে চাষের জমি। অনেক পরিবার বারবার ঘর সরিয়ে নতুন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। যারা আর্থিকভাবে কিছুটা সচ্ছল, তারা দ্বীপ ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়েছেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলোর অনেকেই এখনও সাগর ও নদীর পাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দ্বীপের নদী-সাগরে পাড়েই টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন।

 

টেকনাফ শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত সড়কের পূর্ব পাশে নাফ নদের তীরে শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া। এখনও সেখানে শতাধিক পরিবারের পাঁচ শতাধিক মানুষ বসবাস করছেন। চরম ঝুঁকি হলেও বেঁচে থাকার যুদ্ধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

নদীর পাড়ে ঝুপড়ি ঘরে কথা হয় ৫৩ বছর বয়সী আলমাজ খাতুনের সঙ্গে। জোয়ারের পানি বাড়লে কী করেন জানতে চাইলে তিনি আঞ্চলিক ভাষায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধইজ্যা জোয়ারের পানি অইলে ঘরত থাহিত ন পারি। পানি বাড়লে অন্য ঘরে যাই, আবার কমলে ফিরি। যাইবার জায়গা নাই, এককান থাহিবার জায়গা চাই।’

তিনি জানান, এই নদীর পাড়ে বসবাসকারী অনেক মানুষ আশ্রয়স্থল ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কিন্তু তিনবার ঘর হারিয়ে যাওয়ার পরও নদীর পাড়ে থাকছেন। কেননা এখান অন্যত্র গিয়ে ঘর করে সামর্থ্য নেই। তাই জীবনের এই টানাপোড়েন যেন জোয়ার-ভাটার মতোই প্রতিদিনের সঙ্গী তার।

হাতে জাল বুনতে বুনতে আলমাজ খাতুন বলেন, ‘নদীর পাড়ে অধিকাংশ মানুষের মাছ ধরা একমাত্র পেশা। এখান থেকে কি-বা আয় করে মানুষ চলে। অনেক কষ্টের জীবন। এই যে এত গরম পরছে, একটু ঠান্ডা বাতাস খাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি অথবা ঘূর্ণিঝড় এলে বাধ্য হয়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিতে হয়। এরপর এখানে ফিরে আসি। দশ বছর ধরে জাল তৈরি করে সংসার চালাচ্ছি। আর কোনও পথ নেই।’

 

একই গ্রামের বাসিন্দা শাহেনা আক্তার (৫০)। একসময়ের সচ্ছল পরিবারের এই নারী ভাঙনের কবলে পড়ে এখন নিঃস্ব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটা সময় ঘরবাড়ি, জমিজমা, গরু ছাগলসহ সবই ছিল। সহায়সম্বল সব গিইল্লা খাইল এই নদী। আমাদের জীবন সংগ্রাম নাফের তীরে। সামন্য জোয়ারে পানি বাড়লে ঘরে থাকা খুব কষ্টকর। এমনকি ঝোড়ো হাওয়া শুরু হলে বুকে কাঁপন শুরু হয়। আর যদি ঘূর্ণিঝড়ের খবর আসে তাহলে রাতে ঘুম হারাম হয়ে যায়।’

নাফ নদের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলেন, ‘ওই ওখানে নৌকা ভাসে, সেখানেই একসময় ছিল প্রায় ৩০০ পরিবারের একটি পাড়া। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে চারবার বসতি হারিয়েছি আমরা। আমার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে এই জায়গাটিও আর বেশিদিন টিকবে না।’

শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, ‘জলবায়ুর প্রভাবে সাগর-নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গত দশ বছরে শাহপরীর দ্বীপের নদী-সাগর তীরে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ বসতি হারিয়েছেন। এর মধ্যে অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশেও আশ্রয়স্থল গড়ে তুলেছেন। কিন্তু অসচ্ছল পরিবারগুলো এখনও নদীর পাড়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার এলাকার প্রায় ৫০০ মানুষ নাফ নদের পাড়ে জীবনযাপন করছেন। প্রায় সময় ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি জোয়ারের পানি বৃদ্ধির কারণে এখন এসে মানুষের টিকে থাকা খুব কঠিন। নদীর পাড়ের লোকজন আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। সরকারের উচিত বাস্তুচ্যুতদের তালিকা করে তাদের পুনর্বাসন করা।’

 

সেন্টমার্টিন বিচের কোনাপাড়ার বাসিন্দা হাফেজ উল্লাহ (৪৫)। সাগরে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন টেকনাফ পৌরসভার পল্লান পাড়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন সাগর পাড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করেছিলাম। কিন্তু আর থাকা সম্ভব হয়নি। জীবনের সহায়সম্বল হারিয়ে গেছে সাগরে। এখন ধারদেনা করে পরিবার নিয়ে প্রবাল দ্বীপ ছেড়ে টেকনাফে এসে আশ্রয় নিয়েছি। কিছু করার নেই। সাগরের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা অসম্ভব। কেননা গত দশ বছরে জলবায়ু এটতা পরিবর্তন হয়েছে সাগর উত্তাল হলে জোয়ারের পানি ১০-১৫ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে পুরো দ্বীপ তলিয়ে যায়। তাই আমার মতো অনেকে দ্বীপে ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ১০-১৫ বছরের মধ্যে সেন্টমার্টিন সাগরে তলিয়ে যাবে।’

জানতে চাইলে সেন্টমার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ুর প্রভাবে দ্বীপের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে দ্বীপ আকারে ছোট হয়ে আসছে। তার ওপর সাগরে জোয়ারে গত ১০ বছরে অন্তত ২০০ পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। আবার অনেকে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেকে চাষবাদ জমি হারিয়েছেন। দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকটও। যদি প্রবাল দ্বীপের চার পাশে বাঁধ-ব্লক না দেয় তাহলে ১০-১৫ বছরের মধ্য সেন্টমার্টিন সাগরের বুকে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে।’

এদিকে জয়বায়ুর প্রভাবে সব থেকে ক্ষতিক্ষস্ত হয়েছে সেন্টমার্টিনের ডেইল পাড়া, পশ্চিম পাড়া, কোনাপাড়া, পশ্চিম পাড়া, উত্তর বিচ। এ ছাড়া শাহপরীর দ্বীপের জালিয়া পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, পশ্চিম পাড়ার অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন।

 

দ্বীপের বাসিন্দা নুর মুহাম্মদ বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেই আজ আমাদের বেহাল অবস্থা। যেভাবে ভাঙন এগোচ্ছে, তাতে এখানে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। অভাবের কারণে ঘরের সামনে ভাঙন চলে এলেও অন্যত্র সরানোর কোনও সুযোগ নেই। আমার আশঙ্কা, আগামী দু-তিন বছরের মধ্যেই এই এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।’

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর বলছে, গত পাঁচ বছরে জলবায়ুর প্রভাবে খাবারের পানি অভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া আশঙ্কাজনক হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার পাশাপাশি পানিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে পানিতে ৯ গুণ বেশি লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় পানি থেকে দূরর্গন্ধও ছড়ায়।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় জনপদ টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে সুপেয় পানির সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছেন। এর ফলে পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন এমন পানি ব্যবহারে আর্সেনিকজনিত নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা পরবর্তীতে ক্যান্সারের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হতে পারে।’

টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে সাগর ও নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষদের সংকট শুধু পরিবেশগত নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সরকারের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পরিকল্পিত পুনর্বাসন, টেকসই আবাসন এবং জীবিকা পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া।

 

জানতে চাইলে পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন ম্যাজিক ইনিশিয়েটিভ কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাতা জিমরান মো. সায়েক বলেন, ‘টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে সাগর ও নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট কেবল পরিবেশগত নয়, এটি জলবায়ু ন্যায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারের উচিত নিরাপদ স্থানে পরিকল্পিত পুনর্বাসন, টেকসই আবাসন ব্যবস্থা এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য ম্যানগ্রোভ বন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষা দেওয়া শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতারও অংশ।’

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘ঝুঁকিতে থাকা গৃহহীন মানুষকে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে হবে। পাশাপাশি ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Ads small one

ঢাকায় রমিজ হত্যা মামলায় নজরুল ইসলাম কারাগারে, রিমান্ড শুনানি আজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
ঢাকায় রমিজ হত্যা মামলায় নজরুল ইসলাম কারাগারে, রিমান্ড শুনানি আজ

নিজস্ব প্রতিনিধি: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় কারওয়ান বাজার এলাকায় এক শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে তাঁর রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালত এ আদেশ দেন বলে নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফ রেজা।
এর আগে সোমবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাঁকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন আহমেদ রূপ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আসামির সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। তবে মঙ্গলবার তিনি আদালতে উপস্থিত না থাকায় বিচারক রিমান্ড শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কারওয়ান বাজার এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন রূপ। বিকেলবেলা মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে আসামিদের ছোড়া গুলি তাঁর ডান চোখে লাগে। আন্দোলনকারীরা রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে কাঁঠালবাগানের একটি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহত রূপের বাবা এ কে এম রকিবুল আহম্মেদ তেজগাঁও থানায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যসংকটে সুন্দরবনের বাঘ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১:৪০ পূর্বাহ্ণ
জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যসংকটে সুন্দরবনের বাঘ

নিজস্ব প্রতিনিধি: আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস উপলক্ষে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বন বিভাগ। বনে ‘বাঘের কেল্লা’ নির্মাণ ও ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও গবেষকেরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং খালের নাব্য হ্রাসের ফলে মিঠাপানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে হরিণসহ তৃণভোজী প্রাণীদের সংখ্যা কমায় বাঘের খাদ্যশৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের বনজীবী নুর ইসলাম ও হরিনগর এলাকার জেলে আকবর আলী জানান, আগের মতো বনে হরিণ বা বাঘের বিচরণ এখন আর দেখা যায় না। তা ছাড়া বনদস্যু ও চোরাশিকারিদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় বন্যপ্রাণী শিকারের ঘটনা ঘটছে। শিকারের কারণে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনে বাঘের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় বাঘ মাঝেমধ্যেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যা মানুষ-বাঘ সংঘাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সাতক্ষীরা উপকূলে বাঘের আক্রমণে ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই কাঠুরে, জেলে ও মৌয়াল।

জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ বলেন, বাঘকে শুধু একটি প্রাণী হিসেবে দেখলে হবে না। বাঘ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষ শিকারি। লবণাক্ততা বাড়া ও মিঠাপানির অভাবের পাশাপাশি মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বাঘের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাই পরিবেশ ও স্থানীয়দের জীবিকাÑ সব মিলিয়েই সমন্বিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুন্দরবনে ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা সুলজ কুমার দ্বীপ বলেন, “মিঠাপানির সংকট দূর করতে বনের ভেতরে কৃত্রিম পুকুর খনন করা হয়েছে। চোরাশিকার প্রতিরোধে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপে বাঘের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১২৫টিতে পৌঁছেছে।”

 

 

 

 

 

চিকিৎসকের অবহেলায় যমজ সন্তানের মায়ের জীবন সংকটাপন্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
চিকিৎসকের অবহেলায় যমজ সন্তানের মায়ের জীবন সংকটাপন্ন

মো. জাবের হোসেন: যমজ সন্তান প্রসবের পর জরায়ুতে গর্ভফুলের (ফুল) অংশবিশেষ রেখেই প্রসূতিকে ছাড়পত্র দেওয়ার চরম অভিযোগ উঠেছে তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে। পর্যাপ্ত তদারকি ও চিকিৎসার গাফিলতিতে প্রসূতি রিমা খাতুন (১৮) প্রসব-পরবর্তী মারাত্মক রক্তক্ষরণে (সেকেন্ডারি পিপিএইচ) আক্রান্ত হয়েছেন। এতে ইতোমধ্যে তাঁর এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে রিমা নিজেও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। গত ৫ জুলাই সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মেলা বাজারে অবস্থিত তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে এই ঘটনা ঘটে।
মেডিকেল রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রসবের পর গর্ভফুল বা প্রসবসংক্রান্ত উপাদান সম্পূর্ণ অপসারণ না করেই প্রসূতিকে ছাড়পত্র দেয় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। ফলে জরায়ুতে অবশিষ্ট অংশ থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং তিনি মারাত্মক রক্তস্বল্পতায় (অ্যানিমিয়া) ভোগেন। পরবর্তীতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর জরায়ু পরিষ্কার ও রক্ত সঞ্চালন করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসবের পর প্রসূতির জরায়ু সঠিকভাবে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া চরম চিকিৎসাগত অবহেলা, যা রোগীর জীবন বিপন্ন করতে পারতো।
রিমা খাতুনের বাবা শুকুর আলী সরদার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ৪ জুলাই তাঁর মেয়ে রিমা ও জামাতা মো. সেলিম খাঁ পরামর্শের জন্য তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে যান। পরদিন ৫ জুলাই শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভর্তি করা হয়। ক্লিনিকটির স্বত্বাধিকারী বিধান বাবুর পরামর্শে স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিধান নিজে উপস্থিত থেকে এক নার্সকে দিয়ে এপিসিওটমি (সাইট কাটা) ও সেলাইয়ের কাজ করান। ওই দিনই রিমা দুটি যমজ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।
জন্মের পরপরই নবজাতকরা অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তাদের খুলনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠায়। অন্যদিকে ৭ জুলাই রিমা খাতুনকে ক্লিনিক থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলে তিনিও খুলনায় সন্তানদের কাছে চলে যান। সেখানে পৌঁছানোর পরদিন রিমা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানকার চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, তাঁর জরায়ুতে গর্ভফুলের অংশ রয়ে গেছে। পরে জরুরি চিকিৎসার মাধ্যমে জরায়ু পরিষ্কার করা হয়।
রিমার স্বামী সেলিম খাঁ আক্ষেপ করে বলেন, “ডাক্তারের বদলে ক্লিনিক মালিক নিজে উপস্থিত থেকে নার্সকে দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। এই ভুল চিকিৎসার জন্যই আমার স্ত্রীর আজ এই অবস্থা, আর আমাদের একটি সন্তানও মারা গেছে। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।”
এদিকে ২৫ জুলাই সকালে তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে গেলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ব্যাপক অসঙ্গতি দেখা যায়। প্রসূতির চিকিৎসায় গাফিলতির চিত্রটি সেখানে পরোক্ষভাবে উঠে আসে। স্বত্বাধিকারী বিধান কখনো নিজেকে ‘মালিক’ আবার কখনো ‘ম্যানেজার’ পরিচয় দেওয়ায় কারণ জানতে চাইলে ম্যানেজার মশিউর রহমান দাবি করেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আমরা মানসিকভাবে চাপের মধ্যে রয়েছি, তাই হয়তো তিনি এমন বলছেন।”
জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হলে প্রসূতির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সাত হাজার টাকা দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে প্রসূতির পরিবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে, প্রসবের কাজে যুক্ত নার্স রিমা খাতুন পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এছাড়া ছাড়পত্র দেওয়ার পর রোগীর জীবনঝুঁকির কথা জেনেও কেন তাঁর কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেনি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।