মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

এল নিনোর সতর্কবার্তা: বাংলাদেশসহ ৬ দেশে বন্যা, খরা ও রোগের আশঙ্কা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৫:৫৬ অপরাহ্ণ
এল নিনোর সতর্কবার্তা: বাংলাদেশসহ ৬ দেশে বন্যা, খরা ও রোগের আশঙ্কা

দ্রুত শক্তিশালী হতে থাকা এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশসহ পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভয়াবহ বন্যা, খরা, ভূমিধস ও রোগব্যাধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) সতর্ক করে বলেছে, জলবায়ুজনিত এ সংকট এমন এক সময়ে দেখা দিচ্ছে, যখন বহু দেশ আগে থেকেই খরা, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরসি জানায়- কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের লাখো মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে চলতি মৌসুমি বৃষ্টিতে প্রাণহানি, বন্যা ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে।

আইআরসির জরুরি পরিস্থিতি-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বব কিচেন বলেন, আমরা একসঙ্গে কয়েকটি জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখছি। যেসব এলাকার আরেকটি ধাক্কা সামলানোর মতো ন্যূনতম সক্ষমতা নেই, মূলত তারাই এখন সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে।

সংস্থাটির মতে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় আবহাওয়ার বৈরিতা আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা
গত ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার জানিয়েছে, এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে এবং ১৯৫০ সালের পর এটি অন্যতম শক্তিশালী রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ। এর সর্বোচ্চ প্রভাব অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেখা যেতে পারে।

এর আগে, জুলাইয়ের শুরুতে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছিল, এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

পূর্ব আফ্রিকায় বাড়ছে উদ্বেগ
আইআরসি জানিয়েছে, পূর্ব আফ্রিকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সোমালিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৪৮ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে এল নিনোজনিত বন্যা সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

 

সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ২০২৩ সালের বন্যায় সোমালিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার টন ফসল নষ্ট হয়েছিল এবং বহু শহর ও জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার একই ধরনের বন্যা হলে ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ হতে পারে, কারণ দেশটির মানুষ ইতোমধ্যেই খরা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমার কারণে চরম দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশে কেন এত বৃষ্টি
দেশে ৫ জুলাই থেকে ব্যাপক বৃষ্টিপাত শুরু হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাসের প্রথম ১১ দিনেই জুলাই মাসের মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ হয়ে গেছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এর প্রধান কারণ ছিল সক্রিয় মৌসুমি বায়ু। এ বছর মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অন্তত সাত দিন দেরিতে এলেও জুলাইয়ের শুরুতেই তা সক্রিয় হয়ে ওঠে, ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদের মতে, এ বৃষ্টিপাতের আরও দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ স্বাভাবিক গতিপথ অনুসরণ না করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বা চট্টগ্রাম বিভাগের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ফলে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস ওই অঞ্চলে বেশি বৃষ্টি ঘটিয়েছে। দ্বিতীয়ত, এল নিনোর একটি বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্য হলো স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি। এতে সাময়িকভাবে তাপপ্রবাহের প্রশমন ঘটলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়।

তার মতে, চলতি বছরের ভারী বৃষ্টিপাতকে এল নিনোর এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

এল নিনো কী
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন, যা সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর ঘটে। স্বাভাবিক অবস্থায় বাণিজ্যিক বায়ু উষ্ণ পানিকে পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এ বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়। ফলে কোথাও অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত, কোথাও আবার তীব্র খরা দেখা দেয়। পূর্ব আফ্রিকায় সাধারণত বছরের মাঝামাঝি শুষ্ক আবহাওয়া এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা তৈরি হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রাজনিত আরেকটি পরিবর্তনের কারণে চলতি বছর এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি
চলতি বছরের বৃষ্টিতে দেশে এক লাখ হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এল নিনো পুরোপুরি বিকশিত হলে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে ধানের ফলন ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। যেহেতু এসব অঞ্চলের কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ধানের ওপর নির্ভরশীল, তাই খাদ্যসংকট ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়বে।

বিশ্বব্যাংক আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, এমন এক সময়ে এ জলবায়ুগত সংকট তৈরি হচ্ছে যখন ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং তেহরানের পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জ্বালানি ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা চাপে পড়েছে এবং সার উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আগাম প্রস্তুতির আহ্বান
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আইআরসি দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারের প্রতি এখনই আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি এবং কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে। তাই শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

Ads small one

বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ণ
বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

শ্যামল শীল
দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলো সভা-সমাবেশ এবং জনসাধারণ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের মানুষের মাঝে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে অনেকটা সচেতনতা গড়ে উঠেছে। এরই মধ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করেছে। তথাপিও বাল্যবিবাহের পরিমাণ আশাতীত হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। কিন্তু এ জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বা জ্ঞানটি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে—এমন পরিবারের সংখ্যা এখনো আশাপ্রদ নয়।
আমাদের দেশে বৈধ বিবাহের জন্য মেয়েদের ১৮ বছর আর ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে মানে বাল্যবিবাহ। সরকারিভাবে প্রতিনিয়তই বাল্যবিবাহ বন্ধে অভিভাবকদের আহ্বান, শাস্তির ব্যবস্থাসহ সচেতনতার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারিভাবেও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবু কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বাল্যবিবাহ বা বাল্যবিয়ে নামের এই ব্যাধি।
আমাদের দেশের গ্রামগুলোতে একটা সময় গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধুমধাম করে, রং মাখামাখি করে বিয়ের উৎসব হতো। বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই মজার সব আয়োজন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না। এখন দেশে প্রতিদিন গড়ে যতগুলো বিয়ে হয় তার অর্ধেকের বেশি হয় অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও এমন গোপনে বিয়ে হয় যে, পাড়াপড়শিও জানতে পারে না খবরটি। এমনও দেখা যায়, এক বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে অথচ পাশের বাড়ির লোকজন বিষয়টি জানেই না। কেন এমন গোপনীয়ভাবে বিয়ে হচ্ছে? কেনইবা এত রাখঢাক? কারণ কী? আসলে কারণ একটাই, একসময় আমাদের দেশে বিয়ের কোনো বয়স ছিল না।
তথ্যানুসন্ধ্যানে এমন ঘটনাও পাওয়া যায়, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে গ্রামাঞ্চলে ছয়-সাত বছরের কোনো মেয়েশিশুর সঙ্গে ৮-১০ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ে পর্যন্ত হয়েছে। দুই পক্ষের অভিভাবকদের ইচ্ছাতে বিয়ে হলেও বিয়ের বর ও কনে জানতই না বিয়ে কী জিনিস। বর্তমান সময়ে ছয়-সাত বছর বয়সি মেয়েশিশুর বিয়ের খবর কোথাও খুঁজে পাওয়া না গেলেও অনেক গ্রামে এখনো ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুর সঙ্গে ১৫-১৬ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ের খবর শোনা যায়। কোথাও কোথাও দরিদ্র পরিবারের ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুকে এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের বয়োবৃদ্ধের কাছে বিয়ে দেওয়ার নজিরও চোখে পড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। আর এসব বিয়েতে সহায়তা করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি ও স্থানীয় কাজি। জনপ্রতিনিধিরা মেয়ে বা ছেলের বয়স বাড়িয়ে বা নাম বদলে জন্মনিবন্ধন করার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য।
গ্রামের সমাজপতিরা অনেক ক্ষেত্রে এসব বিয়ের খবর জানেন। গোপনে এসব বিয়ে আয়োজনের খবর জেনেও তারা চুপচাপ থাকেন। কখনো কখনো বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সমাজের সচেতন মানুষ জানার পর প্রতিবাদ করলে মেয়ের পরিবার থেকে বলা হয়, স্কুলে বা বাড়িতে বখাটে যুবকরা মেয়েটিকে যন্ত্রণা দেয়। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েকে দ্রুত পাত্রস্থ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবার থেকে বলা হয়, গরিবের সংসারে মেয়েটি অনেকটা বোঝা। তাই ভালো বা পয়সাওয়ালা অথবা প্রবাসী পাত্র পেয়ে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এমন অনেক অজুহাত থাকে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে। কোনো কোনো স্থানে যিনি বিয়ে পড়ান তিনি ফতোয়া দেন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কোটি কোটি মেয়ের ছয়-সাত বছরে বিয়ে হলো, কই কারো তো কোনো ক্ষতি হয়নি। এখন হবে কেন? আবার দেখা গেল যে, মৌলভী সাহেবকে বিয়ের জন্য ডেকে আনা হয় তিনি যদি বাল্যবিয়ে পড়াতে না চান, তবে সমাজপতিরা বাল্যবিয়ে পড়াতে তাদের বাধ্য করেন। এ অবস্থায় কখনো কোনো সচেতন মানুষ বা প্রশাসন যদি খবর পেয়ে বিয়ের মজলিশে উপস্থিত হন, তবে তিনি বা তাকে সদ্য কিনে নিয়ে আসা নতুন জন্মসনদটা দেখানো হয়। বিয়ে মজলিশে কেউ উপস্থিত হলে মানবতার দোহাইও দেয়া হয়। বলা হয়, ‘আজ বিয়ে ভেঙে গেলে এ মেয়েকে নিয়ে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।’ সমাজে বর্তমানে এভাবেই চলছে বাল্যবিবাহ।
গ্রামাঞ্চলের অনেক অভিভাবক ভাবেন তার পরিবারের মানসম্মানের কথা, ভাবেন তিনি সমাজের অতিদরিদ্র একজন মানুষ। যেদিন তার কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল সেদিন থেকেই যেন পরিবারের কর্তার মাথায় একটা পাহাড়সম বোঝা চেপে বসল। সেদিন থেকেই চিন্তায় চিন্তায় তার জীবন যেন অন্ধকারময়! মেয়েটা একটু একটু বড় হওয়ার পর অভিভাবকের চিন্তার মাত্রাটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। কোনো মতে, ১১-১২ বছর হলেই পরিবারের কর্তার দিন-রাত দৌড় শুরু হয়ে যায় ঘটকের পেছনে। যেন কোনোমতে বিয়েটা দিতে পারলেই তিনি দম ফেলে বাঁচেন।
আসলেই কি তাই? মেয়েকে অপরিণত বয়সে বিয়ে দিয়ে পরিবারের কর্তা কি বাঁচলেন? অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। পরিবারের কর্তা নিজ হাতে তার কন্যার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করলেন। তিনি নিজেও ডুব দিলেন অমানিশার কালো অন্ধকারে। অপরিণত বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পর অধিকাংশ সময়ই প্রথম যে জিনিসটি সামনে আসে তা হলো, বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়েটি এসে আর স্বামীর বাড়ি ফিরতে চায় না—এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে আমাদের সমাজে। যখন তার পুতুল খেলার বয়স, তখনই যদি থাকে সংসার নামক শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়, তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হয়ে থাকে। যখন অভিভাবকরা কোনোমতেই বুঝিয়ে-সুঝিয়েও মেয়েকে আর স্বামীর বাড়ি পাঠাতে পারেন না; তখন সমাজপতিরা এ নিয়ে বিচার-সালিসে বসেন। অথবা মামলা, থানা, আদালত করে সময় কাটাতে হয় অভিভাবকদের। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই তালাকের মাধ্যমে বিয়ের কবর রচিত হয়। আজকাল আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সময়ে যেসব স্বামী-স্ত্রীর তালাক হচ্ছে তাদের অধিকাংশই বাল্যবিবাহের শিকার। তাই বাল্যবিবাহের বিষয়ে সচেতন হতে হবে আমাকে-আপনাকে সবাইকে।
অল্প বয়সে বেশির ভাগ মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। দেশে মা ও শিশুমৃত্যুর মূল কারণ ১৮ বছরের কম বয়সিদের মা হওয়া। কিশোরী মায়ের মৃত্যুঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক মায়ের তুলনায় অন্তত চার গুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এক বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। বাল্যবিবাহের কারণে মাতৃমৃত্যু কিংবা শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নাবালিকা মেয়ে মা হওয়ায় কীভাবে শিশুকে পরিচর্যা করবে, সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকে না। এর ফলে মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। বাল্যবিবাহের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুও ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশুর মৃত্যুঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, নারীশিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানা রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ বিরোধী পদক্ষেপের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃৃক্ত করতে হবে। সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মা ও শিশুর মৃত্যুহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
পরিশেষে বলতে চাই, আপনার অপরিণত মেয়েকে আপনার অভিলাষের বলি বানাবেন না। তার বিয়ের খরচ, মালামালের খরচ বা পাত্রপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী যৌতুক যা দেবেন, তা দিয়ে মেয়েটির লেখাপড়ার খরচ জোগান। দেখবেন লেখাপড়া করে ওই মেয়েটিই একসময় নিজের পায়ে দাঁড়াবে। হয়তো সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে বড়মাপের কর্মকর্তা হবে। তখন তাকে বিয়ে করার জন্য সমাজের উন্নত পরিবারের ছেলেদের লাইন পড়ে যাবে।
বর্তমান সরকার প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখেই এখন নতুন বই দিচ্ছে, শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে। এ ছাড়া বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ তো আছেই। তাহলে কেন আপনার দুমুঠো অন্ন সাবাড় করছে বলে তাকে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছেন? আসুন আপনি-আমি সবাই সচেতন হই এবং সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিয়ে নামের ব্যাধিটা সমাজ থেকে চিরতরে বিদায়ের ব্যবস্থা করি। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ণ
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

 

এম শফিকুল ইসলাম
চলতি মৌসুমে আমন আবাদ ও ক্ষেত পরিচর্যায় অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বহন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাতক্ষীরার প্রান্তিক কৃষকরা। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পাওয়ার টিলার মালিকরা বিঘা প্রতি চাষ খরচ গত মৌসুমের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। এছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিঘা প্রতি মোট উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় সরকারের কাছে ধানের যৌক্তিক দাম নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সদর উপজেলার ভোমরা গ্রামের কৃষক শংকর ঘোষের মতে, জমিতে ফসল চাষ করে লাভ হচ্ছে না। বাজারে ধান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বিঘা প্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এবার চাষ খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। তা ছাড়া প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার নিচে কোনো শ্রমিক মিলছে না। সারের দামও চড়া। সব মিলিয়ে এবার বিঘায় ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও ধানের বাজারদর সুবিধাজনক নয়।
একই উপজেলার লক্ষ্ণীদাঁড়ি গ্রামের কৃষক আবু বক্করের ভাষ্য, ফসল উৎপাদন করে উপযুক্ত দাম না পেয়ে দিন দিন কৃষকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না মিললে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে। জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষকদের অবস্থাও একই রকম।
তবে কৃষকরা যাতে লাভবান হতে পারেন, সে জন্য ফলন বাড়াতে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে ভরা আমন মৌসুমে জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ধান চাষ করে কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছর সাতক্ষীরা জেলায় ৮০ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখান থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

সাতক্ষীরা জেলায় প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে ৭ জনই বাল্যবিবাহের শিকারÑবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র। দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে আইনি ফাঁকফোকর, সামাজিক ভীতি এবং নজরদারির অভাবে অকালেই ঝরে পড়ছে শত শত সম্ভাবনাময় প্রাণ। ১৫ বছর বয়সে ভুল সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসে নির্যাতন সহ্য করা, কিংবা ১৬ ও ১৫ বছরের দুই নাবালক-নাবালিকার এফিডেভিটের মাধ্যমে জোরপূর্বক আইনি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
বাল্যবিবাহের পেছনে কেবল অসচেতনতা নয়, কাজ করছে নানাবিধ ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণ। উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র জলবায়ু সংকট, সুপেয় পানির তীব্র অভাব ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার ফলে কম বয়সে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের ভয় এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে অভিভাবকেরা দ্রুত বিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এই কিশোরীদেরই। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণ, লবণাক্ত পরিবেশের প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, এপিলেপসি ও চরম রক্তস্বল্পতায় তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে; এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন বহু প্রসূতি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইনি ব্যবস্থার অসাদুপব্যবহার। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে জাল কাগজপত্র বা এফিডেভিটের দোহাই দিয়ে বেআইনি বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। উপরন্তু, স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর পারস্পরিক দায় চাপানো বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ার মানসিকতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত আইনি প্রয়োগ। জন্মসনদ যাচাইকরণ নিশ্চিতকরণ, অসাধু এফিডেভিট চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং স্থানীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য সংকট ও সামাজিক ভীতি দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ের অসময়ে বিয়ে শুধু একটি জীবনের পরাজয় নয়, বরং এটি পুরো সমাজের অগ্রগতিকেই পিছিয়ে দেয়।