শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

কালিগঞ্জে মবের মাধ্যমে সুমাইয়া হত্যার অভিযোগে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৬:৪৯ অপরাহ্ণ
কালিগঞ্জে মবের মাধ্যমে সুমাইয়া হত্যার অভিযোগে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে মামলা

পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কাজলা-কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ও কাশিবাটি গ্রামের এনামুল হকের মেয়ে ফারজানা সুলতানা হত্যার ঘটনায় সন্ধিগ্ধ সুমাইয়াকে মব সৃষ্টির মাধ্যমে হত্যার ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। রবিবার নিহতের পিতা মোঃ আব্দুল লতিফ শেখ বাদি হয়ে আট জনের নাম উল্লেখ করে এ মামলা দায়ের করেন। সাতক্ষীরার আমলী আদালত-২ এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক মেহেদী হাসান এ ঘটনায় কোন অপমৃত্যু বা হত্যা মামলা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করার জন্য কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
মামলার বাদি তৌফিক শেখ কালিগঞ্জ উপজেলার কাশিবাটি গ্রামের কলুইমেদে এলাকার ফজর আলী শেখের ছেলে ও একটি ঘেরের পাহারাদার।

মামলার আসামীরা হলেন, কাশিবাটি গ্রামের এন্তোফা মোড়লের ছেলে হামিদুল মোড়ল, একই গ্রামের আব্দুল গফফার খানের ছেলে হুসাইন খাঁন, রাজু আহম্মেদ এর ছেলে রাফি ইসলাম, রমজান আলী খাঁনের ছেলে রেজাউল ইসলাম খান, রফিকুল ইসলাম খাঁনের ছেলে নাজিম খাঁন, ইমান আলীর ছেলে সাদ্দাম হোসেন, নিহত সুমাইয়ার ভাসুরের ছেলে হাফিজুল ইসলাম সরদারের ছেলে তৌফিক হোসেন ও নওয়াপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে শামীম হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা ১২ জন।

অভিযোগ, লতিফ শেখ হত্যাকারিদের নাম উল্লেখ করে রবিবার আদালতে মামলা করবেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় আসামীদের বাঁচাতে নিহত সুমাইয়ার জামাতা আমিরুলের উপর প্রভাব বিস্তার করে প্রকৃত ঘটনা উহ্য রেখে কারো নাম উল্লেখ না করে যেনতেন প্রকারে শনিবার রাতেই একটি হত্যা মামলা দায়ের করিয়েছেন একটি প্রভাবশালীমহল।

ঘটনার বিবরণ ও লতিফ শেখের দায়েরকৃত মামলা থেকে জানা যায়, একই গ্রামের এনামুল হকের মেয়ে ফারজানা সুলতানা স্থানীয় কাজলা-কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। ফারজানার পরিবারের সাথে তার মেয়ে সুমাইয়ার পরিবারের সুসম্পর্ক ছিলো। প্রতিদিনের ন্যয় গত ২০ জুলাই সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে যায় ফারজানা। দুপুর একটার পর টিফিনের সময় প্রতিদিনের ন্যয় সে বাড়িতে না আসায় তার অভিভাবকগণ বিদ্যালয়ে যাইয়া সন্ধান না পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে অবহিত করে মাইকিং করা হয়। বিকেল তিনটার দিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। এ সময় পুলিশ ও ফারজানার স্বজনরা মুঠোফোনে সুমাইয়াকে অবহিত করলেও তাকে বাড়ি ফিরতে বলে। দাওয়াত থেকে ভূমিহীন জনপদ চিংড়িখালি শ^শুরবাড়িতে অবস্থান করা সুমাইয়া তার শ^াশুড়ি তৌফিকা ও মা নাছিমাকে নিয়ে বিকেল ৫টার দিকে বাড়িতে চলে আসে।

 

খবর পেয়ে বাবা লতিফ শেখকে অবহিত করে তাকে নিয়ে বোনের বাড়িতে আসে আব্দুল্লাহ আল মামুন। এ সময় পুলিশ ও স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদে ফারাজানা সম্পর্কে কোন তথ্য জানেনা মর্মে অবহিত করলে তাকে চড় থাপ্পড় মারা হয়। পুলিশ তাকে নিজ জিম্মায় নেয়। উক্ত সময় আসামীগণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থিত শতশত জনগণকে উত্তেজিত করিয়ে জোরপূর্বক বাড়িতে ঢুকে উঠানে থাকা ইট নিয়ে সুমাইয়ার দুইটি বসতঘরে ঢুকে লোহার রড, বাঁশের লাঠি ও ইট দিয়ে লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ঘরে থাকা দুটি খাট, দুটি আলমারি, একটি ফ্রিজ, ঘরের চাল, দেওয়াল, দরজা ভাংচুর করে পরে পশ্চিম পাশের ঘরের বিছানাপত্রে আগুণ লাগিয়ে ৩০ হাজার টাকার মালামাল ক্ষতি করে। পরে আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়। মাগরিবের নামাজের পর আসামীরা বাড়িল বৈদ্যুতিক আলো নিভিয়ে দিয়ে সুমাইয়ার কাছ থেকে চাবি না নিয়ে পশ্চিম পাশের্^র ঘরের তালা ভাঙে। ঘরের মধ্যে তখন ফারাজানার সন্ধান মেলেনি।

 

রাত সোয়া সাতটার দিকে আবারো বাড়ির আলো বন্ধ করে ওই ঘরের আলো নিভিয়ে আবারো তল্লাশি চালায় আসামীরা। এ সময় কোন প্রকারে কাঠের জানালার পাল্লা লাগিয়ে রাখা ওই ঘরের দেয়াল আলমারির ড্রয়ারে রাখা হাত-পা বাঁধা সুমাইয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করে আসামীরা। এরপর বারান্দায় অবস্থানকারি পুলিশের কাছ থেকে সুমাইয়াকে আসামীরা ছিনিয়ে নিয়ে চড় ও থাপ্পড় মারতে মারতে উঠানে চিৎ করে ফেলে দিয়ে ইট ও হাতুড়ি দিয়ে মুখম-ল, মাথা ও গলাসহ বিভিন্নস্থান থেঁতেলে দেয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে ইন্দ্রনগর মোড়ে যেয়ে অবস্থান করে। পাশবিক নির্যাতনে সুমাইয়ার কয়েকটি দাঁত ছাড়িয়ে পড়ে যায়। রাত সাড়ে আটটার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে সুমাইয়ার লাশ উদ্ধার করে।

 

পুলিশ সুমাইয়ার সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে পরদিন সুমাইয়ার লাশ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। সুমাইয়ার লাশ এলাকায় দাফন করতে দেওয়া হবে না মর্মে প্রভাবশালীরা হুমকি দেয়। একপর্যায়ে ২২ জুলাই রাত ১১টার দিকে মর্গ থেকে সুমাইয়ার লাশ নিয়ে রাত সাড়ে ১২টার পর কলুইমেদে খালপারে দাফন করা হয়। মর্গ থেকে লাশ নেওয়ার সময় মৃত্যসংক্রান্ত কাগজপত্র চাইলে থানা ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে নিতে হবে বলে তাদেরকে জানানো হয়।

 

প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্য হামিদ মোড়লসহ কয়েকজনকে সুমাইয়া হত্যার দায় থেকে বাঁচাতে তাদেরকে ফারজানা হত্যা মামলার সাক্ষী বানিয়ে সুমাইয়ার ভাই আল মামুনকে আসামী করা হয়। যাতে সুমাইয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে কোন মামলা না করা হয় সেজন্য লতিফ শেখ, তার ভাই রবিউল শেখকে হুমকি ধামকি দেওয়া হয়। মামলা করলেও ওই প্রভাবশালি জনপ্রতিনিধির কথার বাইরে কারো নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করা যাবে না মর্মে জানতে পেরে আব্দুল লতিফ রবিবার আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে আব্দুল লতিফকে নিজ অফিসে ডেকে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে থানায় গেলে অজ্ঞাতনামা আসামীদের মামলা হয়ে যাবে বলে জানিয়ে দেন ওই জনপ্রতিনিধি।

মামলায় (সিআর-৬২১/২৬ নং কালিঃ) আরো উল্লেখ করা হয়, ফারজানার মৃত্যু সংক্রান্ত সুমাইয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে তার কোন প্রকার সম্পৃক্ততার সত্যতা না পাওয়া স্বত্বেও উল্লেখিত আসামীগণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিকটিম সুমাইয়ার বসতঘরসহ বসতঘরে রক্ষিত উল্লেখিত জিনিসনপত্রাদি ভাংচুর করে এবং একপর্যায়ে আগুণ দিয়া জ¦ালাইয়া দেয়। ফারজানার মৃত্যু সংক্রান্ত ঘটনায় সুমাইয়ার সম্পৃক্ততার সুষ্ঠু বিচারের জন্য আইনে সোপর্দ না করে আসামীরা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে আইনতঃ শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে। মেয়ের উপর সহিংসতার বর্ণনা দেওয়ার একপর্যায়ে সুমাইয়া ও ফারজানা হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে কাঠগড়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন লতিফ শেখ।

অপরদিকে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি জানতে পারেন যে, লতিফ শেখ আদালতে রবিবারে মামলা করবেন জানতে পেরে ও কালিগঞ্জ থানার পুলিশের সঙ্গে কথা বলে তড়িঘড়ি করে নিহত সুমাইয়ার স্বামী আমিরুল ইসলামকে শনিবার সন্ধ্যায় থানায় পাঠান। লাশ দাফন নিয়ে বিপাকে পড়া, ঘরপোড়ানা ও খুনের সহিংসতার কথা না লিখে প্রকৃত ঘটনার তথ্য গোপন করে সাক্ষী ও আসামীর নাম উল্লেখ না করে রাতেই একটি হত্যা মামলা (জিআর-১৬৮/২৬ কালিঃ) দায়ের করানো হয়। মামলায় আমিরুল উল্লেখ করেছে, গত ২৯ জুন থেকে মাদারীপুরে রং মিস্ত্রীর কাজ করে সে। ২০ জুলাই সকালে স্ত্রী তাকে কিস্তির টাকা পরিশোধ করার জন্য ফোন করে জানায়। টাকা না দিলে তাকে হেনস্তা করা হতে পারে। সে এক হাজার টাকা পাঠানোর কথা বলে। একই দিনে ফেইসবুকের মাধ্যমে স্ত্রীকে হত্যা করার খবর পান। স্ত্রীকে অজ্ঞাতনামা লোকজন মারপিট করে হত্যা করেছে। ভাংচুর করা হয়েছে চার লাখ টাকার মালামাল।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জজ কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোসলেমউদ্দিন বলেন, ফারজানার হত্যার বিপরীতে সুমাইয়াকে মব সৃষ্টি করে হত্যা ন্যয় বিচার ও আইনের পরিপন্থি।

কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম জানান, মোঃ আব্দুল লতিফ শেখকে থানায় এসে মামলা করার ব্যাপারে নির্ভয় দেওয়া হয়। এরপরও এ ধরণের স্পর্শকাতর হত্যাকা-ে নিহতের পিতাকে না পেয়ে নিহতের স্বামী আমিরুল ইসলাম বাদি হয়ে শনিবার থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তভার উপপরিদর্শক মল্লিক মনিরুজ্জামানের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। দুটি হত্যাকা-ে পুলিশ তদন্ত করছে। ফারজানা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহ আল আমিনের রিমা- শুনানী আগামি মঙ্গলবার।

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এম শফিকুল ইসলাম: পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। অসতর্কতার কারণে শিশুদের অকাল মৃত্যু নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ডিজাস্টার ফোরাম জেলা ভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে।

 

পরিসংখ্যানে তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ দেবাহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের একটি মাছের ঘেরের পানিতে পড়ে আসমাউল হুসনা (২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ১৪ জুলাই তালা উপজেলার ধামসা ঢ্যামসাখোলা গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে রুমানা খাতুন (৫) নামক এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে পৃথক দুটি ঘটনায় শান্ত (৫) এবং ফাহিম (৩) নামের দুটি শিশুর পুকুর ও বেতনা নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

 

২২ মে কালীগঞ্জ উপজেলার মাগরি গ্রামে পুকুরে গোসল করতে নেমে জান্নাতুল (১১) নামে এক শিশু প্রাণ হারায়। একই উপজেলার ২৩ মার্চ সন্ন্যাসীচক গ্রামের নানা বাড়িতে এসে মাছের ঘেরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে একই দিনে পৃথক ঘটনায় ৪টি শিশু ও ১ জন কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রান হারিয়েছে। ডুবে মৃত্যুর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন ছেলে ও কন্যাশিশু রয়েছে। ডিজাস্টার ফোরামের আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৪ জন। যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

 

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল,’ ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইট’ বাস স্্েরাতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান”।

 

ডব্লিউএইচও এর পরিসংখ্যান বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, গ্রাম, শহর ও নগরকেন্দ্রীক পরিবারদের সচেতনতার অভাব, গাফিলতি, অন্যমনস্ক এবং অজ্ঞতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী