শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

ঘরে ঘরে সাংবাদিক, কোথায় সাংবাদিকতা?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৫ অপরাহ্ণ
ঘরে ঘরে সাংবাদিক, কোথায় সাংবাদিকতা?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একসময় সাংবাদিকতা ছিল একটি কঠিন, দায়িত্বশীল এবং জন স্বার্থনির্ভর পেশা। সংবাদ সংগ্রহ করতে একজন প্রতিবেদককে দিনের পর দিন মাঠে থাকতে হতো, তথ্য যাচাই করতে হতো, একাধিক পক্ষের বক্তব্য নিতে হতো, তারপর সংবাদ প্রকাশিত হতো। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। আজ একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থাকলেই মুহূর্তের মধ্যে যে কেউ ছবি, ভিডিও বা লেখা প্রকাশ করতে পারেন। ফলে একটি বহুল প্রচলিত কথা এখন প্রায়ই শোনা যায়-“ঘরে ঘরে সাংবাদিক।”প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি ঘরে ঘরে সাংবাদিক তৈরি হয়েছে? নাকি ঘরে ঘরে তৈরি হয়েছে তথ্য প্রকাশের মাধ্যম? এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সাংবাদিকতা কখনোই শুধু ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ করা বা ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়ার নাম নয়। সাংবাদিকতা হলো সত্য অনুসন্ধানের শিল্প, দায়িত্বশীল তথ্য পরিবেশনের অঙ্গীকার এবং জনস্বার্থ রক্ষার এক নিরন্তর সংগ্রাম। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের প্রথম পরিচয় তাঁর সততা, দ্বিতীয় পরিচয় তাঁর নিরপেক্ষতা এবং তৃতীয় পরিচয় তাঁর জবাবদিহি। তিনি জানেন, একটি ভুল সংবাদ শুধু একজন ব্যক্তির নয়, একটি পরিবার, একটি প্রতিষ্ঠান এমনকি একটি রাষ্ট্রেরও অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই তথ্য ছড়িয়ে দেন। কেউ ভাইরাল হওয়ার আশায়, কেউ ব্যক্তিগত প্রতিশোধের কারণে, আবার কেউ না বুঝেই গুজব প্রচারে অংশ নেন। একটি পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা, একটি সম্পাদিত ছবি দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা কিংবা একটি অসম্পূর্ণ তথ্যকে পূর্ণ সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মিথ্যা তথ্যের গতি সত্যের চেয়ে অনেক বেশি।ডিজিটাল যুগ নাগরিক সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। দুর্ঘটনা, অগ্নিকা-, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা দুর্নীতির প্রাথমিক তথ্য অনেক সময় সাধারণ মানুষের মাধ্যমেই প্রথম সামনে আসে। এতে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পায় এবং সংবাদ মাধ্যমও দ্রুত ঘটনাস্থলের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ নাগরিকের অংশগ্রহণ সংবাদকে আরও প্রাণবন্ত ও গতিশীল করেছে।কিন্তু নাগরিক সাংবাদিকতা এবং পেশাদার সাংবাদিকতা এক জিনিস নয়। একজন নাগরিক একটি ঘটনার সাক্ষী হতে পারেন, কিন্তু সেই ঘটনার সত্যতা যাচাই, কারণ অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ, আইনগত ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ এবং জনস্বার্থের আলোকে সংবাদ উপস্থাপন করাই পেশাদার সাংবাদিকের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা, অভিজ্ঞতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ। আজ আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়কে পেশা নয়, প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। একটি অনলাইন পোর্টাল খুলে, একটি পরিচয়পত্র বানিয়ে কিংবা একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করেই নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এরপর সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অবৈধ সুবিধা আদায় কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়। কয়েকজনের এই অনৈতিক কর্মকা-ের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় প্রকৃত সাংবাদিকদের। ফলে সমাজে সাংবাদিকতার প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। মানুষ যখন দেখেন একজন কথিত সাংবাদিক কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অযৌক্তিক দাবি করছেন, তখন তাঁরা পুরো সাংবাদিক সমাজকেই একই চোখে দেখতে শুরু করেন। অথচ প্রকৃত সাংবাদিকরা দিনের পর দিন ঝুঁকি নিয়ে, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে থেকেও সত্য প্রকাশের জন্য কাজ করে চলেছেন। তাঁদের সঙ্গে অসাধু ব্যক্তিদের এক কাতারে দাঁড় করানো অন্যায়। এই পরিস্থিতির জন্য শুধু ভুয়া সাংবাদিকদের দায়ী করলে হবে না। সংবাদ মাধ্যমকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি দেখা যায়। কখনো কখনো শিরোনামকে আকর্ষণীয় করতে গিয়ে মূল তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়। আবার রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবের অভিযোগও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। তাই গণমাধ্যমের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করা।রাষ্ট্রের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি, প্রতারণা কিংবা ভুয়া পরিচয়ের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত সাংবাদিকরা ভয়ভীতি বা হয়রানি ছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারেও ডিজিটাল সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। শিশু-কিশোরদের শেখাতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া প্রতিটি তথ্য সত্য নয়। কোনো সংবাদ শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করতে হবে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক কখনো গুজব ছড়াতে পারেন না। তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি মানুষের হাতে অভূতপূর্ব শক্তি তুলে দিয়েছে। কিন্তু শক্তির সঠিক ব্যবহার না হলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। ক্যামেরা হাতে থাকলেই যেমন সবাই আলোকচিত্রী হন না, তেমনি মোবাইল ফোন হাতে থাকলেই সবাই সাংবাদিক হয়ে যান না। সাংবাদিকতা একটি নৈতিক অঙ্গীকার, একটি পেশাগত শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার নাম।আজ আমাদের প্রয়োজন সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ানো নয়; প্রয়োজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বৃদ্ধি করা। প্রয়োজন এমন গণমাধ্যম, যা ক্ষমতার নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে; জনপ্রিয়তার নয়, জনস্বার্থের কথা বলবে; গুজবের নয়, তথ্যের ওপর আস্থা রাখবে।’ঘরে ঘরে সাংবাদিক’-এই কথাটি যদি সচেতন নাগরিকের অংশগ্রহণকে বোঝায়, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু যদি এর অর্থ হয় যাচাইহীন তথ্যের বন্যা, ভুয়া পরিচয়ের বিস্তার এবং পেশাগত নৈতিকতার অবক্ষয়, তবে তা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। প্রযুক্তি আমাদের হাতে তথ্য পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব এখনো সৎ, দক্ষ ও নীতিবান সাংবাদিকদের কাঁধেই রয়ে গেছে।তাই সময়ের দাবি একটাই-ঘরে ঘরে মোবাইল থাকুক, তথ্যপ্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ুক, নাগরিকের অংশগ্রহণ বাড়ুক; কিন্তু সাংবাদিকতার মান, মর্যাদা ও নৈতিকতা যেন কোনোভাবেই বিসর্জন না যায়। কারণ একটি দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যমই পারে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে, দুর্নীতিকে উন্মোচন করতে এবং সমাজকে সত্যের পথে পরিচালিত করতে। ঘরে ঘরে তথ্যপ্রেরক তৈরি হতে পারে, কিন্তু ঘরে ঘরে সাংবাদিক তৈরি হয় না; সাংবাদিক তৈরি হয় সততা, দক্ষতা, ত্যাগ ও সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার মাধ্যমে। লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এম শফিকুল ইসলাম: পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। অসতর্কতার কারণে শিশুদের অকাল মৃত্যু নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ডিজাস্টার ফোরাম জেলা ভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে।

 

পরিসংখ্যানে তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ দেবাহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের একটি মাছের ঘেরের পানিতে পড়ে আসমাউল হুসনা (২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ১৪ জুলাই তালা উপজেলার ধামসা ঢ্যামসাখোলা গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে রুমানা খাতুন (৫) নামক এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে পৃথক দুটি ঘটনায় শান্ত (৫) এবং ফাহিম (৩) নামের দুটি শিশুর পুকুর ও বেতনা নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

 

২২ মে কালীগঞ্জ উপজেলার মাগরি গ্রামে পুকুরে গোসল করতে নেমে জান্নাতুল (১১) নামে এক শিশু প্রাণ হারায়। একই উপজেলার ২৩ মার্চ সন্ন্যাসীচক গ্রামের নানা বাড়িতে এসে মাছের ঘেরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে একই দিনে পৃথক ঘটনায় ৪টি শিশু ও ১ জন কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রান হারিয়েছে। ডুবে মৃত্যুর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন ছেলে ও কন্যাশিশু রয়েছে। ডিজাস্টার ফোরামের আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৪ জন। যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

 

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল,’ ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইট’ বাস স্্েরাতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান”।

 

ডব্লিউএইচও এর পরিসংখ্যান বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, গ্রাম, শহর ও নগরকেন্দ্রীক পরিবারদের সচেতনতার অভাব, গাফিলতি, অন্যমনস্ক এবং অজ্ঞতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী