সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩

দি সোর্ড অব টিপু সুলতান: বাঘের গর্জন, এক বংশের উত্থান ও ‘বীরত্ব

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ণ
দি সোর্ড অব টিপু সুলতান: বাঘের গর্জন, এক বংশের উত্থান ও ‘বীরত্ব

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

ইতিহাসের কিছু অধ্যায় শুধু তথ্য নয়, অনুভূতিরও যেখানে রক্ত, ত্যাগ, স্বপ্ন আর সাহস মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য মহাকাব্য। টিপু সুলতান এই নামটি উচ্চারিত হলেই যেন কানে ভেসে আসে তলোয়ারের ঝনঝন শব্দ, যুদ্ধের দামামা, আর এক বাঘের গর্জন। তাঁর সেই বিখ্যাত তলোয়ার “দি সোর্ড অব টিপু সুলতান” শুধু একটি অস্ত্র নয়, এটি প্রতিরোধের প্রতীক, আত্মমর্যাদার প্রতীক, স্বাধীনতার এক অমর অঙ্গীকার। কিন্তু এই বীরের গল্প শুরু হয় আরও আগে তার পিতা হায়দার আলি-এর হাত ধরে। এক সাধারণ সৈনিক থেকে রাজ্যের অধিপতি হায়দার আলি খানের পূর্বপুরুষরা ছিলেন সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা, যাদের জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা।

 

রাজকীয় বংশের গৌরব নয়, বরং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষদের মধ্য থেকেই উঠে আসে এই বীরের পরিবার। হায়দার আলির পিতা ফতেহ মোহাম্মদ ছিলেন একজন সৈনিক। সেই সৈনিক জীবনের কঠোরতা, শৃঙ্খলা ও যুদ্ধের বাস্তবতা ছোটবেলা থেকেই হায়দার আলির রক্তে প্রবাহিত হয়। লোককথার মতো শোনা যায় পরপর কয়েকটি কন্যা সন্তানের জন্মের পর হায়দার আলির পিতা-মাতা সৃষ্টিকর্তার কাছে একটি পুত্র সন্তানের জন্য গভীর প্রার্থনা করেছিলেন। সেই প্রার্থনারই ফল যেন হায়দার আলি যিনি আনুমানিক ১৭২০ সালে জন্মের পর থেকেই যেন নিয়তি নির্ধারিত এক যোদ্ধা। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ছাড়াই, শুধুমাত্র অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ও রণকৌশলের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের এক অসাধারণ কৌশলী যিনি বুঝতেন কখন আঘাত করতে হয়, কখন পিছু হটতে হয়, আর কখন শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে হয়।

 

এই অসাধারণ রণকৌশল, সাহস এবং নেতৃত্বগুণের কারণে একসময় সাধারণ সৈনিক থেকে তিনি হয়ে ওঠেন মহীশুর রাজ্যের প্রকৃত শাসক। এই মহান বীর ৭ ডিসেম্বর ১৭৮২ সালে ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে নারাসিংগরায়পেট, কর্ণাটকে মারা যান। তিনি দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন বিশেষ করে পিঠে ফোড়া জাতীয় জটিল রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর তাৎক্ষনিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি-কারণ এতে সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়তে পারতো। তাই কিছুদিন গোপন রেখে তাঁর পুত্র টিপু সুলতান এর হাতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব সুষ্ঠুভাবে হস্তান্তর করা হয়।

বংশের উত্তরাধিকার: টিপু সুলতানের উত্থান এই বীরের ঘরেই জন্ম নেন টিপু সুলতান এক নতুন ইতিহাসের নির্মাতা। শৈশব থেকেই তিনি যুদ্ধবিদ্যা, রাজনীতি এবং প্রশাসনের শিক্ষায় গড়ে ওঠেন। তাঁর মধ্যে ছিল পিতার সাহস, কিন্তু তার সাথে যুক্ত হয়েছিল এক নতুন যুগের চিন্তা ও প্রযুক্তি। তাঁর হাতে “দি সোর্ড অব টিপু সুলতান” হয়ে ওঠে এক প্রতীক যেখানে প্রতিটি আঘাত ছিল স্বাধীনতার জন্য, প্রতিটি যুদ্ধ ছিল আত্মমর্যাদার জন্য।

সংগ্রামের ধারাবাহিকতা
প্রথম ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধ, দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধ এবং তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধ এই তিনটি যুদ্ধে হায়দার আলি ও টিপু সুলতান একসঙ্গে লড়াই করে মহীশুরকে রক্ষা করেন। বিশেষ করে পল্লীলুরের যুদ্ধ-এ ব্রিটিশদের ভয়াবহ পরাজয় ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে আছে। ছোট্ট ৩৩টি গ্রাম থেকে শুরু করে প্রায় এক লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এক বিশাল শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয় মহীশুর। যার মধ্যে কর্ণাটকের অধিকাংশ অঞ্চল, তামিলনাড়ুর কিছু অংশ, কেরালার মালাবার অঞ্চল এবং অন্ধপ্রদেশের কিছু অংশ ছিল। প্রথম দিকে মহীশুরের সৈন্য সংখ্যা ছিল দশ হাজার সেই সৈন্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল এক লক্ষে যেখানে প্রতিটি সৈনিক যেন ছিল এক একটি জ্বলন্ত আগুন।

বাঘের গর্জন ও বীরত্বের প্রতিচ্ছবি
টিপু সুলতানের চেহারা ছিল তীক্ষè, উজ্জ্বল যা দেখলে মনে হতো কোনো রাজকীয় বাঘ, শিকারের অপেক্ষায় আছে। তাঁর প্রতিটি চাহনিতে ছিল স্থিরতা এবং মনে হতো তিনি ভবিষ্যতের কোনো এক মহাপ্রলয় দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর বীরত্বের কিছু কথা আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগায়। একবার যুদ্ধের ময়দানে ব্রিটিশ প্রতিনিধি তাঁকে ভয় দেখানোর জন্য শর্ত দিয়েছিল। টিপু সুলতান শান্তভাবে, কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন সেই অমর বাণী যা আজও স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে মানুষের চোখ ঝাপসা করে দেয়: “মানুষের মতো একশ বছর বেঁচে থাকার চেয়ে বাঘের মতো একদিন বেঁচে থাকাই শ্রেয়।” শুধু মুখেই নয়, তাঁর প্রতিটি কাজে ছিল আত্মমর্যাদার বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশরা যখন তাঁকে পরাজয় মেনে নিয়ে সন্ধি করার প্রস্তাব দিল, তখন তিনি তাঁর তলোয়ারের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন: “এই তলোয়ার মহীশুরের মান, আর আমি এই মানের অতন্দ্র প্রহরী। যতক্ষণ আমার শরীরে শেষ রক্তবিন্দু আছে, ততক্ষণ এই তলোয়ার কেবল শত্রুর রক্তেই তৃষ্ণা মেটাবে।”

চূড়ান্ত অধ্যায়: ৪ মে, ১৭৯৯ শ্রীরঙ্গপত্তনমের সেই শেষ দিনটির কথা মনে করলে আজও বুক কেঁপে ওঠে। চারদিকে ব্রিটিশ কামানের গর্জন। তারপর আসে সেই ভাগ্যনির্ধারক দিন চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশুর যুদ্ধ। ব্রিটিশরা, লর্ড ওয়েলেসলি-এর নেতৃত্বে, মহীশুরকে চূড়ান্তভাবে দখল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তনম অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। চারদিকে শুধু যুদ্ধ, ধ্বংস আর অনিশ্চয়তা। অনেকে টিপু সুলতানকে বলেছিলেন পালিয়ে যান, আবার ফিরে এসে লড়বেন। কিন্তু তিনি ছিলেন বাঘ, পালানো তাঁর স্বভাব নয়। তিনি বলেছিলেন “বাঘের একদিনের জীবন ভেড়ার একশ’ দিনের জীবনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।” দুর্গের দেয়াল ভেঙে ব্রিটিশ বাহিনী ভেতরে প্রবেশ করে। টিপু সুলতান জানতেন, মৃত্যু সন্নিকটে। রাজসভার সভাসদ ও বিশ্বস্ত সেনাপতিরা তাঁকে শহর ছেড়ে নিরাপদে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি গর্জে উঠে বলেছিলেন: “আমি মহীশুরের মাটি ছেড়ে কোথাও যাব না। রাজা যখন পালিয়ে যায়, তখন তার প্রজারাও সাহস হারায়। আজ আমি লড়ব, আমার মৃত্যুর পর আমার ইতিহাস লড়বে। টিপু সুলতান তখন আর রাজা নন তিনি একজন সাধারণ সৈনিক, হাতে তলোয়ার, চোখে আগুন। তিনি পরিচয় গোপন করে সম্মুখ সমরে লড়াই চালিয়ে যান। হয়তো পরিচয় দিলে তিনি বেঁচে থাকতে পারতেন বন্দী হিসেবে। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন বীরের মৃত্যু।

তিনি তাঁর সৈন্যদের কাছ থেকে বন্দুক নিয়ে ব্রিটিশ সৈন্য হত্যা করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাঁর সেই বিখ্যাত তলোয়ার দিয়ে বহু সৈন্যের মাথা দ্বিখন্ডিত করছিলেন এ সময় ব্রিটিশ সৈন্যেদের বন্দুকের গুলি ও তরবারির আঘাত সহ্য করে দুর্গের ফটকের সামনে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর শরীরে অসংখ্য ক্ষতের দাগ। ব্রিটিশ সেনাপতিরা তাঁর দেহাবশেষ দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল একজন মানুষ একা এত অমানুষিক শক্তির লড়াই কী করে করতে পারে! তিনি সেদিন কেবল হারেননি, বরং পরাজিত হয়েও জয়ী হয়েছিলেন বীরত্বের ইতিহাসে।

সমসাময়িক ভারত: বিচ্ছিন্নতার বিষাদ
কিন্তু হায়দার আলি ও টিপু সুলতানের এই মহাকাব্যিক সংগ্রামের পাশে আরেকটি চিত্র ছিল বড় বিষাদময়। তৎকালীন ভারত খ–বিখ-। মুর্শিদাবাদের নবাবেরা তখন ব্রিটিশদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেন, হায়দ্রাবাদের নিজাম কিংবা মারাঠা শক্তি সবাই তখন নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সংকীর্ণ লড়াইয়ে লিপ্ত। কেন তারা টিপুকে সহযোগিতা করেনি ? এটি ছিল ইতিহাসের এক বড় ট্র্যাজেডি। ব্রিটিশরা ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ বা ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতির মাধ্যমে ভারতীয় শাসকদের একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল। টিপু সুলতান যখন স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তখন অনেক প্রতিবেশী রাজা তাঁকে সাহায্য করার চেয়ে ব্রিটিশের সাথে গোপন আঁতাত করাকেই নিরাপদ মনে করেছিলেন। তাঁরা বুঝতে পারেননি, টিপু সুলতান শুধু মহীশুরের রাজা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরো ভারতের স্বাধীনতার শেষ বাতিঘর। সেই বাতিঘর নিভে গেলে যে অন্ধকার নেমে আসবে, তা তাঁরা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ: টিপু সুলতানের পতন এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক সমীকরণ
১৭৯৯ সালের ৪ মে মাসে শ্রীরাঙ্গাপত্তনমের পতনের মাধ্যমে টিপু সুলতানের মৃত্যু এবং মহীশূর রাজ্যের স্বাধীনতা বিলুপ্তি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত সোপান হিসেবে বিবেচিত হয়। এই যুদ্ধ কেবল টিপু এবং ইংরেজদের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ভারতের প্রধান শক্তিগুলোর এক জটিল ও অশুভ জোটের পরিণতি। তৎকালীন দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে তিনটি বড় শক্তির আধিপত্য ছিল: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, হায়দ্রাবাদের নিজাম এবং মারাঠা কনফেডারেসি।

১. হায়দ্রাবাদের নিজাম (আসফ ঝাহি রাজবংশ):
শাসক: নিজাম আলী খান।
টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিলেন নিজাম। লর্ড ওয়েলেসলির ‘অধীনতামূলক মিত্রতা’ (Subsidiary Alliance) চুক্তির ফাঁদে পড়ে নিজাম নিজ রাজ্যে ব্রিটিশ সৈন্য রাখতে বাধ্য হন। তিনি মহীশূর যুদ্ধের সময় সরাসরি ইংরেজদের বিশাল সেনাবাহিনী ও রসদ সরবরাহ করে সহায়তা করেন। কারণ- নিজাম সবসময়ই মারাঠা এবং মহীশূরের ক্রমবর্ধমান শক্তির কাছে নিজেকে কোণঠাসা মনে করতেন। ব্রিটিশদের ছায়াতলে থাকা তিনি অধিক নিরাপদ মনে করেছিলেন।

২. মারাঠা সাম্রাজ্য (মারাঠা কনফেডারেসি): পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও এবং নানা ফড়নবিশ। মারাঠারা চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যদিও শেষ মুহূর্তে তারা কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ভান করেছিল, কিন্তু পরোক্ষভাবে তারা ব্রিটিশদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল যাতে মহীশূর ধ্বংস হলে যুদ্ধের লুটপাটের বড় অংশ তারা পায়। কারণ: মারাঠারা সবসময়ই টিপু সুলতানকে দক্ষিণ ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত। তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা ব্রিটিশদের কাজকে আরও সহজ করে দিয়েছিল। এই জোটের ভয়াবহতা ও টিপু সুলতানের চূড়ান্ত পরিণতি টিপু সুলতানের পতনের পেছনে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কাজ করছিল, তা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং বহুমুখী ছিল:

কৌশলগত অবরুদ্ধকরণ: ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজাম এবং মারাঠাদের টিপুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। এর ফলে টিপু সুলতানকে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব তিন দিক থেকেই অবরুদ্ধ করা হয়। তিনি কোনো মিত্র খুঁজে পাননি এবং ফরাসিদের কাছ থেকে আসা সহায়তার প্রতিশ্রুতিও ব্রিটিশদের কঠোর নজরদারির কারণে সফল হয়নি।

বিশ্বাসঘাতকতা ও একাকিত্ব: টিপু সুলতান যখন যুদ্ধের ময়দানে বীরের মতো লড়ছেন, তখন তার প্রতিবেশী শাসকরা কেবল ব্রিটিশদের পক্ষে ছিল না, বরং যুদ্ধের পর মহীশূরের বিশাল ভূখ- নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য ব্রিটিশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিল। টিপুর পরাজয় শুধু একজন শাসকের পতন ছিল না, এটি ছিল ভারতের সকল আঞ্চলিক শক্তির ব্রিটিশদের কাছে মাথা নত করার এক ট্র্যাজিক উদাহরণ। রাজনৈতিক পরিণতির বিশ্লেষণ: এই যুদ্ধের পর মহীশূরকে একটি দেশীয় রাজ্যে (Princely State) পরিণত করা হয় এবং প্রাচীন ওদেয়ার (Wodeyar) রাজবংশকে পুতুল শাসক হিসেবে বসানো হয়। এটি ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতির চরম সাফল্য ছিল।

উপসংহার
টিপু সুলতানের লড়াই ছিল দেশীয় স্বাধীনতার শেষ রক্ষাকবচ। কিন্তু নিজাম এবং মারাঠাদের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্রিটিশদের কূটনৈতিক চাল ভারতের ভাগ্যে পরাধীনতার অন্ধকার ডেকে আনে। চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ প্রমাণ করে যে, ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের অভাবে কীভাবে শক্তিশালী শাসকরাও বিচ্ছিন্ন হয়ে ধ্বংসের মুখে পড়েন। টিপু সুলতানের মৃত্যু ছিল একটি যুগের সমাপ্তি, যার ফলে ব্রিটিশরা পুরো দক্ষিণ ভারতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত করে ফেলে। লেখক: কলামিস্ট, গবেষক

 

Ads small one

সাতক্ষীরায় প্রতি ১০ জনে ৭ কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় প্রতি ১০ জনে ৭ কিশোরী বাল্যবিবাহের শিকার

 

নিজস্ব প্রতিনিধি: নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা কাজের তাগিদে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। সাতক্ষীরা শহরের বাড়িতে একা হয়ে পড়া মেয়েটির ওপর তখন পরিবারের কার্যকর কোনো নজরদারি ছিল না। সেই সুযোগে স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পার হতেই সে জানতে পারে তার স্বামী একজন পেশাদার জুয়াড়ি। পাওনাদারদের চাপ, পারিবারিক কলহ আর স্বামীর শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের মুখে বাপের বাড়িতে ফিরে আসতে বাধ্য হয় সে। পরবর্তীতে পুনরায় পড়াশোনা শুরু করে সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষায় ‘এ-মাইনাস’ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। জীবনে বাল্যবিবাহের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে পেছনে ফেলে এই তরুণী এখন বিবাহ বিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী ওই কিশোরী উল্লেখ করেন, অবুঝ বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর সংসারে অশান্তি শুরু হয় এবং জানতে পারেন স্বামী নিয়মিত জুয়া খেলত ও ঋণের মধ্যে ছিল। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পরিবারের কাছে ফিরে এসে আবার পড়াশোনা শুরু করেছেন এবং ভবিষ্যতে নিজের মতো করে জীবন গড়ে তুলতে চান।
সাতক্ষীরা শহরজুড়ে আইনি ফাঁকফোকর, সামাজিক অবক্ষয় ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে শতশত কিশোরীর জীবন এভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালী গ্রামের কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রী ও পার্শ্ববর্তী ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের বাল্যবিবাহ সম্পন্ন হয়।
স্থানীয়রা জানান, কিছুদিন আগে এই কিশোর-কিশোরী এক সাথে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজনের মধ্যস্থতায় বৈঠকের মাধ্যমে উভয় পক্ষ থেকে লিখিত অঙ্গীকারনামা দেওয়া হয়েছিল যে, বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেওয়া হবে না। কিন্তু সেই অঙ্গীকারনামা অমান্য করে ছেলের বাবা রফিকুল ইসলাম সাতক্ষীরা জজ কোর্টের একজন আইনজীবীর মাধ্যমে এফিডেভিট করিয়ে ১৫ ও ১৬ বছরের দুই নাবালক-নাবালিকাকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন।
শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি অবগত থাকলেও আইনি ও দাপ্তরিক কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মহিলা বিষয়ক কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাহায্য না চাইলে পুলিশ সরাসরি গিয়ে অভিযান চালাতে পারে না।
শ্যামনগর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক জানান, খবর পাওয়ার পর অভিযুক্ত ছেলের বাবাকে কার্যালয়ে হাজির হওয়ার জন্য অফিশিয়াল নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং তিনি উপস্থিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে ছেলের বাবা রফিকুল ইসলামের দাবি, পরিস্থিতি বিবেচনা করে এফিডেভিটের মাধ্যমে সামাজিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের বর্তমান গড় হার দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশে, যার মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। উপকূলীয় এই অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও অতিরিক্ত লবণাক্ততায় নিয়মিত কাজ করার ফলে কম বয়সে মেয়েদের শরীরের ত্বক নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে সামাজিক ভীতি থেকে অভিভাবকেরা দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেন।
গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি হেলেনা বিলকিস জানান, ক্লিনিকে আসা গর্ভবতী নারীদের একটি বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এই বয়সে সন্তান ধারণের কারণে এবং অতিরিক্ত লবণাক্ত পরিবেশের প্রভাবে তাদের উচ্চ রক্তচাপ, এপিলেপসি ও রক্তস্বল্পতার হার বেশি। নদী পার হয়ে জেলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে অনেক প্রসূতির মৃত্যু ঘটে।
সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম বিপ্লব হোসেন জানান, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে মেয়ে এবং ২১ বছরের নিচে ছেলের বিয়ে বেআইনি। অসাধু নোটারি পাবলিক ও জালিয়াতি চক্র টাকার বিনিময়ে এফিডেভিট করে দিচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
মানবাধিকার কর্মী মাধব দত্ত জানান, কার্যকর নজরদারির অভাবের কারণেই অঙ্গীকারনামা থাকার পরও বাল্যবিবাহ রোখা যাচ্ছে না। স্থানীয় সরকারের উদ্যোগ ও সঠিক সনদ যাচাই ছাড়া বিবাহ রেজিস্ট্রি বন্ধ করা প্রয়োজন।
সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার জানান, গোপনে ও এফিডেভিটের অপব্যবহার করে বিয়ে সম্পাদন করার কারণে সব ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হয় না, তবে স্থানীয় নজরদারি জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রতাপনগরে প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক কর্মশালা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ণ
প্রতাপনগরে প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক কর্মশালা

সংবাদদাতা: আশাশুনির প্রতাপনগরে প্রাথমিক চিকিৎসা, নিরাপদ অপসারণ ও আগাম সতর্কবার্তা বিষয়ক পরিবারভিত্তিক ওরিয়েন্টেশন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘আইডিয়াল’-এর বাস্তবায়নে, ‘সিডিডি’-এর কারিগরি সহায়তায় এবং ‘লিলিয়ান ফন্ডস’-এর অর্থায়নে ‘রেজিলেন্স বিগিনস এট হোম’ প্রকল্পের অধীনে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় ২৫ জন প্রতিবন্ধী শিশুর কেয়ারগিভার অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিদর্শক মো. ইলিয়াস হোসেন। বক্তব্য দেন প্রকল্পের প্রজেক্ট অফিসার মো. মামুন আলী ও প্রজেক্ট ফোকাল এস এম মিজানুর রহমান।

আজকের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৫ অপরাহ্ণ
আজকের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের ৬টি হিন্দু পরিবারের ২৫ শতক জমি দখল করে বানানো খুপড়ি ঘর ও বেড়া আজ সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে অপসারনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় কালিগঞ্জ থানার গোলঘরে অনুষ্ঠিত এক সালিশি সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে গত ১৪ আগস্ট রাতে গ্রাম পুলিশ সাইফুল ও তার সহযোগীরা জয়দেব রজক ও বাসুদেব রজকসহ ছয়টি পরিবারের জমিতে খুপড়ি ঘর নির্মাণ করে জমি দখল করে নেয়। পরবর্তীতে বাসুদেব রজক ও রীনা রানী রজক থানায় পৃথক দুটি অভিযোগ দায়ের করলে শালিসি সভা ডাকা হয়।
সাবেক ইউপি সদস্য আনারুল মীর জানান, সাইফুলের পক্ষ থেকে জমির সপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় আজ সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে অবৈধ ঘর ও বেড়া সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শালিসি সভায় দক্ষিণ শ্রীপুর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহম্মদ শাহজী, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জুলফিকার সাঁফুই ও সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান পাড় উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্তনামায় স্বাক্ষর করেন। কালিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক মল্লিক মনিরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম হাওলাদারকে বদলী করে সাতক্ষীরা আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে মো. শাহীন যোগদান করেছেন।