শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা, তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৪৫ অপরাহ্ণ
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা, তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা

টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যেই দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের ষষ্ঠ দিনের পরীক্ষা। সোমবার (১৩ জুলাই) দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোমরসমান পানি পেরিয়ে, নৌকা ও ভ্যানে চড়ে চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে দেখা গেছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তারা চলমান পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন।

বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এর আওতাধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। তবে অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়। রবিবার (১২ জুলাই) রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকা তলিয়ে গিয়েছিল। এতে করে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা বাতিল করে স্কুল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে। সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কেন্দ্রগুলোতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে উপস্থিত হন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। অনেক এলাকায় রবিবারের বৃষ্টির পানি এখনও জমে আছে। নতুন করে বৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা।

দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যার কারণে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে পানি জমে যায় এবং উপজেলার শত শত পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকে পড়ে। এছাড়া কুমিল্লার সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ও ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজ কেন্দ্রেও ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে— তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা নৌকা, ভ্যান ও কোমরসমান ময়লা পানি পেরিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে। অনেকেই এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে সোমবারের পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্তকে অমানবিক বলে উল্লেখ করেন। তবে শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও তাদের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে।

রবিবার দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের রবিবারের নবম শ্রেণির অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা, দশম শ্রেণির প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা এবং একাদশ শ্রেণির ব্যবহারিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অতি বৃষ্টির কারণে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম থেকে নবম শ্রেণির দ্বিতীয় সাময়িক সিটি পরীক্ষা ও ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলের দাদশ শ্রেণির ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া, দশম শ্রেণির প্রাক-নির্বাচনি পরীক্ষা স্থগিত করে ১৭ জুলাই নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

একই কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোমবারের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সরকার কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে অনেকেই সোচ্চার হচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে অনেকেই বলছেন, বন্যা, জলাবদ্ধতা, বৃষ্টিতে আগে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভাবা উচিত। একটি পরীক্ষার তারিখের চেয়ে হাজারো শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও সমান সুযোগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পরীক্ষা দিচ্ছে। মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে হলেও পরীক্ষা স্থগিত করা উচিত। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে কেউ কেউ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছেন।

ফেসবুকে একজন পরীক্ষার্থী লিখেছেন, টানা বৃষ্টি, রাস্তায় জলাবদ্ধতা এবং বাসায় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় বসতে হবে। বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলোচনা করে এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় পরীক্ষা নেওয়া বা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যেসব পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে, সেগুলো পরে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও লিখছেন, আমরা চাইনি পরীক্ষা পেছাতে। এমন না যে স্টুডেন্টরা সারাবছর পড়ালেখা করে নাই, তাই বলে পরীক্ষার আগে আসছে এসব বলতে। কিন্তু আপনারা একবার ভেবে দেখেছেন— যেই ছেলেটার বাসা অব্দি পানি উঠে আছে, সেই ছেলেটা কি এখনও ঘুমাতে পারছে? তার প্রিপারেশনটা কি ঠিক মতো নিতে পেরেছে? বলতে পারেন সবার তো এমন হয় নাই, কিন্তু কিছু কিছু এরিয়াতে অবশ্যই হয়েছে এবং ড্যাম শিউর অনেক এক্সাম হলেও পানি উঠে আছে। ঢাকা শহরের অধিকাংশ জায়গায় এখনও পানির নিচে। একে তো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ের আগে এক দিন গ্যাপ, তার ওপর আবহাওয়া ও পরিস্থিতি এতটা বাজে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে একটাই প্রশ্ন — কী এমন হতো যদি এই এক্সামটা কালকে না নিতেন? কী এমন হয়ে যেতো? না রাখতে পারলেন আপনাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর না রক্ষা করতে পারলেন— সকল বোর্ডের অধিকার। উল্টো সকল বোর্ডের নাম করে স্ট্যান্ডার্ডহীন প্রশ্ন হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন। মনে রাখবেন, লাখো লাখো শিক্ষার্থীর অভিশাপ নিজের কাঁধে নিয়ে রেখেছেন।

শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত সরকারের। আমরা নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘‘মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দাবি পুনর্বিবেচনা করুন। টানা বৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ আজ চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। চট্টগ্রামসহ অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অসংখ্য পরিবার। আবহাওয়া অধিদফতরও আগামী ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। সিলেট ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা এবং তাদের অভিভাবকরা গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক জায়গা থেকে পরীক্ষা স্থগিতের দাবিও উঠেছে। আজকে পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় নিশ্চয়ই আপনাদের চোখে পড়েছে।’’

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘‘শিক্ষামন্ত্রীর কাছে বিনীত আহ্বান, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাদের দাবিটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। পরীক্ষা পেছালে মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক অ্যাকাডেমিক প্লানে নতুন করে কিছু জটিলতা তৈরি হবে এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি একজন শিক্ষার্থী সারা জীবনে একবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে এবং তার ফলাফল পরবর্তী জীবনের প্রত্যেকটি ধাপে ইম্প্যাক্ট রাখবে, এটাও সত্য। কোনও শিক্ষার্থী যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লাইফ টাইম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের কোনও ধরনের ক্ষতি হলে, তার দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারবে না।’’

 

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘‘আমাদের প্রতিবছরই জুলাই-আগস্ট মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি হয়। পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে তো আর এটা ফ্লেক্সিবল হতে পারে না। সেই জায়গায় যে বিষয়টা হচ্ছে— এলনিনো বলে একটা বিষয় আছে, আবার ‘লা নিনা’ আছে । যেটা প্রশান্ত মহাসাগরের স্রোত ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর ফলে কখনও খরা বেশি হয়— কখনও বন্যা বৃষ্টিপাত বেশি হয়, লা নিনার প্রভাবে বৃষ্টিপাত বেশি হয়, এবার লালিনার বছর। আমাদের যারা আবহাওয়া নিয়ে কাজ করেন তারা জানেন যে, এ বছর আমাদের বৃষ্টি-ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এগুলো অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি হবে। সেই জায়গায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে যদি আমাদের এই পাবলিক পরীক্ষার রুটিনগুলোকে একটু রি-অ্যাডজাস্ট করা হয়— তাহলে পরীক্ষার্থীদের জন্য ভালো হয়। পরীক্ষার্থীরা যখন একটা রুটিন পায়, তাদের একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকে, পরীক্ষার্থীদের তাদের অভিভাবকদের এবং স্কুলের শিক্ষকদেরও প্রস্তুতি থাকে।’’

তিনি বলেন, ‘‘বিদ্যালয়ের সেই প্রস্তুতির জায়গায় ওপরের ম্যানেজমেন্ট আছে, কিন্তু এক্সিকিউশন লেভেলে তো তারা আছে— তাদের ওই জায়গাটাকে ফ্যাসিলিটেট করার জন্য আবহাওয়া অধিদফতরের সাথে আমাদের মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগটা আরও দৃঢ় হওয়া দরকার বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।’’

Ads small one

সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এম শফিকুল ইসলাম: পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কোমলমতি শিশুরা। অসতর্কতার কারণে শিশুদের অকাল মৃত্যু নিয়ে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ডিজাস্টার ফোরাম জেলা ভিত্তিক অনুসন্ধান চালিয়ে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। পরিসংখ্যানে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে।

 

পরিসংখ্যানে তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ দেবাহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামের একটি মাছের ঘেরের পানিতে পড়ে আসমাউল হুসনা (২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে ১৪ জুলাই তালা উপজেলার ধামসা ঢ্যামসাখোলা গ্রামের বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে রুমানা খাতুন (৫) নামক এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে পৃথক দুটি ঘটনায় শান্ত (৫) এবং ফাহিম (৩) নামের দুটি শিশুর পুকুর ও বেতনা নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

 

২২ মে কালীগঞ্জ উপজেলার মাগরি গ্রামে পুকুরে গোসল করতে নেমে জান্নাতুল (১১) নামে এক শিশু প্রাণ হারায়। একই উপজেলার ২৩ মার্চ সন্ন্যাসীচক গ্রামের নানা বাড়িতে এসে মাছের ঘেরের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনি, কলারোয়া, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জে একই দিনে পৃথক ঘটনায় ৪টি শিশু ও ১ জন কিশোর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

ডিজাস্টার ফোরামের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পানিতে ডুবে ৫৮২ জন শিশু প্রান হারিয়েছে। ডুবে মৃত্যুর মধ্যে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২৫২ জন এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৫১ জন ছেলে ও কন্যাশিশু রয়েছে। ডিজাস্টার ফোরামের আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১ হাজার ৩১১ জন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৮৪ জন। যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ। মৃত শিশুদের মধ্যে ছেলে ৭৬১ জন এবং মেয়ে ৪২৩ জন।

 

মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৩১ জনের বয়স ছিল ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। ওই সময়ে পুকুরে ডুবে ৭৬৫ জন, নদীতে ডুবে ১৮৫ জন এবং মাছের ঘের ও ডোবার পানিতে ডুবে ১০৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ জুলাই দেশব্যাপী ‘বিশ্ব পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়েছে। যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল,’ ইউনাইট টু টার্ন দ্য টাইট’ বাস স্্েরাতের মোড় ঘোরাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান”।

 

ডব্লিউএইচও এর পরিসংখ্যান বলেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, গ্রাম, শহর ও নগরকেন্দ্রীক পরিবারদের সচেতনতার অভাব, গাফিলতি, অন্যমনস্ক এবং অজ্ঞতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী