রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

ধুলিহরে পূর্ববিরোধের জেরে যুবককে গাছে বেঁধে মারধর ও মব সৃষ্টির বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ণ
ধুলিহরে পূর্ববিরোধের জেরে যুবককে গাছে বেঁধে মারধর ও মব সৃষ্টির বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি

নিজস্ব প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের চাঁদপুর মালির মোড়ে পূর্ববিরোধ ও আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে এক যুবককে আটকে রেখে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভিডিও প্রচার ও অপপ্রচারের মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয় করার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সৌরভ বিশ্বাস। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল ১১টায় বি.ডি.এফ (ব্রহ্মরাজপুর-ধুলিহর-ফিংড়ি) প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেন সৌরভ। তিনি ধুলিহর ইউনিয়নের বেড়বাড়ি ডাকের বটতলা গ্রামের রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ছেলে।

লিখিত বক্তব্যে সৌরভ বলেন, গত ৪ নভেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোটরসাইকেল বন্ধক ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে কথা বলতে তিনি চাঁদপুর মালির মোড়সংলগ্ন একটি বাড়িতে যান। বেনেখালি গ্রামের আয়ুব আলীর কাছ থেকে তিনি একটি মোটরসাইকেল বন্ধক নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে মমতাজ বেগম ও ফজর আলী মধ্যস্থতা করেছিলেন বলে তাঁর দাবি।

সৌরভের ভাষ্য অনুযায়ী, জরুরি প্রয়োজনে পাঁচ হাজার টাকা দরকার হওয়ায় ঘটনার দিন তিনি মমতাজ বেগমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। মমতাজ তাঁকে জানান, তিনি সাবিনা খাতুনের বাড়িতে রয়েছেন। পরে সেখানে গিয়ে আয়ুব আলীর সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন সৌরভ। এ সময় মোটরসাইকেল ফেরত দেওয়া ও আর্থিক লেনদেনের হিসাব নিয়ে আলোচনা চলছিল।

সৌরভ অভিযোগ করেন, কিছুক্ষণ পর বাড়ির বাইরে লোকজন জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে বাড়ির মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে কয়েকজন তাঁকে টেনেহিঁচড়ে উঠান থেকে বের করে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন। এ সময় লাঠিসোঁটা, চড়-থাপ্পড় ও ঘুষি মারা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, একটি আর্থিক লেনদেনের বিষয়কে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে রূপ দিয়ে তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে। মমতাজ বেগমের সঙ্গে তাঁর কোনো অনৈতিক সম্পর্ক ছিল না দাবি করে সৌরভ বলেন, পুরো বিষয়টি মোটরসাইকেল বন্ধক ও আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত।

লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও দাবি করেন, মমতাজ বেগমের স্বামী ফজর আলীর পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের আগে থেকেই বিরোধ রয়েছে। এর আগে তাঁদের বাড়িঘর ও বারান্দা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ঘটনার দিন ৩০ থেকে ৪০ জন যুবক সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি। এ সময় স্থানীয় কয়েকজনের পাশাপাশি শাহীন নামে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সৌরভ।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও ও লাইভে পূর্ণাঙ্গ ঘটনা যাচাই না করে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সৌরভের অভিযোগ, কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই, বক্তব্য শোনা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের অপেক্ষা না করে কাউকে জনসমক্ষে অভিযুক্ত ও হেয় করার প্রবণতা ব্যক্তির মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তিনি জানান, স্থানীয় লোকজন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে ব্রহ্মরাজপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও সাতক্ষীরা সদর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে তাঁদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। আদালতের মাধ্যমে তাঁরা জামিন পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে সৌরভ বলেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সমাধান করাই নিয়ম। কাউকে আটকে রাখা, গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার বসিয়ে জনমত তৈরির অধিকার কারও নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার, কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ জনতার নয়।

তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, মারধর ও আটকে রাখার অভিযোগ যাচাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সৌরভ বলেন, ‘আমি কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাই না। আমি শুধু প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ ও ন্যায়বিচার চাই।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত মমতাজ বেগম, সাবিনা খাতুন ও ফজর আলী সৌরভের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।

Ads small one

সাতক্ষীরায় বছরে ২২ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় বছরে ২২ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদন

পত্রদূত ডেস্ক: অর্থকরী ফসল হিসেবে সাতক্ষীরায় সুপারি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া যায় বলে নতুন নতুন সুপারির বাগান গড়ে তুলছেন চাষিরা। এতে বাড়ছে উৎপাদন, পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলায় বছরে প্রায় ৫০০ টন সুপারি উৎপাদিত হয়। যার বাজারমূল্য ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার বেশি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পান চাষের পাশাপাশি সুপারি উৎপাদনেও এগিয়ে যাচ্ছে সাতক্ষীরা। গত পাঁচ বছরে জেলায় সুপারি চাষের জমি বেড়েছে প্রায় ২৫০ বিঘা। ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ১৫০ বিঘা জমিতে সুপারি চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০০ বিঘায়। এ মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৫০ টন সুপারি। শুকনা সুপারি কেজিপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে ৫০০ টন সুপারির বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

তিন বিঘা জমিতে সুপারির বাগান করেছেন তালা উপজেলার কুমিরা গ্রামের কৃষক অরবিন্দ কুমার। তিনি বলেন, নারকেলসহ বিভিন্ন গাছের সঙ্গে সুপারি গাছ লাগিয়েছেন। একটি সুপারি গাছে ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। তাঁর বাগান থেকে বছরে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার সুপারি বিক্রি হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাগান থেকেই পাইকারি দামে সুপারি কিনে নিয়ে যান। তাঁর গ্রামের অনেক কৃষক পানবরজের পাশাপাশি সুপারি চাষ করছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পাটকেলঘাটা বাজারে সপ্তাহে দুই দিন—মঙ্গলবার ও শুক্রবার—সুপারি ও পান কেনাবেচার বড় হাট বসে। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এই হাটে সুপারি আসে। পাশাপাশি যশোর ও খুলনা থেকেও পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখানে সুপারি কিনতে আসেন।

বাজারের সুপারি আড়তদার হযরত আলী বলেন, সপ্তাহে দুই দিন তাঁর আড়তে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে সুপারি ও পান কিনে নিয়ে যান।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রাজারবাগান এলাকার সুপারি ব্যবসায়ী প্রণব চ্যাটার্জি জানান, কাঁচা ও শুকনা—দুই ধরনের সুপারিরই ভালো চাহিদা রয়েছে। তিনি প্রতিদিন পান ও সুপারি বিক্রি করেন। প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার পাটকেলঘাটা বাজার থেকে পাইকারি দামে পান ও সুপারি কেনেন। প্রতি হাজার কাঁচা সুপারি কিনতে হয় ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। আর শুকনা সুপারি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ৪৫০ টাকা দরে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, পান ও সুপারি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। জেলায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সুপারি উৎপাদিত হচ্ছে। অনেকে বাড়ির আঙিনায় সুপারির বাগান করছেন। আবার কেউ কেউ অন্য ফসলের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবেও সুপারি চাষ করছেন।

শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উৎসব আজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ
শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উৎসব আজ

পত্রদূত ডেস্ক: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্যামাপূজা (কালীপূজা) ও দীপাবলি আজ রোববার। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে সাধারণত শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। শক্তি ও শান্তির দেবী শ্যামা মায়ের পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে চলছে নানা আয়োজন। উৎসবকে ঘিরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস।

বাঙালি সংস্কৃতিতে কালীপূজা ও দীপাবলির উৎসবের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আলোর উৎসব দীপাবলিকে বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ‘দীপাবলি’ বললেও অবাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি ‘দিওয়ালি’ নামে পরিচিত। ধর্মীয় এই উৎসবকে অনেকে ‘দীপান্বিতা কালীপূজা’ও বলে থাকেন। অশুভ ও অকল্যাণের প্রতীক অন্ধকার দূর করে শুভ ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শত শত বছর ধরে এই উৎসব পালন করে আসছেন। বাঙালি, অসমীয়া ও ওড়িয়া হিন্দুরা এই তিথিতে কালীপূজা উদ্‌যাপন করেন।

পঞ্জিকামতে, রোববার দুপুর ১টা ২ মিনিটে অমাবস্যা তিথি শুরু হবে, যা শেষ হবে আগামীকাল সোমবার বেলা ১১টা ৫৮ মিনিটে।

কালীপূজা সাধারণত মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত হয়। একই তিথিতে কালীপূজার পাশাপাশি অনেকে লক্ষ্মীপূজাও করবেন। কালীপূজার দিন সন্ধ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বাড়িতে ও শ্মশানে প্রদীপ প্রজ্বালন করে প্রয়াত পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনকে স্মরণ করেন।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, সবুজবাগ থানাধীন শ্রীশ্রী বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, পুরান ঢাকার রাধাগোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দির, পোস্তগোলা মহাশ্মশান, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও বাংলাবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ ও মন্দিরে শ্যামাপূজার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

আলো ও উৎসবের এক মহামিলন দীপাবলি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ
আলো ও উৎসবের এক মহামিলন দীপাবলি

প্রকাশ ঘোষ বিধান

দীপাবলি বা দেওয়ালি হলো আনন্দ, আলো ও উৎসবের এক মহামিলন। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক উৎসব। সংস্কৃত ‘দীপ’ (আলো) এবং ‘আবলি’ (সারি) শব্দ দুটি মিলে ‘দীপাবলি’ শব্দের উৎপত্তি, যার শাব্দিক অর্থ প্রদীপের সারি। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। এই উৎসব মূলত আধ্যাত্মিক অন্ধকার দূর করে আলোর প্রতিষ্ঠা, মন্দের ওপর ভালোর জয় এবং অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের বিজয়ের প্রতীক।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ও দেদীপ্যমান উৎসব হলো দীপাবলি। শরৎ ও হেমন্তের সন্ধিক্ষণে, যখন চারদিকে প্রকৃতিতে হিমেল হাওয়া ও মৃদু অন্ধকার নেমে আসে, তখন কোটি কোটি প্রদীপের আলোয় মর্ত্যভূমিকে স্বর্গীয় আভায় রাঙিয়ে তোলে এই উৎসব। বর্ণিল আলোকসজ্জা, আতশবাজির রোশনাই এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে এই দিনটি আবালবৃদ্ধবনিতাকে এক অনাবিল আনন্দে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

দীপাবলি উৎসবের পেছনে একাধিক ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের বিশ্বাসমতে, রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করে ১৪ বছরের বনবাস শেষে এই দিনেই শ্রীরামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষ্মণসহ অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন। তাঁদের স্বাগত জানাতে অযোধ্যাবাসী সমগ্র নগরী ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকময় করে তুলেছিলেন।

দক্ষিণ ভারতে বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী অসুর নরকাসুরকে বধ করে মর্ত্যবাসীকে স্বস্তি দিয়েছিলেন। শুধু হিন্দুধর্মেই নয়, জৈনধর্মাবলম্বীদের মতে, ৫২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই দিনে মহাবীর মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেন। আবার শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ ৫২ জন রাজপুত্রসহ এই দিনে কারামুক্ত হয়েছিলেন বলে শিখ সম্প্রদায় দিনটিকে ‘বন্দী ছোড় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে।

দীপাবলি সাধারণত পাঁচ দিনব্যাপী একটি উৎসব, যার প্রতিটি দিনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। উৎসবের মূল দিনটিতে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মাটির তৈরি প্রদীপ, মোমবাতি এবং আধুনিক নানা ধরনের আলোকসজ্জায় পুরো বাড়ি সাজানো হয়। দরজার সামনে রঙিন গুঁড়ো বা আবির দিয়ে তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন আলপনা বা রঙ্গোলি। বাঙালি সমাজে দীপাবলির আগের দিন ভূত চতুর্দশী উপলক্ষে ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো এবং ১৪ শাক খাওয়ার নিয়ম রয়েছে। দীপাবলির রাতে পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে শ্রীশ্রী কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে দেবী লক্ষ্মী ও গণেশের পূজা করা হয়। আনন্দ ভাগ করে নিতে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মধ্যে মিষ্টি ও উপহার বিতরণ করা হয়।

দীপাবলি জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে মানুষকে একত্রিত করে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে এই উৎসবের সার্বজনীন রূপ দেখা যায়। অনেক দেশে এ উপলক্ষে সরকারি ছুটিও থাকে। এটি কেবল বাহ্যিক আলোর প্রদর্শনী নয়; মানুষের অন্তরের কুসংস্কার, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির আলো জ্বালানোর এক মহান বার্তা বহন করে।

উপনিষদের সেই অমর বাণী—‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’, অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আমাদের আলোতে নিয়ে যাও—দীপাবলির মূল চেতনাকে ধারণ করে। আধুনিক আলোকসজ্জা বা আতশবাজির চেয়েও দীপাবলির প্রকৃত সার্থকতা লুকিয়ে আছে মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে সমাজে শান্তি, ভালোবাসা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে।

দীপাবলি জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সর্বজনীন সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। মাটির টিমটিমে প্রদীপের ঐতিহ্য আজ আধুনিক চিনে আলোর ঝলকানিতে কিছুটা রূপ পাল্টালেও এর অন্তর্নিহিত আবেদন চিরন্তন। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশের কথা মাথায় রেখে শব্দবাজিমুক্ত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব দীপাবলি উদযাপনের চেতনা ছড়িয়ে পড়ছে। প্রদীপের আলো যেমন চারপাশের অন্ধকার দূর করে দেয়, তেমনি দীপাবলির আলো প্রতিটি মানুষের জীবনকে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে তুলুক—এটাই হোক এই উৎসবের প্রার্থনা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট