মো. খলিলুর রহমান
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্েযর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো সরকারি উন্মুক্ত খালগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি খাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষ, কৃষক এবং পরিবেশবাদীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জনসাধারণের মনে এখন একটাই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত সরকারি খাল কেন ইজারা দেওয়া হবে?
ভূমি মন্ত্রণালয় তথ্যসুত্র বলছে, সরকারি জলমহাল বা খাল ইজারা দেওয়ার পেছনে মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে যেমন সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি,উন্মুক্ত খালগুলো থেকে মাছ চাষ বা অন্য কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। রক্ষণাবেক্ষণ ও অবৈধ দখল রোধ, ইজারা গ্রহীতা খালের দেখভাল করবেন, যার ফলে অনেকে মনে করেন এর মাধ্যমে খালের অবৈধ দখলদারিত্ব কমবে এবং খালের নাব্যতা বজায় থাকবে। পরিকল্পিত মৎস্য চাষ করে যুব সমাজ বা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে স্বাবলম্বী করতে অনেক সময় শর্তসাপেক্ষে খাল ইজারা দেওয়া হয়। প্রকৃত পক্ষে এসব উদ্দেশ্য কাগজে কলমে সীমাবব্ধ থাকে।
সরেজমিন পরিদর্শন কালে বিভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে সামনে কাগজে কলমে সরকারের রাজস্ব আদায় ও আইন শৃঙ্খলার উদ্দেশ্যটি ইতিবাচক মনে হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত এবং অত্যন্ত জনদুর্ভোগপূর্ণ। ইজারা দেওয়ার পর উন্মুক্ত খালের চরিত্র বদলে সেটি একটি বাণিজ্যিক পুঁজিপতিদের ঘেরে পরিণত হয়, যার মাশুল দিতে হয় স্থানীয় লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে।কৃত্রিম সেচ সংকট ও কৃষির অপূরণীয় ক্ষতিকোনো একটি খাল ইজারা হওয়ার পরপরই ইজারা গ্রহীতারা বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য খালের বিভিন্ন পয়েন্টে আড়াআড়ি বাঁধ, নেট-পাটা বা বাঁশের ঘের তৈরি করেন। এর ফলে খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
শুষ্ক মৌসুমে (বোরো বা আমন চাষের সময়) যখন কৃষকদের জমিতে সেচের পানির তীব্র প্রয়োজন হয়, তখন ইজারাদাররা মাছের ক্ষতি হবে এই অজুহাতে কৃষকদের পাম্প বা সেচযন্ত্র দিয়ে খালের পানি নিতে বাধা দেয়। ফলে হাজার হাজার একর ফসলি জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয় এবং দেশের সার্বিক খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
বর্ষা মৌসুমে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার অভিশাপ ইজারাদারদের দেওয়া অবৈধ বাঁধ ও জাল-পাটার কারণ। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি বা উজান থেকে আসা পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে পারে না। পানি নিষ্কাশনের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত এবং মানুষের বাড়িঘর ও চলাচলের রাস্তা দিনের পর দিন পানির নিচে তলিয়ে থাকে। এই কৃত্রিম জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয় এবং মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে।
দরিদ্র ও প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা উন্মুক্ত খালে প্রাকৃতিকভাবে বড় হওয়া মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতেন, ইজারা প্রথার কারণে তারা আজ সম্পূর্ণ বেকার। ইজারা নেওয়ার পর খালের চারপাশ ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো পাহারা দেওয়া হয়। সাধারণ বা পেশাদার কোনো মৎস্যজীবীকেই খালের ধারেকাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না। ফলে গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আমিষের সহজ লভ্যতা কমে যাচ্ছে এবং তারা চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে।
দীর্ঘ লম্বা খালগুলো মহস্য সমিতির নামে ইজারা নিয়ে সে খাল গুলো খন্ড খন্ড করে ভাগ করে বিভিন্ন জনের নামে লিজ দেওয়া। যার ফল স্বরুপ হচ্ছে পানি চলাচলে বাঁধাগ্রস্থ। সেই ধবংস হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ।
সাধারণ মানুষ,কৃষক ও জেলে পরিবারের সাথে আলাপকালে তাদের উদ্বেগ ও বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারি খাল ইজারা দেওয়ার ফলে স্থানীয় কৃষি ও জনজীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
একাধিক ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন,খাল ইজারা নেওয়ার পর ইজারাদাররা সেখানে বাঁধ বা জাল দিয়ে পানি আটকে রাখেন। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সাধারণ কৃষকরা চাষাবাদের জন্য পানি পান না এবং বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
দেশের বড় একটা জনগোষ্ঠী মৎস্যজীবী তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে উন্মক্ত খাল থেতে মাছ শিকার করে। ইজারা দেওয়ার পর এসব মানুষের মাছ ধরার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের বার্ষিক সামান্য কিছু টাকা রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে গ্রামীণ অঞ্চলের কোটি কোটি টাকার কৃষি, পরিবেশ এবং সর্বসাধারণের পানির প্রাকৃতিক অধিকারকে বন্ধক রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত বা টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে কৃষি বিভাগ বারবার ফসলি জমি রক্ষা এবং উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন, সেখানে সেচের প্রধান উৎস উন্মুক্ত খালগুলোকে ইজারা দেওয়া একটি আত্মঘাতী নীতি।
সরকারি খাল কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের লাইফলাইন বা জীবনরেখা। তাই রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশ সরিয়ে রেখে, দেশের কৃষি খাতকে বাঁচাতে এবং সাধারণ মানুষের পানির প্রাকৃতিক অধিকার নিশ্চিত করতে সমস্ত সরকারি খাল ইজারা মুক্ত করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখাই হবে রাষ্ট্রীয় কল্যাণের প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ।