মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা: নীরবতা ভাঙার এখনই সময়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১১:২৫ অপরাহ্ণ
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা: নীরবতা ভাঙার এখনই সময়

নিকোলাস বিশ্বাস
নারী ও শিশু নির্যাতন কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কিংবা অপরাধের পরিসংখ্যানগত হিসাব নয়; এটি একটি সমাজের মানবিকতা, নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে সামনে আসছে। শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধগুলো আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক-সবক্ষেত্রেই এ ধরনের অপরাধ অহরহ ঘটছে। অপরাধীরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক কুসংস্কার এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অসহায় ও দুর্বল মানুষদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। আমাদের সমাজে নারী ও শিশুরা তুলনামূলকভাবে আর্থ-সামাজিক অবস্থানগত কারণে দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা প্রায়ই তাদের সহজ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা কেবল ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে বিঘিœত করে।
বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি ২০২৬ সালেও অত্যন্ত সংকটাপন্ন ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন দেশে চলমান সশস্ত্র সংঘাত, সম্মুখসারিতে কাজ করা মানবসেবা ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর তীব্র অর্থসংকট এবং লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কয়েক দশকের আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রায় প্রতি তিনজন নারীর একজন তার জীবদ্দশায় ঘনিষ্ঠ সঙ্গী কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

এর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত হয়রানি ও হুমকির মাধ্যমে নারী সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক আন্দোলনকারী ও পরিচিত ব্যক্তিত্বদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) শিশুদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান যৌন সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অপরাধীদের প্রতি ‘শূন্য-সহনশীলতা’ নীতি কার্যকর করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানের জন্য জোর দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা মারাত্মকভাবে বাড়ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক মাসেই সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে-যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর গত নয় মাসের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,০৪২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম অর্ধে ৪৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫ জন শিশু শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা অথবা যৌন নির্যাতনের পর করুণ পরিণতি হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে।
এছাড়াও সংগৃহীত উপাত্তসমূহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নির্দেশ করে: ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৮৬ শতাংশ শিশু শৃঙ্খলার নামে শারীরিক সহিংসতার মুখোমুখি হয় এবং দেশের ৪৭.২ শতাংশ কিশোরীর ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বাল্যবিবাহ হয়ে যায়। এছাড়া প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় সঙ্গীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন।
তবে এ তথ্যগুলো মূল ঘটনার একটি অংশমাত্র। সামাজিক কলঙ্ক, প্রতিশোধের ভয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং সামাজিক চাপের কারণে অধিকাংশ ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা নিতে পারেন না এবং আদালতের বাইরে আপস করতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশে ১০২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং ‘১০৯ ও ১০৯২১’ জাতীয় হেল্পলাইনের মতো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে চরম দুর্বলতা রয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নথিভুক্ত হওয়া ৫,৬০০টিরও বেশি যৌন সহিংসতার মামলার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ মামলায় আসামির শাস্তি বা রায় কার্যকর হয়েছে।
জরুরি ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশকে অতিসত্বর একটি ডেডিকেটেড ‘শিশু বিষয়ক বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন সংস্কার করতে হবে এবং পেশাদার ও সমাজভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কর্মী দল গঠন করতে হবে। সেই সাথে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বিত একটি কার্যকরী কর্মগোষ্ঠী গঠন করা প্রয়োজন, যা সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের মাধ্যমে অরক্ষিত নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দেবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে একটি স্থায়ী সুরক্ষা বলয়ে রূপান্তর করবে।
প্রযুক্তির বিকাশ অপরাধের ধরণ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়াকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। স্মার্টফোন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট এখন সবার হাতে থাকায় যেকোনো নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অতীতেও সহিংসতা হতো, কিন্তু প্রযুক্তি অপ্রতুল থাকায় এত দ্রুত তা সামাজিক প্রভাব তৈরি করতে পারতো না। সামাজিক মাধ্যমে নির্যাতনের বিষয় ছড়ানোর দুটি দিক রয়েছে:
ক) ইতিবাচক প্রভাব: অন্যায়ের ভিডিও বা ছবি জনমত গঠন করতে সাহায্য করে, অপরাধীকে দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে।
খ) নেতিবাচক প্রভাব: সহিংসতার ভয়াবহ দৃশ্য বারবার দেখার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে।
নারী ও শিশুদের ওপর এই মানসিক প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হয়। কোনো মা যখন একটি শিশুর ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখেন, তখন নিজ সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তার মনে স্থায়ী শঙ্কা তৈরি হয়। একইভাবে, প্রকাশ্যে কোনো নারীকে লাঞ্ছিত হতে দেখলে অন্য নারীদের মনে ভয় জন্মায় এবং তারা নিজেদের স্বাধীনতা ও চলাফেরা সংকুচিত করেন। এভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাও প্রযুক্তি মারফতে পুরো সমাজে এক যৌথ মানসিক আঘাত ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে।
এছাড়া প্রযুক্তির অসচেতন ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন না রাখা, সংবেদনশীল ছবি বারবার পোস্ট করা কিংবা গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার দ্বিতীয়বারের মত সামাজিকভাবে হেনস্থা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন। প্রযুক্তি কেবল একটি মাধ্যম; তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য।
দলীয় সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গণতান্ত্রিক চর্চায় মতাদর্শিক ভিন্নতা স্বাভাবিক, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ কখনোই কোনো ব্যক্তির ওপর অমানবিক অত্যাচারকে সমর্থন করতে পারে না।
গণপিটুনি, শারীরিক নির্যাতন, প্রকাশ্যে অপমান ও নৃশংসতা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে। ক্ষমতা প্রদর্শন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতাকে যখন নিয়মিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। একসময় মানুষের এই কষ্ট দেখে সমাজ উদাসীন হয়ে পড়ে, যা একটি অসুস্থ সামাজিক ব্যবস্থার লক্ষণ।
একইভাবে, পারিবারিক সহিংসতা একটি মারাত্মক কিন্তু গোপনীয় সমস্যা। পরিবার ও সমাজ প্রায়ই একে ‘ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয়’ বলে এড়িয়ে যায়। স্ত্রীর ওপর নির্যাতন, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা এবং বয়োবৃদ্ধ বা দুর্বলদের অপমান করা গুরুতর অপরাধ হলেও সম্মানহানি ও সংসার টিকিয়ে রাখার চাপে ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন। এই নীরবতা অপরাধীকে আরও উৎসাহিত করে। তাই পরিবার ও সমাজকে এ নীরবতা ভেঙে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে শুধু আইন সংশোধন বা আলোচনার আয়োজন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও বহুমুখী পদক্ষেপ:
১. কঠোর ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ: রাজনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার তোয়াক্কা না করে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘসূত্রতা বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস নষ্ট করে।
২. নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা: পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিশুদের সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও লিঙ্গসমতার শিক্ষা দিতে হবে। ছেলেদের শেখাতে হবে যে শক্তি কখনো অন্যকে নিপীড়নের অধিকার দেয় না। মেয়েদেরও তাদের অধিকার, আত্মরক্ষা এবং হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
৩. ভিকটিম দোষারোপ বন্ধ করা: সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা বা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে অপরাধীর ওপর থেকে দায় সরানোর মানসিকতা বাদ দিতে হবে। অপরাধের সমস্ত দায় সম্পূর্ণভাবে অপরাধীর; তবে ভুক্তভোগী সহানুভূতি ও আইনি সমর্থন পাওয়ার যোগ্য।
৪. গণমাধ্যম ও রাজনীতির দায়িত্ব: গণমাধ্যমকে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রেখে দায়িত্বশীল পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি মেনে চলতে হবে এবং কোনো অপরাধীকে দলীয় আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার বড় বড় অট্টালিকা, প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে নয়; বরং তার সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
নারী ও শিশুর সুরক্ষা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাজ, নাগরিক সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা অপরাধকে সমর্থন করার নামান্তর। আজ যে ঘটনা অন্যের পরিবারে ঘটছে, তা আগামীকাল আমাদের নিজেদের ঘরেও ঘটতে পারে।
আমাদের এমন এক সমাজ তৈরি করতে হবে যেখানে নারীরা ঘরে ও বাইরে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং শিশুরা ভয়হীন পরিবেশে বড় হবে। কোনো মতপার্থক্যই সহিংসতাকে বৈধ করতে পারে না। নীরবতা ভেঙে সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মাধ্যমেই আমরা একটি বাসযোগ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি। লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল-টঘঋচঅ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত

 

 

 

Ads small one

বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ণ
বর্তমান সমাজে বাল্যবিবাহ বেড়ে চলছে

শ্যামল শীল
দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া বাল্যবিবাহমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলো সভা-সমাবেশ এবং জনসাধারণ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের মানুষের মাঝে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে অনেকটা সচেতনতা গড়ে উঠেছে। এরই মধ্যে সরকার দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করেছে। তথাপিও বাল্যবিবাহের পরিমাণ আশাতীত হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবার বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। কিন্তু এ জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বা জ্ঞানটি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে—এমন পরিবারের সংখ্যা এখনো আশাপ্রদ নয়।
আমাদের দেশে বৈধ বিবাহের জন্য মেয়েদের ১৮ বছর আর ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে কোনো ছেলে বা মেয়ের বিয়ে মানে বাল্যবিবাহ। সরকারিভাবে প্রতিনিয়তই বাল্যবিবাহ বন্ধে অভিভাবকদের আহ্বান, শাস্তির ব্যবস্থাসহ সচেতনতার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারিভাবেও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবু কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বাল্যবিবাহ বা বাল্যবিয়ে নামের এই ব্যাধি।
আমাদের দেশের গ্রামগুলোতে একটা সময় গ্রাম্য পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধুমধাম করে, রং মাখামাখি করে বিয়ের উৎসব হতো। বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই মজার সব আয়োজন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না। এখন দেশে প্রতিদিন গড়ে যতগুলো বিয়ে হয় তার অর্ধেকের বেশি হয় অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। কোথাও কোথাও এমন গোপনে বিয়ে হয় যে, পাড়াপড়শিও জানতে পারে না খবরটি। এমনও দেখা যায়, এক বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে অথচ পাশের বাড়ির লোকজন বিষয়টি জানেই না। কেন এমন গোপনীয়ভাবে বিয়ে হচ্ছে? কেনইবা এত রাখঢাক? কারণ কী? আসলে কারণ একটাই, একসময় আমাদের দেশে বিয়ের কোনো বয়স ছিল না।
তথ্যানুসন্ধ্যানে এমন ঘটনাও পাওয়া যায়, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে গ্রামাঞ্চলে ছয়-সাত বছরের কোনো মেয়েশিশুর সঙ্গে ৮-১০ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ে পর্যন্ত হয়েছে। দুই পক্ষের অভিভাবকদের ইচ্ছাতে বিয়ে হলেও বিয়ের বর ও কনে জানতই না বিয়ে কী জিনিস। বর্তমান সময়ে ছয়-সাত বছর বয়সি মেয়েশিশুর বিয়ের খবর কোথাও খুঁজে পাওয়া না গেলেও অনেক গ্রামে এখনো ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুর সঙ্গে ১৫-১৬ বছরের ছেলেশিশুর বিয়ের খবর শোনা যায়। কোথাও কোথাও দরিদ্র পরিবারের ১১-১২ বছরের মেয়েশিশুকে এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের বয়োবৃদ্ধের কাছে বিয়ে দেওয়ার নজিরও চোখে পড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। আর এসব বিয়েতে সহায়তা করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি ও স্থানীয় কাজি। জনপ্রতিনিধিরা মেয়ে বা ছেলের বয়স বাড়িয়ে বা নাম বদলে জন্মনিবন্ধন করার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্য।
গ্রামের সমাজপতিরা অনেক ক্ষেত্রে এসব বিয়ের খবর জানেন। গোপনে এসব বিয়ে আয়োজনের খবর জেনেও তারা চুপচাপ থাকেন। কখনো কখনো বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সমাজের সচেতন মানুষ জানার পর প্রতিবাদ করলে মেয়ের পরিবার থেকে বলা হয়, স্কুলে বা বাড়িতে বখাটে যুবকরা মেয়েটিকে যন্ত্রণা দেয়। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েকে দ্রুত পাত্রস্থ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবার থেকে বলা হয়, গরিবের সংসারে মেয়েটি অনেকটা বোঝা। তাই ভালো বা পয়সাওয়ালা অথবা প্রবাসী পাত্র পেয়ে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এমন অনেক অজুহাত থাকে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে। কোনো কোনো স্থানে যিনি বিয়ে পড়ান তিনি ফতোয়া দেন পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কোটি কোটি মেয়ের ছয়-সাত বছরে বিয়ে হলো, কই কারো তো কোনো ক্ষতি হয়নি। এখন হবে কেন? আবার দেখা গেল যে, মৌলভী সাহেবকে বিয়ের জন্য ডেকে আনা হয় তিনি যদি বাল্যবিয়ে পড়াতে না চান, তবে সমাজপতিরা বাল্যবিয়ে পড়াতে তাদের বাধ্য করেন। এ অবস্থায় কখনো কোনো সচেতন মানুষ বা প্রশাসন যদি খবর পেয়ে বিয়ের মজলিশে উপস্থিত হন, তবে তিনি বা তাকে সদ্য কিনে নিয়ে আসা নতুন জন্মসনদটা দেখানো হয়। বিয়ে মজলিশে কেউ উপস্থিত হলে মানবতার দোহাইও দেয়া হয়। বলা হয়, ‘আজ বিয়ে ভেঙে গেলে এ মেয়েকে নিয়ে সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।’ সমাজে বর্তমানে এভাবেই চলছে বাল্যবিবাহ।
গ্রামাঞ্চলের অনেক অভিভাবক ভাবেন তার পরিবারের মানসম্মানের কথা, ভাবেন তিনি সমাজের অতিদরিদ্র একজন মানুষ। যেদিন তার কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল সেদিন থেকেই যেন পরিবারের কর্তার মাথায় একটা পাহাড়সম বোঝা চেপে বসল। সেদিন থেকেই চিন্তায় চিন্তায় তার জীবন যেন অন্ধকারময়! মেয়েটা একটু একটু বড় হওয়ার পর অভিভাবকের চিন্তার মাত্রাটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। কোনো মতে, ১১-১২ বছর হলেই পরিবারের কর্তার দিন-রাত দৌড় শুরু হয়ে যায় ঘটকের পেছনে। যেন কোনোমতে বিয়েটা দিতে পারলেই তিনি দম ফেলে বাঁচেন।
আসলেই কি তাই? মেয়েকে অপরিণত বয়সে বিয়ে দিয়ে পরিবারের কর্তা কি বাঁচলেন? অনেক ক্ষেত্রে এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। পরিবারের কর্তা নিজ হাতে তার কন্যার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করলেন। তিনি নিজেও ডুব দিলেন অমানিশার কালো অন্ধকারে। অপরিণত বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পর অধিকাংশ সময়ই প্রথম যে জিনিসটি সামনে আসে তা হলো, বিয়ের কিছুদিন পর স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়েটি এসে আর স্বামীর বাড়ি ফিরতে চায় না—এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে আমাদের সমাজে। যখন তার পুতুল খেলার বয়স, তখনই যদি থাকে সংসার নামক শৃঙ্খলে বন্দি করা হয়, তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি হয়ে থাকে। যখন অভিভাবকরা কোনোমতেই বুঝিয়ে-সুঝিয়েও মেয়েকে আর স্বামীর বাড়ি পাঠাতে পারেন না; তখন সমাজপতিরা এ নিয়ে বিচার-সালিসে বসেন। অথবা মামলা, থানা, আদালত করে সময় কাটাতে হয় অভিভাবকদের। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই তালাকের মাধ্যমে বিয়ের কবর রচিত হয়। আজকাল আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সময়ে যেসব স্বামী-স্ত্রীর তালাক হচ্ছে তাদের অধিকাংশই বাল্যবিবাহের শিকার। তাই বাল্যবিবাহের বিষয়ে সচেতন হতে হবে আমাকে-আপনাকে সবাইকে।
অল্প বয়সে বেশির ভাগ মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। দেশে মা ও শিশুমৃত্যুর মূল কারণ ১৮ বছরের কম বয়সিদের মা হওয়া। কিশোরী মায়ের মৃত্যুঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক মায়ের তুলনায় অন্তত চার গুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এক বেসরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। বাল্যবিবাহের কারণে মাতৃমৃত্যু কিংবা শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নাবালিকা মেয়ে মা হওয়ায় কীভাবে শিশুকে পরিচর্যা করবে, সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকে না। এর ফলে মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে। বাল্যবিবাহের কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুও ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশুর মৃত্যুঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, নারীশিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানা রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেতে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ বিরোধী পদক্ষেপের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃৃক্ত করতে হবে। সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মা ও শিশুর মৃত্যুহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
পরিশেষে বলতে চাই, আপনার অপরিণত মেয়েকে আপনার অভিলাষের বলি বানাবেন না। তার বিয়ের খরচ, মালামালের খরচ বা পাত্রপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী যৌতুক যা দেবেন, তা দিয়ে মেয়েটির লেখাপড়ার খরচ জোগান। দেখবেন লেখাপড়া করে ওই মেয়েটিই একসময় নিজের পায়ে দাঁড়াবে। হয়তো সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে বড়মাপের কর্মকর্তা হবে। তখন তাকে বিয়ে করার জন্য সমাজের উন্নত পরিবারের ছেলেদের লাইন পড়ে যাবে।
বর্তমান সরকার প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখেই এখন নতুন বই দিচ্ছে, শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে। এ ছাড়া বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ তো আছেই। তাহলে কেন আপনার দুমুঠো অন্ন সাবাড় করছে বলে তাকে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছেন? আসুন আপনি-আমি সবাই সচেতন হই এবং সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে বাল্যবিয়ে নামের ব্যাধিটা সমাজ থেকে চিরতরে বিদায়ের ব্যবস্থা করি। লেখক: সাবেক জবি শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ণ
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় সাতক্ষীরার আমন চাষিরা

 

এম শফিকুল ইসলাম
চলতি মৌসুমে আমন আবাদ ও ক্ষেত পরিচর্যায় অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বহন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাতক্ষীরার প্রান্তিক কৃষকরা। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পাওয়ার টিলার মালিকরা বিঘা প্রতি চাষ খরচ গত মৌসুমের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। এছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিঘা প্রতি মোট উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় সরকারের কাছে ধানের যৌক্তিক দাম নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সদর উপজেলার ভোমরা গ্রামের কৃষক শংকর ঘোষের মতে, জমিতে ফসল চাষ করে লাভ হচ্ছে না। বাজারে ধান বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বিঘা প্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এবার চাষ খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। তা ছাড়া প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার নিচে কোনো শ্রমিক মিলছে না। সারের দামও চড়া। সব মিলিয়ে এবার বিঘায় ৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও ধানের বাজারদর সুবিধাজনক নয়।
একই উপজেলার লক্ষ্ণীদাঁড়ি গ্রামের কৃষক আবু বক্করের ভাষ্য, ফসল উৎপাদন করে উপযুক্ত দাম না পেয়ে দিন দিন কৃষকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না মিললে পরিবার নিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে। জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষকদের অবস্থাও একই রকম।
তবে কৃষকরা যাতে লাভবান হতে পারেন, সে জন্য ফলন বাড়াতে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম। বর্তমানে ভরা আমন মৌসুমে জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ধান চাষ করে কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বছর সাতক্ষীরা জেলায় ৮০ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখান থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ উপকূলের বাল্যবিবাহ: প্রথা, প্রতারণা ও একটি সামাজিক বিপর্যয়

সাতক্ষীরা জেলায় প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে ৭ জনই বাল্যবিবাহের শিকারÑবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র। দৈনিক পত্রদূত পত্রিকার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে আইনি ফাঁকফোকর, সামাজিক ভীতি এবং নজরদারির অভাবে অকালেই ঝরে পড়ছে শত শত সম্ভাবনাময় প্রাণ। ১৫ বছর বয়সে ভুল সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসে নির্যাতন সহ্য করা, কিংবা ১৬ ও ১৫ বছরের দুই নাবালক-নাবালিকার এফিডেভিটের মাধ্যমে জোরপূর্বক আইনি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, সমাজে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
বাল্যবিবাহের পেছনে কেবল অসচেতনতা নয়, কাজ করছে নানাবিধ ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণ। উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র জলবায়ু সংকট, সুপেয় পানির তীব্র অভাব ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার ফলে কম বয়সে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের ভয় এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে অভিভাবকেরা দ্রুত বিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এই কিশোরীদেরই। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণ, লবণাক্ত পরিবেশের প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, এপিলেপসি ও চরম রক্তস্বল্পতায় তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে; এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন বহু প্রসূতি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আইনি ব্যবস্থার অসাদুপব্যবহার। ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭’ থাকা সত্ত্বেও অসাধু চক্র ও নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে জাল কাগজপত্র বা এফিডেভিটের দোহাই দিয়ে বেআইনি বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। উপরন্তু, স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর পারস্পরিক দায় চাপানো বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়ার মানসিকতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।
এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কঠোর ও সমন্বিত আইনি প্রয়োগ। জন্মসনদ যাচাইকরণ নিশ্চিতকরণ, অসাধু এফিডেভিট চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং স্থানীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সরাসরি দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য সংকট ও সামাজিক ভীতি দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ের অসময়ে বিয়ে শুধু একটি জীবনের পরাজয় নয়, বরং এটি পুরো সমাজের অগ্রগতিকেই পিছিয়ে দেয়।