বর্ষার জলে ভাসে স্বপ্ন-আশাশুনির নৌকার কারিগরের ঘামে লেখা বেঁচে থাকার গল্প
সচ্চিদানন্দ দে সদয়, আশাশুনি: দিগন্তজোড়া আকাশ কালো হতে শুরু করলেই আশাশুনির মানুষ বুঝে যায়-বর্ষা আর দূরে নয়। নদীর পানি ধীরে ধীরে ফুলে ওঠে, খাল-বিল ভরে যায়, আর একসময় সেই পানি ছাপিয়ে ঢুকে পড়ে গ্রামগঞ্জে। চারপাশ তখন যেন এক জলমগ্ন পৃথিবী। এই জলজ বাস্তবতায় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে একটি প্রাচীন সঙ্গী-নৌকা। আর সেই নৌকার প্রাণ সঞ্চার করেন যেসব কারিগর, তাদের হাতেই এখন ব্যস্ততার ছোঁয়া।
উপজেলার কুল্যা, দরগাপুর, রামনগর, প্রতাপনগর ও খাজরাসহ, কুন্দুডিয়া নদীতীরবর্তী বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়-কোথাও পুরোনো নৌকার গায়ে নতুন করে আলকাতরা লাগানো হচ্ছে, কোথাও কাঠের গন্ধে ভরে উঠেছে উঠান, আবার কোথাও হাতুড়ির শব্দে তৈরি হচ্ছে নতুন জীবিকার বাহন। বর্ষা আসার আগমুহূর্তে এ যেন এক নীরব উৎসব-কিন্তু এই উৎসব আনন্দের চেয়ে বেশি প্রয়োজনের, টিকে থাকার।
স্থানীয় অনেকেই জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে নৌকার ব্যবহার কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু বর্ষা এলেই এর অপরিহার্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন কাঁচা-পাকা রাস্তা ডুবে যায়, ক্ষেত-খামার পানির নিচে চলে যায়, তখন নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। কৃষক তার জমিতে যেতে, জেলে নদীতে জাল ফেলতে, গৃহস্থ তার গরুর খাদ্য আনতে কিংবা অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে-সব ক্ষেত্রেই নৌকার বিকল্প নেই।
এমনকি অনেক স্কুলপড়ুয়া শিশুর জন্য নৌকাই প্রতিদিনের স্কুলবাস। খরিয়াটি গ্রামের প্রবীণ নৌকা কারিগর বলাই মন্ডল স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ছোটবেলায় বাবার পাশে বসে কাঠ ঘষতাম, তখন বুঝিনি এই কাজটাই একদিন জীবনের ভরসা হবে। এখন সেই কাজই করছি। তবে আগের মতো ভালো কাঠ আর পাই না।”
তাঁর কথায় এক ধরনের আক্ষেপ ফুটে ওঠে। তিনি জানান, আগে উন্নতমানের কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হতো, যা বছরের পর বছর টিকে থাকত। এখন কড়ই, চাম্বল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “একটা নৌকা বানানো শুধু কাঠ জোড়া লাগানো নয়-এটা একটা শিল্প। কাঠের সঙ্গে মাটিয়া তেল, আলকাতরা, তারকাটা, গজাল-সবকিছু মিলিয়ে একটা নৌকাকে টেকসই করতে হয়।
১২ হাত লম্বা একটা নৌকা বানাতে ১৫-২০ দিন লাগে, মজুরি প্রায় ৩০/৪০ হাজার টাকা। কিন্তু সব সময় কাজ থাকে না, অর্ডার না পেলে বসে থাকতে হয়।” কারিগরদের এই জীবনে অনিশ্চয়তাও কম নয়। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়েই কাজের চাপ বাড়ে, বাকি সময় অনেকেই অন্য পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হন। তবুও তারা এই পেশা ছাড়তে পারেন না-কারণ এটি শুধু জীবিকা নয়, এটি তাদের পরিচয়, তাদের শিকড়।
আশাশুনির নদীভাঙন ও নিয়মিত প্লাবন এখানকার মানুষের জীবনকে করে তুলেছে কঠিন। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতায়ও তারা হার মানেনি। বরং নৌকাকে সঙ্গী করে তারা খুঁজে নিয়েছে বেঁচে থাকার উপায়। বর্ষা এলেই সেই সংগ্রাম আরও দৃশ্যমান হয়-আর তারই নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে গ্রামের উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা আধা-তৈরি নৌকাগুলো। এই জনপদে নৌকা শুধু একটি বাহন নয়, এটি জীবনের গল্প-যেখানে প্রতিটি পাটাতনে লেগে থাকে কারিগরের ঘাম, প্রতিটি কাঠের গাঁটে গাঁটে জড়িয়ে থাকে সংগ্রামের ইতিহাস। বর্ষা এলেই সেই গল্পগুলো আবার নতুন করে লেখা হয়-নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে, মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে।



