সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

বাদাবনের শেষ ডাক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ণ
বাদাবনের শেষ ডাক

শেখ সিদ্দিকুর রহমান:
প্রথম পর্ব: বাঘের ছায়া
শ্যামনগর উপজেলার সোরা গ্রাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে কালিন্দী নদীর বুক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি গোলপাতার ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘর। জোয়ারের সময় নদীর পানি উঠোন পর্যন্ত এসে থেমে যায়, ভাটায় কাদামাটির বুক চিরে বেরিয়ে পড়ে লাল কাঁকড়ার সারি। দূরে, নদীর ওপারে সবুজের এক অন্ধকার প্রাচীর সুন্দরবন। গ্রামের মানুষ তাকে বলে বাদাবন। সেই বন তাদের কাছে যেমন অন্নদাতা, তেমনি মৃত্যুরও আরেক নাম। সোরা গ্রামের মানুষ বনের দিকে তাকিয়ে বলে “বাদাবন যার মা, বাঘ তার ছায়া।” সেই ছায়াই একদিন গ্রাস করেছিল নৈমুদ্দীন গাজীকে।
সেদিনও ভোরের আকাশে কুয়াশা ছিল। বনবিবির থানে ধূপ জ্বালিয়ে, সাদা গামছা কাঁধে, কপালে হাত ঠেকিয়ে নৈমুদ্দীন বলেছিল- “মা বনবিবি, পেটের দায়ে যাচ্ছি। ফিরিয়ে আনো। তারপর পাঁচজন মৌয়ালের দল ডিঙি নৌকা ঠেলে কালিন্দী পেরিয়ে ঢুকে পড়েছিল মাদার নদীর দিকে। কিন্তু ফিরে এসেছিল চারজন। বিকেলে গ্রামের ঘাটে যখন নৌকাটি ভিড়ল, নৈমুদ্দীনের লাঠি, দা আর ছেঁড়া গামছা দেখে খালেদা বিবির বুক হাহাকার করে উঠেছিল।“মানুষটা কই?” কেউ উত্তর দিতে পারেনি। অনেকক্ষণ পরে একজন ফিসফিস করে বলেছিল “বড়মিয়া নিয়ে গেছে…” “বড়মিয়া” সুন্দরবনের মানুষ বাঘকে এই নামেই ডাকে। কথাটা শুনে দশ বছরের আবুল গাজী প্রথম বুঝেছিল, বনের কাছে মানুষ কত অসহায়।
তারপরের দিনগুলো যেন ঝড়ের পর ভাঙা বাঁধ। দুই মেয়ের বিয়ে আগেই দিয়েছিলেন নৈমুদ্দীন। সংসারে রইল শুধু খালেদা বিবি আর ছোট ছেলে আবুল। আবুল তখন সোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। বইয়ের পাতায় নদী, পাহাড়, বন পড়ত; কিন্তু তার নিজের জীবনের বনটা ছিল রক্তমাখা। খালেদা বিবি ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীতে নেমে যেতেন। কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাঁকড়ার খাঁচা, চিংড়ির বেহুন্দি জাল, খেপলা জাল নিয়ে সারাদিন কাটত। কখনো দশটা কাঁকড়া, কখনো আধা কেজি গলদা পোনা যা মিলত, তাই নিয়ে ভেটখালি বাজারে বিক্রি করতেন। অনেক দিন এমন গেছে, মা-ছেলে শুধু লবণ-মরিচ দিয়ে ভাত খেয়েছে। আবার কোনো কোনো দিন ভাতও জোটেনি। এক রাতে খালেদা বিবি দেখলেন, আবুল পড়ার বই খুলে বসে আছে, কিন্তু চোখের জল বইয়ের পাতায় পড়ছে।
“কিরে, পড়ছিস না কেন ? আবুল মাথা নিচু করে বলল, “মা, কাল থেকে আর স্কুলে যাব না।
“কেন? ‘খাতা কেনার টাকা নেই। মাস্টারমশাই বলেছেন ছেড়া বই বাঁধাই অথবা নতুন কিনতে’। “আমি আর টাকা দিতে পারব না”, এছাড়া খালেদা বিবি আর কিছু বলতে পারেননি। সেই রাতেই বাতাসে দুলছিল গোলপাতার চাল। বাইরে কালিন্দীর ঢেউ ভাঙছিল। একটি শিশুর স্বপ্নও সেদিন ভেঙে গিয়েছিল।
বছর গড়ায়। সময় মানুষের মুখ বদলে দেয়। দশ বছরের আবুল কুড়ি বছরের যুবক হয়েছে। দীর্ঘদেহী, রোগা, তামাটে রঙের মুখে কঠোর জীবনের রেখা। হাতের তালু শক্ত হয়ে গেছে বৈঠা বাওয়া আর নদীতে জাল টানতে টানতে। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি। বাবার রক্তমাখা গামছার স্মৃতি। প্রতিবার বাদাবনের দিকে তাকালেই তার মনে হতো, বন যেন তাকে ডেকে বলে- তোর বাবা আমার কাছে আছে… মায়ের কষ্টের কথা ভেবে আবুলের মনটা বিষণœ হয়ে ওঠে, তাকে অনেক টাকা রোজগার করতে হবে, মাকে আর এই বয়সে সে পরিশ্রম করতে দেবে না। একদিন সন্ধ্যায় খালেদা বিবি বাজার থেকে ফিরলেন। হাতে মাত্র এক মুঠো চাল। আবুল চুপচাপ বসে ছিল। হঠাৎ বলল, মা, আমি বনে যাব। খালেদা বিবির বুক কেঁপে উঠল। “না বাবা, ওই বন তোর বাপকে নিয়েছে। তোকে আর যেতে দেব না। না গেলে আমরা বাঁচব কী করে?” ঐ পাড়ার মোস্তাক,আনারুল, সবুর বনে যাবে মধু আনতে, আমিও ওদের সাথে যাবো বলেছি, ওরা আমাকে নিয়ে যাবে বলেছে”। কথাটা শুনে মা আর উত্তর দিতে পারলেন না। কেবল কান্না চেপে বললেন “তাহলে আগে বনবিবির দোয়া নিয়ে যাস। মানুষের জোরে বন জেতা যায় না। দুই দিন পরে ভোরে আবুল পৌঁছাল বুড়িগোয়ালিনী ঘাটে। সেখানে অপেক্ষা করছিল তিনজন অভিজ্ঞ মৌয়াল- মোস্তাক, সবুর আর আনারুল। তাদের নৌকায় তোলা হচ্ছিল মধু আহরণের সরঞ্জাম
ধামা, দা, ধোঁয়া তৈরির জন্য শুকনো পাটকাঠি ও নারকেলের ছোবড়া, মশাল, গ্যাসলাইট, দড়ি, বেতের ঝুড়ি, গামছা, লাঠি, পানির কলস, চিড়া-গুড়, আর ছোট একটি বনবিবির আসন লাল কাপড়ে মোড়ানো।
মোস্তাক আবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ভয় পাস? আবুল একটু হেসে বলল, ভয় পাই। কিন্তু অভাবকে আরও বেশি ভয় পাই। মোস্তাক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যে কথাটা বললি, সেই কথাই আমাদের সবাইকে বনে নিয়ে যায়। নৌকার দড়ি খুলে দেওয়া হলো। ভাটার স্রোত ধরে নৌকা ধীরে ধীরে কালিন্দী পেরিয়ে মাদার নদীর দিকে এগোতে লাগল। দূরে তখন সুন্দরবনের মাথার ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়েছে।সবুর বৈঠা টানতে টানতে গলা ছেড়ে বনবিবির গান ধরল- ‘বনবিবি মা, বাদার রানী, দাও গো সবার প্রাণ। গেওয়া-গরান, সুন্দরী বনে, ফিরি যেন নিরাপদ প্রাণ। বড়মিয়া যদি পথ আগলায়, রেখো মাগো মান। মধুর চাক আর সন্তানের মুখ, এই তো আমাদের টান’। চারজনের কণ্ঠ মিলিয়ে গেল নদীর বাতাসে। সামনে তখন কেবল সবুজ অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বুকেই অপেক্ষা করছিল এমন এক সকাল, যার কথা বহু বছর পরে সোরা গ্রামের মানুষও শিউরে শিউরে বলবে…হায়রে কপাল! দ্বিতীয় পর্ব: বনের ভেতর প্রথম পা মাদার নদীর বুক চিরে ডিঙি নৌকাটি ধীরে ধীরে সরু খালের মুখে ঢুকে পড়ল। নদীর খোলা আলো যেন এক মুহূর্তেই পিছনে রয়ে গেল। দুই তীরে গেওয়া, গরান, সুন্দরী আর পশুর গাছের ডালপালা মাথা নিচু করে এমনভাবে ঝুঁকে আছে, যেন তারা নিজেরাই পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে। সবুর গান থামিয়ে বৈঠা টেনে নিল। নৌকার গায়ে শুধু জোয়ারের পানির মৃদু চাপ। আর দূরে কোথাও অচেনা এক পাখির ডাক। মোস্তাক নিচু গলায় বলল, “এখান থেকে আর অকারণে কথা বলবি না। বনেরও কান আছে।” আবুল বিস্মিত চোখে চারদিকে তাকাল। বইয়ে সুন্দরবনের কথা পড়েছিল, কিন্তু এই নীরবতা বইয়ের পাতায় ছিল না। এখানে বাতাসও যেন শব্দ করে বইতে ভয় পায়। আনারুল নৌকার সামনের দিকে ইশারা করল।
“ওই যে দেখছিস, কেওড়ার শ্বাসমূল। ভুল করে পা দিলেই গেঁথে যাবে। সাবধানে নামবি।” জোয়ার তখন নামছে। কাদামাটির বুক ভেদ করে হাজার হাজার শ্বাসমূল সুঁচের মতো বেরিয়ে আছে। নৌকা ভিড়তেই চারজন একে একে নেমে পড়ল। পা ডুবল নরম কাদায়। এক ধরনের তীব্র নোনাজলের গন্ধে ভরে আছে চারদিক। মোস্তাক বনবিবির ছোট্ট আসনটি একটি গেওয়া গাছের গোড়ায় রেখে ধূপ জ্বালাল। চারজনই নীরবে মাথা নত করল। আবুলও মায়ের কথা মনে করে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ…ডান পাশের ঝোপে খস্… খস্…আবুল চমকে উঠল। লাঠিটা শক্ত করে ধরতেই সবুর মৃদু হেসে বলল, “ভয় পাস না। বাতাসও কখনো কখনো মানুষকে ধোঁকা দেয়।” কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আনারুলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে কাদার দিকে ঝুঁকে বসেছে।
“এইদিকে একবার আয়।” আবুল এগিয়ে গেল। কাদার ওপর স্পষ্ট কয়েকটি থাবার ছাপ। সে আগে কখনো বাঘের পায়ের ছাপ দেখেনি। তাই কিছু বুঝতে পারল না। মোস্তাক একবার তাকিয়েই গম্ভীর হয়ে গেল। সে নিচু হয়ে কাদায় হাত রাখল। তারপর খুব আস্তে বলল, পুরোনো নয়…সবুরের গলায় আর আগের দৃঢ়তা নেই। “কতক্ষণ হবে?” মোস্তাক চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, এক ঘণ্টাও না।” আবুলের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে অজান্তেই বাবার কথা ভাবল। ঠিক তখনই… বনের অনেক গভীর থেকে ভেসে এলো এক দীর্ঘ, কর্কশ সতর্ক ডাক। বানরের দল। মোস্তাক আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। “সবাই একসঙ্গে থাকো। কেউ আলাদা হবে না।” চারজন আবার ধীরে ধীরে বনের আরও গভীরে হাঁটতে শুরু করল। তাদের অজান্তেই, অনেক দূরে, গরান গাছের ঘন শিকড়ের আড়ালে কিছু একটা নিঃশব্দে সরে গেল… কেউ তা দেখল না। শুধু বনের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। মোস্তাক চারদিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “আজ আর সামনে যাওয়া ঠিক হবে না। জোয়ার বাড়ছে। এই খালের মুখেই নোঙর করি। রাতটা নৌকাতেই কাটবে। ভোরের আলো ফুটলেই মধুর চাকের খোঁজে বের হব।” কথা শেষ হতেই সবুর নোঙর ফেলল। আনারুল নৌকাটি একটি গেওয়া গাছের মোটা শিকড়ে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল। চারদিকে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলো। নদীর জলে জোয়ারের মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। আবুলের চোখে ঘুম এল না। অজানা এক আশঙ্কায় তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মনে হলো, ঘন অন্ধকারের আড়াল থেকে অদৃশ্য কেউ যেন নিঃশব্দে তাদের ওপর নজর রেখে আছে।
তৃতীয় পর্ব: নীরবতার ভেতর চোখ সূর্য তখন গাছের মাথা ছুঁয়ে ওপরে উঠেছে। সুন্দরবনের ভেতরেও আলো এসেছে, কিন্তু সেই আলো মাটিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। গেওয়া, গরান, সুন্দরী আর পশুর গাছের ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো চিকন সোনালি রেখা হয়ে কাদার ওপর পড়ছে। চারজন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। মোস্তাক সামনে, তার পেছনে আবুল। তারপর আনারুল ও সবুর।
প্রতিটি পা ফেলতে হচ্ছে দেখে-শুনে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও কেওড়ার শ্বাসমূল, কোথাও লবণাক্ত পানির সরু খাল। হঠাৎ মোস্তাক হাত তুলে ইশারা করল। সবাই থেমে গেল। সামনের একটি সুন্দরী গাছের অনেক ওপরে ঝুলছে বিশাল একটি মধুর চাক। হাজার হাজার মৌমাছি গুনগুন করছে। সবুর মৃদু হেসে বলল, “আজ বনবিবি মুখ তুলে চেয়েছেন। ধোঁয়া তৈরির জন্য শুকনো পাটকাঠি আর নারকেলের ছোবড়ায় আগুন ধরানো হলো। ধোঁয়া ধীরে ধীরে চাকের দিকে উঠতেই মৌমাছিরা অস্থির হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আনারুল গাছে উঠল। নিচে দাঁড়িয়ে আবুল থামা ধরে আছে। এক এক করে সোনালি মধু ঝরে পড়ছে। আবুলের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। মনে হলো আজ ফিরলে মায়ের হাতে শুধু একমুঠো চাল নয়, হয়তো নতুন একটি শাড়িও তুলে দিতে পারবে। ঠিক সেই সময়… বনের সব শব্দ যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল। মৌমাছির গুঞ্জন নেই। পাখির ডাক নেই। বাতাসের শব্দও নেই। মোস্তাকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে চারদিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “নাম… তাড়াতাড়ি নাম।
আনারুল কিছু না বুঝেই গাছ থেকে নেমে এল। আবুল ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? মোস্তাক কোনো উত্তর দিল না। সে কাদার ওপর ঝুঁকে রইল। একটি নয়… দুটি নয়… অনেকগুলো হরিণের পায়ের ছাপ এলোমেলো হয়ে ছুটে গেছে একই দিকে। যেন মুহূর্তের মধ্যে পুরো পাল আতঙ্কে পালিয়েছে। সবুরের ঠোঁট শুকিয়ে গেল। হরিণ এমন দৌড়ায় একটাই কারণে…” কথাটা শেষ করল না সে। কারণ বাকিটা সবারই জানা। হঠাৎ বাঁনরের দল গাছের মাথায় লাফাতে লাফাতে চিৎকার শুরু করল।
একটি… দুটি… তারপর একসঙ্গে অনেকগুলো। তাদের চোখ সব একই দিকে। মোস্তাক ফিসফিস করে বলল, “পিছিয়ে আয়… কেউ দৌড়াবি না। চারজন ধীরে ধীরে পেছাতে লাগল। আবুলের মনে হলো, ঘন গরান গাছের আড়াল থেকে কেউ তাদের দেখছে। সে তাকাল। কিছুই নেই। আবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই কাদার ওপর চোখ পড়তেই তার বুক হিম হয়ে গেল। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এক জোড়া বিশাল থাবার ছাপ। থাবার ভেতরে এখনো পানি জমেনি।
অর্থাৎ… কিছুক্ষণ আগেই সে এখানে ছিল। মোস্তাক নিচু স্বরে বলল, ও আমাদের আগে দেখেছে। এখন প্রশ্ন একটাই…” আবুল কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, কী প্রশ্ন?” মোস্তাক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে আতঙ্ক। “ও কি চলে গেছে… নাকি এখনও আমাদের দেখছে? ঠিক সেই মুহূর্তে…তাদের ডান পাশের ঘন হেঁতাল ঝোপে একবার ভারী কিছু নড়ে উঠল। তারপর আবার সব শান্ত। এমন নীরবতা, যেন বন নিজেই নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। চারজন মানুষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর ঘন সবুজ অন্ধকারের ভেতর, অদেখা দুটি চোখ নিঃশব্দে তাদের প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ করতে লাগল…এবার তারা আবার নৌকায় উঠলো, আরও এগিয়ে যাবে তারা রাত কাটাবে বড় খালে নৌকা বেধে।
চতুর্থ পর্ব: অরণ্যের অভিশাপ
রাতের শেষ প্রহরে আবুলের ঘুম ভাঙল। কেন ভাঙল, সে বুঝতে পারল না। চারদিকে তখনও অন্ধকার। গেওয়া গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দু-একটি তারা দেখা যাচ্ছে। জোয়ারের পানি ধীরে ধীরে নৌকার গায়ে আছড়ে পড়ছে। আবুল উঠে বসতেই দেখল, মোস্তাক জেগে আছে। হাতে লাঠি। চোখ দুটি অন্ধকারের দিকে স্থির। ঘুমাওনি?” মোস্তাক মাথা নাড়ল। বাদাবনে সব রাত ঘুমানোর জন্য না। কিছু রাত পাহারা দেওয়ার জন্য।” আবুল আর কিছু বলল না। হঠাৎ দূরে কোথাও একটি চিত্রা হরিণ আতঙ্কিত স্বরে ডেকে উঠল। একবার…দু’বার… তারপর আবার সব নিস্তব্ধ। মোস্তাক নিচু গলায় বলল, ভোর হতে বেশি দেরি নেই। তৈরি হও। পূর্ব আকাশে আলো ফুটতেই চারজন বনবিবির ছোট্ট আসনের সামনে দাঁড়াল। মোস্তাক লাল কাপড়ের ওপর ধূপ জ্বালিয়ে দুই হাত তুলে বলল, বনবিবি মা, বাদার রানী, আমরা লোভের জন্য নয়, পেটের দায়ে এসেছি। বড়মিয়ার চোখ থেকে রক্ষা করো, সত্য পথে ফিরিয়ে নিও।” চারজনই মাথা নত করল। সবুর আস্তে আস্তে বলল, বনে ঢুকলে একটা কথা কখনও ভুলবি না, আবুল। কী কথা?” “যত মধুই দেখিস, নিজের ভাগের বেশি নিবি না। বাদাবন লোভ ক্ষমা করে না। আবুল নীরবে মাথা নাড়ল। সকালের শিশির তখনও পাতায় ঝুলছে। একটি সরু খাল পেরিয়ে তারা আরও গভীরে ঢুকে পড়ল। এ অংশে বন যেন আরও ঘন। সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছায় না। কাদার ওপর অসংখ্য থাবার ছাপ। কিছু হরিণের, কিছু বুনো শূকরের। হঠাৎ আনারুল থেমে গেল। সে নিচু হয়ে কাদার ভেতর থেকে একটি পুরোনো মাটির তাবিজ তুলে নিল। তাবিজটি কালো হয়ে গেছে। তার গায়ে লাল সুতোর ছেঁড়া অংশ এখনো ঝুলছে। সবুরের মুখের রং বদলে গেল। ওটা যেখানে ছিল, সেখানেই রেখে দাও। কেন?” এই বনে কার কী জিনিস, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে নেই। আনারুল আর কথা বাড়াল না। তাবিজটি আগের জায়গাতেই রেখে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে…এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। কিন্তু আশ্চর্য! চারপাশের একটি পাতাও নড়ল না। আবুলের বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল। মোস্তাক বিড়বিড় করে বনবিবির নাম জপতে লাগল। দূরে কোথাও কাঠঠোকরার শব্দ হচ্ছিল। হঠাৎ সেটাও থেমে গেল। বনের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন হাজার বছরের ঘুম ভেঙে কেউ নিঃশব্দে জেগে উঠেছে। ঠিক তখনই… তাদের বাঁ পাশের ঘন হেঁতাল ঝোপের ভেতর থেকে ভেসে এল ভারী নিশ্বাসের শব্দ। ফোঁস… ফোঁস… চারজনই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মোস্তাক ঠোঁটে আঙুল চেপে ইশারা করল কেউ যেন নড়ে না। শ্বাসের শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। আবুলের হাতের লাঠি ঘামে ভিজে গেছে। তার মনে পড়ে গেল মায়ের কথা- “ওই বন তোর বাপকে নিয়েছে। তোকে আর দেব না… এক মুহূর্ত… দুই মুহূর্ত…
তারপর হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে এক ঝাঁক বুনো শূকর ছুটে বেরিয়ে অন্যদিকে পালিয়ে গেল। চারজন একসঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু মোস্তাকের মুখে কোনো হাসি নেই। সে ফিসফিস করে বলল, “শূকরগুলো আমাদের দেখে পালায়নি… আবুল বিস্মিত চোখে তাকাল। তাহলে?” মোস্তাকের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “ওরা পালিয়েছে… যেটা তাদের তাড়া করছিল, তার ভয়ে।” কথাটা শেষ হতেই খুব কাছে, এতটাই কাছে যে মাটি পর্যন্ত কেঁপে উঠল গরররর…! একটি গভীর, রুদ্ধ গর্জন ভেসে এলো। চারজনের শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল… শেষ পর্ব : বাদাবনের শেষ ডাক গর্জনের শব্দ মিলিয়ে যেতেই চারজন মানুষ যেন মাটিতে গেঁথে গেল। মোস্তাকের কণ্ঠ ফিসফিস করে উঠল “কেউ দৌড়াবি না। সবাই পিঠে পিঠ রেখে দাঁড়া। মুহূর্তের মধ্যেই তারা গোল হয়ে দাঁড়াল। চারটি লাঠি চারদিকে তাক করা। চারপাশে আবার নীরবতা। এমন নীরবতা, যেন কিছুই ঘটেনি। শুধু দূরে কোথাও একটি বানর কর্কশ স্বরে ডাকতে ডাকতে গাছের মাথা বদলাচ্ছে। মোস্তাক নিচু গলায় বলল, “ও চলে যায়নি। আমাদের ঘিরে ঘুরছে। আবুলের বুকের ভেতর ঢাকের মতো শব্দ হচ্ছে। তবু তার চোখে ভয়ের চেয়ে বেশি ভেসে উঠল মায়ের মুখ। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় খালেদা বিবি তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন “ফিরে আয় বাবা। মধু না আনলেও ক্ষতি নেই।” আবুল দাঁত চেপে লাঠিটা আরও শক্ত করে ধরল। হঠাৎ ডান পাশের ঝোপ দুলে উঠল। সবাই সেদিকে তাকাতেই বিপদ এল উল্টো দিক থেকে। এক ঝলক হলুদ-কালো ডোরাকাটা বজ্রপাত যেন মাটি ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। মোস্তাক চিৎকার করে উঠল “সা-ব-ধা-ন!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রচ- ধাক্কায় সবুর ছিটকে পড়ল কাদার মধ্যে। লাঠির আঘাত, মানুষের চিৎকার, শুকনো ডাল ভাঙার শব্দে মুহূর্তের মধ্যে বন কেঁপে উঠল। আবুল এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুরকে টেনে সরিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিশাল থাবাটি তার কাঁধ চিরে বয়ে গেল। রক্ত ছিটকে পড়ল কাদার ওপর। আনারুল আর মোস্তাক একসঙ্গে চিৎকার করতে করতে লাঠি উঁচিয়ে এগিয়ে এলো। দা দিয়ে গাছের গুঁড়িতে সজোরে আঘাত করতে লাগল। বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য বড়মিয়া থমকে দাঁড়াল। তার চোখ দুটি স্থির। রাজকীয়। নির্মম। তারপর আরেকটি গর্জন তুলে সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। আবুল চিৎকার করে উঠল তোরা পালা! মাকে বলিস… আমি চেষ্টা করেছিলাম…”মোস্তাক আবুলকে ধরতে ছুটল। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। ঘন হেঁতাল ঝোপ কেঁপে উঠল। তারপর…সব আবার নিস্তব্ধ। শুধু কাদার ওপর পড়ে রইল একটি ভাঙা লাঠি, রক্তমাখা গামছা আর ছড়িয়ে থাকা মধু। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলতে পারল না। শেষ পর্যন্ত মোস্তাক কাঁপা গলায় বলল “চল… আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।” বিকেলের শেষ আলোয় ডিঙি নৌকাটি বুড়িগোয়ালিনী ঘাটে ভিড়ল। ঘাটে লোক জড়ো হলো। সবাই একবার নৌকার দিকে তাকাল। তারপর একে অন্যের মুখের দিকে। চারজন গিয়েছিল। ফিরেছে তিনজন। খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। খালেদা বিবি দৌড়ে ঘাটে এলেন। তার চোখ প্রথমে নৌকার প্রতিটি মুখ খুঁজল। তারপর হঠাৎ থেমে গেল। মোস্তাক কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে রক্তমাখা গামছাটি তাঁর হাতে তুলে দিল। খালেদা বিবি দু’হাতে গামছাটি বুকে চেপে ধরলেন। অনেকক্ষণ তাঁর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। তারপর বুকফাটা এক আর্তনাদ কালিন্দীর দুই পাড় কাঁপিয়ে ছড়িয়ে পড়ল “হায় আল্লাহ… আমার ঘরটা আবার শূন্য করে দিলে!” ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে জল নেমে এলো। কেউ তাঁকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল না। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে লাল হয়ে ডুবে যাচ্ছে। কালিন্দীর জলে সেই লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর ওপারে বাদাবন আগের মতোই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু সোরা গ্রামের মানুষের কাছে সেই দিনটি আর কোনো সাধারণ দিন হয়ে থাকল না। আজও নতুন কোনো মৌয়াল প্রথমবার বাদাবনের পথে পা বাড়ালে গ্রামের বয়স্ক মানুষরা থেমে থেমে দুটি নাম উচ্চারণ করেন- নৈমুদ্দীন গাজী…আবুল গাজী… তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু একটি কথাই বলেন “বাদাবন অন্ন দেয়, কিন্তু তার পাওনাও একদিন বুঝে নেয়। লেখক: সাবেক ব্যাংকার, লেখক ও গবেষক।

Ads small one

এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ
এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে

ন্যাম ভবন থেকে দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে ব্রিফ করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও জোনের ডিসি ইবনে মিজান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করেছি। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। মরদেহটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।’ এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা তদন্ত শেষে বলা যাবে বলেও জানান তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নং ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান ভবনটির লোকজন। এসময় শেরেবাংলা নগর থানায় ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়। এরপর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং ডিএমপি তেজগাঁও জোনের ডিসি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে জানালা দিয়ে মরদেহ দেখে পিবিআই এবং সিআইডি’র ফরেনসিক টিমকে আসতে বলেন।

ব্রিফিংয়ে ইবনে মিজান জানান, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার সময় এই দুজন ওই ফ্ল্যাটে ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে।’

প্রসঙ্গত, গত ২১ জুলাই এক তরুণীর সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হলে জামায়াতে ইসলামী ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। বহিষ্কার আদেশে দলীয় তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং তারা চলতি বছরের ১৭ জুন বিয়ে করেছেন।

বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। জামায়াত তাকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে জানালেও দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় তার এমপি পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়নি। এ নিয়ে সংসদীয় কমিটিতেও বিতর্ক হয় এবং একটি কমিটি থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়।

সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, বহিষ্কারের পরও ‘খাতা-কলমে’ তিনি জামায়াতের সদস্য। এ বক্তব্য নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা হয়।

সাড়ে ৫ বছর পর ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হলো টাকা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৪০ পূর্বাহ্ণ
সাড়ে ৫ বছর পর ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হলো টাকা

দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর পর ডলারের বিপরীতে অবমূল্যায়নের ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশি টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত গত এক বছরের হিসাবে টাকার মান বেড়েছে দশমিক ০৬ শতাংশ। আর ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী হয়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে। এই সময়ে এক ডলারের বিপরীতে টাকার দর ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় ওঠে। অর্থাৎ এই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ৩৮ টাকা ২০ পয়সা বা ৪৫ দশমিক ০৫ শতাংশ।

তবে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। ৩০ আগস্ট ডলারের দাম সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় ওঠার পর ১৭ সেপ্টেম্বর তা কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। ফলে ওই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে ৯৫ পয়সা।

যেভাবে কমেছে টাকার মান

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা ৯০ পয়সা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় নামে। অর্থাৎ এক বছরে ডলারের দাম কমেছিল ১০ পয়সা। বিপরীতে টাকার মান বেড়েছিল দশমিক ১২ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কম থাকা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে ওই সময়ে ডলারের চাহিদা ও সংকট তুলনামূলক কম ছিল। ফলে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছিল।

কিন্তু ২০২১ সাল থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশে আমদানিও বাড়ে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে ৮৫ টাকা ৮০ পয়সায় ওঠে। ওই বছর টাকার মান কমে যায় ১ দশমিক ১৮ শতাংশ।

এরপর ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। একই সময়ে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় দেশে ডলারের সংকট আরও তীব্র হয়।

ফলে ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫ টাকা ৮৫ পয়সায়। এক বছরে ডলারের দাম বেড়েছিল ২০ টাকা ৫ পয়সা বা ২৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই হারে কমে যায় টাকার মান।

এরপরও টাকার ওপর চাপ অব্যাহত ছিল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে ১১০ টাকা হয়। ওই বছর ডলারের দাম বাড়ে ৪ টাকা ১৫ পয়সা বা ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম আরও ১০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকায় ওঠে। এক বছরে টাকার মান কমে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ।

২০২৫ সালেও টাকার অবমূল্যায়ন অব্যাহত ছিল। ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে ডলারের দাম বেড়ে ১২২ টাকা ৩৩ পয়সায় দাঁড়ায়। এক বছরে ডলারের দাম বেড়েছিল ২ টাকা ৩৩ পয়সা বা ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

এবার উল্টো চিত্র

তবে চলতি বছর এসে ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনের ধারায় পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসাবে টাকার মান কমার পরিবর্তে বেড়েছে দশমিক ০৬ শতাংশ।

এরপর আগস্টের শেষ দিকে ডলারের দর আবার কিছুটা বাড়লেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তা কমে আসে। ৩০ আগস্ট প্রতি ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর তা কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, এই সময়ে টাকার মান বেড়েছে দশমিক ৭৭ শতাংশ।

আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতিও তুলে ধরা হয়েছে। গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের জুনে বেশ কয়েকটি দেশের মুদ্রার মান কমেছে।

এ সময়ে ভারতের রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার মুদ্রার মান কমেছে ১০ শতাংশের বেশি। ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহর মান কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।

অন্যদিকে একই সময়ে মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত ও চীনের ইউয়ানের মান বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ করে। পাকিস্তানি রুপির মান বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।

অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে অবমূল্যায়নের পর চলতি সময়ে বাংলাদেশি টাকা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে।

টাকার মান কমলে যে চাপ বাড়ে

ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয়ের ওপর। আমদানিকারকদের বেশি টাকা দিয়ে একই পরিমাণ ডলার কিনতে হয়। এতে আমদানি করা জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের খরচ বাড়ে।

এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে। পণ্যের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে এবং মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়ে।

এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রায় নেওয়া ঋণের বিপরীতে বেশি টাকা পরিশোধ করতে হয়। ফলে টাকার অবমূল্যায়নের সঙ্গে দেশের বৈদেশিক ঋণের টাকার অঙ্কের দায়ও বাড়ে।

অন্যদিকে টাকার মান শক্তিশালী হলে আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ কিছুটা কমে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে টাকার হিসাবে চাপ কমতে পারে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করে আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর।

 

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো লিটারে ২০ টাকা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৩৯ পূর্বাহ্ণ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো লিটারে ২০ টাকা

দেশের এক লাফে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন; চার ধরনের তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। আজ রবিবার (২২০ সেপ্টেম্বর) জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন দাম কার্যকর হবে আগামীকাল সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। ফলে ডিজেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার হবে।

এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রল ১৪০ এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে দেশে তা পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। এতে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

এর আগে ১৯ এপ্রিল থেকে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। একই সময়ে কেরোসিন ১৮, পেট্রল ১৯ এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়ানো হয়। জুনে কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ে। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাম অপরিবর্তিত ছিল।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ালে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়৷