বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

বাদাবনের শেষ ডাক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৩ অপরাহ্ণ
বাদাবনের শেষ ডাক

শেখ সিদ্দিকুর রহমান:
প্রথম পর্ব: বাঘের ছায়া
শ্যামনগর উপজেলার সোরা গ্রাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে কালিন্দী নদীর বুক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি গোলপাতার ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘর। জোয়ারের সময় নদীর পানি উঠোন পর্যন্ত এসে থেমে যায়, ভাটায় কাদামাটির বুক চিরে বেরিয়ে পড়ে লাল কাঁকড়ার সারি। দূরে, নদীর ওপারে সবুজের এক অন্ধকার প্রাচীর সুন্দরবন। গ্রামের মানুষ তাকে বলে বাদাবন। সেই বন তাদের কাছে যেমন অন্নদাতা, তেমনি মৃত্যুরও আরেক নাম। সোরা গ্রামের মানুষ বনের দিকে তাকিয়ে বলে “বাদাবন যার মা, বাঘ তার ছায়া।” সেই ছায়াই একদিন গ্রাস করেছিল নৈমুদ্দীন গাজীকে।
সেদিনও ভোরের আকাশে কুয়াশা ছিল। বনবিবির থানে ধূপ জ্বালিয়ে, সাদা গামছা কাঁধে, কপালে হাত ঠেকিয়ে নৈমুদ্দীন বলেছিল- “মা বনবিবি, পেটের দায়ে যাচ্ছি। ফিরিয়ে আনো। তারপর পাঁচজন মৌয়ালের দল ডিঙি নৌকা ঠেলে কালিন্দী পেরিয়ে ঢুকে পড়েছিল মাদার নদীর দিকে। কিন্তু ফিরে এসেছিল চারজন। বিকেলে গ্রামের ঘাটে যখন নৌকাটি ভিড়ল, নৈমুদ্দীনের লাঠি, দা আর ছেঁড়া গামছা দেখে খালেদা বিবির বুক হাহাকার করে উঠেছিল।“মানুষটা কই?” কেউ উত্তর দিতে পারেনি। অনেকক্ষণ পরে একজন ফিসফিস করে বলেছিল “বড়মিয়া নিয়ে গেছে…” “বড়মিয়া” সুন্দরবনের মানুষ বাঘকে এই নামেই ডাকে। কথাটা শুনে দশ বছরের আবুল গাজী প্রথম বুঝেছিল, বনের কাছে মানুষ কত অসহায়।
তারপরের দিনগুলো যেন ঝড়ের পর ভাঙা বাঁধ। দুই মেয়ের বিয়ে আগেই দিয়েছিলেন নৈমুদ্দীন। সংসারে রইল শুধু খালেদা বিবি আর ছোট ছেলে আবুল। আবুল তখন সোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। বইয়ের পাতায় নদী, পাহাড়, বন পড়ত; কিন্তু তার নিজের জীবনের বনটা ছিল রক্তমাখা। খালেদা বিবি ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীতে নেমে যেতেন। কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাঁকড়ার খাঁচা, চিংড়ির বেহুন্দি জাল, খেপলা জাল নিয়ে সারাদিন কাটত। কখনো দশটা কাঁকড়া, কখনো আধা কেজি গলদা পোনা যা মিলত, তাই নিয়ে ভেটখালি বাজারে বিক্রি করতেন। অনেক দিন এমন গেছে, মা-ছেলে শুধু লবণ-মরিচ দিয়ে ভাত খেয়েছে। আবার কোনো কোনো দিন ভাতও জোটেনি। এক রাতে খালেদা বিবি দেখলেন, আবুল পড়ার বই খুলে বসে আছে, কিন্তু চোখের জল বইয়ের পাতায় পড়ছে।
“কিরে, পড়ছিস না কেন ? আবুল মাথা নিচু করে বলল, “মা, কাল থেকে আর স্কুলে যাব না।
“কেন? ‘খাতা কেনার টাকা নেই। মাস্টারমশাই বলেছেন ছেড়া বই বাঁধাই অথবা নতুন কিনতে’। “আমি আর টাকা দিতে পারব না”, এছাড়া খালেদা বিবি আর কিছু বলতে পারেননি। সেই রাতেই বাতাসে দুলছিল গোলপাতার চাল। বাইরে কালিন্দীর ঢেউ ভাঙছিল। একটি শিশুর স্বপ্নও সেদিন ভেঙে গিয়েছিল।
বছর গড়ায়। সময় মানুষের মুখ বদলে দেয়। দশ বছরের আবুল কুড়ি বছরের যুবক হয়েছে। দীর্ঘদেহী, রোগা, তামাটে রঙের মুখে কঠোর জীবনের রেখা। হাতের তালু শক্ত হয়ে গেছে বৈঠা বাওয়া আর নদীতে জাল টানতে টানতে। কিন্তু একটি জিনিস বদলায়নি। বাবার রক্তমাখা গামছার স্মৃতি। প্রতিবার বাদাবনের দিকে তাকালেই তার মনে হতো, বন যেন তাকে ডেকে বলে- তোর বাবা আমার কাছে আছে… মায়ের কষ্টের কথা ভেবে আবুলের মনটা বিষণœ হয়ে ওঠে, তাকে অনেক টাকা রোজগার করতে হবে, মাকে আর এই বয়সে সে পরিশ্রম করতে দেবে না। একদিন সন্ধ্যায় খালেদা বিবি বাজার থেকে ফিরলেন। হাতে মাত্র এক মুঠো চাল। আবুল চুপচাপ বসে ছিল। হঠাৎ বলল, মা, আমি বনে যাব। খালেদা বিবির বুক কেঁপে উঠল। “না বাবা, ওই বন তোর বাপকে নিয়েছে। তোকে আর যেতে দেব না। না গেলে আমরা বাঁচব কী করে?” ঐ পাড়ার মোস্তাক,আনারুল, সবুর বনে যাবে মধু আনতে, আমিও ওদের সাথে যাবো বলেছি, ওরা আমাকে নিয়ে যাবে বলেছে”। কথাটা শুনে মা আর উত্তর দিতে পারলেন না। কেবল কান্না চেপে বললেন “তাহলে আগে বনবিবির দোয়া নিয়ে যাস। মানুষের জোরে বন জেতা যায় না। দুই দিন পরে ভোরে আবুল পৌঁছাল বুড়িগোয়ালিনী ঘাটে। সেখানে অপেক্ষা করছিল তিনজন অভিজ্ঞ মৌয়াল- মোস্তাক, সবুর আর আনারুল। তাদের নৌকায় তোলা হচ্ছিল মধু আহরণের সরঞ্জাম
ধামা, দা, ধোঁয়া তৈরির জন্য শুকনো পাটকাঠি ও নারকেলের ছোবড়া, মশাল, গ্যাসলাইট, দড়ি, বেতের ঝুড়ি, গামছা, লাঠি, পানির কলস, চিড়া-গুড়, আর ছোট একটি বনবিবির আসন লাল কাপড়ে মোড়ানো।
মোস্তাক আবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ভয় পাস? আবুল একটু হেসে বলল, ভয় পাই। কিন্তু অভাবকে আরও বেশি ভয় পাই। মোস্তাক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যে কথাটা বললি, সেই কথাই আমাদের সবাইকে বনে নিয়ে যায়। নৌকার দড়ি খুলে দেওয়া হলো। ভাটার স্রোত ধরে নৌকা ধীরে ধীরে কালিন্দী পেরিয়ে মাদার নদীর দিকে এগোতে লাগল। দূরে তখন সুন্দরবনের মাথার ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়েছে।সবুর বৈঠা টানতে টানতে গলা ছেড়ে বনবিবির গান ধরল- ‘বনবিবি মা, বাদার রানী, দাও গো সবার প্রাণ। গেওয়া-গরান, সুন্দরী বনে, ফিরি যেন নিরাপদ প্রাণ। বড়মিয়া যদি পথ আগলায়, রেখো মাগো মান। মধুর চাক আর সন্তানের মুখ, এই তো আমাদের টান’। চারজনের কণ্ঠ মিলিয়ে গেল নদীর বাতাসে। সামনে তখন কেবল সবুজ অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বুকেই অপেক্ষা করছিল এমন এক সকাল, যার কথা বহু বছর পরে সোরা গ্রামের মানুষও শিউরে শিউরে বলবে…হায়রে কপাল! দ্বিতীয় পর্ব: বনের ভেতর প্রথম পা মাদার নদীর বুক চিরে ডিঙি নৌকাটি ধীরে ধীরে সরু খালের মুখে ঢুকে পড়ল। নদীর খোলা আলো যেন এক মুহূর্তেই পিছনে রয়ে গেল। দুই তীরে গেওয়া, গরান, সুন্দরী আর পশুর গাছের ডালপালা মাথা নিচু করে এমনভাবে ঝুঁকে আছে, যেন তারা নিজেরাই পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে। সবুর গান থামিয়ে বৈঠা টেনে নিল। নৌকার গায়ে শুধু জোয়ারের পানির মৃদু চাপ। আর দূরে কোথাও অচেনা এক পাখির ডাক। মোস্তাক নিচু গলায় বলল, “এখান থেকে আর অকারণে কথা বলবি না। বনেরও কান আছে।” আবুল বিস্মিত চোখে চারদিকে তাকাল। বইয়ে সুন্দরবনের কথা পড়েছিল, কিন্তু এই নীরবতা বইয়ের পাতায় ছিল না। এখানে বাতাসও যেন শব্দ করে বইতে ভয় পায়। আনারুল নৌকার সামনের দিকে ইশারা করল।
“ওই যে দেখছিস, কেওড়ার শ্বাসমূল। ভুল করে পা দিলেই গেঁথে যাবে। সাবধানে নামবি।” জোয়ার তখন নামছে। কাদামাটির বুক ভেদ করে হাজার হাজার শ্বাসমূল সুঁচের মতো বেরিয়ে আছে। নৌকা ভিড়তেই চারজন একে একে নেমে পড়ল। পা ডুবল নরম কাদায়। এক ধরনের তীব্র নোনাজলের গন্ধে ভরে আছে চারদিক। মোস্তাক বনবিবির ছোট্ট আসনটি একটি গেওয়া গাছের গোড়ায় রেখে ধূপ জ্বালাল। চারজনই নীরবে মাথা নত করল। আবুলও মায়ের কথা মনে করে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ…ডান পাশের ঝোপে খস্… খস্…আবুল চমকে উঠল। লাঠিটা শক্ত করে ধরতেই সবুর মৃদু হেসে বলল, “ভয় পাস না। বাতাসও কখনো কখনো মানুষকে ধোঁকা দেয়।” কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আনারুলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে কাদার দিকে ঝুঁকে বসেছে।
“এইদিকে একবার আয়।” আবুল এগিয়ে গেল। কাদার ওপর স্পষ্ট কয়েকটি থাবার ছাপ। সে আগে কখনো বাঘের পায়ের ছাপ দেখেনি। তাই কিছু বুঝতে পারল না। মোস্তাক একবার তাকিয়েই গম্ভীর হয়ে গেল। সে নিচু হয়ে কাদায় হাত রাখল। তারপর খুব আস্তে বলল, পুরোনো নয়…সবুরের গলায় আর আগের দৃঢ়তা নেই। “কতক্ষণ হবে?” মোস্তাক চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, এক ঘণ্টাও না।” আবুলের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে অজান্তেই বাবার কথা ভাবল। ঠিক তখনই… বনের অনেক গভীর থেকে ভেসে এলো এক দীর্ঘ, কর্কশ সতর্ক ডাক। বানরের দল। মোস্তাক আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। “সবাই একসঙ্গে থাকো। কেউ আলাদা হবে না।” চারজন আবার ধীরে ধীরে বনের আরও গভীরে হাঁটতে শুরু করল। তাদের অজান্তেই, অনেক দূরে, গরান গাছের ঘন শিকড়ের আড়ালে কিছু একটা নিঃশব্দে সরে গেল… কেউ তা দেখল না। শুধু বনের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। মোস্তাক চারদিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “আজ আর সামনে যাওয়া ঠিক হবে না। জোয়ার বাড়ছে। এই খালের মুখেই নোঙর করি। রাতটা নৌকাতেই কাটবে। ভোরের আলো ফুটলেই মধুর চাকের খোঁজে বের হব।” কথা শেষ হতেই সবুর নোঙর ফেলল। আনারুল নৌকাটি একটি গেওয়া গাছের মোটা শিকড়ে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল। চারদিকে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলো। নদীর জলে জোয়ারের মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। আবুলের চোখে ঘুম এল না। অজানা এক আশঙ্কায় তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মনে হলো, ঘন অন্ধকারের আড়াল থেকে অদৃশ্য কেউ যেন নিঃশব্দে তাদের ওপর নজর রেখে আছে।
তৃতীয় পর্ব: নীরবতার ভেতর চোখ সূর্য তখন গাছের মাথা ছুঁয়ে ওপরে উঠেছে। সুন্দরবনের ভেতরেও আলো এসেছে, কিন্তু সেই আলো মাটিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। গেওয়া, গরান, সুন্দরী আর পশুর গাছের ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো চিকন সোনালি রেখা হয়ে কাদার ওপর পড়ছে। চারজন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। মোস্তাক সামনে, তার পেছনে আবুল। তারপর আনারুল ও সবুর।
প্রতিটি পা ফেলতে হচ্ছে দেখে-শুনে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও কেওড়ার শ্বাসমূল, কোথাও লবণাক্ত পানির সরু খাল। হঠাৎ মোস্তাক হাত তুলে ইশারা করল। সবাই থেমে গেল। সামনের একটি সুন্দরী গাছের অনেক ওপরে ঝুলছে বিশাল একটি মধুর চাক। হাজার হাজার মৌমাছি গুনগুন করছে। সবুর মৃদু হেসে বলল, “আজ বনবিবি মুখ তুলে চেয়েছেন। ধোঁয়া তৈরির জন্য শুকনো পাটকাঠি আর নারকেলের ছোবড়ায় আগুন ধরানো হলো। ধোঁয়া ধীরে ধীরে চাকের দিকে উঠতেই মৌমাছিরা অস্থির হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আনারুল গাছে উঠল। নিচে দাঁড়িয়ে আবুল থামা ধরে আছে। এক এক করে সোনালি মধু ঝরে পড়ছে। আবুলের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। মনে হলো আজ ফিরলে মায়ের হাতে শুধু একমুঠো চাল নয়, হয়তো নতুন একটি শাড়িও তুলে দিতে পারবে। ঠিক সেই সময়… বনের সব শব্দ যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল। মৌমাছির গুঞ্জন নেই। পাখির ডাক নেই। বাতাসের শব্দও নেই। মোস্তাকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে চারদিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “নাম… তাড়াতাড়ি নাম।
আনারুল কিছু না বুঝেই গাছ থেকে নেমে এল। আবুল ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? মোস্তাক কোনো উত্তর দিল না। সে কাদার ওপর ঝুঁকে রইল। একটি নয়… দুটি নয়… অনেকগুলো হরিণের পায়ের ছাপ এলোমেলো হয়ে ছুটে গেছে একই দিকে। যেন মুহূর্তের মধ্যে পুরো পাল আতঙ্কে পালিয়েছে। সবুরের ঠোঁট শুকিয়ে গেল। হরিণ এমন দৌড়ায় একটাই কারণে…” কথাটা শেষ করল না সে। কারণ বাকিটা সবারই জানা। হঠাৎ বাঁনরের দল গাছের মাথায় লাফাতে লাফাতে চিৎকার শুরু করল।
একটি… দুটি… তারপর একসঙ্গে অনেকগুলো। তাদের চোখ সব একই দিকে। মোস্তাক ফিসফিস করে বলল, “পিছিয়ে আয়… কেউ দৌড়াবি না। চারজন ধীরে ধীরে পেছাতে লাগল। আবুলের মনে হলো, ঘন গরান গাছের আড়াল থেকে কেউ তাদের দেখছে। সে তাকাল। কিছুই নেই। আবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই কাদার ওপর চোখ পড়তেই তার বুক হিম হয়ে গেল। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এক জোড়া বিশাল থাবার ছাপ। থাবার ভেতরে এখনো পানি জমেনি।
অর্থাৎ… কিছুক্ষণ আগেই সে এখানে ছিল। মোস্তাক নিচু স্বরে বলল, ও আমাদের আগে দেখেছে। এখন প্রশ্ন একটাই…” আবুল কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, কী প্রশ্ন?” মোস্তাক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে আতঙ্ক। “ও কি চলে গেছে… নাকি এখনও আমাদের দেখছে? ঠিক সেই মুহূর্তে…তাদের ডান পাশের ঘন হেঁতাল ঝোপে একবার ভারী কিছু নড়ে উঠল। তারপর আবার সব শান্ত। এমন নীরবতা, যেন বন নিজেই নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। চারজন মানুষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর ঘন সবুজ অন্ধকারের ভেতর, অদেখা দুটি চোখ নিঃশব্দে তাদের প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ করতে লাগল…এবার তারা আবার নৌকায় উঠলো, আরও এগিয়ে যাবে তারা রাত কাটাবে বড় খালে নৌকা বেধে।
চতুর্থ পর্ব: অরণ্যের অভিশাপ
রাতের শেষ প্রহরে আবুলের ঘুম ভাঙল। কেন ভাঙল, সে বুঝতে পারল না। চারদিকে তখনও অন্ধকার। গেওয়া গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দু-একটি তারা দেখা যাচ্ছে। জোয়ারের পানি ধীরে ধীরে নৌকার গায়ে আছড়ে পড়ছে। আবুল উঠে বসতেই দেখল, মোস্তাক জেগে আছে। হাতে লাঠি। চোখ দুটি অন্ধকারের দিকে স্থির। ঘুমাওনি?” মোস্তাক মাথা নাড়ল। বাদাবনে সব রাত ঘুমানোর জন্য না। কিছু রাত পাহারা দেওয়ার জন্য।” আবুল আর কিছু বলল না। হঠাৎ দূরে কোথাও একটি চিত্রা হরিণ আতঙ্কিত স্বরে ডেকে উঠল। একবার…দু’বার… তারপর আবার সব নিস্তব্ধ। মোস্তাক নিচু গলায় বলল, ভোর হতে বেশি দেরি নেই। তৈরি হও। পূর্ব আকাশে আলো ফুটতেই চারজন বনবিবির ছোট্ট আসনের সামনে দাঁড়াল। মোস্তাক লাল কাপড়ের ওপর ধূপ জ্বালিয়ে দুই হাত তুলে বলল, বনবিবি মা, বাদার রানী, আমরা লোভের জন্য নয়, পেটের দায়ে এসেছি। বড়মিয়ার চোখ থেকে রক্ষা করো, সত্য পথে ফিরিয়ে নিও।” চারজনই মাথা নত করল। সবুর আস্তে আস্তে বলল, বনে ঢুকলে একটা কথা কখনও ভুলবি না, আবুল। কী কথা?” “যত মধুই দেখিস, নিজের ভাগের বেশি নিবি না। বাদাবন লোভ ক্ষমা করে না। আবুল নীরবে মাথা নাড়ল। সকালের শিশির তখনও পাতায় ঝুলছে। একটি সরু খাল পেরিয়ে তারা আরও গভীরে ঢুকে পড়ল। এ অংশে বন যেন আরও ঘন। সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছায় না। কাদার ওপর অসংখ্য থাবার ছাপ। কিছু হরিণের, কিছু বুনো শূকরের। হঠাৎ আনারুল থেমে গেল। সে নিচু হয়ে কাদার ভেতর থেকে একটি পুরোনো মাটির তাবিজ তুলে নিল। তাবিজটি কালো হয়ে গেছে। তার গায়ে লাল সুতোর ছেঁড়া অংশ এখনো ঝুলছে। সবুরের মুখের রং বদলে গেল। ওটা যেখানে ছিল, সেখানেই রেখে দাও। কেন?” এই বনে কার কী জিনিস, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে নেই। আনারুল আর কথা বাড়াল না। তাবিজটি আগের জায়গাতেই রেখে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে…এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল। কিন্তু আশ্চর্য! চারপাশের একটি পাতাও নড়ল না। আবুলের বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল। মোস্তাক বিড়বিড় করে বনবিবির নাম জপতে লাগল। দূরে কোথাও কাঠঠোকরার শব্দ হচ্ছিল। হঠাৎ সেটাও থেমে গেল। বনের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন হাজার বছরের ঘুম ভেঙে কেউ নিঃশব্দে জেগে উঠেছে। ঠিক তখনই… তাদের বাঁ পাশের ঘন হেঁতাল ঝোপের ভেতর থেকে ভেসে এল ভারী নিশ্বাসের শব্দ। ফোঁস… ফোঁস… চারজনই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মোস্তাক ঠোঁটে আঙুল চেপে ইশারা করল কেউ যেন নড়ে না। শ্বাসের শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। আবুলের হাতের লাঠি ঘামে ভিজে গেছে। তার মনে পড়ে গেল মায়ের কথা- “ওই বন তোর বাপকে নিয়েছে। তোকে আর দেব না… এক মুহূর্ত… দুই মুহূর্ত…
তারপর হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে এক ঝাঁক বুনো শূকর ছুটে বেরিয়ে অন্যদিকে পালিয়ে গেল। চারজন একসঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু মোস্তাকের মুখে কোনো হাসি নেই। সে ফিসফিস করে বলল, “শূকরগুলো আমাদের দেখে পালায়নি… আবুল বিস্মিত চোখে তাকাল। তাহলে?” মোস্তাকের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “ওরা পালিয়েছে… যেটা তাদের তাড়া করছিল, তার ভয়ে।” কথাটা শেষ হতেই খুব কাছে, এতটাই কাছে যে মাটি পর্যন্ত কেঁপে উঠল গরররর…! একটি গভীর, রুদ্ধ গর্জন ভেসে এলো। চারজনের শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল… শেষ পর্ব : বাদাবনের শেষ ডাক গর্জনের শব্দ মিলিয়ে যেতেই চারজন মানুষ যেন মাটিতে গেঁথে গেল। মোস্তাকের কণ্ঠ ফিসফিস করে উঠল “কেউ দৌড়াবি না। সবাই পিঠে পিঠ রেখে দাঁড়া। মুহূর্তের মধ্যেই তারা গোল হয়ে দাঁড়াল। চারটি লাঠি চারদিকে তাক করা। চারপাশে আবার নীরবতা। এমন নীরবতা, যেন কিছুই ঘটেনি। শুধু দূরে কোথাও একটি বানর কর্কশ স্বরে ডাকতে ডাকতে গাছের মাথা বদলাচ্ছে। মোস্তাক নিচু গলায় বলল, “ও চলে যায়নি। আমাদের ঘিরে ঘুরছে। আবুলের বুকের ভেতর ঢাকের মতো শব্দ হচ্ছে। তবু তার চোখে ভয়ের চেয়ে বেশি ভেসে উঠল মায়ের মুখ। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় খালেদা বিবি তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন “ফিরে আয় বাবা। মধু না আনলেও ক্ষতি নেই।” আবুল দাঁত চেপে লাঠিটা আরও শক্ত করে ধরল। হঠাৎ ডান পাশের ঝোপ দুলে উঠল। সবাই সেদিকে তাকাতেই বিপদ এল উল্টো দিক থেকে। এক ঝলক হলুদ-কালো ডোরাকাটা বজ্রপাত যেন মাটি ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। মোস্তাক চিৎকার করে উঠল “সা-ব-ধা-ন!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রচ- ধাক্কায় সবুর ছিটকে পড়ল কাদার মধ্যে। লাঠির আঘাত, মানুষের চিৎকার, শুকনো ডাল ভাঙার শব্দে মুহূর্তের মধ্যে বন কেঁপে উঠল। আবুল এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুরকে টেনে সরিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিশাল থাবাটি তার কাঁধ চিরে বয়ে গেল। রক্ত ছিটকে পড়ল কাদার ওপর। আনারুল আর মোস্তাক একসঙ্গে চিৎকার করতে করতে লাঠি উঁচিয়ে এগিয়ে এলো। দা দিয়ে গাছের গুঁড়িতে সজোরে আঘাত করতে লাগল। বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য বড়মিয়া থমকে দাঁড়াল। তার চোখ দুটি স্থির। রাজকীয়। নির্মম। তারপর আরেকটি গর্জন তুলে সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। আবুল চিৎকার করে উঠল তোরা পালা! মাকে বলিস… আমি চেষ্টা করেছিলাম…”মোস্তাক আবুলকে ধরতে ছুটল। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। ঘন হেঁতাল ঝোপ কেঁপে উঠল। তারপর…সব আবার নিস্তব্ধ। শুধু কাদার ওপর পড়ে রইল একটি ভাঙা লাঠি, রক্তমাখা গামছা আর ছড়িয়ে থাকা মধু। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলতে পারল না। শেষ পর্যন্ত মোস্তাক কাঁপা গলায় বলল “চল… আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।” বিকেলের শেষ আলোয় ডিঙি নৌকাটি বুড়িগোয়ালিনী ঘাটে ভিড়ল। ঘাটে লোক জড়ো হলো। সবাই একবার নৌকার দিকে তাকাল। তারপর একে অন্যের মুখের দিকে। চারজন গিয়েছিল। ফিরেছে তিনজন। খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। খালেদা বিবি দৌড়ে ঘাটে এলেন। তার চোখ প্রথমে নৌকার প্রতিটি মুখ খুঁজল। তারপর হঠাৎ থেমে গেল। মোস্তাক কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে রক্তমাখা গামছাটি তাঁর হাতে তুলে দিল। খালেদা বিবি দু’হাতে গামছাটি বুকে চেপে ধরলেন। অনেকক্ষণ তাঁর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। তারপর বুকফাটা এক আর্তনাদ কালিন্দীর দুই পাড় কাঁপিয়ে ছড়িয়ে পড়ল “হায় আল্লাহ… আমার ঘরটা আবার শূন্য করে দিলে!” ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে জল নেমে এলো। কেউ তাঁকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল না। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে লাল হয়ে ডুবে যাচ্ছে। কালিন্দীর জলে সেই লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর ওপারে বাদাবন আগের মতোই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু সোরা গ্রামের মানুষের কাছে সেই দিনটি আর কোনো সাধারণ দিন হয়ে থাকল না। আজও নতুন কোনো মৌয়াল প্রথমবার বাদাবনের পথে পা বাড়ালে গ্রামের বয়স্ক মানুষরা থেমে থেমে দুটি নাম উচ্চারণ করেন- নৈমুদ্দীন গাজী…আবুল গাজী… তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু একটি কথাই বলেন “বাদাবন অন্ন দেয়, কিন্তু তার পাওনাও একদিন বুঝে নেয়। লেখক: সাবেক ব্যাংকার, লেখক ও গবেষক।

Ads small one

ইইউতে বাংলাদেশের পোশাকে বড় ধাক্কা, রফতানি কমলো ১৪%

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ণ
ইইউতে বাংলাদেশের পোশাকে বড় ধাক্কা, রফতানি কমলো ১৪%

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক আমদানির বাজারে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সামগ্রিকভাবে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে এই পতনের চেয়েও বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ইইউতে কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

অর্থাৎ ইইউর বাজারে চাহিদা কমার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়লেও বাংলাদেশ শুধু বাজার সংকোচনের কারণে কমেনি; বরং সামগ্রিক বাজারের তুলনায় আরও বেশি হারে বাজার হারিয়েছে।

ইইউর আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৫৪ হাজার ৩৮৮ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৫১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি কমেছে প্রায় ২ হাজার ৭৭৫ মিলিয়ন ইউরো।

শুধু মূল্য নয়, আমদানির পরিমাণও কমেছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসে ইইউ ২ হাজার ৬৮৮ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন কেজি পোশাক আমদানি করেছিল। এ বছর তা কমে হয়েছে ২ হাজার ৬০১ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন কেজি—পতন ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।

সুগন্ধি চাল নিয়ে কী ঘটেছিল? দাম চড়তেই অর্ধেক হলো রফতানি কোটা
অর্থাৎ ইইউর পোশাক বাজারে ক্রেতারা এ বছর আগের তুলনায় কম পোশাক কিনছেন। একই সঙ্গে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্যও কমেছে। সব উৎস মিলিয়ে গড় ইউনিট মূল্য ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে কেজিপ্রতি ১৯ দশমিক ৮৪ ইউরো হয়েছে।

বাংলাদেশের পতন বাজারের চেয়েও বেশি

এই সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেই বাংলাদেশের চিত্র আরও চ্যালেঞ্জিং। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি মূল্য কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একই সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

অর্থাৎ পরিমাণের তুলনায় মূল্যের পতন অনেক বেশি। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশের পোশাকের গড় রফতানি মূল্য কমে যাওয়া।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে কেজিপ্রতি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তুলনায় এটি ইইউর প্রধান পোশাক সরবরাহকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন গড় মূল্য।

ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে দুটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—রফতানির পরিমাণ কমছে এবং প্রতি কেজি পোশাকের দামও কমছে। এর ফলে মোট রফতানি আয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

অপরদিকে, ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের কয়েকজন ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে।

চীনের পোশাক আমদানি মূল্য ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ যখন ইইউর মোট পোশাক আমদানি মূল্য ৫ শতাংশের বেশি কমেছে, তখন এই দুই দেশ বাজারে তাদের সরবরাহ বাড়াতে পেরেছে।

এখানে ভিয়েতনামের গড় ইউনিট মূল্যও বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কম্বোডিয়ার গড় মূল্য বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ এসব দেশের ক্ষেত্রে বাজারের অংশ ধরে রাখার সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি এর বিপরীত। বাংলাদেশ কম দামে পোশাক সরবরাহ করেও বাজারের অংশ ধরে রাখতে পারেনি। ফলে ইইউর বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

তবে জুন-জুলাইয়ে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

সামগ্রিক জানুয়ারি-জুলাই হিসাব এখনো বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক। কিন্তু মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

চলতি বছরের জুন ও জুলাই—টানা দুই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়েছে।

জুনে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ২০২৫ সালের ১ হাজার ৩৫৫ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১ হাজার ৩৬৭ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি আরও কিছুটা বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে রফতানি ছিল ১ হাজার ৬৬৭ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ইউরো। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৯ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ইউরো—প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।

জুন থেকে জুলাইয়ের ব্যবধানও উল্লেখযোগ্য। এক মাসে বাংলাদেশের রফতানি মূল্য বেড়েছে ৩৬২ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ইউরো, যা ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশের মাসিক বৃদ্ধি।

এই দুই মাসের প্রবৃদ্ধির কারণে জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক রফতানির যে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন ছিল, জানুয়ারি-জুলাই শেষে তা কমে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ ক্রমপুঞ্জীভূত পতন ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

এখনই পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না

তবে এই পরিবর্তনকে এখনই বাজার পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সাত মাসের হিসাবে বাংলাদেশের রফতানি এখনো দ্বিগুণ অঙ্কে কম। একই সময়ে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে।

বরং জুন ও জুলাইয়ের তথ্যকে আপাতত পতনের গতি কমে আসার প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী দুই মাসে তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আগামী মাসগুলোতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে কি না। যদি জুন-জুলাইয়ের মতো প্রবৃদ্ধি পরবর্তী মাসগুলোতেও ধরে রাখা যায়, তাহলে বছরের শুরুতে তৈরি হওয়া বড় ঘাটতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আবার প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হলে সাত মাসের এই সাময়িক উন্নতির প্রভাবও দ্রুত ম্লান হয়ে যেতে পারে।

কম দাম কি বাংলাদেশের জন্য সুবিধা, নাকি চাপ?

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পোশাকের ইউনিট মূল্য। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম কেজিপ্রতি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো, যা তুলনামূলকভাবে সর্বনিম্ন। অথচ এই কম দাম বাংলাদেশের বাজার অংশ ধরে রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

এতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি বড় বাস্তবতা সামনে আসে—শুধু কম দামে পোশাক সরবরাহ করে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সময়ে প্রতিযোগী কিছু দেশ তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য বিক্রি করেও বাজার বাড়াতে পারছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সাম্প্রতিক মাসগুলোর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, জানুয়ারি-জুলাইয়ের সামগ্রিক চিত্র এখন নেতিবাচক হলেও জুন ও জুলাইয়ে টানা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ফলে জানুয়ারি-জুনের ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন সাত মাসে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এটিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার বলা ঠিক হবে না; বরং পতনের গতি কমে আসার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়।

ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর একটি। তাই এই বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যাওয়া, প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ার প্রবণতা—তিনটি বিষয়ই বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে

জুন-জুলাইয়ের ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখা গেলে পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বেশি মূল্য সংযোজনের পোশাক, পণ্যের বৈচিত্র্য, মান, সরবরাহ সক্ষমতা এবং ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কারণ সাত মাসের তথ্য আপাতত একটি দ্বিমুখী বার্তা দিচ্ছে—ইইউর বাজার সংকুচিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সংকোচনের মধ্যে সব সরবরাহকারী সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বাংলাদেশ যেখানে কম দামে পোশাক বিক্রি করেও বাজার হারিয়েছে, সেখানে চীন ও ভিয়েতনাম বাজার বাড়িয়েছে। আবার জুন ও জুলাইয়ের টানা প্রবৃদ্ধি বলছে, বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি একমুখী নেতিবাচকও নয়।

স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মালয়েশিয়া যাচ্ছেন মির্জা আব্বাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মালয়েশিয়া যাচ্ছেন মির্জা আব্বাস

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আবারও মালয়েশিয়া যাচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর পৌনে ১২টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন তিনি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মির্জা আব্বাস মালয়েশিয়া যাচ্ছেন।

এর আগে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা শেষে গত ২ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন মির্জা আব্বাস। প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর তিনি দেশে ফিরেছিলেন।

ঘরেই উৎপাদন করা যাবে বিদ্যুৎ, বিক্রি করতে পারবেন সরকারের কাছে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ণ
ঘরেই উৎপাদন করা যাবে বিদ্যুৎ, বিক্রি করতে পারবেন সরকারের কাছে

অনলাইন ডেস্ক: ঘরে ঘরে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহী করছে বাংলাদেশ সরকার। নিজের ঘরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে অতিরিক্ত থাকলে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে টাকাও আয় করা যাবে। জাতীয় গ্রিডে দেওয়া প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য সরকার ১০.৫০ টাকা করে দেবে। এতে শুধু নিজের বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, অর্থ উপার্জনের পথও খুলছে।

এ বিষয়ে সরকারি এক বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সোলার দিয়ে নিজের বিদ্যুৎ নিজেই উৎপাদন করুন। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আয় করুন। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য সরকার ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে দেবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ এর মধ্যে সোলার সিস্টেম চালু করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে এই পরিমাণ প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

সোলার বাছাইয়ের বিষয়ে সরকারি এই বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আগে দেখুন আপনার ছাদে কতটা সোলার বসানো যাবে। সোলার ক্যালকুটের ব্যবহার করে সহজেই হিসাব করুন। তালিকাভুক্ত সোলার কোম্পানি বেছে নিন। সোলার ও ব্যাটারি বসানো ও রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করবে। সময়ের মধ্যে সোলার চালু করুন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করুন।