যে হাত একদিন নতুন প্রাণের স্পর্শ দিত
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
গভীর রাত। চারদিকে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ কোনো বাড়ি থেকে ছুটে আসে খবরÑ“দাই মাকে ডাকো, সময় হয়ে গেছে।” মুহূর্তেই ঘুম ভেঙে যেত তাঁর। হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগ, সঙ্গে প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম। কাঁধে দায়িত্ব, মনে সাহস। কাদা মাড়িয়ে, বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে কিংবা নৌকায় নদী পার হয়ে তিনি পৌঁছে যেতেন প্রসূতি মায়ের কাছে। কয়েক ঘণ্টার উদ্বেগ শেষে যখন নবজাতকের প্রথম কান্না ভেসে উঠত, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, যেন গোটা গ্রামই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলত। সেই মানুষটিই ছিলেন গ্রামের সবার প্রিয় দাই মাÑকোথাও তিনি পরিচিত ছিলেন ধরনী মা নামে। আজ সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না।
সময় বদলেছে, চিকিৎসাব্যবস্থা আধুনিক হয়েছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী ও চিকিৎসকের হাতেই এখন অধিকাংশ সন্তান জন্ম নেয়। ফলে একসময় গ্রামীণ জনপদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা দাই মায়েরা আজ নীরবে হারিয়ে যাচ্ছেন ইতিহাসের পাতায়। একসময় আশাশুনি উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই একজন বা একাধিক অভিজ্ঞ দাই মা ছিলেন। কোনো নারী গর্ভবতী হওয়ার খবর পেলেই পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। গর্ভকালীন নানা পরামর্শ দেওয়া থেকে শুরু করে প্রসবকালীন সেবাÑসবই তিনি করতেন নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, ধৈর্য ও মানবিকতা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। গ্রামের মানুষের কাছে দাই মা শুধু একজন সেবাদানকারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন পরিবারের একজন আপনজন। প্রসব শেষে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হতো নতুন শাড়ি, চাল-ডাল, ফলমূল কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার। অনেক সময় প্রসূতির বাবার বাড়ি থেকেও তাঁর জন্য আলাদা উপঢৌকন আসত। সেই সম্মান ছিল আন্তরিকতার, কৃতজ্ঞতার এবং সামাজিক স্বীকৃতির। প্রসব সফল হলে পরিবারের আনন্দে দাই মায়ের চোখেও জল আসত।
নবজাতককে কোলে নিয়ে তিনি আশীর্বাদ করতেন। সেই শিশুটি বড় হয়ে তাঁকে “দাই মা” বলেই চিনত। অনেকেই কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তাঁর খোঁজ নিতেন। আজ সেই সম্পর্কও অনেকটাই অতীত। প্রবীণ কয়েকজন দাই মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় মাসের অধিকাংশ দিনই তাঁদের ব্যস্ততায় কাটত। রাত-বিরাতের কোনো হিসাব ছিল না। মানুষ ডাকলেই ছুটে যেতেন। এখন মাসের পর মাস কোনো ডাকই আসে না। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই নারীরা অনেকেই আজ আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
একজন প্রবীণ দাই মা আক্ষেপ করে বলেন, “আমার হাতে এই এলাকার শত শত সন্তান জন্ম নিয়েছে। আজ তারা বড় হয়েছে, অনেকেই চাকরি করে, কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক। কিন্তু আমাকে মনে রাখার সময় যেন কারও নেই।” তাঁদের এই কথায় শুধু ব্যক্তিগত কষ্ট নয়, ফুটে ওঠে একটি সমাজের স্মৃতিভ্রংশের চিত্র। অবশ্য এটিও সত্য, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমাতে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। জটিল প্রসব, অস্ত্রোপচার, নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যাÑএসব ক্ষেত্রে হাসপাতালের বিকল্প নেই।
তাই নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার প্রসার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑএই পরিবর্তনের মধ্যেও কি দাই মায়েদের অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য নেই? জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিজ্ঞ দাই মায়েদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তাঁরা গর্ভবতী নারীদের সচেতন করা, প্রসবপূর্ব ঝুঁকি চিহ্নিত করা, জরুরি রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো এবং নবজাতকের প্রাথমিক পরিচর্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও স্থানীয় ধাত্রীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজে লাগানোর নজির রয়েছে। দুঃখজনক হলো, আমাদের সমাজে দাই মায়েদের অবদান নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। তাঁদের কোনো তালিকা নেই, নেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা সামাজিক নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা। অথচ কয়েক দশক আগেও গ্রামের পর গ্রামে নিরাপদ মাতৃত্বের প্রধান ভরসা ছিলেন তাঁরাই। সমাজ এগোবে, প্রযুক্তি বদলাবেÑএটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিড়ে যদি হারিয়ে যায় মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা, তবে উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না।
যে নারীরা নিজের ঘুম, স্বাচ্ছন্দ্য আর ব্যক্তিগত জীবন বিসর্জন দিয়ে হাজারো শিশুকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, তাঁদের অবদান ইতিহাসের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না। আশাশুনির মতো উপকূলীয় জনপদের বহু দাই মা আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিঃশব্দে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের মুখে এখন আর বিজয়ের হাসি নেই, আছে শুধুই স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস। অথচ এই জনপদের অসংখ্য মানুষের জীবনের শুরু হয়েছিল তাঁদেরই স্নেহমাখা হাতের স্পর্শে। তাই সময় এসেছে এই মানুষগুলোর প্রতি নতুন করে তাকানোর।
তাঁদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান জানানো, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের কাজে লাগানো এবং অন্তত মানবিক স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ, দাই মায়েরা কেবল একটি পেশার নাম নন; তাঁরা গ্রামবাংলার স্বাস্থ্য-ঐতিহ্যের এক জীবন্ত ইতিহাস, যাঁদের অবদান কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়।



