সবুজে ঘেরা কামারালী: একজন আব্দুস সাত্তার ও একটি আদর্শ গ্রামের গল্প
সংবাদদাতা: সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার যুগিখালী ইউনিয়নের একটি অবহেলিত গ্রাম ছিল কামারালী। কিন্তু আজ সেখানে চোখ মেললেই দেখা যায় দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ। মাঠের পর মাঠ ফসলের হাসিতে মন জুড়িয়ে যায়। এই বদলে যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছেন একজন দূরদর্শী ও কঠোর পরিশ্রমী সফল উদ্যোক্তা-আব্দুস সাত্তার সানা।
আব্দুস সাত্তার সানা আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে মৎস্য চাষ শুরু করেন। মাছ চাষে সফলতা পাওয়ার পর তিনি চিন্তা করলেন, জমির কোনো অংশই ফেলে রাখা যাবে না। সেই ভাবনা থেকেই বিগত ৫-৬ বছর ধরে তিনি শুরু করেন আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ।
বর্তমানে কামারালী মাঠে তাঁর ৫ বিঘা জমির ওপর বিশাল এক মৎস্য ঘের রয়েছে। যার মধ্যে সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে তিনি নিবিড়ভাবে মাছ চাষ করছেন। আর বাকি ১.৫ (দেড়) বিঘা পতিত জমিকে তিনি রূপ দিয়েছেন এক জীবন্ত প্রদর্শনী খামারে। ঘেরের পাড়ের এক ইঞ্চি জমিও তিনি ফেলে রাখেননি। ঘেরের পাড়ে পাড়ে আজ ঝুলছে খেরই, বরবটি, করলা, উচ্ছে, ঢেঁড়স, শিম, লাউ, কুমড়া আর কলার চমৎকার ফলন। আর্শীবাদের এক জলাধার আব্দুস সাত্তার সানার এই একক প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান ও টেকসই করেছে এলাকার ‘কামারালী রিজার্ভার’।
সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে এই রিজার্ভারটি এলাকার কৃষকদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও উত্তরাণের এই রিজার্ভারের কল্যাণে খরা বা সেচ সংকটের সময়েও কৃষকেরা নিরবচ্ছিন্ন পানির সুবিধা পাচ্ছেন, যা পুরো এলাকার কৃষি ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
অবহেলা থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার মন্ত্র আব্দুস সাত্তার সানা শুধু নিজের ভাগ্যবদল করেই ক্ষান্ত হননি। বিগত ৩ বছর ধরে তিনি এলাকার কৃষক ও কৃষাণীদের নিয়ে নিয়মিত উঠান বৈঠক করে আসছেন। গ্রামীণ নারীদের ঘরের কোণ থেকে বের করে এনে বাড়ির চারপাশের পরিত্যক্ত জমিতে কীভাবে সবজি চাষ করতে হয়, সেই পরামর্শ ও হাতে-কলমে শিক্ষা দেন তিনি।
তাঁর এই নিঃস্বার্থ পরামর্শ আর দিকনির্দেশনায় অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষ নিজেদের পতিত জমিতে চাষবাস শুরু করে। ধীরে ধীরে পুরো গ্রামের চিত্র পাল্টে যেতে থাকে। বেকারত্বমুক্ত এক অনন্য ‘আদর্শ গ্রাম’ আজ আব্দুস সাত্তার সানার সেই নীরব বিপ্লবের সুফল ভোগ করছে পুরো কামারালী গ্রাম।
বর্তমানে এই গ্রামে কোনো বেকার মানুষ নেই। অলস বসে থাকার দিন ফুরিয়েছে; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এখন কোনো না কোনো চাষবাস বা কৃষি কাজের সাথে যুক্ত। একসময় যাদের অভাব-অনটনে দিন কাটত, আজ তাদের আর কারো দুয়ারে হাত পাততে হয় না। গ্রামের প্রতিটি পরিবার এখন স্বাবলম্বী, প্রত্যেকের মুখে ফুটেছে আত্মতৃপ্তির হাসি।
কামারালী গ্রামটি এখন একটি অনুকরণীয় ‘আদর্শ গ্রাম’। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতির এক নিপুণ শিল্পী সবুজ ক্যানভাসে গ্রামটিকে সাজিয়েছেন। আর এই সবুজ সমারোহ এবং প্রতিটি মানুষের মুখে স্বাবলম্বী হওয়ার যে হাসি, তার পিছনের মূল কারিগর-সফল উদ্যোক্তা আব্দুস সাত্তার সানা। তাঁর এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রমের সাথে যদি সদিচ্ছা থাকে, তবে একটি মানুষের হাত ধরে পুরো সমাজের রূপান্তর সম্ভব। সংবাদদাতা জুলফিকার আলী












