সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: উপকূলে মিঠাপানির সংকট
সাতক্ষীরাসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠাপানির সংকট এখন আর কেবল একটি সাধারণ সমস্যা নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক মানবিক ও অস্তিত্বের সংকটে। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব, তীব্র জলোচ্ছ্বাস, নদী-খাল ভরাট এবং আশঙ্কাজনকভাবে ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানিতে লবণাক্ততার আগ্রাসন উপকূলের মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও জীবিকাকে চরম বিপন্ন করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় সম্প্রতি সাতক্ষীরায় ‘মিঠা পানির যোগান নিশ্চিতকরণ ও ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় অংশীজনের করণীয়’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট আজ কতটা তীব্র, তা সেখানে না গেলে অনুধাবন করা কঠিন। মাইলের পর মাইল হেঁটে কলসি কাঁখে নারীদের একটু খাওয়ার পানির জন্য সংগ্রাম করা কিংবা লবণাক্ত পানি পানের ফলে নারীদের জরায়ুর রোগসহ নানা চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়া নিত্যদিনের চিত্র। অন্যদিকে, মিঠাপানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে কৃষি ও গবাদিপশু পালন। অর্থাৎ, পানির এই সংকট উপকূলের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনমিতিকেই বদলে দিচ্ছে।
সাতক্ষীরার কর্মশালায় সরকারি কর্মকর্তা, পরিবেশকর্মী, সাংবাদিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠ থেকে যে উদ্বেগ ও সুপারিশগুলো উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত যৌক্তিক। প্রধান অতিথি সাতক্ষীরা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা যথাযথই বলেছেন যে, মিঠাপানি কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার রক্ষায় কেবল সরকারি আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না; প্রয়োজন স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা এবং একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা।
খননের অভাবে ভরাট হয়ে যাওয়া স্থানীয় খাল ও ঐতিহ্যবাহী পুকুরগুলো দ্রুত পুনঃখনন করে মিঠাপানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা সবচেয়ে কার্যকর সমাধানগুলোর একটি। পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রযুক্তি ও সহায়তা বাড়াতে হবে। নদী, খাল ও সরকারি জলাশয় দখল করে যারা পরিবেশের ক্ষতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’ এবং স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কর্মশালা থেকে উঠে আসা সুপারিশমালাকে কেবল কাগজের দলিলে বন্দি না রেখে, দ্রুত সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এবং তা বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
উপকূলের মানুষের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সংস্থাসমূহ সাতক্ষীরার এই কর্মশালার সুপারিশগুলোকে আমলে নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান ও ‘সবুজ দিন’ বিনির্মাণে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। উপকূলের মানুষকে বাঁচাতে মিঠাপানির অধিকার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।









