রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

সাতক্ষীরায় বছরে ২২ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
সাতক্ষীরায় বছরে ২২ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদন

পত্রদূত ডেস্ক: অর্থকরী ফসল হিসেবে সাতক্ষীরায় সুপারি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া যায় বলে নতুন নতুন সুপারির বাগান গড়ে তুলছেন চাষিরা। এতে বাড়ছে উৎপাদন, পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলায় বছরে প্রায় ৫০০ টন সুপারি উৎপাদিত হয়। যার বাজারমূল্য ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার বেশি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পান চাষের পাশাপাশি সুপারি উৎপাদনেও এগিয়ে যাচ্ছে সাতক্ষীরা। গত পাঁচ বছরে জেলায় সুপারি চাষের জমি বেড়েছে প্রায় ২৫০ বিঘা। ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ১৫০ বিঘা জমিতে সুপারি চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০০ বিঘায়। এ মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৫০ টন সুপারি। শুকনা সুপারি কেজিপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে ৫০০ টন সুপারির বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

তিন বিঘা জমিতে সুপারির বাগান করেছেন তালা উপজেলার কুমিরা গ্রামের কৃষক অরবিন্দ কুমার। তিনি বলেন, নারকেলসহ বিভিন্ন গাছের সঙ্গে সুপারি গাছ লাগিয়েছেন। একটি সুপারি গাছে ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। তাঁর বাগান থেকে বছরে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার সুপারি বিক্রি হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাগান থেকেই পাইকারি দামে সুপারি কিনে নিয়ে যান। তাঁর গ্রামের অনেক কৃষক পানবরজের পাশাপাশি সুপারি চাষ করছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পাটকেলঘাটা বাজারে সপ্তাহে দুই দিন—মঙ্গলবার ও শুক্রবার—সুপারি ও পান কেনাবেচার বড় হাট বসে। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এই হাটে সুপারি আসে। পাশাপাশি যশোর ও খুলনা থেকেও পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখানে সুপারি কিনতে আসেন।

বাজারের সুপারি আড়তদার হযরত আলী বলেন, সপ্তাহে দুই দিন তাঁর আড়তে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার সুপারি কেনাবেচা হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে সুপারি ও পান কিনে নিয়ে যান।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রাজারবাগান এলাকার সুপারি ব্যবসায়ী প্রণব চ্যাটার্জি জানান, কাঁচা ও শুকনা—দুই ধরনের সুপারিরই ভালো চাহিদা রয়েছে। তিনি প্রতিদিন পান ও সুপারি বিক্রি করেন। প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার পাটকেলঘাটা বাজার থেকে পাইকারি দামে পান ও সুপারি কেনেন। প্রতি হাজার কাঁচা সুপারি কিনতে হয় ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। আর শুকনা সুপারি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ৪৫০ টাকা দরে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, পান ও সুপারি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। জেলায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সুপারি উৎপাদিত হচ্ছে। অনেকে বাড়ির আঙিনায় সুপারির বাগান করছেন। আবার কেউ কেউ অন্য ফসলের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবেও সুপারি চাষ করছেন।

Ads small one

শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উৎসব আজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ
শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উৎসব আজ

পত্রদূত ডেস্ক: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্যামাপূজা (কালীপূজা) ও দীপাবলি আজ রোববার। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে সাধারণত শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। শক্তি ও শান্তির দেবী শ্যামা মায়ের পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে চলছে নানা আয়োজন। উৎসবকে ঘিরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস।

বাঙালি সংস্কৃতিতে কালীপূজা ও দীপাবলির উৎসবের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আলোর উৎসব দীপাবলিকে বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ‘দীপাবলি’ বললেও অবাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি ‘দিওয়ালি’ নামে পরিচিত। ধর্মীয় এই উৎসবকে অনেকে ‘দীপান্বিতা কালীপূজা’ও বলে থাকেন। অশুভ ও অকল্যাণের প্রতীক অন্ধকার দূর করে শুভ ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শত শত বছর ধরে এই উৎসব পালন করে আসছেন। বাঙালি, অসমীয়া ও ওড়িয়া হিন্দুরা এই তিথিতে কালীপূজা উদ্‌যাপন করেন।

পঞ্জিকামতে, রোববার দুপুর ১টা ২ মিনিটে অমাবস্যা তিথি শুরু হবে, যা শেষ হবে আগামীকাল সোমবার বেলা ১১টা ৫৮ মিনিটে।

কালীপূজা সাধারণত মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত হয়। একই তিথিতে কালীপূজার পাশাপাশি অনেকে লক্ষ্মীপূজাও করবেন। কালীপূজার দিন সন্ধ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বাড়িতে ও শ্মশানে প্রদীপ প্রজ্বালন করে প্রয়াত পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনকে স্মরণ করেন।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, সবুজবাগ থানাধীন শ্রীশ্রী বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, পুরান ঢাকার রাধাগোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দির, পোস্তগোলা মহাশ্মশান, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার ও বাংলাবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ ও মন্দিরে শ্যামাপূজার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

আলো ও উৎসবের এক মহামিলন দীপাবলি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ
আলো ও উৎসবের এক মহামিলন দীপাবলি

প্রকাশ ঘোষ বিধান

দীপাবলি বা দেওয়ালি হলো আনন্দ, আলো ও উৎসবের এক মহামিলন। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক উৎসব। সংস্কৃত ‘দীপ’ (আলো) এবং ‘আবলি’ (সারি) শব্দ দুটি মিলে ‘দীপাবলি’ শব্দের উৎপত্তি, যার শাব্দিক অর্থ প্রদীপের সারি। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। এই উৎসব মূলত আধ্যাত্মিক অন্ধকার দূর করে আলোর প্রতিষ্ঠা, মন্দের ওপর ভালোর জয় এবং অজ্ঞতার ওপর জ্ঞানের বিজয়ের প্রতীক।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ও দেদীপ্যমান উৎসব হলো দীপাবলি। শরৎ ও হেমন্তের সন্ধিক্ষণে, যখন চারদিকে প্রকৃতিতে হিমেল হাওয়া ও মৃদু অন্ধকার নেমে আসে, তখন কোটি কোটি প্রদীপের আলোয় মর্ত্যভূমিকে স্বর্গীয় আভায় রাঙিয়ে তোলে এই উৎসব। বর্ণিল আলোকসজ্জা, আতশবাজির রোশনাই এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে এই দিনটি আবালবৃদ্ধবনিতাকে এক অনাবিল আনন্দে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

দীপাবলি উৎসবের পেছনে একাধিক ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের বিশ্বাসমতে, রাক্ষসরাজ রাবণকে বধ করে ১৪ বছরের বনবাস শেষে এই দিনেই শ্রীরামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষ্মণসহ অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন। তাঁদের স্বাগত জানাতে অযোধ্যাবাসী সমগ্র নগরী ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকময় করে তুলেছিলেন।

দক্ষিণ ভারতে বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারী অসুর নরকাসুরকে বধ করে মর্ত্যবাসীকে স্বস্তি দিয়েছিলেন। শুধু হিন্দুধর্মেই নয়, জৈনধর্মাবলম্বীদের মতে, ৫২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই দিনে মহাবীর মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেন। আবার শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ ৫২ জন রাজপুত্রসহ এই দিনে কারামুক্ত হয়েছিলেন বলে শিখ সম্প্রদায় দিনটিকে ‘বন্দী ছোড় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে।

দীপাবলি সাধারণত পাঁচ দিনব্যাপী একটি উৎসব, যার প্রতিটি দিনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। উৎসবের মূল দিনটিতে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মাটির তৈরি প্রদীপ, মোমবাতি এবং আধুনিক নানা ধরনের আলোকসজ্জায় পুরো বাড়ি সাজানো হয়। দরজার সামনে রঙিন গুঁড়ো বা আবির দিয়ে তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন আলপনা বা রঙ্গোলি। বাঙালি সমাজে দীপাবলির আগের দিন ভূত চতুর্দশী উপলক্ষে ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো এবং ১৪ শাক খাওয়ার নিয়ম রয়েছে। দীপাবলির রাতে পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে শ্রীশ্রী কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে দেবী লক্ষ্মী ও গণেশের পূজা করা হয়। আনন্দ ভাগ করে নিতে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মধ্যে মিষ্টি ও উপহার বিতরণ করা হয়।

দীপাবলি জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে মানুষকে একত্রিত করে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে এই উৎসবের সার্বজনীন রূপ দেখা যায়। অনেক দেশে এ উপলক্ষে সরকারি ছুটিও থাকে। এটি কেবল বাহ্যিক আলোর প্রদর্শনী নয়; মানুষের অন্তরের কুসংস্কার, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির আলো জ্বালানোর এক মহান বার্তা বহন করে।

উপনিষদের সেই অমর বাণী—‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’, অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আমাদের আলোতে নিয়ে যাও—দীপাবলির মূল চেতনাকে ধারণ করে। আধুনিক আলোকসজ্জা বা আতশবাজির চেয়েও দীপাবলির প্রকৃত সার্থকতা লুকিয়ে আছে মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে সমাজে শান্তি, ভালোবাসা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে।

দীপাবলি জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সর্বজনীন সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। মাটির টিমটিমে প্রদীপের ঐতিহ্য আজ আধুনিক চিনে আলোর ঝলকানিতে কিছুটা রূপ পাল্টালেও এর অন্তর্নিহিত আবেদন চিরন্তন। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশের কথা মাথায় রেখে শব্দবাজিমুক্ত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব দীপাবলি উদযাপনের চেতনা ছড়িয়ে পড়ছে। প্রদীপের আলো যেমন চারপাশের অন্ধকার দূর করে দেয়, তেমনি দীপাবলির আলো প্রতিটি মানুষের জীবনকে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে তুলুক—এটাই হোক এই উৎসবের প্রার্থনা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস: সুপরিকল্পিত নগরই সমৃদ্ধ জনপদের নিদর্শন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:৫১ পূর্বাহ্ণ
বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস: সুপরিকল্পিত নগরই সমৃদ্ধ জনপদের নিদর্শন

সাকিবুর রহমান বাবলা
নগর কেবল ইট-পাথরের দালান, প্রশস্ত সড়ক কিংবা সুউচ্চ অট্টালিকার সমষ্টি নয়। একটি নগরের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সাফল্য নির্ভর করে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার মান, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচলের ওপর। পরিকল্পিত নগর মানুষকে শুধু বসবাসের জায়গা দেয় না, বরং কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক-সামাজিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে। নগর পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর ৮ নভেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস।
আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্লোস মারিয়া দেলা পাওলেরা ১৯৪৯ সালে দিবসটির প্রচলন করেন। তিনি প্যারিসের ইনস্টিটিউট অব আরবানিজম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। নগর পরিকল্পনার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি এবং পরিকল্পিত নগর গঠনে পেশাজীবীদের ভূমিকা তুলে ধরাই ছিল তাঁর উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব সিটি অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানার্স এবং গ্লোবাল প্ল্যানার্স নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন দিবসটির প্রচার ও উদযাপনে ভূমিকা রাখে।
দিবসটির একটি বিশেষ প্রতীকী পতাকাও রয়েছে। অধ্যাপক দেলা পাওলেরার পরিকল্পিত এই পতাকায় নীল, সবুজ ও সোনালি হলুদ রঙের সমন্বয় রয়েছে। নীল রং আকাশ ও বাতাস, সবুজ প্রকৃতি ও ভূমি এবং সোনালি হলুদ সূর্যের প্রতীক। এই প্রতীকের মাধ্যমে নগর পরিকল্পনায় মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ভারসাম্যের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
২০২৬ সালের প্রচারাভিযানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের মাধ্যমে পরিকল্পনার ইতিবাচক ফলাফল তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালের ‘পরিকল্পনাই সমাধানের একটি অংশ’ বার্তার ধারাবাহিকতায় এবারের মূল ভাবনা হলো, পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে মানুষের জীবন ও জনপদের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। রয়্যাল টাউন প্ল্যানিং ইনস্টিটিউট বিশ্বব্যাপী পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। কারণ জনগণের মতামত, স্থানীয় জ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা ও সম্মিলিত আকাক্সক্ষার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই জনপদ।
বর্তমান বিশ্বে দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যগত বৈষম্য এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, জলাভূমি ও কৃষিজমি ধ্বংস, বস্তির বিস্তার এবং নাগরিক বৈষম্য বাড়ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, সাশ্রয়ী আবাসন, আধুনিক গণপরিবহন, প্রশস্ত ও নিরাপদ ফুটপাত, সাইকেল চলাচলের ব্যবস্থা, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান এবং পর্যাপ্ত সবুজায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নদী, খাল ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বিশ্বের কয়েকটি নগর এ ক্ষেত্রে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন মানবকেন্দ্রিক ও সাইকেলবান্ধব নগর পরিকল্পনার জন্য পরিচিত। সিঙ্গাপুর পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, আবাসন ও সবুজায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা সাশ্রয়ী আবাসন ও গণপরিবহনে, ব্রাজিলের কুরিতিবা বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ও পরিবেশবান্ধব নগরায়ণে এবং সুইজারল্যান্ডের জুরিখ সমন্বিত গণপরিবহন ও নগর ব্যবস্থাপনায় প্রশংসিত। বিভিন্ন সূচকের মাধ্যমে এসব শহরের সাফল্য মূল্যায়ন করা হয়।
নগর পরিকল্পনার ইতিহাসে প্যাট্রিক গেডেস, এবেনেজার হাওয়ার্ড, জেন জ্যাকবস, ইয়ান গেল ও জাইমে লার্নারের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্যাট্রিক গেডেস নগর, সমাজ, পরিবেশ ও অর্থনীতির সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন। এবেনেজার হাওয়ার্ডের গার্ডেন সিটি ধারণা আধুনিক পরিকল্পিত নগরায়ণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। জেন জ্যাকবস স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও মানবিক নগরচিন্তার প্রবক্তা। ইয়ান গেল পথচারীবান্ধব নগর ও জনপরিসর উন্নয়নে এবং জাইমে লার্নার কুরিতিবার গণপরিবহন ও পরিবেশবান্ধব নগর রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ২০২৩ সালে প্ল্যানেটিজেনের পাঠক-ভোটভিত্তিক ১০০ প্রভাবশালী নগরচিন্তাবিদের তালিকায় জেন জ্যাকবস প্রথম এবং ইয়ান গেল দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
বাংলাদেশে নগর পরিকল্পনার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় মূলত ১৯৫০-এর দশকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে নগর পরিকল্পনা শাখার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এ উদ্যোগের সূচনা। ১৯৫৩ সালে টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট প্রণয়ন এবং ১৯৫৬ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নগর পরিকল্পনা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৯ সালে ঢাকার প্রথম মহাপরিকল্পনা প্রণীত হয়। ১৯৬২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ফিজিক্যাল প্ল্যানিং বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলেও এর শিক্ষাক্রম শুরু হয় ১৯৬৯ সালে। এর মধ্য দিয়ে দেশে পেশাদার নগর পরিকল্পনাবিদ তৈরির আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের মতো পেশাজীবী সংগঠনও দিবসটি পালন করে।
বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ সাতক্ষীরার মতো শহরেও পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। সাতক্ষীরা জেলার তিনটি পৌরসভা ও সাতটি উপজেলায় প্রায় ২২ লাখ মানুষের বসবাস। সমৃদ্ধ নগর গড়ে তুলতে বিশেষ করে জলাবদ্ধতা নিরসন, নদী-খাল ও জলাভূমি সংরক্ষণ, সাশ্রয়ী আবাসন, নিরাপদ সড়ক, সামাজিক বনায়ন, কার্যকর গণপরিবহন এবং পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।
একটি আদর্শ নগর গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু নগর পরিকল্পনাবিদদের নয়; জনপ্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকÑসবারই সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। নগর পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, জনবান্ধব, পরিবেশসম্মত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনের প্রতি সংবেদনশীল। কারণ সুন্দর ও সমৃদ্ধ জনপদ কখনো অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে না। মানুষের নিরাপদ, সুস্থ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি নগরের প্রকৃত সার্থকতা প্রকাশ পায়।