সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩

সাবেক এমপি লায়লা পারভিন সেঁজুতি ফের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার, জামিন আবেদন না’মঞ্জুর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৭:৫৪ অপরাহ্ণ
সাবেক এমপি লায়লা পারভিন সেঁজুতি ফের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার, জামিন আবেদন না’মঞ্জুর

পত্রদূত রিপোর্ট: সাবেক সাংসদ ও সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক লায়লা পারভীন সেঁজুতিকে আবারো একটি অপহরণ ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সাতক্ষীরা দায়রা জজ আদালত থেকে অহিদ হত্যা মামলায় জামিন লাভ করার পর মামলার কুচপুকুরের আনিছুর হত্যা মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক আব্দুল্লাহিল আরিফ নিশাথের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার সাতক্ষীরার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম বিলাস মন্ডলের আদালত তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখান। একইসাথে তাকে ওই মামলায় তার জামিন আবেদন না’মঞ্জুর করা হয়।

২০২৫ সালের ২০ মে গভীর রাতে সাবেক এমপি সেঁজুতিকে পুলিশ তার রাধানগরস্থ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। তাকে সাতক্ষীরা বাইপাস সড়কে সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক সংক্রান্ত মিছিলের ঘটনায় জনৈক অলিউর রহমানের দায়ের করা মামলায় সন্দিগ্ধ আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকাকালিন তাকে বাইপাস সড়কে মৎস্যজীবী দলের নেতা সাইফুল ইসলামের বাড়ি সংলগ্ন অফিস ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় সন্দিগ্ধ আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একইভাবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে বাইপাস সড়কে লাঠিসোটাসহ মিছিল ও সরকার পতনের চেষ্টার অভিযোগে জনৈক আব্দুল হামিদ সরদারের দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

 

জিআর-৭৭/২৫ ও জিআর-৯৬ ২৫ নং মামলায় সেঁজুতি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। জিআর-২৭৮/২৫ নং মামলায় গত ৩ জুন তিনি মহামান্য হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলে ১০ জুন সাতক্ষীরা আদালত থেকে তার জামিননামা সাতক্ষীরা কারাগারে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপক্ষ ওই জামিনাদেশ স্থগীত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজে আবেদন করলে গত ১৬ জুন তা নো অর্ডার হয়। তবে তার আগেই জামিন স্থগীতের একটি চিঠি সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে পাঠান। ফলে সুপ্রিম কোর্টে জামিনাদেশ স্থগিত না হলেও ১০ জুন পাঠানো জামিননামা কার্যকর করেনি কারা কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, তিনটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর সেঁজুতিকে গত ২০২০ সালের ১৬ মার্চ ধুলিহরের অহেদ আলী অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী পারুল বেগমের দায়েরকৃত ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর থানার জিআর-২৯৯/২৪ নং মামলায় সন্দিগ্ধ আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। ওই মামলায় সাতক্ষীরা দায়রা জজ মোঃ নজরুল ইসলামের আদালত গত ২৫ জুন তাকে জামিন দেন। জামিননামা ওইদিন জেলখানায় পাঠানো হলেও তার ২৭৮/২৫ নং মামলায় জামিননামার কার্যক্রম কারাগারে ঝুলে থাকে। এর বিরুদ্ধে সেঁজুতির আইনজীবীরা রবিবার সাতক্ষীরার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে আবেদন করলে তিনি কারাকর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

 

এরপরপরই সেঁজুতির স্বজন ও আইনজীবীরা জানতে পারেন যে, তাকে ২০১৪ সালের ১৮ জুলাই রাতে শহরতলীর কুচপুকুরের অজিহার মোড়লের ছেলে আনিছুর অপহরণ ও হত্যা মামলায় (জিআর-৪০২/২৪ সদর) সন্দিগ্ধ আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আবেদন করা হয়।

এদিকে সোমবার আদালত চত্বরে লায়লা পারভিন সেঁজুতি তার শুভাকাঙ্খীদের উদ্দেশ্যে বলেন, অন্যায় চিরদিন পরাজিত হয়। তাকে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তবে এর সুফল তিনি দ্রুত পাবেন। তিনি সকলকে ধৈর্য্য ধরার আহবান জানান।

এদিকে জানতে চাইলে রবিবার বিকেলে ধুলিহরের পারুল বেগম মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি মামলা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানেন না। তাকে দিয়ে যারা মামলা করিয়েছেন তারাই মামলার বর্তমান অবস্থা বলতে পারেন। লায়লা পারভীন সেঁজুতিকে তিনি চেনেন না।

কুচপুকুরের অনিছুর হত্যা মামলার বাদি মকফুর রহমান রবিবার বিকেলে মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি যাদের নামে ভাই হত্যা মামলা করেছেন তাদের প্রত্যেককে চেনেন। বর্তমানে ওই মামলায় একজন গ্রেপ্তার ও দুইজন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মামলার অভিযোগপত্র সম্পর্কে তিনি ১৫/২০ দিন আগে তদন্তকারি কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছিলেন।

লায়লা পারভীন সেঁজুতিকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি কাউকে হয়রানি করতে চান না। সেঁজুতিকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করলে অবশ্যই তার সঙ্গে মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তার কথা বলা উচিত ছিল। কারণ যাকে তাকে আসামী করা অনুচিত। অহেতুক কাউকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলে তাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাব দিতে হবে।

এ ব্যাপারে আনিছুর রহমান হত্যা মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল আরিফ নিশান সোমবার সাবেক সাংসদ লায়লা পারভীন সেজুঁতির জামিন আবেদন না’মঞ্জুর হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত করেন।

Ads small one

আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবস: গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র ও জনগণের কণ্ঠস্বর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ
আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবস: গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র ও জনগণের কণ্ঠস্বর

সাকিবুর রহমান বাবলা

৩০ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবস (International Day of Parliamentarism)। ২০১৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৭২/২৭৮ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে দিবসটির স্বীকৃতি দেয়। ১৮৮৯ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় Inter-Parliamentary Union, যা আজ বিশ্বের জাতীয় সংসদগুলোর বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংগঠন। বর্তমানে আইপিইউ’র সদস্য ১৮৩টি জাতীয় সংসদ, যা বিশ্বের অধিকাংশ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে।
সংসদ গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এখানে আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণ করেন। জাতিসংঘের মতে; ঐক্যবদ্ধ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

বিশ্বে অধিকাংশ দেশেই কোনো না কোনো ধরনের সংসদীয় বা প্রতিনিধিত্বমূলক আইনসভা রয়েছে। তবে সব দেশ সমানভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা নেই; কোথাও সংসদ কার্যকর, কোথাও তা সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন, এরমধ্যে হাতে গোনা দু-একটি দেশে গণতন্ত্র শুন্য হলেও সংসদ গঠন করা হয়। তবুও জনগণের মতামতকে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে সংসদীয় ব্যবস্থা আজও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত।

আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য হলো সংসদে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী নারীদের প্রতিনিধিত্ব আগের তুলনায় বাড়লেও এখনো তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একইভাবে তরুণ জনগোষ্ঠী বিশ্বের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ হলেও অধিকাংশ দেশের সংসদে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। অথচ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সম্পর্কিত ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাই সংসদে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনেরও অপরিহার্য শর্ত।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, গঠনমূলক বিতর্কের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার এবং নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমে সংসদকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রধান সুফল হলো জনগণের অংশগ্রহণ, ক্ষমতার ভারসাম্য, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং শান্তিপূর্ণভাবে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ। তবে দলীয়করণ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, দুর্নীতি বা প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি এর কিছু চ্যালেঞ্জ। ইসলামের শূরা বা পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলোÑজনস্বার্থে আলোচনা, মতবিনিময় ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতি।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর সংবিধানে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর দায়িত্ব পালন করে।

প্রতি বছর আন্তর্জাতিক সংসদীয় দিবস নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি অংশগ্রহণ, জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তি এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত করার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তরুণ ও নারীদের অধিক অংশগ্রহণ, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সংসদ এবং মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার-ই ভবিষ্যতের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

 

মানহানীর মামলায় পত্রিকা সম্পাদক মোহিত কুমার নাথ ও সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁ বেকসুর খালাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৭:৪৩ অপরাহ্ণ
মানহানীর মামলায় পত্রিকা সম্পাদক মোহিত কুমার নাথ ও সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁ বেকসুর খালাস

পত্রদূত রিপোর্ট: মানহানির মামলায় দীপ্ত টেলিভিশন, প্রজন্মের ভাবনা ও বাংলা ’৭১ এর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি রঘুনাথ খাঁ ও দৈনিক প্রজন্মের ভাবনার সম্পাদক মোহিত কুমার নাথকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। সোমবার দুপুরে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম বিলাস ম-ল এক জনাকীর্ণ আদালতে এ আদেশ দেন। মামলার বাদি আক্তারুজ্জামান বাচ্চু সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোমরপুর গ্রামের আব্দুর রশিদ সরদারের ছেলে।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৯ জুন রাত ৯টার দিকে সাংবাদিক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু প্রেসক্লাবের সামনে বসে ছিপ দিয়ে পৌরদীঘির মাছ ধরছিলেন। বিষয়টি তাকে সতর্ক করেন পৌরসভার নৈশ প্রহরী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। নিষেধ অমান্য করে মাছ ধরা অব্যাহত রাখলে একপর্যায়ে তাকে আটক করেন পৌরসভার নৈশ প্রহরী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। এ সময় তার কাছ থেকে আড়াই কেজি তেলাপিয়া মাছ ও একটি ছোট রুই মাছ জব্দ করা হয়।

 

এ ঘটনায় তিনি পৌর মেয়রের নির্দেশনা অনুযায়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৩০ জুন লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগপত্রে মাছ চুরির সময় ঘটনাস্থলে সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম, এম জিল্লুর রহমান, মনিরুল ইসলাম ও শাকিলা ইসলাম জুঁই উপস্থিত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় “অবশেষে মাছ চুরি করতে যেয়ে ধরা পড়লেন সাতক্ষীরার বাচ্চু” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ২০১৬ সালের পহেলা জুলাই দৈনিক প্রজন্মের ভাবনা পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

 

এতে ক্ষুব্ধ হন আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। একপর্যায়ে তিনি ওই বছরের ১৮ জুন সাতক্ষীরার জ্যেষ্ট বিচারিক হাকিম আদালতে দৈনিক প্রজন্মের ভাবনার সাতক্ষীরা প্রতিনিধি রঘুনাথ খাঁ ও সম্পাদক মোহিত কুমার নাথ এর বিরুদ্ধে ৫০৫, ৫০০ ও ৫০১ ধারায় মামলা দায়ের করেন। আদালত বিবাদীপক্ষের বিরুদ্ধে সমন জারির নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে দন্ডবিধির ৫০০ ও ৫০১ ধারায় মামলার অভিযোগ গঠণ করা হয়। মামলায় বাদি পক্ষে সাক্ষী দেন সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মনি ও শাকিলা ইসলাম জুঁই।

সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাড, মোসলেমউদ্দিন ও অ্যাড. জিয়াউর রহমান জিয়া জানান, ২৪৫(১) ধারায় সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁ ও সম্পাদক মোহিত কুমার নাথকে সোমবার বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত। এ সময় বাদি ও আসামী কাঠগোড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

পিটিআই মাঠের কিনারায় পালপাড়ার শেষ চাকার গল্প

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৪:৪২ অপরাহ্ণ
পিটিআই মাঠের কিনারায় পালপাড়ার শেষ চাকার গল্প

আখলাকুর রহমান

খুব সকালে যখন সাতক্ষীরা শহরের পিটিআই মাঠের পাশ দিয়ে হুসহুস করে মোটরসাইকেল, সাইকেল কিংবা যাত্রী বোঝাই ভ্যানগুলো ছুটে চলে, তখন ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দের আড়ালে একটা অদ্ভুত চাকার ঘূর্ণন শব্দ ঢাকা পড়ে যায়। চলতি পথে তীব্র গতির এই ব্যস্ত পিচঢালা রাস্তার ঠিক ধারেই হঠাৎ চোখ আটকে যায় সারি সারি সাজানো মাটির সানকি, কলস, আর ছোট ছোট লালচে খেলনা হাঁড়ি-পাতিলের ওপর। চারপাশের আধুনিক কোলাহল আর যানবাহনের এই তীব্র গতির মাঝে জায়গাটা যেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের সেই থমকে যাওয়া কোনো এক আদিম জনপদ। এটি আমাদের চেনা শহরের আড়ালের সেই ঐতিহ্যবাহী কুমোর পাড়া বা পালপাড়া।

 

আজ হয়তো মোটরসাইকেল বা ভ্যানের গতি একটু কমিয়ে জানালার বাইরে তাকালে সেখানে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটা ঘর চোখে পড়ে, যারা চরম দারিদ্র্য আর প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের দাপটের মাঝেও বুক দিয়ে আঁকড়ে ধরে রেখেছে তাদের বাপ-দাদার এই আদিম পেশাকে। কিন্তু এই জীর্ণতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, যার সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে, সাতক্ষীরার প্রাণস্পন্দন ‘প্রাণসায়র’ খালের হাত ধরে।

 

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন জমিদার প্রাণনাথ রায়চৌধুরী এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে পলিমাটি কেটে ‘প্রাণসায়র’ খাল খনন করেন, তখন ইছামতি নদী থেকে এই জলপথ ধরে দূর-দূরান্তের বণিকেরা আসত। বিভূতিভূষণের উপন্যাসের কোনো মায়াবী নদীর মতো খালের সেই জোয়ারের জলের টানেই তৎকালীন নদীয়া, চব্বিশ পরগনা এবং খুলনার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দক্ষ মৃৎশিল্পীরা এসে এই খালের কূলে বসতি স্থাপন করেন।

 

মৃৎশিল্পের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ভালো মানের আঠালো কাঁদা মাটি এবং তৈরি জিনিসপত্র দূর-দূরান্তে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সুলভ জলপথ। প্রাণসায়রের তীরের এই ভূখন্ডটি ছিল তাদের জন্য এক স্বর্গভূমি, কারণ খালের তলদেশের উর্বর পলিমাটি দিয়ে তৈরি হতো চমৎকার সব তৈজসপত্র, আর খালের ঘাট থেকেই নৌকায় করে তা চলে যেত দূরবর্তী হাট-বাজারে। দেখতে দেখতে পিটিআই মাঠের এই বিস্তীর্ণ এলাকাটি মুখরিত হয়ে উঠেছিল ‘পাল’ উপাধির শত শত কারিগরের কোলাহলে, যা কালের নিয়মে নাম পায় পালপাড়া।

সময় বদলেছে, জোয়ারের সেই প্রমত্তা প্রাণসায়র খাল আজ বদ্ধ, শীর্ণ এক প্রৌঢ়ার মতো নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। প্রকৃতি নিয়মরক্ষা করে দিনে হয়তো দুবার জোয়ার-ভাটা ঠিকই বয়ে নিয়ে আসে, কিন্তু সেই জলে আর আগের মতো লাবণ্যতা নেই, নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন। যে খালের বুক চিরে একসময় বড় বড় মহাজনী নৌকা আর ধোঁয়া ওড়ানো স্টিমার দাপিয়ে বেড়াত, আজ সেখানে শুধুই জমাট বাঁধা কচুরিপানার স্তব্ধতা। কোনো এক রূপকথার অভিশাপে যেন এই নৌপথের সমস্ত বাণিজ্যিকতা আজ একদম বন্ধ হয়ে গেছে।

 

খালের জলের সাথে সাথে যেন পালপাড়ার জৌলুসও শুকিয়ে গেছে, শত পরিবারের সেই বিশাল পাড়াটি আজ সংকুচিত হতে হতে মাত্র কয়েকটি ঘরে এসে ঠেকেছে। নতুন প্রজন্ম আর মাটির চাকার পেছনে সময় নষ্ট করতে চায় না, কিন্তু প্রবীণ যে দু-চারজন কারিগর এখনো টিকে আছেন, তাদের কাছে এটি কেবল জীবিকা নয়। এটি তাদের ধমনীতে বহমান বংশানুক্রমিক রক্ত আর ঐতিহ্য। প্রতিদিন ভোরবেলা তারা যখন কাদা মাখানো চাকাটি ঘোরান, তখন চাকার প্রতিটি ঘূর্ণনে যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রাণসায়রের পুরনো ইতিহাস।

লেখা : আখলাকুর রহমান, উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা