শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

সুখের পেছনে ছুটা নয়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৭:০১ অপরাহ্ণ
সুখের পেছনে ছুটা নয়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

“সুখ হলো একটি প্রজাপতির মতো। তুমি যত তাকে তাড়া করবে, ততই সে তোমার নাগালের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু যদি তুমি শান্তভাবে বসে থাকো, তবে হয়তো সে নিজেই এসে তোমার কাঁধে বসবে।”Ñবিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক ন্যাথানিয়েল হথর্নের এই উক্তিটি শুধু একটি সুন্দর উপমাই নয়; এটি মানুষের জীবনবোধের এক গভীর দর্শন। আধুনিক সভ্যতার দ্রুতগতির জীবন, প্রতিযোগিতার চাপ এবং ভোগবাদী মানসিকতার ভিড়ে এই কথাটি যেন আজ আরও বেশি সত্য হয়ে উঠেছে। মানুষ আজ সুখের জন্য যত বেশি ছুটছে, সুখ যেন ততই অধরা হয়ে পড়ছে। মানুষের জীবনের প্রতিটি প্রচেষ্টার কেন্দ্রে থাকে সুখের অনুসন্ধান।

 

শিশুর পড়াশোনা, তরুণের কর্মজীবন, ব্যবসায়ীর বিনিয়োগ, কৃষকের মাঠে পরিশ্রম, শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম কিংবা রাজনীতিবিদের জনসেবাÑসবকিছুর পেছনেই কোথাও না কোথাও সুখের আকাক্সক্ষা কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুখ কি সত্যিই এমন কিছু, যা কেবল অর্জনের মাধ্যমে পাওয়া যায়? নাকি সুখ এমন এক অনুভূতি, যা আমাদের মনোজগতের গভীরে লুকিয়ে থাকে? আজকের পৃথিবীতে সাফল্যের সংজ্ঞা অনেকটাই বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে যুক্ত। কে কত বড় বাড়ির মালিক, কার গাড়ি কত দামি, কে কত অর্থ উপার্জন করেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার অনুসারী কতÑএসব দিয়ে অনেকেই সুখের পরিমাপ করতে চান। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। পৃথিবীর বহু ধনী মানুষও মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও একাকীত্বে ভোগেন।

 

আবার সীমিত আয়ের বহু মানুষকে দেখা যায় পরিবার, প্রকৃতি ও আন্তরিক সম্পর্কের মধ্যেই পরম তৃপ্তিতে জীবন কাটাতে। অর্থাৎ সুখের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক থাকলেও সুখের উৎস কেবল অর্থ নয়। অর্থ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে, নিরাপত্তা দেয়, সুযোগ সৃষ্টি করে; কিন্তু মনের শান্তি কিনে দিতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট সীমার পর অর্থের পরিমাণ বাড়লেও সুখের পরিমাণ সমানুপাতিকভাবে বাড়ে না। বরং নতুন সম্পদ নতুন দায়িত্ব, নতুন উদ্বেগ এবং নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। বর্তমান সমাজে সুখকে সবচেয়ে বেশি দূরে ঠেলে দিচ্ছে তুলনার সংস্কৃতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন আমরা অন্যের সাজানো জীবন দেখি।

 

কারও বিদেশ ভ্রমণ, কারও নতুন গাড়ি, কারও সাফল্যের গল্প কিংবা বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়। অথচ আমরা ভুলে যাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ তার জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোই প্রকাশ করে; ব্যর্থতা, কান্না, হতাশা কিংবা একাকীত্ব খুব কমই প্রকাশ পায়। এই তুলনা মানুষের মনে অপ্রাপ্তির বোধ সৃষ্টি করে। ফলে নিজের জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোও আর চোখে পড়ে না। যে মানুষ গতকাল পর্যন্ত নিজের পরিবার, সন্তান কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ পেতেন, আজ তিনি অন্যের জীবন দেখে নিজের সুখকেও অসম্পূর্ণ ভাবতে শুরু করেন। এভাবেই সুখ ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।

 

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মন খুব দ্রুত নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এটিকে বলা হয় হেডোনিক অ্যাডাপটেশন। অর্থাৎ যে জিনিসটি একসময় আমাদের খুব আনন্দ দেয়, কিছুদিন পর সেটিই স্বাভাবিক হয়ে যায়। নতুন ফোন, নতুন বাড়ি, নতুন চাকরি বা পদোন্নতির আনন্দও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তখন আবার নতুন কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। এই অন্তহীন চক্রের মধ্যেই মানুষ সুখের পেছনে ছুটতে থাকে, কিন্তু স্থায়ী প্রশান্তি খুঁজে পায় না।বাংলার প্রাচীন দর্শন দর্শনÑসবখানেই সুখের মূল উৎস হিসেবে অন্তরের শান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধও বলেছেন, আকাক্সক্ষাই দুঃখের মূল কারণ। আকাক্সক্ষা যত বাড়বে, অস্থিরতাও তত বাড়বে। আবার আকাক্সক্ষাকে পুরোপুরি ত্যাগ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই রয়েছে মুক্তির পথ।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর বহু রচনায় সুখকে বাহ্যিক অর্জনের পরিবর্তে অন্তরের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর দর্শনে মানুষ তখনই সত্যিকারের সুখী হয়, যখন সে প্রকৃতির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে এবং নিজের অন্তরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলতে পারে। জীবনানন্দ দাশের কবিতাতেও প্রকৃতির নির্জন সৌন্দর্যের মধ্যে যে প্রশান্তির সন্ধান পাওয়া যায়, তা আমাদের শেখায়Ñসুখ সব সময় কোলাহলের মধ্যে থাকে না। আজকের শিশু-কিশোররাও এই অস্থিরতার শিকার। পরীক্ষার ফল, প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ারের চাপ এবং অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা তাদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে। তারা ভালো মানুষ হওয়ার আগে সফল মানুষ হওয়ার শিক্ষা পাচ্ছে। ফলে সাফল্য এলেও আনন্দ অনেক সময় আসে না।

 

শিক্ষা যদি কেবল প্রতিযোগিতা শেখায়, কিন্তু জীবনকে উপভোগ করতে না শেখায়, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও অনেক পরিবারে আন্তরিক আলাপের সময় নেই। সবাই ব্যস্ত নিজের কাজ, নিজের মোবাইল কিংবা নিজের জগৎ নিয়ে। অথচ একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়; পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান এবং সময়। যে পরিবারে আন্তরিক সম্পর্ক থাকে, সেখানে সীমিত সম্পদেও সুখের অভাব হয় না। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুখ একটি সামাজিক বিষয়ও।

 

যে সমাজে বৈষম্য কম, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, শিক্ষা সবার নাগালে এবং মানুষ একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলÑসেই সমাজে মানুষ তুলনামূলক বেশি সুখী থাকে। অন্যদিকে দুর্নীতি, বৈষম্য, বেকারত্ব, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক প্রশান্তিকে নষ্ট করে দেয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের লক্ষ্য যদি কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি হয়, আর মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা উপেক্ষিত থাকে, তবে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদ- হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সুখের অনুভূতি।

সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কৃতজ্ঞতা। আমরা যা পাইনি, তা নিয়েই বেশি ভাবি; অথচ যা পেয়েছি, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যাই। সুস্থ শরীর, পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের আন্তরিকতা, প্রতিদিনের সূর্যোদয় কিংবা একটি শান্ত সন্ধ্যাÑএসবের মূল্য অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না। অথচ এসবই জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। মানুষ যখন অন্যের উপকার করে, সমাজের জন্য কিছু করে কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন তার মনে যে আনন্দ জন্ম নেয়, তা কোনো বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

 

গবেষণায়ও দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, দান এবং সামাজিক অংশগ্রহণ মানুষের মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক প্রাণী; অন্যের সুখের সঙ্গে নিজের সুখও জড়িয়ে থাকে। প্রকৃতিও সুখের এক অনন্য উৎস। অথচ আধুনিক নগরজীবনে মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। নদী, গাছ, পাখি, খোলা আকাশ কিংবা বৃষ্টির শব্দÑএসবের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কমে যাচ্ছে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মধ্যেও যে গভীর মানসিক প্রশান্তি রয়েছে, তা আজ বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও প্রমাণিত।

 

প্রজাপতির উপমাটি আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়। প্রজাপতি কখনো কোলাহল পছন্দ করে না। শান্ত পরিবেশেই সে বসে। সুখও তেমনই। অস্থিরতা, লোভ, অহংকার, হিংসা এবং অযথা প্রতিযোগিতার মধ্যে সুখ বেশিক্ষণ থাকে না। সুখ আসে তখনই, যখন মানুষ নিজের ভেতরে শান্তির একটি আশ্রয় গড়ে তুলতে পারে। তাই সুখের জন্য লক্ষ্যহীন হয়ে বসে থাকাও সমাধান নয়। মানুষকে অবশ্যই পরিশ্রম করতে হবে, স্বপ্ন দেখতে হবে, সাফল্যের জন্য চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সেই চেষ্টা যেন অস্থিরতা, লোভ বা আত্মবিনাশের কারণ না হয়। কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকবে, কিন্তু ফলের প্রতি অতি-আসক্তি থাকবে না। অর্জনের আনন্দ থাকবে, কিন্তু প্রাপ্তির অহংকার থাকবে না। এই ভারসাম্যই মানুষকে প্রকৃত সুখের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

 

আমরা যদি সন্তানদের কেবল সফল নয়, সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি; যদি পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পারি; যদি সমাজে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি; যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দিইÑতবেই সুখী সমাজ গড়ার পথে এগোনো সম্ভব। শেষ পর্যন্ত সুখ কোনো গন্তব্য নয়, কোনো পুরস্কারও নয়। সুখ হলো জীবনযাপনের একটি শিল্প। এটি ছোট ছোট মুহূর্তে, আন্তরিক সম্পর্কের উষ্ণতায়, কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং নিজের সঙ্গে নিজের শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। প্রজাপতিকে ধরতে দৌড়ালে সে উড়ে যায়। কিন্তু ফুলে ভরা একটি সুন্দর বাগান তৈরি করলে প্রজাপতি নিজেই সেখানে আসে।

 

মানুষের জীবনও ঠিক তেমন। সুখের পেছনে অন্ধভাবে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে এমন একটি সুন্দর, সৎ, সংযমী ও মানবিক জীবন গড়ে তোলাই শ্রেয়, যেখানে সুখ নিজেই একদিন নীরবে এসে আমাদের কাঁধে বসবে। তখন সুখ আর ক্ষণিকের অনুভূতি থাকবে না; তা হয়ে উঠবে জীবনযাপনের স্বাভাবিক সঙ্গী।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

Ads small one

প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ণ
প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা এবং একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন

দীপঙ্কর বিশ্বাস

সংবাদপপত্রের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ‘নোটিফিকেশন ফিড’ সাংবাদিকতার রূপান্তর ঘটেছে চোখে পড়ার মতো গতিতে। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট বদলে দিয়েছে তথ্য দেওয়া-নেওয়ার পুরো ব্যাকরণ। কিন্তু এই পরিবর্তনের স্্েরাতে ভেসে ওঠা বড় প্রশ্নটি হলো: প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে, নাকি এর পেশাদারিত্বকে ঠেলে দিয়েছে অবক্ষয়ের দিকে?

একদিক থেকে বিচার করলে, প্রযুক্তি সাংবাদিকতার জন্য নিয়ে এসেছে এক নতুন দিগন্ত। এখন আর কোনো ঘটনা ঘটলে পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না; মুহূর্তের মধ্যেই তথ্য পৌঁছে যায় কোটি কোটি মানুষের কাছে। মাঠপর্যায়ের জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ড্রোন ও স্যাটেলাইট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল নথিপত্র ঘেঁটে তথ্য বের করার কাজ প্রযুক্তি সংবাদকর্মীদের ক্ষমতা ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তথ্যের এই বাঁধভাঙা জোয়ারে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়েছে, তা হলো বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদের নির্ভুলতার পরীক্ষা। ‘সবার আগে খবর দেওয়া’র এক প্রতিযোগিতায় সংবাদের যাচাই-বাছাই বা ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব হারাচ্ছে। সংবেদনশীলতা আর চটকদার শিরোনাম এখন গভীর ও মানসম্পন্ন অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চেয়ে ভুয়া খবর এবং গুজব অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুগে এসে মৌলিক কনটেন্ট বা লেখালেখির ধরণে এক ধরনের যান্ত্রিকতা কাজ করছে। সাংবাদিকতা তো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়; এর পেছনে থাকে মানবিক আবেদন, সহমর্মিতা, নীতি-নৈতিকতা এবং সমাজকে বুঝতে পারার প্রজ্ঞা, যা কোনো প্রযুক্তির পক্ষে হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যখন কেবল পেজভিউ কিংবা রিচ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে, তখন সাংবাদিকতা তার মহৎ সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি নিজেই নিজের মধ্যে কোনো অবক্ষয় বয়ে আনে না; অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন প্রযুক্তিকে পেশাগত নীতি ও নৈতিকতার উপরে স্থান দেওয়া হয়। প্রযুক্তিকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে যদি সংবাদের মূল ভিত্তি সত্যতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রাখা যায়, তবেই কেবল সাংবাদিকতা তার গৌরব বজায় রাখতে পারবে।

 

দিনশেষে, আধুনিকতম প্রযুক্তিও একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের বিবেক ও অনুসন্ধানী দৃষ্টির বিকল্প হতে পারে না।

 

 

পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ
পুতুল নাচে বেঁচে থাকে বাংলার লোকঐতিহ্য

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। হাটের পাশে কিংবা গ্রামের খোলা মাঠে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাপড়ের পর্দা টাঙিয়ে তৈরি হতো ছোট্ট একটি মঞ্চ। সন্ধ্যা নামতেই ভিড় জমাতেন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসত ঢোল, করতাল, বাঁশি কিংবা হারমোনিয়ামের সুর। তারপর শুরু হতো পুতুলের অভিনয়। সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুল কখনো রাজা, কখনো রানি, কখনো বীর যোদ্ধা, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র হয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করত।

 

সেই পুতুল নাচ ছিল শুধু বিনোদন নয়, ছিল গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অনন্য বাহক। বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে পুতুল নাচ অন্যতম। বহু শতাব্দী ধরে এই শিল্প মানুষের আনন্দ, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ধর্মীয় কাহিনি, রূপকথা, লোকগাঁথা, নৈতিক শিক্ষা কিংবা সামাজিক সমস্যার গল্পÑসবই উঠে আসত পুতুল নাচের মঞ্চে।

 

শিল্পীরা কণ্ঠস্বর বদলে একাই একাধিক চরিত্রের সংলাপ বলতেন, যা দর্শকদের বিস্মিত করত। পুতুল নাচের পুতুলগুলো তৈরি হতো কাঠ, কাপড়, রঙ ও সুতা দিয়ে। একজন দক্ষ কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একটি পুতুল তৈরি করতেন। এরপর সেই পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করতেন শিল্পী। হাতের নিপুণ কৌশলে সুতো টেনে পুতুলকে হাঁটানো, নাচানো, হাসানো কিংবা কান্নার অভিনয় করানো ছিল এক অসাধারণ শিল্প।

 

একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুতুল নাচের দল ছিল বেশ পরিচিত। শীতের মৌসুমে কিংবা গ্রামীণ মেলায় তাদের ব্যস্ততা থাকত সবচেয়ে বেশি। একটি দল কয়েক মাস ধরে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে অনুষ্ঠান করত। দর্শকদের দেওয়া অর্থেই চলত তাদের সংসার। সেই সময় এই শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল অনেক পরিবারের জীবিকার উৎস। কালের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।

 

টেলিভিশন, সিনেমা, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। গ্রামের মাঠে এখন আর আগের মতো পুতুল নাচের আসর বসে না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাস্তবে পুতুল নাচ দেখেনি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প।শুধু দর্শক কমে যাওয়াই নয়, শিল্পীদের জীবনও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।

 

কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিকাজ, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সদস্যরা আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী নন। কারণ এতে নেই আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতি। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পুতুল নাচ কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একটি পুতুল নাচের প্রদর্শনীতে যেমন থাকে অভিনয়, তেমনি থাকে সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলা, কারুশিল্প ও নাট্যকলার সম্মিলন। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত লোকশিল্প।

 

বর্তমান সময়ে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন, পুতুল নাচের দলকে আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে এই শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যটনের সঙ্গেও পুতুল নাচকে যুক্ত করা সম্ভব।

 

দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ঐতিহ্যবাহী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচের আয়োজন করলে শিল্পীরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরাও বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। ডিজিটাল যুগেও এই শিল্পের নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। পুতুল নাচের ভিডিও ধারণ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচার, শিশুদের জন্য অ্যানিমেশনধর্মী উপস্থাপনা কিংবা আধুনিক গল্পের সঙ্গে লোকজ উপাদানের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুনভাবে এই শিল্পকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

 

এতে ঐতিহ্যও রক্ষা পাবে, আবার নতুন দর্শকও তৈরি হবে। একটি জাতির পরিচয় শুধু তার উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পেও নিহিত থাকে। পুতুল নাচ সেই পরিচয়েরই এক উজ্জ্বল অংশ। এই শিল্প হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়, গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি এবং বহু শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার।

 

তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পুতুল নাচকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ পুতুলের সুতোয় বাঁধা সেই ছোট্ট মঞ্চে লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: সংবাদকর্মী

পাইকগাছায় নার্সারীতে গুটি কলম তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ২:১৯ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় নার্সারীতে গুটি কলম তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): পাইকগাছার নার্সারী গুলিতে গুটি কলম তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছে মালিক ও শ্রমিকরা। গুটি কলম তৈরীর উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। সাধারণত বৈশাখ-আষাঢ় গুটি কলম তৈরীর উপযুক্ত সময়। বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়া ও মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় এই সময়ে কলমের ডালে খুব দ্রুত ও সফলভাবে শিকড় গজায়।

মাতৃগুণ বজায় রাখা, দ্রুত ফলন, রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বাড়ানো এবং অধিক ফলন পেতে গুটিকলম ব্যবহার করা হয়। সম্পূর্ণ মাতৃগাছে গুণাগুন সমৃদ্ধ চারা করার জন্য গুটিকলম জনপ্রিয়। কাগজি লেবু, পেয়ারা, লিচু, জলপাই, ডালিম, করম চা, গোলাপ জামসহ বিভিন্ন গাছে গুটি কলম করা হয়।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ছোট-বড় প্রায় ৫ শতাধিত নার্সারী গড়ে উঠেছে। যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যা রয়েছে গদাইপুর গ্রামে। বর্ষা মৌসুম শুরুতে চারা তৈরীর জন্য নার্সারী মালিক ও কর্মচারীরা গুটিকলম তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেছে। যে গাছের ডালে গুটি করা হবে সে ডালের বয়স কমপক্ষে ৬ মাস থেকে ২ বছর হতে হবে। গুটি কলম তৈরী করতে গাছের ডালের দুই ইঞ্চি মত ছাল পুরাটা গোল করে কেঁটে ফেলে জৈব সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে কাঁটা অংশ ভাল করে বেঁধে গুটি করতে হবে। মাটির গুটি সবসময় ভিজা রাখতে হবে। মাটিতে পলিথিন দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে। ১ মাসের মধ্যেই মাটির ভিতর থেকে শিকড় বেড় হয়।

হিতামপুর গ্রামে অবস্থিত রজনীগন্ধা নার্সারীর মালিক সুকনাথ পাল জানান, এ বছর তার নার্সারীতে ২৫ হাজার গুটি কলমের চারা তৈরী করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মিস্টি জলপাই, মাল্টা, পেয়ারা ও লিচু।

গদাইপুর নার্সারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সরদার জানান, তার নার্সারীতে বিভিন্ন জাতের প্রায় ৪৫ হাজার গুটি কলম তৈরী করছেন। শ্রমিকের অভাবে কলম তৈরী করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে কলম তৈরীর সময় পার হয়ে গেলে এ মৌসুমের আর গুটি কলম তৈরী করা যাবে না। সে কারনে কলম তৈরীতে অধিক পয়সা খরচ হচ্ছে। এছাড়া শামসুল, আক্তার, রওশনারা, মিজানুর, নাসির, নজরুল, বিল্লালসহ বিভিন্ন নার্সারি মালিক গুটি কলম তৈরি করছেন।

গদাইপুর গ্রামের গুটি কলমের অভিজ্ঞ কারিগর হামিদ মোড়ল জানান, প্রতিটি গুটি দুই টাকা দরে তৈরী করছি। গোপালপুর গ্রামের গুটি কলমের অভিজ্ঞ কারিগর মোক্তার ও সালাম বলেন, লেবু গুটি ২টাকা ও অন্য জাতের গুটি কলম ১ টাকা ৭০ পয়সা দরে তৈরী করছি।

পাইকগাছা উপজেলা নার্সারী মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার পাল জানান, কলম তৈরীর শ্রমিক ঠিকমত না পাওয়ায় কারণে উচ্চ মূল্যে শ্রমিক নিয়ে কলম তৈরী করতে হচ্ছে। গদাইপুর এলাকার তৈরী কলম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা, রাজশাহী সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। তবে ঠিকমত বাজার দর না পাওয়ায় নার্সারী মালিকরা আশানারুপ ব্যবসা করতে পারছে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান, পাইকগাছার নার্সারী শিল্প খুলনা জেলার শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। নার্সারীতে উৎপাদিত চারা সবুজ বননায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে তেমনি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।