সুখের পেছনে ছুটা নয়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
“সুখ হলো একটি প্রজাপতির মতো। তুমি যত তাকে তাড়া করবে, ততই সে তোমার নাগালের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু যদি তুমি শান্তভাবে বসে থাকো, তবে হয়তো সে নিজেই এসে তোমার কাঁধে বসবে।”Ñবিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক ন্যাথানিয়েল হথর্নের এই উক্তিটি শুধু একটি সুন্দর উপমাই নয়; এটি মানুষের জীবনবোধের এক গভীর দর্শন। আধুনিক সভ্যতার দ্রুতগতির জীবন, প্রতিযোগিতার চাপ এবং ভোগবাদী মানসিকতার ভিড়ে এই কথাটি যেন আজ আরও বেশি সত্য হয়ে উঠেছে। মানুষ আজ সুখের জন্য যত বেশি ছুটছে, সুখ যেন ততই অধরা হয়ে পড়ছে। মানুষের জীবনের প্রতিটি প্রচেষ্টার কেন্দ্রে থাকে সুখের অনুসন্ধান।
শিশুর পড়াশোনা, তরুণের কর্মজীবন, ব্যবসায়ীর বিনিয়োগ, কৃষকের মাঠে পরিশ্রম, শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম কিংবা রাজনীতিবিদের জনসেবাÑসবকিছুর পেছনেই কোথাও না কোথাও সুখের আকাক্সক্ষা কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুখ কি সত্যিই এমন কিছু, যা কেবল অর্জনের মাধ্যমে পাওয়া যায়? নাকি সুখ এমন এক অনুভূতি, যা আমাদের মনোজগতের গভীরে লুকিয়ে থাকে? আজকের পৃথিবীতে সাফল্যের সংজ্ঞা অনেকটাই বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে যুক্ত। কে কত বড় বাড়ির মালিক, কার গাড়ি কত দামি, কে কত অর্থ উপার্জন করেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার অনুসারী কতÑএসব দিয়ে অনেকেই সুখের পরিমাপ করতে চান। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। পৃথিবীর বহু ধনী মানুষও মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও একাকীত্বে ভোগেন।
আবার সীমিত আয়ের বহু মানুষকে দেখা যায় পরিবার, প্রকৃতি ও আন্তরিক সম্পর্কের মধ্যেই পরম তৃপ্তিতে জীবন কাটাতে। অর্থাৎ সুখের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক থাকলেও সুখের উৎস কেবল অর্থ নয়। অর্থ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে, নিরাপত্তা দেয়, সুযোগ সৃষ্টি করে; কিন্তু মনের শান্তি কিনে দিতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট সীমার পর অর্থের পরিমাণ বাড়লেও সুখের পরিমাণ সমানুপাতিকভাবে বাড়ে না। বরং নতুন সম্পদ নতুন দায়িত্ব, নতুন উদ্বেগ এবং নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। বর্তমান সমাজে সুখকে সবচেয়ে বেশি দূরে ঠেলে দিচ্ছে তুলনার সংস্কৃতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন আমরা অন্যের সাজানো জীবন দেখি।
কারও বিদেশ ভ্রমণ, কারও নতুন গাড়ি, কারও সাফল্যের গল্প কিংবা বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়। অথচ আমরা ভুলে যাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ তার জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোই প্রকাশ করে; ব্যর্থতা, কান্না, হতাশা কিংবা একাকীত্ব খুব কমই প্রকাশ পায়। এই তুলনা মানুষের মনে অপ্রাপ্তির বোধ সৃষ্টি করে। ফলে নিজের জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোও আর চোখে পড়ে না। যে মানুষ গতকাল পর্যন্ত নিজের পরিবার, সন্তান কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ পেতেন, আজ তিনি অন্যের জীবন দেখে নিজের সুখকেও অসম্পূর্ণ ভাবতে শুরু করেন। এভাবেই সুখ ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মন খুব দ্রুত নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এটিকে বলা হয় হেডোনিক অ্যাডাপটেশন। অর্থাৎ যে জিনিসটি একসময় আমাদের খুব আনন্দ দেয়, কিছুদিন পর সেটিই স্বাভাবিক হয়ে যায়। নতুন ফোন, নতুন বাড়ি, নতুন চাকরি বা পদোন্নতির আনন্দও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তখন আবার নতুন কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। এই অন্তহীন চক্রের মধ্যেই মানুষ সুখের পেছনে ছুটতে থাকে, কিন্তু স্থায়ী প্রশান্তি খুঁজে পায় না।বাংলার প্রাচীন দর্শন দর্শনÑসবখানেই সুখের মূল উৎস হিসেবে অন্তরের শান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধও বলেছেন, আকাক্সক্ষাই দুঃখের মূল কারণ। আকাক্সক্ষা যত বাড়বে, অস্থিরতাও তত বাড়বে। আবার আকাক্সক্ষাকে পুরোপুরি ত্যাগ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই রয়েছে মুক্তির পথ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর বহু রচনায় সুখকে বাহ্যিক অর্জনের পরিবর্তে অন্তরের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর দর্শনে মানুষ তখনই সত্যিকারের সুখী হয়, যখন সে প্রকৃতির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে এবং নিজের অন্তরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলতে পারে। জীবনানন্দ দাশের কবিতাতেও প্রকৃতির নির্জন সৌন্দর্যের মধ্যে যে প্রশান্তির সন্ধান পাওয়া যায়, তা আমাদের শেখায়Ñসুখ সব সময় কোলাহলের মধ্যে থাকে না। আজকের শিশু-কিশোররাও এই অস্থিরতার শিকার। পরীক্ষার ফল, প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ারের চাপ এবং অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা তাদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে। তারা ভালো মানুষ হওয়ার আগে সফল মানুষ হওয়ার শিক্ষা পাচ্ছে। ফলে সাফল্য এলেও আনন্দ অনেক সময় আসে না।
শিক্ষা যদি কেবল প্রতিযোগিতা শেখায়, কিন্তু জীবনকে উপভোগ করতে না শেখায়, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও অনেক পরিবারে আন্তরিক আলাপের সময় নেই। সবাই ব্যস্ত নিজের কাজ, নিজের মোবাইল কিংবা নিজের জগৎ নিয়ে। অথচ একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়; পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান এবং সময়। যে পরিবারে আন্তরিক সম্পর্ক থাকে, সেখানে সীমিত সম্পদেও সুখের অভাব হয় না। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুখ একটি সামাজিক বিষয়ও।
যে সমাজে বৈষম্য কম, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, শিক্ষা সবার নাগালে এবং মানুষ একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলÑসেই সমাজে মানুষ তুলনামূলক বেশি সুখী থাকে। অন্যদিকে দুর্নীতি, বৈষম্য, বেকারত্ব, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক প্রশান্তিকে নষ্ট করে দেয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের লক্ষ্য যদি কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি হয়, আর মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা উপেক্ষিত থাকে, তবে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদ- হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সুখের অনুভূতি।
সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কৃতজ্ঞতা। আমরা যা পাইনি, তা নিয়েই বেশি ভাবি; অথচ যা পেয়েছি, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যাই। সুস্থ শরীর, পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের আন্তরিকতা, প্রতিদিনের সূর্যোদয় কিংবা একটি শান্ত সন্ধ্যাÑএসবের মূল্য অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না। অথচ এসবই জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। মানুষ যখন অন্যের উপকার করে, সমাজের জন্য কিছু করে কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন তার মনে যে আনন্দ জন্ম নেয়, তা কোনো বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
গবেষণায়ও দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, দান এবং সামাজিক অংশগ্রহণ মানুষের মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক প্রাণী; অন্যের সুখের সঙ্গে নিজের সুখও জড়িয়ে থাকে। প্রকৃতিও সুখের এক অনন্য উৎস। অথচ আধুনিক নগরজীবনে মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। নদী, গাছ, পাখি, খোলা আকাশ কিংবা বৃষ্টির শব্দÑএসবের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কমে যাচ্ছে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মধ্যেও যে গভীর মানসিক প্রশান্তি রয়েছে, তা আজ বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও প্রমাণিত।
প্রজাপতির উপমাটি আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়। প্রজাপতি কখনো কোলাহল পছন্দ করে না। শান্ত পরিবেশেই সে বসে। সুখও তেমনই। অস্থিরতা, লোভ, অহংকার, হিংসা এবং অযথা প্রতিযোগিতার মধ্যে সুখ বেশিক্ষণ থাকে না। সুখ আসে তখনই, যখন মানুষ নিজের ভেতরে শান্তির একটি আশ্রয় গড়ে তুলতে পারে। তাই সুখের জন্য লক্ষ্যহীন হয়ে বসে থাকাও সমাধান নয়। মানুষকে অবশ্যই পরিশ্রম করতে হবে, স্বপ্ন দেখতে হবে, সাফল্যের জন্য চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সেই চেষ্টা যেন অস্থিরতা, লোভ বা আত্মবিনাশের কারণ না হয়। কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকবে, কিন্তু ফলের প্রতি অতি-আসক্তি থাকবে না। অর্জনের আনন্দ থাকবে, কিন্তু প্রাপ্তির অহংকার থাকবে না। এই ভারসাম্যই মানুষকে প্রকৃত সুখের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
আমরা যদি সন্তানদের কেবল সফল নয়, সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি; যদি পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পারি; যদি সমাজে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি; যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দিইÑতবেই সুখী সমাজ গড়ার পথে এগোনো সম্ভব। শেষ পর্যন্ত সুখ কোনো গন্তব্য নয়, কোনো পুরস্কারও নয়। সুখ হলো জীবনযাপনের একটি শিল্প। এটি ছোট ছোট মুহূর্তে, আন্তরিক সম্পর্কের উষ্ণতায়, কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং নিজের সঙ্গে নিজের শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। প্রজাপতিকে ধরতে দৌড়ালে সে উড়ে যায়। কিন্তু ফুলে ভরা একটি সুন্দর বাগান তৈরি করলে প্রজাপতি নিজেই সেখানে আসে।
মানুষের জীবনও ঠিক তেমন। সুখের পেছনে অন্ধভাবে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে এমন একটি সুন্দর, সৎ, সংযমী ও মানবিক জীবন গড়ে তোলাই শ্রেয়, যেখানে সুখ নিজেই একদিন নীরবে এসে আমাদের কাঁধে বসবে। তখন সুখ আর ক্ষণিকের অনুভূতি থাকবে না; তা হয়ে উঠবে জীবনযাপনের স্বাভাবিক সঙ্গী।
লেখক: সংবাদকর্মী







