আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক দিবস: লক্ষ্য-নিরাপদ ও টেকসই সমুদ্রযাত্রা
সাকিবুর রহমান বাবলা
সমুদ্র শুধু নীল জলরাশির বিস্তার নয়; আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য, খাদ্য, জ্বালানি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম প্রধান জীবনরেখা। পৃথিবীর আন্তর্জাতিক পণ্যবাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। তাই জাহাজ যখন এক বন্দরের সঙ্গে আরেক বন্দরকে যুক্ত করে, তখন তার সঙ্গে যুক্ত থাকে কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও বিশ্বের অর্থনীতির স্পন্দন। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষ বৃহস্পতিবার পালিত হয় বিশ্ব সামুদ্রিক দিবস বা বিশ্ব নৌ দিবস। ২০২৬ সালে দিবসটি পালিত হচ্ছে ২৪ সেপ্টেম্বর।
এবারের বিশেষত্ব আরও বড়। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)Ñ২০২৬ ও ২০২৭ দুই বছরের জন্য একই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে: ‘নীতি থেকে অনুশীলনে: সামুদ্রিক উৎকর্ষের ক্ষমতায়ন’। এর মূল বক্তব্য হলোÑআন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতি, আইন ও নিরাপত্তা মানদ- গ্রহণ করলেই হবে না; সেগুলোকে জাতীয় আইন, বন্দর, জাহাজ ও প্রতিদিনের বাস্তব পরিচালনায় কার্যকর করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশাল অংশ সমুদ্রনির্ভর। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি জ্বালানি, খাদ্য, কাঁচামাল, শিল্পপণ্য ও ভোক্তা সামগ্রী বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে দেয় শিপিং শিল্প। ফলে নিরাপদ নৌযান, দক্ষ বন্দর, প্রশিক্ষিত নাবিক এবং দূষণমুক্ত সমুদ্রÑসবকিছুই বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে জলদস্যুতা, সশস্ত্র সংঘাত, দুর্ঘটনা, তেল ও রাসায়নিক দূষণ, কার্বন নিঃসরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিও এই খাতের সঙ্গে জড়িত। এই কারণেই আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ ও সুরক্ষিত জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা, সামুদ্রিক ও বায়ুম-লীয় দূষণ কমানো, নাবিকদের অধিকার ও কল্যাণ রক্ষা এবং সমুদ্রভিত্তিক টেকসই অর্থনীতির গুরুত্ব তুলে ধরা।
১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ জেনেভায় জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় আইএমও প্রতিষ্ঠার কনভেনশন গৃহীত হয়; তা ১৭ মার্চ ১৯৫৮ কার্যকর হয় এবং ১৯৫৯ সালে সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। এর সদর দপ্তর লন্ডনে। বর্তমানে আইএমওর সদস্যরাষ্ট্র ১৭৬টি, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে; বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে সংস্থাটিতে যোগ দেয়।
আইএমও আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা, জাহাজ চলাচলের দক্ষতা, সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শিপিংয়ের জন্য বৈশ্বিক নিয়মকাঠামো তৈরি করে। এর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির মধ্যে রয়েছে সোলাসÑসমুদ্রে জীবনের নিরাপত্তা, মারপোলÑজাহাজ থেকে দূষণ প্রতিরোধ এবং এসটিসিডব্লিউÑনাবিকদের প্রশিক্ষণ, সনদ ও দায়িত্ব পালনের আন্তর্জাতিক মান। এর সঙ্গে নাবিকদের কর্মপরিবেশ ও অধিকার রক্ষায় আইএলও-এর মেরিটাইম লেবার কনভেনশন, ২০০৬-কে মানসম্মত শিপিংয়ের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোনো দেশের পতাকাবাহী জাহাজ কতটা নিরাপদ, তা বোঝার ক্ষেত্রে পোর্ট স্টেট কন্ট্রোলের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। প্যারিস এমওইউ-এর ২০২৫ সালের পারফরম্যান্স তালিকা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে এবং আগের তিন বছরের পরিদর্শন ও আটক-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। এতে কেম্যান আইল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও জাপান হোয়াইট লিস্টের প্রথম পাঁচে রয়েছে। অন্যদিকে ব্ল্যাক লিস্টে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, পালাউ, টোগো, গিনি-বিসাউ, বেলিজ, ভানুয়াতু, ভিয়েতনাম, কোমোরোস, তানজানিয়া ও ক্যামেরুন রয়েছে। বাংলাদেশের রয়েছে গ্রে লিস্ট থেকে হোয়াইট লিস্টে উত্তরণের অঙ্গীকার। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (আঙ্কটাড)-এর ‘সামুদ্রিক পরিবহন পর্যালোচনা ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে জাহাজের বহনক্ষমতা বা ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি)-এর মালিকানার হিসাবে গ্রিস ১৬.৪ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে, চীন ১৪.৪ শতাংশ এবং জাপান ৯.৯ শতাংশ নিয়ে পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে। তিন দেশের সম্মিলিত অংশ ৪০.৭ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে চীনের জাহাজবহরের আর্থিক মূল্যও বিশ্বে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বে ১,০০০ গ্রস টনের বেশি প্রায় ৬২ হাজার জাহাজসহ মোট প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার বাণিজ্যিক ও অন্যান্য জাহাজ ছিল। ২০২৫ সালে নির্মিত জাহাজের গ্রস টনেজের প্রায় ৯১ শতাংশ চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে নির্মিত হয়েছেÑযা এশিয়ার জাহাজ নির্মাণশিল্পের শক্তি নির্দেশ করে।
বিশ্বের প্রায় ২০ লাখ মানুষ সমুদ্রে কর্মরতÑতাঁদের শ্রমেই বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সচল থাকে। নতুন জ্বালানি, স্বয়ংক্রিয় জাহাজ, ডিজিটাল নেভিগেশন ও ডিকার্বনাইজেশনের যুগে তাঁদের দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও মেরিটাইম শিক্ষা এখন শুধু চাকরির প্রস্তুতি নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রস্তুতি। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান, নৌযানবিদ্যা, সামুদ্রিক প্রকৌশল, সামুদ্রিক আইন, সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং বন্দর ব্যবস্থাপনাÑবিভিন্ন শাখায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার প্রয়োজন বাড়ছে। বাংলাদেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এ শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব আরও বেশি। বিশাল উপকূল, বঙ্গোপসাগর, বন্দর, নৌপথ ও সম্ভাবনাময় ব্লু ইকোনমি আমাদের সামনে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে নিরাপদ নৌযান, দক্ষ নাবিক, আধুনিক বন্দর, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মান বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে নৌ-বাণিজ্যের শিকড় বহু প্রাচীন। ফিনিশীয় ও প্রাচীন মিশরীয়রা ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মেসোপটেমিয়া ও সিন্ধু সভ্যতার মধ্যেও সমুদ্র ও নদীপথে বাণিজ্যিক যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ভাইকিং, আরব, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ ও ব্রিটিশ নাবিকেরা নৌযাত্রার বিস্তার ঘটান। আধুনিক যুগে ম্যালকম ম্যাকলিনের কনটেইনার পরিবহন ব্যবস্থার বিকাশ বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটায়। মানসম্মত কনটেইনারের মাধ্যমে পণ্য ওঠানো-নামানো দ্রুত ও দক্ষ হওয়ায় সমুদ্রপথের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়।
বাংলার ইতিহাস নদী ও সমুদ্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা ও বঙ্গোপসাগরের অবস্থান প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলকে নৌ-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূখ-ে পরিণত করে। উয়ারী-বটেশ্বরের প্রতœনিদর্শন প্রাচীন বাণিজ্যিক যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়; তাম্রলিপ্ত, সপ্তগ্রাম ও চট্টগ্রাম বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে বিকশিত হয়। আরব ও ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যে বস্ত্র, চাল, চিনি, মসলা ও অন্যান্য পণ্যের আদান-প্রদান ছিল উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে নদী ও উপকূলীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাঠের নৌযান নির্মাণে বাংলার দীর্ঘদিনের দক্ষতা গড়ে ওঠে। তাই বাংলার নৌ-ঐতিহ্য শুধু বাণিজ্যের ইতিহাস নয়; এটি এ অঞ্চলের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রারও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক দিবস তাই কেবল জাহাজ বা সমুদ্রের দিবস নয়Ñএটি বিশ্ব অর্থনীতি, মানবজীবন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। ‘নীতি থেকে অনুশীলনে’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভালো আইন ও নীতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত হয়। নিরাপদ জাহাজ, নিরাপদ নাবিক, পরিচ্ছন্ন সমুদ্র এবং স্থিতিশীল বৈশ্বিক বাণিজ্যÑএই চারটি লক্ষ্য সামনে রেখে নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে বড় শিক্ষা।












