শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কৃতজ্ঞতার শক্তি/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১০:৫৬ অপরাহ্ণ
কৃতজ্ঞতার শক্তি/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি গল্প ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। গল্পটি ছিল একটি ছোট্ট পাখিকে নিয়ে। চারদিকে তপ্ত বালু, নেই কোনো গাছ, নেই কোনো জলাশয়। প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার সংগ্রামে তার পালক ঝরে পড়ছে, শক্তি ফুরিয়ে যাচ্ছে। একদিন সে জানতে পারল, তার এই দুর্দশা আরও বহু বছর চলবে। এমন সংবাদ যে কাউকে ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য জনক ভাবে পাখিটি অভিযোগ না করে প্রতিদিন সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করল। আর কিছুদিনের মধ্যেই তার চারপাশ বদলে গেল।

 

শুষ্ক ভূমি সবুজে ভরে উঠল, জল এলো, জীবন ফিরে এলো।এটি নিছক একটি গল্প। বাস্তবতার নিরিখে এর সত্যতা বিচার করার প্রয়োজন নেই। কারণ গল্পের শক্তি তার ঘটনার মধ্যে নয়, তার বার্তার মধ্যে। আর এই গল্পের বার্তা হলোÑকৃতজ্ঞতা মানুষের জীবনবোধ বদলে দিতে পারে। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সহজ কাজ গুলোর একটি হলো অভিযোগ করা। রাষ্ট্র নিয়ে অভিযোগ, সমাজ নিয়ে অভিযোগ, পরিবার নিয়ে অভিযোগ, নিজের ভাগ্য নিয়ে অভিযোগÑআমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশ জুড়েই যেন অসন্তোষের ভাষা।

 

অভিযোগের অনেক কারণও আছে। দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবেশগত বিপর্যয় কিংবা সামাজিক বৈষম্যÑএসব বাস্তব সমস্যাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অভিযোগ কি আমাদের সমস্যার সমাধান দেয়? নাকি আমাদের আরও হতাশ করে তোলে? মানুষের মনোবিজ্ঞানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মন সাধারণত যা নেই, তার দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘নেগেটিভিটি বায়াস’। অর্থাৎ ইতিবাচক ঘটনার চেয়ে নেতিবাচক ঘটনাই আমাদের মনে বেশি প্রভাব ফেলে।

 

দশটি ভালো ঘটনার মধ্যে একটি খারাপ ঘটনা ঘটলে আমরা সেই একটিকেই বেশি মনে রাখি। ফলে জীবনের অসংখ্য প্রাপ্তি আড়ালে পড়ে যায়। আমাদের চারপাশে তাকালেই এর উদাহরণ পাওয়া যায়। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেনি। তখন তার মনোযোগ থাকে ব্যর্থতার দিকে। একজন চাকরিজীবী হয়তো একটি স্থায়ী আয়ের উৎস পেয়েছেন, কিন্তু কাক্সিক্ষত পদোন্নতি না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন। একজন কৃষক হয়তো গত বছরের তুলনায় ভালো ফলন পেয়েছেন, কিন্তু বাজারদর প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ায় সব অর্জনকেই ব্যর্থতা মনে করেন। এভাবে আমরা জীবনের প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির হিসাবই বেশি করি।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

 

প্রতিদিন আমরা অন্যের সাফল্যের ছবি দেখি। কেউ বিদেশে পড়তে যাচ্ছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনছে, কেউ ব্যবসায় সফল হচ্ছে, কেউ ঘুরতে যাচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এসব দেখে অজান্তেই আমরা নিজের জীবনকে তাদের সঙ্গে তুলনা করি। ফলে নিজের অর্জনগুলোকে তুচ্ছ মনে হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অন্যের জীবনের পুরো গল্প দেখায় না। দেখায় কেবল নির্বাচিত কিছু মুহূর্ত। যে মানুষটির হাসিমাখা ছবি আমরা দেখছি, তার জীবনেও হয়তো আছে গভীর উদ্বেগ, সংগ্রাম কিংবা একাকিত্ব। তাই তুলনার এই সংস্কৃতি মানুষকে সুখী করার বদলে আরও অসন্তুষ্ট করে তুলছে। কৃতজ্ঞতা এই অসন্তোষের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিরোধ।

 

কৃতজ্ঞতা মানে শুধু ‘ধন্যবাদ’ বলা নয়। কৃতজ্ঞতা হলো জীবনের প্রতি এক ধরনের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি। এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার জীবনে অনেক কিছুই আছে, যা মূল্যবান।আমরা কি কখনও ভেবে দেখি, সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের পায়ে হেঁটে চলতে পারা কত বড় আশীর্বাদ? পরিবারের সদস্যদের সুস্থভাবে পাশে পাওয়া কত বড় প্রাপ্তি? প্রতিদিন খাবার জোগাড় করতে পারা, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারা কিংবা নিরাপদে ঘুমাতে পারাÑপৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে এগুলো স্বপ্নের মতো।

 

জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এখনও বিশ্বের বহু মানুষ নিরাপদ পানীয় জল, পর্যাপ্ত খাদ্য কিংবা মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে লাখো মানুষ অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে। সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করলে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের অভিযোগের পাশাপাশি কৃতজ্ঞ হওয়ার কারণও কম নয়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার সঙ্গে তাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। তবু তারা জীবন থামিয়ে রাখে না।

 

ঝড়ের পর আবার ঘর তোলে, ভেঙে যাওয়া জমিতে আবার চাষ করে, সন্তানদের নতুন স্বপ্ন দেখায়। এই যে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি, এর পেছনে রয়েছে আশাবাদ ও কৃতজ্ঞতার এক অদৃশ্য ভিত্তি। মানুষের ইতিহাসও মূলত ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। যুদ্ধ, মহামারি, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগÑকত বিপর্যয়ই তো এসেছে। কিন্তু মানুষ আবার নতুন করে শুরু করেছে। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানসিক স্থিতি। আর কৃতজ্ঞতা সেই স্থিতিকে আরও শক্তিশালী করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে কৃতজ্ঞতার উপকারিতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। গবেষণাগুলো বলছে, যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতা চর্চা করেন, তারা তুলনামূলক ভাবে কম হতাশায় ভোগেন, তাদের মানসিক চাপ কম থাকে এবং জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি বেশি থাকে।

 

কৃতজ্ঞতা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক আবেগ তৈরি করে, সম্পর্ক উন্নত করে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। করোনা ভাইরাস মহামারির সময় এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়েছিল। যখন পৃথিব জুড়ে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছিল, তখন অনেক মানুষ নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন জীবনের সাধারণ বিষয়গুলোর মূল্য। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, সুস্থ শরীরে শ্বাস নিতে পারা কিংবা প্রিয়জনের উপস্থিতিÑএসবই তখন অমূল্য হয়ে উঠেছিল। ধর্মীয় দর্শনেও কৃতজ্ঞতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

 

প্রায় সব ধর্ম ও দর্শনের মধ্যেই একটি অভিন্ন বার্তা রয়েছেÑঅহংকার নয়, কৃতজ্ঞতাই মানুষকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। তবে কৃতজ্ঞতা মানে এই নয় যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। সমাজের সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা যাবে না। বরং কৃতজ্ঞতা মানুষকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। কারণ যে মানুষ নিজের প্রাপ্তির মূল্য বোঝে, সে অন্যের বঞ্চনাও উপলব্ধি করতে পারে। ফলে সে সমাজ পরিবর্তনের কাজেও বেশি আন্তরিক হয়। আমাদের পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায় কৃতজ্ঞতার চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।

 

শিশুদের শেখাতে হবে, প্রতিটি অর্জনের পেছনে অনেক মানুষের অবদান থাকে। একজন কৃষক খাবার উৎপাদন করেন, শ্রমিক রাস্তা তৈরি করেন, শিক্ষক জ্ঞান দেন, চিকিৎসক জীবন বাঁচান। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে উপলব্ধি করতে পারলেই মানুষের মধ্যে বিনয় ও মানবিকতা বাড়বে। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তির উন্নয়ন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়িয়েছে প্রত্যাশাও। আমরা যত বেশি পাচ্ছি, তত বেশি চাইছি। ফলে সন্তুষ্টি যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।

 

এই অন্তহীন চাওয়ার সংস্কৃতির মধ্যে কৃতজ্ঞতা আমাদের থামতে শেখায়। শেখায়, জীবনের মূল্য শুধু ভবিষ্যতের অর্জনে নয়, বর্তমানের প্রাপ্তিতেও নিহিত। ছোট্ট পাখিটির গল্পে দশ বছরের কষ্ট এক মাসে শেষ হয়ে যায়। বাস্তব জীবন এত সহজ নয়। এখানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেই সব সমস্যা দূর হয়ে যায় না। কিন্তু কৃতজ্ঞতা মানুষের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। আর সেই শক্তিই তাকে প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়াতে সাহায্য করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বাইরের জগতে নয়, মানুষের ভেতরে ঘটে। যখন একজন মানুষ অভিযোগের ভাষা ছেড়ে কৃতজ্ঞতার ভাষা শেখে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।

 

আর দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে অনেক সময় জীবনও বদলে যায়। এই অস্থির সময়ে তাই কৃতজ্ঞতার শিক্ষা নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। আমরা যদি প্রতিদিন অন্তত একবার নিজের প্রাপ্তিগুলোর কথা স্মরণ করি, যদি উপলব্ধি করি যে জীবনে এখনও অনেক সৌন্দর্য, অনেক সম্ভাবনা এবং অনেক আশীর্বাদ আছে, তাহলে হয়তো আমাদের সমাজও কিছুটা ইতিবাচক হবে। কারণ সুখের সবচেয়ে বড় উৎস সবসময় বেশি পাওয়া নয়; বরং যা পেয়েছি, তার মূল্য বুঝতে শেখা। আর সেই শিক্ষার নামই কৃতজ্ঞতা।

লেখক: সাংবাদকর্মী

Ads small one

প্রসঙ্গ: ১৫ মাস ধরে অন্ধকারে প্রাথমিক বিদ্যালয়, দায় কার?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
প্রসঙ্গ: ১৫ মাস ধরে অন্ধকারে প্রাথমিক বিদ্যালয়, দায় কার?

সম্পাদকীয়

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার চেড়াঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে বন্ধ রয়েছেÑএই খবরটি শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং সরকারি একটি সেবা খাতের সমন্বয়হীনতা ও উদাসীনতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বিদ্যালয়ের ট্রান্সফরমারটি চুরি হওয়ার পর থেকে পুরো প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎহীন। এর ফলে চলমান তীব্র গরমে শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে ফ্যান ছাড়া, প্রচ- হাঁসফাঁস করা পরিস্থিতিতে পাঠগ্রহণ করতে হচ্ছে। একটি স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা কেন এমন অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, সেই প্রশ্ন এড়ানো অসম্ভব।

বিদ্যালয় সূত্র এবং সংবাদে প্রকাশ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের জন্য প্রায় ৬৭ হাজার টাকা দাবি করেছে। কিন্তু একটি প্রান্তিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়Ñসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও চুরির ক্ষতিপূরণের দায় কেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা ওই এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তাবে? ট্রান্সফরমারটি ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সেটি চুরি যাওয়ার পর সরকারি তহবিল বা সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষ কোটা থেকে কেন তা প্রতিস্থাপন করা হলো না, তা বোধগম্য নয়।

গ্রীষ্মের প্রচ- দাবদাহে যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরাই ঘরে-বাইরে টিকতে পারছেন না, সেখানে ছোট্ট শিশুরা বিদ্যুৎহীন বদ্ধ শ্রেণিকক্ষে দিনের পর দিন কীভাবে ক্লাস করছে, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। গরমে শিশুরা ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না, অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের একাংশ বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়তে পারে, যা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধাক্কা।
ইতিমধ্যেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকেও দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ চালুর জন্য জেলা প্রশাসকের (ডিসি) হস্তক্ষেপ কামনা করে পত্র পাঠানো হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক এই চিঠ চালাচালির মাঝেই পেরিয়ে গেছে ১৫টি মাস। আমরা মনে করি, শিক্ষা ও জনস্বার্থের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বরাদ্দ বা প্রশাসনিক নির্দেশনা পেলে তারা ব্যবস্থা নেবে। আমরা জেলা প্রশাসক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানাই, এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অতি দ্রুত বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে চেড়াঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের ব্যবস্থা করুন। সরকারি নিয়মকানুন বা অর্থের টানাটানির অজুহাতে শিশুদের শিক্ষা জীবন ও স্বাস্থ্যকে এভাবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না। অনতিবিলম্বে চেড়াঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুতের আলো ফিরুকÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

 

 

 

আগের দিনটাই ভালো ছিল!/ শেখ আমিনুর রহমান কাজল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১১:৩৮ অপরাহ্ণ
আগের দিনটাই ভালো ছিল!/ শেখ আমিনুর রহমান কাজল

শেখ আমিনুর রহমান কাজল

একটা সময় ছিল, যখন আনন্দ মানেই ছিল একসাথে থাকা। প্রযুক্তি ছিল কম, কিন্তু মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা ছিল অনেক বেশি। আজ সবকিছু হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, কিন্তু সেই প্রাণখোলা আনন্দ, সেই মিলেমিশে থাকার উষ্ণতা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।

আগে টিভি ছিল গ্রামের বা পাড়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। একটা-দুটো বাড়িতে টিভি থাকত, আর সন্ধ্যা নামলেই আশেপাশের মানুষজন সেখানে জড়ো হতে শুরু করত। কেউ মাদুর নিয়ে আসত, কেউ চাটাই, কেউবা একটা ছোট্ট টুল। ঘরের ভেতর জায়গা না হলে উঠোনে বসেই টিভি দেখা হতো। টিভির পর্দার চেয়ে বেশি প্রাণবন্ত ছিল মানুষের মুখের হাসি, গল্প আর উচ্ছ্বাস।

বিশ্বকাপ ফুটবল এলে পুরো পাড়া যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হতো। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, মেক্সিকো কিংবা ক্যামেরুন—প্রতিটি দলেরই আলাদা সমর্থক ছিল। খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই চলত তর্ক-বিতর্ক, ভবিষ্যদ্বাণী আর খুনসুটি।

কারো বাড়ির ছাদে উড়ত ব্রাজিলের পতাকা, কারো উঠোনে আর্জেন্টিনার। জার্মানির সমর্থকরা নিজেদের দলকে সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ বলে গর্ব করত, ইতালির সমর্থকরা বলত তাদের রক্ষণভাগের তুলনা নেই। ফ্রান্সের সমর্থকরা তারকাদের নিয়ে আলোচনা করত, আর ক্যামেরুন বা মেক্সিকোর সমর্থকরা নিজেদের দলকে আন্ডারডগ হিসেবে সাহস দিত।

খেলা চলাকালে গোল হলে পুরো পাড়া কেঁপে উঠত। ব্রাজিল গোল দিলে একদল লাফিয়ে উঠত, আর্জেন্টিনা গোল দিলে আরেকদল আনন্দে চিৎকার করত। কেউ বাঁশি বাজাত, কেউ পটকা ফুটাত, কেউ আবার দৌড়ে গিয়ে বন্ধুদের খোঁচা দিত। পরাজয়ের পরও মন খারাপের মাঝেও ছিল এক ধরনের আনন্দ, কারণ পরদিন আবার নতুন করে তর্ক শুরু হবে।

রাত জেগে খেলা দেখার সেই দিনগুলো ছিল অন্যরকম। মাঝরাতে চা বানানো হতো, মুড়ি, চানাচুর, বিস্কুট আর বাদাম ভাগাভাগি করে খাওয়া হতো। কারো চোখে ঘুম চলে এলে পাশের জন ধাক্কা দিয়ে বলত, “এই ওঠ! খেলার আসল মজা এখন শুরু!” মনে হতো পুরো বিশ্বকাপটাই যেন আমাদের পাড়ার মাঠে হচ্ছে।

শুধু খেলা নয়, পিকনিকের আনন্দও ছিল অসাধারণ। শীতের সকালে ট্রাক বা বাস ভাড়া করে সবাই মিলে পিকনিকে যাওয়া হতো। রান্নার দায়িত্ব একদল, খেলাধুলার দায়িত্ব আরেকদল। কেউ মাংস কাটছে, কেউ সবজি ধুচ্ছে, কেউ আগুন জ্বালাচ্ছে। রান্না শেষ হওয়ার আগেই সবাই দশবার জিজ্ঞেস করত, “খাওয়া কবে হবে?”

খাওয়ার পর শুরু হতো গান, কৌতুক, লটারির খেলা, দৌড় প্রতিযোগিতা আর দলবেঁধে ছবি তোলা। তখন ছবি তুলতে মোবাইলের শত শত ক্যামেরা ছিল না, কিন্তু প্রতিটি ছবির পেছনে ছিল শত শত স্মৃতি।

ঈদ, পূজা, নববর্ষ কিংবা যে কোনো উৎসব মানেই ছিল একসাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। বিকেলে মাঠে আড্ডা, রাতে গল্প, আর ছোট ছোট বিষয় নিয়েই অনেক বড় আনন্দ।

তারপর ধীরে ধীরে সময় বদলালো। ঘরে ঘরে টিভি এলো। এরপর এলো স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুক আর অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখন খেলার স্কোর মোবাইলে, সিনেমা মোবাইলে, খবর মোবাইলে, বিনোদন মোবাইলে। এমনকি অনেক সময় সম্পর্কও এখন মোবাইলের পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আগে মানুষ মানুষকে খুঁজত, এখন খোঁজে ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড। আগে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে খেলা দেখা হতো, এখন একই বাড়িতে থেকেও সবাই আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত।

আগে বিশ্বকাপের ফাইনাল মিস হয়ে গেলে কষ্ট লাগত। এখন সবাই বলে, “সমস্যা কী? পরে হাইলাইটস দেখে নেব।” কিন্তু হাইলাইটস কি সেই উত্তেজনা ফিরিয়ে দিতে পারে? সেই একসাথে চিৎকার করা, সেই বুক ধড়ফড় করা মুহূর্তগুলো কি আর ফিরে আসে?

প্রযুক্তি আমাদের অনেক সুবিধা দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে অজান্তেই কে যেন আমাদের কাছ থেকে কিছু মূল্যবান জিনিস নিয়ে গেছে—একসাথে বসে হাসার সময়, গল্প করার সময়, সম্পর্কের উষ্ণতা আর প্রাণখোলা আনন্দ।

আগে টিভি কম ছিল, কিন্তু মানুষ বেশি ছিল। এখন টিভি বেশি, মোবাইল বেশি, ইন্টারনেট বেশি—কিন্তু একসাথে বসে আনন্দ করার মানুষ যেন একটু কমে গেছে।

আজও যখন কোনো পুরোনো বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সেই তর্কের কথা মনে পড়ে, জার্মানি-ইতালির সমর্থকদের উল্লাস মনে পড়ে, পিকনিকের সেই হাসির শব্দ কানে ভেসে আসে—তখন মনটা অদ্ভুত এক নস্টালজিয়ায় ভরে ওঠে।

তখন সত্যিই মনে হয়Ñ আগের দিনগুলোতে হয়তো প্রযুক্তি কম ছিল, কিন্তু জীবনটা ছিল অনেক বেশি জীবন্ত। সুবিধা কম ছিল, কিন্তু সুখ ছিল বেশি। বিনোদনের মাধ্যম কম ছিল, কিন্তু আনন্দ ছিল অফুরন্ত।

তাই আজও হৃদয়ের গভীর থেকে একটি কথাই বারবার ভেসে আসেÑ “আগের দিনটাই ভালো ছিল; কারণ তখন মানুষ একে অপরের অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল।”

লেখক: শিক্ষক

 

 

শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ গঠনে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১১:১৬ অপরাহ্ণ
শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ গঠনে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই

সোহাগ হোসেন

শিশুরা একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাদের সুস্থ, নিরাপদ ও শিক্ষানির্ভর পরিবেশে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো সমাজের একটি অংশের শিশু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত থেকে। এবারের প্রতিপাদ্যÑ “শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করি”— আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

শিশুশ্রম কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। যে বয়সে একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার, খেলাধুলা করার এবং নিজের মেধা ও প্রতিভা বিকাশের কথা, সে বয়সে অনেক শিশু জীবিকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। এর ফলে তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে এবং স্বাভাবিক শৈশব হারাচ্ছে।

শিশু শ্রমের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দারিদ্র্যকে চিহ্নিত করা হলেও বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং সস্তা শ্রমের চাহিদাও এই সমস্যাকে জিইয়ে রাখছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশু শ্রম সহজে দৃশ্যমান না হওয়ায় সমস্যাটি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।

একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন তার প্রতিটি শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারে। শিশু শ্রমের কারণে একটি শিশু যেমন নিজের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হয়, তেমনি দেশও হারায় একজন সম্ভাবনাময় নাগরিককে। ফলে শিশু শ্রম নিরসনকে শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

শিশু শ্রম রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ সমূহ:
প্রথমত, শিশু শ্রমের অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দরিদ্র ও নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো সন্তানদের শ্রমে পাঠাতে বাধ্য না হয়।

দ্বিতীয়ত, সকল শিশুর জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয় ত্যাগকারী শিশুদের পুনরায় শিক্ষার আওতায় আনা এবং শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও আকর্ষণীয় ও বাস্তবমুখী করে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, শিশু শ্রম সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশু নিয়োগের বিরুদ্ধে নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

চতুর্থত, শিশু শ্রমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে পরিবার, নিয়োগকর্তা ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন ও গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পঞ্চমত, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে শিশু শ্রম প্রতিরোধে শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো শিশু শ্রমে জড়িত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ষষ্ঠত, ইতোমধ্যে শ্রমে জড়িত শিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরকে শ্রম থেকে সরিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শিশু শ্রম নির্মূল কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি উন্নত ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত। তাই শিশুদের হাতে শ্রমের সরঞ্জাম নয়, শিক্ষা ও স্বপ্নের আলো তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা